বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৫:০১ পূর্বাহ্ন

আমাদের হুমায়ূন আহমেদ

বাংলা সাহিত্যের উন্মেষকাল থেকে আজ অবধি জন্ম নেওয়া অনেকেই নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছেন এর বিভিন্ন শাখা। তবে সাহিত্যের পরতে পরতে আনন্দের রসদ ঢুকিয়ে পাঠককে মোহগ্রস্ত করতে পেরেছেন হাতেগোনা কয়েকজন সাহিত্যিক। তাদের মধ্যে অন্যতম বিংশ শতাব্দীর বাঙালি কথাকার হুমায়ূন আহমেদ। তিনি জন্মগতভাবেই পেয়েছিলেন কিংবা অর্জন করেছিলেন এক জাদুকরী ক্ষমতা। কী সম্মোহনেই না পাঠককে বেঁধেছেন তার লেখায়! হুমায়ূন আহমেদের লেখা পড়ে তার ভক্তে পরিণত হননি এমন ব্যক্তি পাওয়া দুস্কর। কলকাতার জীবনমুখী গানের জনপ্রিয় শিল্পী নচিকেতা চক্রবর্তী এক সাক্ষাৎকারে দেরিতে হুমায়ূন আহমেদের লেখা পড়ার জন্য নিজের আক্ষেপের কথা জানিয়েছেন এভাবে- মিসির আলির মতো যে চরিত্র হতে পারে, তা বিস্ময়কর। কী অসাধারণ লেখার ক্ষমতা তার! বাংলাদেশে এলে ইচ্ছা করে হুমায়ূন আহমেদের বাড়ির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে থাকি।

মানুষকে, মানুষের জীবনকে যে চোখে তিনি দেখেছেন; সাধারণের ভেতর থেকেও তা হয়ে উঠেছে অসাধারণ। স্বপ্ন গড়া ও ভাঙার খেলায় তার পারদর্শিতা পাঠকের অবচেতন মনকে স্পর্শ না করে পারে না। গল্প বলার কৌশলেও তিনি অনন্য। কাহিনীর ভাঁজে হাস্যরস (হিউমার) জুড়ে দিয়ে পাঠককে আন্দোলিত করেছেন ইচ্ছেমতো। খেলা করেছেন পাঠকের দর্শন এবং ভাবনার জগৎ নিয়েও। পাঠক কিংবা দর্শকের স্বাভাবিক চিন্তার পথ ধরে তার চরিত্রগুলো হাঁটেনি। তিনিই কলকাঠি নেড়ে বদলিয়েছেন ঘটনা-অণুঘটনার মোড়।

হুমায়ূন আহমেদের বড় অবদান নিঃসন্দেহে বাঙালি পাঠককে সাহিত্যমুখী করা।

আমাদের দেশের যত পাঠকের বইয়ের তাকে হুমায়ূন আহমেদ স্থান করে নিয়েছেন, তার ধারেকাছেও কেউ নেই। অতি সাধারণ কিংবা অসাধারণ যে লোকটি উপন্যাস পড়াকে নিতান্ত ‘সময়ের অপচয়’ বলে এ থেকে দূরে থাকেন, তারাও তার লেখায়ে ঢুঁ না মেরে পারেন না। সব পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে যদি রূঢ়-রূঢ়ি শব্দের বদলে সাধারণ বর্ণনায় সাহিত্যকর্ম সম্পাদন করা যায়, তাতে দোষের কী?

