শুক্রবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৮, ০২:৪০ অপরাহ্ন

আমার স্মৃতিতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ

 

।। এবাদত আলী।।

(পুর্ব প্রকাশের পর)
এ দিকে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের শুরু থেকেই পাকিস্তানি আর্মিরা অন্যান্য জেলা শহরের মত পাবনাতেও আসতে শুরু করে।

তারা কাশিপুর শিল্পনগরী ও নুরপুর ডাক বাংলোতে তাদের আস্তানা গড়ে তোলে। খোলা জিপে চড়ে রাইফেলের নল উচিঁয়ে সারা শহর টহল দিয়ে বেড়াতে থাকে।

অপর দিকে পাবনায় বসবাসকারি বিহারীদের (অবাঙালি) স্পর্ধা যেন দিন দিন বেপরোয়া হতে থাকে। তারা যখন যাকে খুশি রাস্তা- ঘাটে অপমান অপদস্ত করতে থাকে।

পাবনার মুসলিম লীগ নেতা ডাঃ মোফাজ্জল হোসেন, পাবনা পৌর সভার চেয়ারম্যান নুরু খন্দকার, পাবনা জেলা জামাতে ইসলামীর নেতা শাহজাদপুরের মওলানা সাইফুদ্দিন ইয়াহিয়া, পাবনা সদরের তারাবাড়িয়ার মওলানা ওসমান গণি খান ওরফে ওজি খান, পাবনা পাথরতলার মওলানা আব্দুস সোবহান, মধুপুরের মওলানা ইসহাক, ইসলামী ছাত্র শিবির নেতা সাথিয়ার মওলানা মতিয়ার রহমান নিজামী, আটঘরিয়ার বিল্লাল মৌলবী, আব্দুল লতিফ মওলানা,

নাজিরপুরের কাশেম মৌলবী, ঘেঁটু মিয়া, পাবনা শহরের লোকমান নিকারি (বিহারী), হাছেন কসাই (আর্মিদের ক্যাম্পে মাংস সাপ্লাই দিত) মালিগাছা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নওশের আলী, সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর, আনোয়ার দেওয়ান, মকবুল হোসেন, রাণীগ্রামের কাইয়ুম (পুলিশ), দাপুনিয়া ইউনিয়নের চাঁদপুর গ্রামের আলিউজ্জামান,

ইউপি চেয়ারম্যান চকভবানী গ্রামের রাজাকার জয়েন উদ্দিন (স্বাধীনতার পরে দাপুনিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান), একই গ্রামের আব্দুল, মধু, জোত আদমের আওয়াল, ভাড়ারা ইউনিয়নের খোর্দ চাঁদপুরের বন্দের চেয়ারম্যান, মেম্বর ডাঃ কফিল উদ্দিন, মজিবুল হক কিরমানি, বেড়া থানার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক, সদস্য নুরু মিয়া, হাজী এন্তাজ আলী, শিক্ষক আব্দুল ওয়াহাব, মফিজ উদ্দিন, আছাদ আলী, রাজাকার কমান্ডার পিরু মিয়া, ঈশ্বরদীর মওলানা খোদাবক্স খাঁন, মওলানা আব্দুল হাই, মুলাডুলির ইউছুফ আলী চেয়ারম্যান, ইউনুছ আলী, জয়নগর গ্রামের পটল আলী, শাহাপুর গ্রামের হাশেম আলী, রূপপুর গ্রামের আবুল হাশেম ও হায়দার আলী,

বাঘইল গ্রামের আতা মৌলবী, মহাদেবপুর গ্রামের হাফেজ হাফু, ফরিদপুর থানার হাদল গ্রামের লফরা চেয়ারম্যান, মওলানা হাসান আীল, ডেমরা গ্রামের কোরবান আলী, আমজাদ হোসেন, আব্দুল লতিফ, আব্দুল গফুর, মোজাম্মেল হক। চাটমোহর থানার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান, সদস্য ময়েন উদ্দিন।

আটঘরিয়া থানার পিস কমিটির লতিফ মওলানা, রাজাকার কমান্ডার কারি ইউছুপ আলী, সদস্য মোমিন, ঠান্ডা, আবু তালেব, বদর বাহিনীর বিল্লাল মওলানা।

