বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯, ০২:৪৬ অপরাহ্ন

অসাম্প্রদায়িক চেতনা আর সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত মাগুড়ায়

কামাল সিদ্দিকী, মাগুড়া থেকে ফিরে : বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে শুরু হয়েছে মাগুরার ঐতিহ্যবাহী কাত্যায়নী পুজা। পাঁচদিন ব্যাপী এই পুজায় দেশ-বিদেশের লক্ষাধিক মানুষ প্রতীমা দর্শন ও উৎসবে মিলিতে হয়েছেন।

দর্শনার্থীর আগমনের বিষয়টি মাথায় রেখে আয়োজকরা পুজাকে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করার জন্য নানা পুরাকীর্তি ও যুদ্ধ বিগ্রহের কাহিনীর আদলে প্রতিটি পুজা মন্ডপ সাজিয়েছেন। দৃষ্টি নন্দন প্রতিমা, গেট, প্যান্ডেল ও আলোক সজ্জায় বৈচিত্র এনে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।

শান্তিপূর্ন ভাবে সর্বোবৃহৎ এই পুজা উৎসবের নিরাপত্তা, আইন শৃংখলা রক্ষায় জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন প্রশংসনীয় ভূমিকা গ্রহন করেছে।

সারাদেশের হিন্দু হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে দূর্গাপূজা সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হলেও মাগুরায় এর ব্যাতিক্রম। এখানে যুগ যুগ ধরে পালিত হচ্ছে কাত্যায়নী পুজা। মাগুড়া দূর্গা পুজা পালিত হলেও তেমন আড়ম্বড়তা হয় না বলেই জানালেন স্থানীয়রা। এখানকার মানুষের কাছে কাত্যায়নী পুজাই তাদের মূল উৎসব।

মন্ডপগুলো ঘুরে দেখার সময় বিভিন্ন শ্রেনী-পেশার মানুষের সাথে কথা বলে মনে হচ্ছিলো ‘সত্যিই বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক চেতণার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। নিজ নিজ ধর্মকে সন্মান জানিয়ে সবাই কাত্যায়নী উৎসবে মেতে উঠেছেন। সবার আগে মানব ধর্ম এটাই প্রমাণ করে মাগুড়ার কাত্যায়নী পুজা। ধর্ম যার যার উৎসব সবার-এই অসাম্প্রদায়িক চেতনা আর সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত মাগুড়ার কাত্যায়নী পুজা চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করতে চাইবে না।

কাত্যায়নী পুজা দেখতে পার্শবর্তী দেশ ভারত, আমেরিকা, কোরয়িাসহ বিভিন্ন দেশের নারী-পুরুষ ভক্ত তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে মাগুড়ায় এসেছেন।

লাখো দর্শনার্থীর ভীড়ে মন্ডপগুলো নানা ধর্ম,বর্ণ, নারী, পুরুষ, শিশুর উপস্থিতিতে মানুষের মিলন মেলায় পরিনত হয়েছে। চট্রগ্রাম থেকে অঞ্জণ দত্ত ও তার স্ত্রী এবং কন্যাকে নিয়ে মাগুরায় এসেছেন কাত্যায়নী পুজা উপভোগ করতে। তিনি জানান, প্রতি বছরই তিনি এ পুজা দেখতে মাগুরায় আসেন।

তার এলাকা থেকে বহু মানুষ এসেছেন মাগুড়ায় কাত্যায়নী মন্ডপের প্রতীমা দর্শনে। সাড়ি সাড়ি বাস, মিনিবাস, মাইক্রোবাস, কার এর উপস্থিতিতি প্রত্যেকটি মন্ডপে অদূরে পার্কিং করে সবাই প্রতীমা দর্শনে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। রাত যত গভীর হয় শত শত মানুষ দল বেঁধে মন্ডপে ঢুকছে প্রতীমা দর্শনের জন্য।

সারারাত ভরে চলে সব মন্ডপে উৎসবের আমেজ।

ফজরের আযানের কিছু আগেই গান, বাজনা, বাদ্যযন্ত্রের শব্দ বন্ধ হয়ে যায়। শ্রী শ্রী জামরুলতলা মন্দির, শিকদার বাড়ী মন্দির, সাতদোহা ন্যাংটা বাবা আশ্রম, সাতদোহা বেলতলা মন্দির, তাঁতীপাড়া মন্দির, কাত্যায়নী পুজা স্মৃতি সংঘ, নিতাই গৌর গোপাল সেবাশ্রম, কালী বাড়ী মন্দিরসহ সবগুলো মন্দিরেই ভীড় ঠেলে প্রতীমা দর্শন খুবই কষ্ট সাধ্য হলেও কেউ ধর্মীয় উৎসব পালন থেকে নিজেকে বিরত রাখছেন না।

মাগুরা নিতাই গৌর গোপাল সেবাশ্রমের অধ্যক্ষ চিমায়নন্দ মহারাজ বলেন, মা দুর্গা বহুরূপে আবির্ভূত হয়েছেন। মা কাত্যায়নী মা দুর্গার একটি রূপ। দ্বাপর যুগে ভগবান শ্রী কৃষ্ণকে পাওয়ার জন্য গোপিরা যমুনা নদীর তীরে বালু দিয়ে প্রতিমা বানিয়ে প্রথম শ্রীশ্রী ক্যাত্যায়নী পুজা শুরু করেন। এতে ভগবান শ্রী কৃষ্ণ খুশি হয়ে গোপি গনের মনোবাসনা পূর্ণ করেন। তারপর থেকেই মূলত কাত্যায়নী পুজার প্রচলন ঘটে। সেই ধারাবাহিকতায় যুগ যুগ ধরে মাগুড়া জেলায় চলছে কাত্যায়নী পুজা।

