বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৮:১৮ পূর্বাহ্ন

অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি চলনবিল

 

স্টাফ রিপোর্টার, চাটমোহর : ‘প্রবাদ রয়েছে, বিল দেখতে চলন, গ্রাম দেখতে কলম-আর শিব দেখতে তালম। এই তিনটি দেখার জিনিস একসঙ্গেই মেলে চলনবিলে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিল চলনবিল। মৎস্য ভাণ্ডার খ্যাত এই বিল শুধু বিলই নয়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমিও। ভ্রমণ পিপাসু মানুষ এই বিলের সৌন্দর্য দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসে।

পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নাটোর- এই তিন জেলার সংযোগস্থলে যে বিশাল নিম্ন জলাভূমি এরই নাম চলনবিল। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ এই নিম্ন জলাভূমি একসময় মাছ ও দেশি-বিদেশি পাখির জন্য বিখ্যাত ছিল। এখন মুক্ত জলাশয়ে মাছের সংখ্যা কমে গেলেও একেবারেই ফুরিয়ে যায়নি তা।

যে বিশাল এলাকা নিয়ে এই বিলাঞ্চল তার মধ্যে রয়েছে পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, নাটোরের সিংড়া, গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম, সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা, উল্লাপাড়া ও তাড়াশ উপজেলা।

এই নয়টি উপজেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের আয়তন প্রায় এক হাজার ১৫০ বর্গ কিলোমিটার। লোক সংখ্যা ৩০ লক্ষাধিক। এই বিলের কূল কিনারাহীন ঢেউ বর্ষায় ভ্রমণ পিপাসুদের মুগ্ধ করে।

চলনবিলের ভেতর দিয়ে হাটিকুমরুল-বনপাড়া মহাসড়ক এবং চাটমোহর-মান্নাননগর সড়কে বর্ষা মৌসুমের প্রায় প্রতিদিন দেশি-বিদেশি পর্যটক বিলের মুগ্ধতা উপভোগ করে।

অনেকের মতে এখানে যদি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা যায় তাহলে তা কক্সবাজার, সেন্টমার্টিনস বা কুয়াকাটার চেয়ে কোনো অংশে কম দর্শনীয় হবে না।

এক সময় এই বিলাঞ্চলে মানুষের বসবাস ছিল না। কালক্রমে নদীবাহিত পলি মাটির চর গড়ে ওঠে বিলের নানা জায়গায়। আর এই অঞ্চলের সাহসী মানুষ মাছ ও পাখির লোভে চলনবিলের মাঝে পুকুর বা দীঘি খনন করে তার পাড়ে গড়ে তুলেছে গ্রাম।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলনবিলের বিশাল বিশাল দীঘির মধ্যে রয়েছে জয়সাগর দীঘি, উলিপুর দীঘি, তাড়াশের কুঞ্জবন, নওগাঁয় ভানুসিংহ দীঘি, বাজার দীঘি, মথুরাদীঘি, ধানচালা দীঘি, দেবীপুরের ভটের দীঘি, মুনিয়াদীঘি, শীতলাই জমিদার বাড়ির দীঘি, সগুনা দীঘি, সুলতানপুর দীঘি, ভায়াটের দীঘি ও উনুখার দীঘি।

তাছাড়া বড় বড় পুকুর কত রয়েছে তার হিসাব নিকাশ নেই। এসব দীঘি ও পুকুর এখন মৎস্য চাষের ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে।

বর্ষাকালে চলনবিল থেকে জেলেদের আহরিত মাছ বিক্রি করার জন্য চাটমোহর উপজেলার বিভিন্ন বাজারে এবং বিলের এক প্রান্তে বিশ্বরোডসংলগ্ন মহিষলুটি বাজারে গড়ে উঠেছে বিশাল আড়ত।

সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এ আড়তে মনোমুগ্ধকর বিভিন্ন প্রজাতির মাছ- যেমন পবা, কৈ, বাচা, চিতল, কাতল, বেলে, বৌ মাছ, বাঁশপাতা, শোল-গজার, রুই, মাগুর, টেংরা, পুঁটি, আইড়, বোয়াল, ফলি, চিংড়ি, টাকি, বাইন মাছ পাওয়া যায়। বিলের আকাশে রাতের তারা মানুষকে প্রাণবন্ত করে।

চলন বিলাঞ্চলের আরো দেখার মতো রয়েছে চাটমোহরের শাহী মসজিদ, হরিপুরের প্রমথ চৌধুরীর জন্মস্থান, জোনাইলে খ্রিস্টান গির্জা, শিতলাই জমিদার বাড়ি, হাণ্ডিয়ালের জগন্নাথ মন্দির, সমাজ শাহী মসজিদ, শাহজাদপুরে রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ী, শাহজাদপুরে শাহ-মখদুমের মাজার, তাড়াশের লাল মন্দির, বিনসাড়ায় বেহুলার কূপ, তাড়াশের দক্ষিণে ষোড়শ শতাব্দিতে তৈরি নশরত শাহের আমলে পাথরের তৈরি মসজিদ, নওগাঁয় শাহ শরিফ জিন্দনী (র.)-এর মাজার, পাশেই পশ্চিমে আরো একটি ভাঙা মসজিদসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন।

চলনবিল অধ্যুষিত এই এলাকায় পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বারোপ করে চাটমোহর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হাসাদুল ইসলাম হীরা বলেন, নিঃসন্দেহে চলনবিল বাংলাদেশের মধ্যে অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি।

বিশেষ করে বর্ষাকালে এই এলাকায় প্রচুর ভ্রমণ পিপাসুদের সমাগম ঘটে। তাদের নিরাপত্তা ও এই এলাকায় যদি সরকারি তত্ত্বাবধানে একটি বিনোদনের জন্য পার্ক নির্মাণ করা হয় তাহলে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম একটি বিনোদন কেন্দ্র হতো এই চলনবিল।

 

 


বিজয় নিশান উড়ছে ঐ…

© All rights reserved 2018 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!