তাদের গুরু মওলানা মতিউর রহমান নিজামী তো গোলাম আজমের খোদ সাগরেদ। তাই ওস্তাদের সহবতে থাকতে থাকতে পাকিস্তানি আর্মিদের সাথে তার সখ্যতা হাজারো গুন বেড়ে যায়।

পাকিস্তানি আর্মিরাও বিদেশ বিভুঁইয়ে পরানের দোস্তদেরকে পেয়ে আও মেরা জান বলে তাদেরকে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে নিতে থাকে।

লোকমান নিকারি প্রতিদিন মিলিটারি ক্যাম্পে মাংস সাপ্লাই দিতে শুরু করে এবং মওলানা আব্দুস সোবহান সার্বক্ষনিকভাবে তাদের খোঁজ খবর নিতো।

এদের সঙ্গে আরেক জনের নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি হলেন, মওলানা ইসহাক। তিনিও পাকিস্তানি আর্মিদের সাথে কুটুম্বিতা করতে শুরু করেন। তিনি পরে শিক্ষা মন্ত্রী হন, তার গাড়িতে মুক্তি বাহিনী বোমা হামলা করলে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।

দেখতে দেখতে ১লা মার্চ এসে গেল। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান ৩রা মার্চ আহুত জাতীয় পরিষদের বৈঠক বানচাল বলে রেডিও পাকিস্তান থেকে ঘোষণা করার পর থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সমগ্র পূর্বপাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন।

আর এই অসহযোগ আন্দোলনের জন্য গোটা বাংলার মানুষ তখন প্রস্তুত। পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দসহ অন্যান্য ছাত্রবৃন্দ এবং পাবনার বিক্ষুব্ধ জনতা এরই পরিপ্রেক্ষিতে পাবনা শহরে মিছিল বের করে এবং ৩ মার্চ থেকে চারদিন পাবনাতে হরতাল পালিত হয়।
ঢাকা থেকে খবর আসে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ই মার্চে রমনা রেসকোর্স ময়দানে আয়োজিত জনসভায় ভাষণ দিয়ে পরবর্তী কর্মসুচি ঘোষণা করবেন। আকাশ বানী বেতার থেকে এই ভাষণের কথা বার বার প্রচার করা হলো।

সেই সাথে আমাদের স্বেচ্ছাসেবীদের ট্রেনিং ও জোরদার করা হলো। আর ট্রেনিং প্রদানের বিশেষত্ব এই যে, আমি যখন পাবনা আরএম একাডেমীর (রাধানগর মজুমদার একাডেমী) নবম শ্রেনীর ছাত্র ছিলাম তখন অর্থাৎ ১৯৬৫ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়।

আর এই যুদ্ধের সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য আমাদের স্কুলে সেনাবাহিনীর অফিসার এসে যারা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য যুদ্ধে যেতে আগ্রহি তাদেরকে নাম লেখাতে বলে। এতে আমরা অনেকেই নিজেদের মাতৃভুমি রক্ষার জন্য সৈনিকের খাতায় নাম লিখাই।

এদের মধ্যে আমাদের ক্লাসের আটঘরিয়া থানার বেরুয়ান গ্রামের শাহাদত মোল্লার (গভঃ প্রাইমারি স্কুলের হেড মাষ্টার) এর ছেলে এএসএম নজরুল ইসলাম রবি, হাপানিয়ার ইউছুফ আলী বাঘা, গাছপাড়ার নুরুল ইসলাম নুরু, ফরিদপুর থানার হাদল গ্রামের অশোক কুমার রায়, পাবনা শহরের সাহাবুদ্দিন চুপ্পু, আবুল মাসুদ লাল, মোহাম্মদ আলী রাজু, রাধানগরের আমিনুল ইসলাম মুক্তা, আবু দাউদ, পাবনা টাউন সুবেদার জাবেদ আলীর ছেলে জালাল উদ্দিন, পৈলানপুরের মিরজাউল হোসেন তারা ও সাইদুর রহমান, খোকন, রফিকুল, কুমার গাড়ির আব্দুস সাত্তার, চরের রশিদ বিশ্বাস, চাটমোহরের মোসলেম উদ্দিন ঈশ্বরদীর দাদপুরের মোজাম্মেল হকসহ আরো অনেকে । অতঃপর আমাদের ট্রেনিং শুরু হয়।