মাগুরা জামরুলতলা পুজা কমিটির সভাপতি, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পংকজ কুন্ডু বলেন, দুর্গাপূজাকে হিন্দুধর্মের মানুষেরা বড় পুজা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। সারাবিশ্বে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ধুমধামের সাথে ব্যাপক আয়োজনে দুর্গাপূজা করে আসলেও মাগুরায় এর ব্যাতিক্রম। মূলত বর্ষার শেষ দিকে ভাদ্র ও আশ্বিন মাসে ইলিশসহ অন্যান্য মছের ভরা মৌসুম।

এ সময় মাগুরা পারনান্দুয়ালীর এলাকার জেলেরা জাল ও নৌকা নিয়ে নদীতে মাছ ধরতে সময় কাটাতেন। কার্তিক মাসে মাছের মৌসুম শেষ হলে তারা বাড়িতে ফিরে আসেন। যে হেতু আশ্বিন মাসে অনুষ্ঠিত দুর্গা পূজায় জেলে সম্প্রদায়ের মানুষেরা অংশ নিতে পারতেন না, সে জন্য এ সম্প্রদায়ের নেতা ধর্নাঢ্য ব্যবসায়ী ‘সতিশ মাঝি’ দুর্গাপূজার ঠিক একমাস পরে কার্তিক মাসে পারনান্দুয়ালী গ্রামে দুর্গাপূজার আদলে প্রতীমা তৈরি করে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় কাত্যায়নী পূজা শুরু করেন।

মূলত: তারই ধারাবাহিকতায় মাগুড়া জেলায় ছড়িয়ে পড়ে কাত্যায়নী পুজা। কত বছর ধরে মাগুড়া অঞ্চলে কাত্যায়নী পুজার প্রচলন ঘটে-এমন তথ্যের সঠিক হিসাব পাওয়া না গেলেও অধিকাংশ মানুষ জানান, প্রায় ৫০/৬০ বছর ধরে চলছে কাত্যায়নী পুজা।

শালিকার সিংড়া গ্রাম থেকে এসেছেন গোবিন্দ চন্দ্র বিশ্বাস (৭০) দম্পত্তি। তিনি বলেন, আমি প্রায় ৫০ বছর ধরে দেখছি মাগুড়া অঞ্চলে কাত্যায়নী পুজা উৎসব মূখর পরিবেশে পালিত হচ্ছে। রামনগর থেকে এসেছেন দীনেশ টিকাদর (৬০) তিনি বলেন আমার বুদ্ধির পর থেকেই কাত্যায়নী পুজা এই এলাকায় চলছে।

দরি মাগুড়া সার্বজনিন পুজা উদযাপন কমিটি ছানা বাবুর বটতলা মন্দিরের সাধারন সম্পাদক বিকাশ সাহা বলেন, শুনেছি ১৯৪০ সাল থেকে এই অঞ্চলে কাত্যায়নী পুজা শুরু হয়। এ অঞ্চলের হিন্দু সম্প্রদায়ের মূল উৎসব কাত্যায়নী পুজায় সব ধর্মের মানুষের উপস্থিতি প্রাণবন্ত করে তোলে।

বিশ্বে একমাত্র মাগুরাতেই ব্যাপক আয়োজনে এ পুজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে বলে তিনি জানান। দেশ-বিদেশ থেকে এ পুজা দেখতে দর্শনার্থীর আগমন ঘটে। হিন্দু-মুসলমান সকলে এক হয়ে উৎসবে অংশ নেন। এই জেলা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধন বড্ড মজবুত। তিনি জানান, অন্যবারের চেয়ে এবার নতুন-নতুন থিমের ওপর পুজার আয়োজন করা হয়েছে।

একটি পুজার পেছনে প্রতীমা, গেট, প্যান্ডেল ও লাইটিংর জন্য প্রায় অর্ধ কোটি টাকা খরচ হয়েছে বলে তিনি জানান। শহরের মধ্যে অধিকাংশ মন্ডপেই ৩০/৪০ লাখ টাকা করে খরচ হয়েছে বলে ধারণা দেন আয়োজকরা।

মাগুরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (পদোন্নতি প্রাপ্ত পুলিশ সুপার) তারিকুল ইসলাম বলেন, কাত্যায়নী পুজা উপলক্ষে মাগুরা উৎসবের শহরে পরিণত হয়। শান্তিপূর্ন ভাবে এ পুজা সম্পন্ন করার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পূজামন্ডপগুলো সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে।

বিগত বছরগুলোর মত এবারও শান্তিপূর্ন ভাবে কাত্যায়নী পুজা সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। জেলা পুজা উদয়াপন কমিটির তথ্যমতে, এ বছর শহরে ১৪টিসহ মাগুড়া জেলার ৮৯টি মন্ডপে কাত্যায়নী পুজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

শনিবার থেকে শুরু হওয়া কাত্যায়নী পুজা বৃহস্পতিবার প্রতীমা বিসর্জনের মধ্যদিয়ে শেষ হবে।


    পাবনায় নামাজের সময়সূচি
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ০৪:৫৫
    সূর্যোদয়ভোর ০৬:১৭
    যোহরদুপুর ১১:৪৪
    আছরবিকাল ১৫:৩৬
    মাগরিবসন্ধ্যা ১৭:১২
    এশা রাত ১৮:৪২
© All rights reserved 2019 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!