বুধবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:৫৬ পূর্বাহ্ন

অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ইসলাম

।। রায়হান রাশেদ ।।

জগতের সব কিছু মহান প্রতিপালকের। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ মানুষও আল্লাহর গোলাম। পৃথিবী মানুষের। মানুষের হাতে পরিচালিত পৃথিবীর চলাচল। আল্লাহর জমিনে মানুষ বিচরণ করতে থাকে জীবনের তাগিদে। অনুসন্ধান করে খুঁজে বেড়ায় কী আছে সৃষ্টির ভেতর। সময়ের প্রয়োজনে জীবনের বাস্তবতায় মানুষ খুঁজে ফিরে অনেক কিছু। গড়ে তোলে জীবনের বসতঘর। চাষ করে মাটির বুক চিড়ে নানা রকম ফসল। কেননা জীবনযাত্রায় বড় রকমের প্রয়োজন দেখা দেয় অর্থনীতির। অর্থ হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার এক ধরনের পথ্য। এ অর্থই মানুষ, সমাজ ও রাষ্ট্রকে বুকটান করে দাঁড়াতে সাহস জোগায়। সুতরাং ইসলাম ধর্ম মানুষকে শিক্ষা দেয়, শুদ্ধ অর্থে স্বাবলম্বী হতে। সঠিক পথে আয়-রোজগার করতে। ইসলাম সর্ববিষয়ে মানুষকে যে সুন্দর, শোভন জীবন উপহার দিয়েছে, কোনো ধর্ম মতবাদ এমন সুন্দর জীবন উপহার দিতে পারেনি এবং পারবে না।

বর্তমান পৃথিবীর সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদ অর্থনৈতিক অভিশাপ। সমাজতন্ত্র স্বাধীন মানুষকে পরাধীন, যান্ত্রিক ও ইতর বস্তুতে পরিণত করে। পক্ষান্তরে পুঁজিবাদী অর্থনীতি মানুষকে বল্গাহীন স্বাধীন, নিপীড়ক, স্বার্থপর ও স্বেচ্ছাচারী করে তোলে। আর ইসলামী অর্থনীতি এই দুই মেরুর অর্থনীতি ব্যবস্থার মাঝে সমন্বয় সাধন করে সমৃদ্ধিশালী সর্বজনীন কল্যাণকামী ও সভ্য সমাজ বিনির্মাণে ভূমিকা পালন করে। মোদ্দা কথা, মানব রচিত কোনো তন্ত্রমন্ত্র ও অর্থব্যবস্থা সর্বজনীন হতে পারে না। অর্থনৈতিক সফলতা ও মুক্তি একমাত্র আল্লাহ প্রেরিত অভ্রান্ত সত্যের উৎস কোরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক ইসলামী অর্থনীতির মাঝেই নিহিত আছে। সমাজতন্ত্র ইতিমধ্যে ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। যেমনি আকস্মিক তার আবির্ভাব, তেমনি সহসা তার তিরোভাব। যেসব দেশ এখনো সমাজতন্ত্রের দাবিদার তারা বহুবার পরিবর্তন, সংযোজন, সংশোধন করেও কোনো ফলবান হতে পারেনি। আর পুঁজিবাদের ইতিহাস তো শোষণ, নিপীড়ন, বঞ্চনা, অন্যায় যুদ্ধ ও সংঘাতের রক্তাক্ত ইতিহাস। পুঁজিবাদের দর্শন চরম ভোগবাদী ও ইন্দ্রিয়পরায়ণতার দর্শন। পক্ষান্তরে ইসলামী অর্থনীতির দর্শন হলো জনহিতকর, সুষম ও সর্বযুগোপযোগী দর্শন, যা আবহমানকাল থেকে মানবকল্যাণে অবদান রেখে আসছে।

পৃথিবীর সমাজে অর্থনীতিকে স্বাবলম্বী করতে মানুষ রচিত করেছে বিভিন্ন মতবাদ। তারা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে নিজেদের আদর্শ। ধরেছে নানা রকম স্লোগান।

পুঁজিবাদ

বর্তমান বিশ্বে রাজনীতি ও অর্থনীতির মূল নিয়ন্ত্রক পুঁজিবাদগোষ্ঠী। বিশ্বের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানের কথা বলে পুঁজিবাদীরা যে পরিকল্পনা বা কর্মসূচি মানব বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করেছে, তাতে মানুষ সাময়িক উপকার দেখলেও এসবের গভীরে যে ‘অ্যালোপ্যাথিক’ ওষুধের মতো দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণগুলো লুকিয়ে আছে, তা আমরা অনেকেই সাধারণ চোখে দেখতে পাচ্ছি না। পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রধান ক্ষতিকর দিক হলো অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিত্তশালীদের সঙ্গে বিত্তহীনদের আকাশ-পাতাল ব্যবধান। পুঁজিবাদের মধ্যে চারটি প্রধান জিনিস রয়েছে—১. ব্যক্তির সম্পত্তিতে অন্য কারো কোনো প্রাপ্য কিংবা মানবিক অধিকার নেই। ২. অর্থোপার্জনে যেকোনো পথ বা পন্থা সে অবলম্বন করতে পারে। ৩. সম্পদের মালিক নিজ ইচ্ছামতো তার সম্পত্তি খরচ করতে পারবে। ৪. জনসাধারণের স্বার্থকে উপেক্ষা করে একজন যত ইচ্ছা সম্পদ সঞ্চয় করতে পারে।

