বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ০২:০৭ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :

আমার স্মৃতিতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ

 

।। এবাদত আলী।।

(পুর্ব প্রকাশের পর)
১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আহমেদ রফিক জয়লাভ করেন এরই কিছু দিন পর নিজ বাড়িতে প্রবেশ করার মুহূর্তে ছাত্র ইউনিয়নের ভাসানী ন্যাপের নকশাল নামধারীরা তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

আমি যখন পাবনা রাধানগর মজুমদার একাডেমীর (আরএমএকাডেমী) ছাত্র ছিলাম তখন ১৯৬৫-৬৬ সালে আমি ছিলাম আর এম একাডেমী ছাত্র সংসদের সর্বপ্রথম জি এস এবং আরএম একাডেমীর প্রথম বার্ষিকী সম্পাদক।

এস এসসি পাশ করার পর পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হলে এডওয়ার্ড কলেজে যখন বিএ অনার্স (বাংলা )এর প্রথম বর্ষের ছাত্র তখন কলেজ শাখা ছাত্র লীগের প্যানেলে ১৯৬৭-৬৮ সালে বার্ষিকী সম্পাদক পদে নির্বাচন করেছিলাম।

শুধু তাই নয় এডওয়ার্ড কলেজের খেলা-ধুলা ও প্রতিটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমার অবাধ বিচরন ছিল। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হাস্য-কৌতুক পরিবেশন, অনুষ্ঠানের ঘোষক এবং গীতি নকশাসহ যে কোন ধারা বর্ণনায় আমার উপস্থিতি ছিল অনিবার্য।

আর সে কারণে তখন থেকেই ছাত্র নেতার কাতারে থকায় উক্ত নেতাগণ ছিলেন আমার পূর্ব পরিচিত। আমি ১৯৬৯ সালের ২২ এপ্রিল তারিখে ভুমি রাজস্ব বিভাগে সরকারি চাকুরিতে যোগদান করি।

কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে ১৯৭১ সালে সরকারি চাকুরি হতে আমাকেসহ পুর্ব পাকিস্তানের প্রায় ৪শ জনকে একই সঙ্গে ছাঁটাই করা হলে ফেব্রুয়ারি মাসের ২৮ তারিখ হতে বেকারত্বের খাতায় নাম লেখাতে হয়। ফলে সারাদিন ঘুরে বেড়ানো ছাড়া আমার আর কোন কাজ থাকেনা।

নেই কাজ তো খৈ ভাজ ধরনের অবস্থা। কিন্তু এই ছাঁটাই আমার জন্যে শাপে যেন বর হয়। পাবনা শহরের নেতৃবৃন্দ তাই আমার এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠনের দায়িত্ব দেন । এলাকার যুব সমাজ ও ছাত্র সমাজের কাছে ছাত্র লীগের নেতা হিসাবে পরিচিতি থাকায় সেই কাজটি আমার জন্য সহায়ক হয় ।

আমার সখের নতুন ফনিক্স সাইকেল খানাকে সঙ্গি হিসাবে কাজে লাগাই। সকালে চারটে খেয়ে বাড়ি থেকে বের হই। ফিরি রাতের বেলা।

কথায় বলে যেখানে রাত সেখানেই কাত। আমারও যেন ঠিক সেই অবস্থা। পাবনা শহরের বন্ধু-বান্ধবদের সাথে নতুন করে সখ্যতা গড়ে ওঠে।

আমার অগ্রজ পাবনা জেলা ছাত্র লীগের সভাপতি আব্দুস সাত্তার লালু (স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে আততায়ীর হাতে নিহত), এডওয়ার্ড কলেজের সাবেক জিএস সোহরাব উদ্দিন সোবা (বর্তমানে মৃত), ছাত্র নেতা মোহাম্মদ নাসিম, (বর্তমানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী) ফজলুর রহমান পটল (সাবেক ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী, মৃত) তোফাজ্জল চৌধুরী, রবি উল ইসলাম রবি, মোহাম্মদ ইকবাল(বর্তমানে মৃত), এম মুক্তার আলী, আব্দুল লতিফ (বর্তমানে মৃত), আফ্ফান আলী, আমার অনুজ প্রতিম ছাত্র নেতা পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র লীগের পাবনা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বকুল (২০০০ সালের ১০ই নভেম্বর সিরাজগঞ্জের কোনাবাড়িয়া নামক স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত), সালাহ উদ্দিন সোহেল, সহপাঠি শাহাবুদ্দিন চুপ্পু (অবসর প্রাপ্ত জেলা জজ ও দুদক কমিশনার), গোলাম সরওয়ার খান সাধন (সঙ্গীত শিল্পী, স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ), জাহিদ হাসান জিন্দান ( টেবুনিয়া ওয়াছিম পাঠশালার সাবেক প্রধান শিক্ষক), বেবী ইসলাম, নুরুল ইসলাম নুরু, জহুরুলল ইসলাম বিশু, (পাবনা পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান) শাহজাহান আলী, কামরুজ্জামান, আমিনুল ইসলাম মুক্তাসহ অনেকের সাথে নতুন করে আবার সখ্যতা গড়ে ওঠে।