যুদ্ধের সময় বিমান হামলা হলে তাৎক্ষনিক কি ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। রাতে ব্লাকআউট বা নিস্প্রদীপ মহড়া কেমন ভাবে দিতে হবে, ট্রেঞ্চ কিভাবে খনন করতে হবে, বোমা ফেলার সময় কেমনভাবে আত্মরক্ষা করতে হবে, লোকজনকে কোথায় কিভাবে সরিয়ে নিতে হবে, আহতদের কিভাবে সেবা করতে হবে, এক কথায় ফাস্ট এইড ও সিভিল ডিফেন্স সংক্রান্ত সর্বপ্রকার ট্রেনিং এর ক্লাস হতো।

পাবনা সদর হাসপাতালের ডাক্তার, সিভিল ডিফেন্স অফিসার, পুলিশ অফিসার, সামরিক বাহিনীর অফিসারগণ আমাদেরকে হাতে কলতে প্রশিক্ষণ দিতেন।

এই প্রশিক্ষণ শেষে আমাদেরকে হায়ার ট্রেনিংএর জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়। আর সেই ট্রেনিং হবে ক্যান্টনমেন্টে। ভবিষ্যতে এই ট্রেনিংএর মাধ্যম ইচ্ছা করলে তাদেরকে সেনাবাহিনীতে রিক্রুট করা হবে বলেও জানানো হয়। কিন্তু তার আর প্রয়োজন হয়না।

১৫ দিনের ট্রেনিংএর পরই যুদ্ধ থেমে যায়। আমাদেরকে ট্রেনিং কোর্স সম্পাদনের জন্য সার্টিফিকেট প্রদান করা হয় এবং দেশের ক্রান্তিলগ্নে আমাদের সাহসিকতাপুর্ণ কাজের মুল্যায়ণ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়।

কিন্তু পাকিস্তানি আর্মিরা আমাদেরকে যা শিক্ষা দিল তাতো আর ভুল হবার নয়। কে জানতো পাকিস্তান রক্ষার জন্য সেদিন যে ট্রেনিং পাকিস্তানি অফিসাররা আমাদেরকে দিয়েছিল পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধেই আবার তাদের দেওয়া ট্রেনিং প্রয়োগ করা হবে।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসের শুরু থেকে যেন তাই ঘটতে চল্লো। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যেভাবে রিীহ মানুষের উপর জুলুম অত্যাচার আরম্ভ করেছে তাতে তাদের সাথে যুদ্ধ করা ছাড়া আমাদের আর কোন গতি নেই।

সেই সময় আমার সহপাঠিসহ আরো যারা আর এম একাডেমীতে ট্রেনিং নিয়েছিল তারাসহ অন্যান্যরা বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে স্বেচ্ছাসেবকদেরকে ট্রেনিং দিতে আরম্ভ করলাম।

আমার এলাকায় এই দায়িত্ব পড়লো আমার উপর। তাই প্রতিদিন বিকালে স্বেচ্ছাসেবকদেরকে ট্রেনিং দেওয়া এবং ট্রেনিং শেষে সকলে মিলে সন্ধ্যায় বিবিসি ও গভীর রাত পর্যন্ত আকাশবাণী কোলকাতার খবর শোনা আমাদের রুটিনে পরিণত হলো।

তখন যে কোন ব্যক্তির বাড়িতে রেডিও পাওয়া যেতনা। আমাদের গ্রামে মাত্র দুটি রেডিও ছিল।

তার একটি পুর্বপাড়ার নওশের বিশ্বাসের বাড়ি আর অপরটি আমাদের বাড়ি। বিশ্বাসের বাড়িতে ছিল মারফিউ রেডিও যা বহন যোগ্য নয়। আর আমাদের যে রেডিও ছিল যা অতি সহজেই বহন করা যেতো। তবে এরিয়াল (চিকন তার দ্বারা তৈরি জালের মত, যা উঁচু বাঁশের সাহায্যে টাঙিয়ে রাখা হতো। ) এরিয়াল ছাড়া রেডিওতে শন শন শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যেতনা। (ক্রমশঃ)

(লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক কলামিস্ট)।

 

 


© All rights reserved 2018 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!