মোটকথা, ব্যক্তি স্বার্থটাই পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য। প্রায় মধ্য যুগ থেকেই পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রধান কর্ণধার ইহুদি সম্প্রদায়। পুঁজিবাদের থিউরিতে ব্যবসা আর সুদে কোনো ব্যবধান বা পার্থক্য নেই। সবাইকে স্মরণ রাখতে হবে, পুঁজিবাদ আর সুদভিত্তিক অর্থনীতির পোশাক কিংবা সাজসজ্জা দেখতে চমকপ্রদ হলেও তা মানুষ ও মানবতার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর। পুঁজিবাদ পৃথিবীর কোনো দেশে অতীতে যেমন সুখ-শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, তেমনি ভবিষ্যতেও পারবে না।

সমাজতন্ত্র

কমিউনিজমের জনক বলে খ্যাত কার্ল মার্ক্স মূলত বস্তুবাদ আর ভাববাদের মধ্যখানে দ্বান্দ্বিক ছিলেন। তাই তাঁর বক্তব্য একেকজনকে একেক রকম তত্ত্ব দিয়েছে। কার্ল মার্ক্স পুঁজিবাদবিরোধী চিন্তাচেতনা ও বস্তুবাদের ভিত্তিতে এক নব্য অর্থনৈতিক মতবাদ কমিউনিজমের জন্ম দিলেও তিনি সরাসরি ঈশ্বরকে অস্বীকার করেছেন বলে কোথাও প্রমাণ নেই। কমিউনিজমের ইশতেহার হলো—অর্থোপার্জনের সব পথ ও পন্থা সমাজের সম্মিলিত মালিকানায় থাকবে। কোনো কিছু ব্যক্তিগত ইচ্ছায় ব্যবহার কিংবা ব্যবহারের অধিকার কারো থাকবে না। ব্যক্তিগত জীবনের ইচ্ছা, কর্ম—সবই হবে রাষ্ট্রের জন্য। প্রত্যেকের জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় উপকরণাদি দেবে সরকার। ব্যক্তি নিয়ন্ত্রিত হবে সরকার কর্তৃক। ব্যক্তি সরকারের নির্দেশে যেকোনো কাজ করতে বাধ্য। এই ইশতেহার প্রকাশের পরপরই কার্ল মার্ক্স চিন্তা কমিউনিস্ট হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত লাভ করে। কার্ল মার্ক্সের চিন্তাচেতনার সঙ্গে বাকি বিশ্বের মার্ক্সবাদীদের বক্তব্য ভিন্ন হোক কিংবা অভিন্ন, আজ আমরা বলতে বাধ্য যে মার্ক্সবাদ ব্যর্থ হয়েছে মানুষের মৌলিক সমস্যার সমাধান দিতে। কার্ল মার্ক্স এত নিবেদিত হয়েও ব্যর্থ হলেন এ জন্য যে সসীম জ্ঞানের গবেষণা ত্রুটিমুক্ত নয়। অসীম জ্ঞান ছাড়া সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কার্ল মার্ক্স মানুষের অন্ন, বাসস্থান, বস্তুর সমস্যার সমাধানের কথা বলেছেন, কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি ভাত খেয়ে ওষুধ সেবনের পর কাপড় গায়ে দিয়ে যে মানুষের মন একটু আতর কিংবা সেন্ট ব্যবহার করতে চায়। এই মন চাওয়াটাকে তিনি আবেগ কিংবা অপ্রয়োজনীয় বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি মানুষকে বস্তুবাদীর ঊর্ধ্বে প্রাণহীন বস্তুতে পরিণত করতে চেয়েছেন। তিনি বুঝতে পারেননি প্রাণ থাকলেই যে আবেগ থাকবে। প্রাণহীন বস্তু মৃত। মানুষ মৃত হলে কবর দিতে হয়।

কার্ল মার্ক্সের প্রচণ্ড আবেগ ছিল। তাঁর এই আবেগ অন্য কারো আবেগকে গুরুত্ব দিতে নারাজ ছিল বলেই মূলত এই ব্যর্থতা।