বিশেষ করে রফিকুল ইসলাম বকুলের সাথে বেশি বেশি যোগাযোগ হয়। কারণ আমার গ্রামের বাড়ি মালিগাছা ইউনিয়নের বাদলপাড়া গ্রাম এবং আশে পাশের গ্রামগুলোতে তাঁর পদচারণা ছিল।

তাছাড়া পাবনা শহরের পশ্চিমাঞ্চলের ছাত্রদের মধ্যে বেশিরভাগ ছাত্রই তখন ছাত্র লীগের সদস্য ছিলেন।

১৯৭১সালের ৩ মার্চ হতে যখন সমগ পূর্ব পাকিস্তানের মত পাবনা জেলাতেও অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয় তখন ‘ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’কে আরো শক্তিশালী করে গড়ে তোলার জন্য স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন কল্পে একাধিকবার বকুল এই এলাকায় আসেন এবং ছাত্র ও যুবসমাজকে চাঙ্গা করে রাখেন।

পাবনা জেলার বিশাল অঞ্চল বিশেষ করে পাবনার পশ্চিমাঞ্চলে হিমায়েতপুর, মালিগাছা মালঞ্চি ও দাপুনিয়া ইউনিয়নে সব চেয়ে বড় সমস্যার সৃষ্টি হয়। আর তা হলো এই এলাকাটি নকশালেরা তাদের আধিপত্য বিস্তার করে।

ষাটের দশকের শেষ দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি নামাক স্থানে এক উগ্রপন্থি নেতা চারু মজুমদার নকশাল বাড়িতে বিস্ফোরন ঘটায় এবং তখন তিনি সকলের নিকট নকশাল নেতা হিসাবে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন।

তার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ভাসানী ন্যাপেরে কিছু নেতা-কর্মি এই নকশালী তৎপরতায় যোগ দেয় এবং নিরীহ মানুষের উপর অত্যাচার চালানো আরম্ভ করে।

পাবনার আমিনুল হক বিশ্বাস টিপু ওরফে টিপু বিশ্বাস, বারি সরদার, আখতারুজ্জামান আখতার, রাধানগরের নুরু খন্দকারের ছেলে মাসুদ খন্দকার, নুরপুরের শহিদ(স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় নিহত), পৈলানপুরের খোকন, কাশেম বিশ্বাস,(মৃত), পাবনা শহরের হামিদ, দাপুনিয়া ইউনিয়নের টিকরি গ্রামের রজিবুল্লা বিশ্বাস ওরফে রতন বিশ্বাস (নিহত) , তার বড় ছেলে জমশেদ (নিহত), কাসেম, মান্নান, ছলেমান, ভজলু, জোতআদম গ্রামের দেলোয়ার হোসেন(নিহত), বাদলপাড়ার লালচাঁদ (নিহত), মকবুল(নিহত), হায়াত আলী, আলেপ(নিহত), শ্রীকৃষ্টপুর গ্রামের এস্কেন্দার (নিহত), গাফ্ফার (নিহত), জলিল (নিহত), শহিদ (নিহত), হামিদ ওরফে হক্কেল, মহব্বত খোনকার(নিহত), মোসলেম(নিহত), হারুন(নিহত), মতি(নিহত), হাকিমদ্দিন মোল্লা(নিহত), মজনু (নিহত), ভাঁজপাড়া গ্রামের মুঞ্জিল (স্বাধীনতার পরে নিহত),চাঁদপুর গ্রামের আলীউজ্জামান, মালিগাছা ইউনিয়নের মালিগাছা গ্রামের ফরিদ(নিহত), নবাব আলী, মজিবর, মান্নান, হান্নানসহ শতাধিক ব্যক্তি নকশালী তৎপরতা শুরু করে। এসময় ইসলামী ছাত্র সংঘ নামে একটি সংগঠন ছিলো যারা জামাতে ইসলামীর লেজুড় বৃত্তি করতো।