সত্তর-আশির দশকে পশ্চিমা লেখকদের দখলে যখন এদেশের বইয়ের বাজার, ঠিক তখন হুমায়ূন আহমেদের বিস্ময়কর আবির্ভাব। বাংলা ভাষার বিশাল পাঠক সমাজ তৈরি এবং প্রকাশনা শিল্পের পুনরুজ্জীবনে তার ভূমিকা অসামান্য। বিগত ৩০ বছর ধরে বাংলা একাডেমির গ্রন্থমেলা মানেই যেন হুমায়ূন আহমেদের নিরঙ্কুুশ আধিপত্য। শুধু হুমায়ূনের ওপর ভর করেই অনেক প্রকাশনী আজ সুপ্রতিষ্ঠিত। কালজয়ী এ কথাশিল্পী নান্দনিক সৃষ্টিকর্মের ঊর্ধ্বমুখী জনপ্রিয়তায় একে একে ছুঁয়েছেন সাফল্যের সব চূড়া। ৬৪ বছরের বর্ণাঢ্য জীবনে লিখেছেন পাঠকনন্দিত দারুণ সব গল্প-উপন্যাস। নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাণে বারবার মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। তার সৃষ্ট চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে পাঠক-দর্শক হেসেছেন-কেঁদেছেন। সত্তর দশকের শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় হুমায়ূন আহমেদের প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ প্রকাশিত হলে বাংলাদেশের সাহিত্যানুরাগীদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। প্রখ্যাত সমালোচক-পণ্ডিত আহমদ শরীফ উক্ত গ্রন্থটির ভূমিকায় বাংলা সাহিত্যের আকাশে হুমায়ূন আহমেদ নামক এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের উদয়ের ঘোষণা দেন। হুমায়ূনের দ্বিতীয় উপন্যাস ‘শঙ্খনীল কারাগার’কে কবি শামসুর রাহমান বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

‘হিমু’ ও ‘মিসির আলি’ চরিত্র দিয়ে লজিক-অ্যান্টি লজিকের প্রতিনিধিত্ব করিয়েই হুমায়ূন আহমেদ থেমে থাকেননি। বাঙালি জীবনের সবচেয়ে বড় ঘটনা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে তিনি আটটি উপন্যাস লিখেছেন; বানিয়েছেন দুটি চলচ্চিত্র এবং বহু টিভি নাটক। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এমন সাবলীল ভঙ্গিতে তিনি গল্প লিখেছেন, যেন চাইলেই ছুঁয়ে দেখা যায় মুক্তিযুদ্ধ। আজ থেকে অনেক বছর পরে কেউ যদি বাংলাদেশের মানুষের জীবন সম্পর্কে জানতে চায়, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে চায়, তাকে অবশ্যই হুমায়ূন আহমেদের লেখা পড়তে হবে। এটা অবশ্যম্ভাবী। হুমায়ূন আহমেদ তার ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘১৯৭১’ প্রভৃতির মাধ্যমে অমর হয়ে থাকবেন। নন্দিত কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনও এমনটা মনে করেন। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান নিয়ে ‘মাতাল হাওয়া’, মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধ-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ তুলে এনেছেন সর্বশেষ প্রকাশিত উপন্যাস ‘দেয়াল’-এ।

মানুষই সাহিত্যকে স্থায়িত্ব দেয়। সবটাই নির্ভর করে, কাকে মানুষ প্রয়োজনীয় মনে করে নিজেদের প্রকাশ ও বিকাশের জন্য। যে সাহিত্য মানুষের জীবন ও নিয়ত সংগ্রামকে ধারণ করে, তা টিকে যায় বহুকাল। তার লেখায় তত্ত্ব কম, কিন্তু জীবনবোধ প্রবল-তীক্ষষ্ট। পাঠকের চাপা ইচ্ছেগুলোর প্রতিফলন পাওয়া যায় তার উপন্যাস ও নাটকে।

হুমায়ূন আহমেদের বইগুলো খুব বেশি নিমগ্নতা দাবি করে না। তাই পড়ে ফেলা সহজ ও আনন্দদায়ক। অনেকে মনে করেন, সহজ জিনিস মানুষ সহজে বিস্মৃত হয়। তার প্রতি আকর্ষণ কমতে থাকে। অথচ এ কথাশিল্পীর সৃষ্টি সময়ের সঙ্গে আরও বেশি পঠিত হচ্ছে, আলোচিত হচ্ছে। তিনি না থাকলেও তার সৃষ্টিকর্ম বহুকাল ধরে জোগাবে আমাদের মনের খোরাক- এ কথা নির্দি্বধায় বলা যায়।


বিজয় নিশান উড়ছে ঐ…

© All rights reserved 2018 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!