রবিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৫:১৩ অপরাহ্ন

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস ও বাংলাদেশের শ্রম আন্দোলন

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস ও বাংলাদেশের শ্রম আন্দোলন

।। এবাদত আলী ।। শ্রমিক এবং কল-কারখানা একে অপরের পরিপূরক হলেও এমন এক সময় ছিলো যখন কল- কারখানার মালিকগণ শ্রমিকদের প্রতি সব সময়ই ছিল উদাসিন। সমস্ত দিন রাতের মধ্যে কোথাও বা ২০ ঘন্টা একটানা শ্রম দিতে হত তখনকার শ্রমিক সমাজকে।

ইউনিফর্ম পরে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে কোমল প্রাণ যে শিশুর স্কুলে যাবার কথা, বিত্তবানের কারখানায় বিরামহীন শ্রমে সেই শিশুটিই গনগনে চুল্লির পাশে চরম ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়তো।

মালিকদের শনৈঃ শনৈঃ উন্নতির বাহন হিসাবে শ্রমিকদের জন্য রাত দিনের কোন বাচ বিচার ছিলনা। শোষণ ও যন্ত্রনার সে এক অসহনীয় পরিস্থিতি বিরাজ করছিলো। অথচ তারা প্রতিবাদ করতে পারতনা।

কোথাও যদি কোন শ্রমিক ভুলক্রমে ক্ষীণতম প্রতিবাদ জানাত, তাহলে তাদের উপর চলত অকথ্য নির্যাতন। তাদের শরীর প্রহারের আঘাতে জর্জরিত হয়ে উঠতো।

তখনকার দিনে শ্রমিক নির্যাতন চলছিল সারা দুনিয়া জুড়ে। শ্রমিকদের প্রতি মানবিক আচার আচরণ প্রদর্শন তথা তাদের প্রয়োজনীয় আরাম আয়েস আর নিরাপত্তার প্রতি মালিক পক্ষ ছিল সম্পূর্ণ উদাসিন।

শ্রমিক শোষণের এ হেন পরিস্থিতির মাঝেই অন্যায় ও মানবিক কালো নীতি দূর করতে শ্রমিক সমাজ তাদের আন্দোলন গড়ে তুলতে থাকে। এদিকে ফরাসি বিপ্লব সংঘটিত হয়। সংঘটিত হয় জার্মানীতে বিপ্লব। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল শ্রমিক শ্রেণির মানুষের অবাধ অংশ গ্রহন।

১৮৬৪ সালে শ্রমিক আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমজীবী মানুষ এই প্রথম একটি শ্রেণি হিসাবে আদর্শিক ও রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হয়ে ওঠে।

১৮৭১ খ্রিষ্টাব্দে প্যারি কমিউনের মাধ্যমে শ্রমিক শ্রেণির প্রথম ক্ষমতা দখল অত:পর লাখ লাখ শ্রমিকের আত্মত্যাগ ও দেশান্তরি হওয়ার মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষের বিপ্লবী চেতনা শানিত হয়ে ওঠে। শ্রমজীবী মানুষের রক্তাক্ত সংগ্রামের ধারায় আমেরিকায় শ্রমিক শ্রেণি সংগঠিত হয় এবং সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

প্যারি কমিউনের পর আমেরিকার শিকাগো শহরেই সবচেয়ে বিশাল শ্রমিক আন্দোলনের সৃষ্টি হয়। এই আন্দোলন রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের আন্দোলন না হলেও শ্রমিকরা তাদের দাসত্বের শৃংখলে আঘাত করতে সক্ষম হয় এবং শ্রমজীবী মানুষ যে পুঁজির দাস নয় তা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়।

শ্রমিক শোষনের অমানবিক দিক তুলে ধরে ৮ ঘন্টা কাজের দাবিতে মার্কিন মূলুকের গোটা শ্রমিক সমাজ সোচ্চার হয়ে ওঠে। দিন ও রাতের ২৪ ঘন্টার মধ্যে ৮ ঘন্টা কাজ ৮ ঘন্টা বিশ্রাম ৮ ঘন্টা বিনোদন এই দাবি ওঠে পুঁজিবাদি আমেরিকাসহ গোটা দুনিয়ার শ্রমজীবী মানুষের প্রাণের দাবি।

তাদের এই ন্যায় সঙ্গত দাবির সবচেয়ে সরব ও জঙ্গি প্রকাশ ঘটে ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দের পয়লা মে এবং পরবর্তী কয়েক দিনের ঘটনা ছিল অত্যন্ত দুঃখ জনক।

মে মাসের চার তারিখে শিকাগো শহরের ‘ হে’ মার্কেটের এক সমাবেশে শ্রমিক-পুলিশের সংঘর্ষে ৪ জন শ্রমিক নিহত হয়। পুলিশ মারা যায় ৭ জন। অনেক শ্রমিক আহত হয়। আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারি শ্রমিক নেতাদের গ্রেফতার করা হয়।