ছাত্রদের আরেকটি সংগঠন ছিল যার নাম ছিল এন এস এফ । এই এন এস এফ এর সক্রিয় নেতা ছিলো রাধানগর মজুমদার পাড়ার আব্দুল বাতেন, পাবনা শহরের রিদ্দিক (পরে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে শহীদ), আটঘরিয়ার শাহজাহান আলী, (বর্তমানে এ্যাডভোকেট ও অধ্যক্ষ),আব্দুস সাত্তার মোল্লা (সাবেক চেয়ারম্যান দেবোত্তর ইউনিয়ন পরিষদ, আটঘরিয়া, পাবনা,( মৃত) আমরা যারা অসহযোগ আন্দোলনের পক্ষে ছিলাম নকশালরা তাদেরকে তাদের দলে ভিঁড়াবার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করতো।

আমাদের অবস্থান নকশালদের বিপক্ষে থাকায় আমাদের জীবনের উপর হুমকি ছিল যথেষ্ট। কারণ তাদের কাছে তখন অস্ত্র ছিল প্রচুর।

হিমায়েতপুরের পশ্চিমে দিয়াড়বোয়ালিয়াতে তাদের একটি অস্ত্র ভান্ডার ছিল। সেই অস্ত্র ওরা এই সকল এলাকার অশিক্ষিত যুবক ও শিক্ষিত বেকার যুবকদের মাঝে বিতরণ করে দেয়। ফলে আমাদের জন্য তখন এলাকায় অবস্থান করাটাই ঝুঁকিপুর্ণ হয়ে ওঠে।

তার পরও আমারা সাহস হারাইনি। আমাদের এলাকার শতাধিক যুবক ও ছাত্রকে আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হিসাবে একত্র করে ধরে রেখেছিলাম। আমাদের গ্রামের পাশে ছিল বাঙ্গাবাড়িয়া দাখিল মাদ্রাসা।

এই মাদ্রসার নিকটে একটি প্রকান্ড বট গাছ ছিল আমাদের ঠিকানা।পদ্মার শাখা বাঙ্গর নদীর উত্তর তীর ঘেঁষে এই বটগাছের নিচেই প্রতি দিন বিকালে একই সময়ে আমরা হাজির হতাম। চলতো শলাপরামর্শ ।

১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা সেই উত্তাল মার্চ মাস। বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সমগ্র পুর্ব পাকিস্তানে শুরু হলো অসহযোগ আন্দোলন। পাবনার প্রশাসন অচল হয়ে পড়ে।

গোটা প্রশাসনের চালক তখন আওয়ামী লীগ নেতা ও পাবনা ৫ আসনের এমএনএ আমজাদ হোসেন (মৃত ৬ এপ্রিল, পাবনা সদর হাসপাতালে,১৯৭১), এ্যাডভোকেট আমিনুদ্দিন (স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ), ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী (১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেল খানায় বন্দী অবস্থায় শহীদ), এ্যাডভোকেট আমজাদ হোসেন,(মৃত)।

গোলাম হাসনায়েন, আব্দুর রব বগা মিয়া (স্বাধীনতার পওে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত), ওয়াজি উদ্দিন খান (উদ্দিন ভাই), আব্দুল গণি, (মৃত) প্রমুখদের হাতে।

পাবনার ডিসি নুরুল কাদের খান তখন আওয়ামী লীগ নেতাদের কথায় তাঁর প্রশাসন চালাতেন। সারা দেশের ছাত্র-জনতার কন্ঠে তখন একই ধ্বনী ‘ বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন করো’।

বাঁশের লাঠি তৈরি করো পুর্ব বাংলা স্বাধীন করো। পিন্ডি না ঢাকা- ঢাকা ঢাকা। তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা। জয় বাংলা, জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু। জয় বঙ্গবন্ধু। ইত্যাদি ইত্যাদি। (ক্রমশঃ)

(লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও কলামিস্ট)

 

 


© All rights reserved 2018 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!