ইসলাম

ইসলামী অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো সর্বক্ষেত্রে ইনসাফসম্মত বণ্টন। পুঁজিবাদী অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো ব্যক্তিস্বার্থ। কমিউনিস্ট আবার ব্যক্তিকে এক প্রকার অস্বীকার করে রাষ্ট্রকে গুরুত্ব দিল। ইসলামী অর্থনীতিতে আবেগ কিংবা স্বার্থপরতা কাজ করেনি। মানুষের বাস্তবিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি নীতি ও কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। একজন ব্যক্তিকে পরিপূর্ণ স্বাভাবিক ও ব্যক্তিগত অধিকার দিয়ে সঙ্গে সম্পদ ব্যবহারের ভারসাম্য রক্ষার নিয়মনীতি করে দেওয়া হয়েছে। ইসলাম বিশ্বকে উপহার দেয় ভারসাম্য অর্থনীতির পাঠ। ইসলামী অর্থনীতি প্রতিষ্ঠায় সমাজ, রাষ্ট্র ও তার মানুষ ভালোভাবে বেঁচে থাকে। আধুনিক যুগে যদি ইসলামী অর্থব্যবস্থা কায়েম করা হয়, তাহলে বিশ্বে ফিরে আসবে শান্তি, সমৃদ্ধি ও প্রগতি। ইসলাম যে অর্থনীতিতে সব মতবাদকে ছাড়িয়ে ছাপিয়ে গেছে, তার উদাহরণ মিলবে ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনকালে।

রাসুল (সা.) যখন মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন, তখন মদিনাবাসী ছিল কৃষক। অর্থনীতিতে দরিদ্র। শিক্ষায় জ্ঞানহীন। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে জঘন্য, ইতর, নিকৃষ্টলোক, শোষণ-শাসন যাদের মজ্জাগত স্বভাব। যারা ছিল ডাকাত নামে খ্যাত। যাদের নাম মানুষ ঘৃণাভরে স্মরণে আনত। একটা সময় তারা মুহাম্মদ (সা.)-এর সাহচর্য পেয়ে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ হয়ে উঠল। পৃথিবীর ইতিহাসে তারা হলো অত্যুজ্জ্বল নক্ষত্র। গরিব-কৃষক-মজদুর সমাজ অর্থনীতিতে হয়ে ওঠে স্বাবলম্বী। ইসলামী অর্থনীতি একটা ক্ষুদ্র গরিব, হতদরিদ্র দেশকে গড়ে তোলে অর্থনীতিতে স্বাবলম্বী ও পৃথিবীবাসীর জন্য মাইলফলক। সমাজ ও রাষ্ট্রকে পৃথিবীর বুকে বুকটান করে দাঁড়াতে, অর্থনীতিতে সফল সমৃদ্ধি পেতে ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.) দিলেন ১০ দফা। এই ১০ দফা অনুযায়ী বিশ্বের অর্থনীতি সাজাতে পারলে, বিশ্ব পাবে অর্থনীতি সুসজ্জিত নতুন এক মাত্রা। হবে সমৃদ্ধিতে আলোকিত। মানুষ পাবে শাসন-শোষণ থেকে মুক্তি। দারিদ্র্য থেকে মুক্তি। ১০ দফা হলো—১. হালাল উপায়ে উপার্জন ও হারাম পথ বর্জন। ২. সুদ উচ্ছেদ। ৩. ব্যবসায়িক অসাধুতা উচ্ছেদ। ৪. জাকাত ব্যবস্থার প্রবর্তন। ৫. বায়তুল মাল প্রতিষ্ঠা। ৬. মানবিক শ্রমনীতির প্রবর্তন। ৭. ওশরের প্রবর্তন ও ভূমিস্বত্ব ব্যবস্থার ইসলামীকরণ। ৮. উত্তরাধিকার ব্যবস্থার যৌক্তিক রূপদান। ৯. রাষ্ট্রের ন্যায়সংগত হস্তক্ষেপ বিধান। ১০. নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রবর্তন।

মানবতার বন্ধু, দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ বিপ্লবী, সফলতম সমাজসেবক ও সমাজসংস্কারক হজরত মুহাম্মদ (সা.) মাত্র ১০ বছরের প্রচেষ্টায় সমকালীন অর্থনীতিতে এমন পরিবর্তন এনেছিলেন, যা ছিল এককথায় অনন্য, যা ছিল অভূতপূর্ব ও অশ্রুতপূর্ব। এ কর্মসূচির মাধ্যমে অত্যাচার ও শোষণের পথ রুদ্ধ করেছেন। দাসভিত্তিক অর্থনীতির মূলে তিনি কুঠারাঘাত করেছেন। বিলাসিতা ও আড়ম্বরপূর্ণ জীবন উত্খাত করেছেন। অবৈধ পথে উপার্জনের মাধ্যমে বিপুল বিত্তের মালিক হয়ে সাধারণ মানুষের ওপর ছুরি চালাবার পথ বন্ধ করেছেন। ইসলামী অর্থনীতি কায়েম হলে সমাজ-রাষ্ট্র পাবে অর্থনীতির শুদ্ধ ও সবল মেরুদণ্ড।

লেখক : ইসলামী গবেষক


    পাবনায় নামাজের সময়সূচি
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ০৫:০৭
    সূর্যোদয়ভোর ০৬:৩০
    যোহরদুপুর ১১:৫১
    আছরবিকাল ১৫:৩৭
    মাগরিবসন্ধ্যা ১৭:১৩
    এশা রাত ১৮:৪৩
© All rights reserved 2019 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!