তারপর বিচারের নামে শুরু হয় প্রহসন। অজুত শ্রমিকের মিলিত কন্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার ঘৃন্য ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে শোষক ও তার দালাল গোষ্ঠি।

প্রহসনমূলক বিচারের মাধ্যমে ১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দের ১১ নভেম্বর ফাঁসিতে ঝুলানো হয় শ্রমিক আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারি নেতাদের। অনেককেই দীর্ঘমেয়াদী কারাদন্ডাদেশ প্রদান করা হয়।

এরপর আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবারের সম্মেলনে এবং প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা সম্মেলনে ১৮৯০ খিষ্টাব্দের ১ মে থেকে এই তারিখটিকে দুনিয়া জুড়ে শ্রমজীবী মানুষের মৈত্রি, সংহতি ও অধিকারের দিন হিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

সেই থেকে আমেরিকার শিকাগোর রাজপথে শ্রমজীবী মানুষের বুকের রক্তে রঞ্জিত স্মৃতি মনে রেখে বিশ্বের প্রতিটি দেশেই পালিত হয়ে আসছে আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস।

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের মাটিতে ১৯৭২ সালের ১ মে তারিখে মহান মে দিবসের রাষ্ট্রিয় স্বীকৃতি মেলে। বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এদিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন। তৎকালিন সরকার প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এদিন জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন।

এর আগে পরাধীন ভারতবর্ষে ১৯২৩ সালে মাদ্রাজে সর্বপ্রথম মে দিবস পালিত হয়। কমিউনিষ্ট নেতা সিঙ্গাভেল্যু চেটিয়া মেয়ের লাল শাড়ির অংশ কেটে মে দিবসের লাল পতাকা উত্তোলন করেন।

তৎকালিন অবিভক্ত বাংলার প্রাণকেন্দ্র কলকাতায় ১৯২৭ সালে প্রথম মে দিবস পালন করা হয়। পাকিস্তান আমলে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করায় তৎকালিন পূর্ব-পাকিস্তানের শ্রমিক শ্রেণি প্রথমবারের মত বিপুল উৎসাহ নিয়ে মহান মে দিবস পালন করে।

আদমজিতে প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক লাল পতাকা নিয়ে মিছিল ও সভা-সমাবেশ করে। সে সময় ১ মে দিবসকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণার জোরালো দাবি উত্থাপিত হয়। কিন্তু পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠি তাতে কোন কর্ণপাত করেনি।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময়ে শ্রমিক শ্রেণির প্রতি মমত্ববোধের বহিপ্রকাশ ঘটিয়ে বীর সেনা মুক্তিযোদ্ধাগন তাদের ক্যাম্পে ক্যাম্পে মে দিবস পালন করে।

১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র বিশ্ব ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সদস্য পদ লাভ করে।

১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠনের পর সারা দেশে একটি শ্রমিক গঠন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটা ছিলো একক শ্রমিক সংগঠন যার নাম দেয়া হয়েছিলো জাতীয় শ্রমিক লীগ।

এবছরই অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। শ্রমিক শ্রেণির সংগঠনগুলোতে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় দলীয় রাজনৈতিক ধারার চর্চা। যা শ্রমিক শ্রেণিকে বিভাজনের মধ্যে ফেলে দিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

১৯৭৯ সালে স্বাধীন দেশের প্রথম সেনা শাসিত সরকার লে:জে: জিয়াউর রহমান তথাকথিত বহু দলীয় গণতন্ত্রের নামে মৌলবাদি স্বাধীনতা বিরোধিদের রাজনীতিতে পুনর্বাসন করতে শুরু করলে শ্রমিক সংগঠন গুলোতে তার প্রতিফলন ঘটে।

জমায়াতের মতাদশের্র “ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন” নামে শ্রমিক সংগঠন গঠিত হয়। এভাবেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের লেজুড় বৃত্তিতে শ্রমিক সংগঠনগুলো জড়িয়ে পড়ে।

ফলে শ্রম জীবী মানুষের স্বার্থ রক্ষার বদলে নিজেদের গদি রক্ষার দিকেই নেতারা মনোযোগি ছিলো অধিকতর। বর্তমানেও শ্রমজীবী সংগঠন গুলোর নেতৃত্ব তাদের হাতে নেই। ফলে নিজেদের মত করে শ্রমিক শ্রেণি মাথা তুলে দাঁড়াতে গিয়ে বার বার হোচট খাচ্ছে।

তবে আশার কথা এই যে, বর্তমান সরকার বাংলাদেশের শ্রৃমজীবী মানুষের কল্যাণের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন করেছে। বাংলাদেশের শ্রম আন্দোলন অচিরেই সফলতার মুখ দেখবে বলে মনে করা যায়। (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।

 


    পাবনায় নামাজের সময়সূচি
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ০৫:০৬
    সূর্যোদয়ভোর ০৬:২৮
    যোহরদুপুর ১১:৫০
    আছরবিকাল ১৫:৩৬
    মাগরিবসন্ধ্যা ১৭:১২
    এশা রাত ১৮:৪২
© All rights reserved 2019 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!