সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ০৩:৩৩ পূর্বাহ্ন

আমার স্মৃতিতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ

 

।।এবাদত আলী।।

(পুর্ব প্রকাশের পর)
১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে একটি টেলিগ্রামের মাধ্যমে রাজস্ব প্রশাসনের সরকারি চাকুরি হতে আমাকেসহ তৎকালিন পুর্ব পাকিস্তানের প্রায় ৪শ জনকে একই সঙ্গে বিনা কারণে ছাঁটাই করা হয়। এর মধ্যে পাবনা জেলায় আমরা ১৬জন ছাঁটাইয়ের আওতায় পড়ি। টেলিগ্রাম পাবার পরপরই পাবনা তাড়াশ বিল্ডিংএ অবস্থিত জে ডি সি বা জয়েন্ট ডেপুটি কমিশনারের কার্যালয়ে গিয়ে আর ডি সি আজিজুর রহমান এবং জয়েন্ট ডেপুটি কমিশনার ইসরাইল হক এর সাথে সাক্ষাত করি।

তাঁরা বলেন এটা আমাদের এক্তিয়ারের বাইরে। অগত্যা ডেপুটি কমিশনার বা জেলা প্রশাসক নুরুল কাদের খানের সঙ্গে সাক্ষাত করি। তিনি সমবেদনা জানানো ছাড়া তার আর কিছুই করার নেই বলে জানান। সেই সঙ্গে তিনি তাঁর সাথে মাঝে মধ্যে দেখা করে খোঁজ খবর নিতে বলেন।

আমি সুযোগ বুঝে তাঁর সাথে দেখা করতাম। তিনি বলতেন আপনি আমার ষ্টাফ, আমার নিজের লোক। কিন্তু সরকার ছাঁটাই করেছে। পুনরায় আদেশ না দিলে আমার কিছুই করার নেই। টেলিগ্রামের মর্মানুসারে সরকারি আদেশ মোতাবেক আমি ফরিদপুর থানর ডেমরা ইউনিয়ন ভুমি অফিসের (তহশিল অফিসের) তহশিলদার –ইন-চার্জ এর নিকট সকল চার্জ বুঝে দিয়ে নিজ বাড়ি বাঙ্গাবাড়িয়া- বাদলপাড়ায় বেকার অবস্থায় দিনাতিপাত করতে লাগলাম।

আর মাঝে মধ্যে ডিসি নুরুল কাদের খানের সঙ্গে সাক্ষাত করতাম। এই ডিসি নুরুল কাদের খানই পাকিস্তানি আর্মিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর মাঝে ক্ষোভের আগুন লক্ষ্য করেছিলাম। তাই আমাদের স্বেচ্ছা সেবকদের ট্রনিংএর কথা তার কাছে অকপটে বলতাম।

তিনিও আওয়ামী লীগ নেতা আমজাদ হোসেন, অ্যাডভোকেট আমিনুদ্দিন, রফিকুল ইসলাম বকুল, ওয়াজি উদ্দিন খান, আব্দুর রব বগা মিয়া, সোহরাব উদ্দিন সোবা, বেবি ইসলাম, আব্দুস সাত্তার লালু, জহুরুল ইসলাম বিশুসহ পাবনার আওয়ামী লীগ নেতা ও ছাত্র লীগ নেতাদের কর্মকান্ডের কথা আভাস ইঙ্গিতে আমাকে বলতেন।

তখন পুর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা থেকে পাবনায় খবরাখবর পাওয়া ছিলো দুষ্কর। তখন দৈনিক আজাদ, দৈনিক ইত্তেফাক. দৈনিক পাকিস্তান ছাড়া বাংলা প্রত্রিকা পাওয়া যেতনা। পাবনা ইদারা পট্রির উত্তর পাশ ঘেঁষে বিহারীদের যে ফলের দোকান ছিলো সেখানে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ইর্দু ভাষায় প্রকাশিত দু তিনটি পত্রিকা আসতো।

ছোট বেলায় মাদরাসার ছাত্র ছিলাম বিধায় অবাধে উর্দু পত্রিকা পড়তে পারতাম। মাঝে মধ্যে গিয়ে তা পড়তাম। কিন্তু পত্রিকা কি আর সকল খবর প্রকাশ করে। তবে এটা পরিষ্কারভাবে বুঝা যেত যে সামনে একটা বড় ধরনের কিছু ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে।

পাকিস্তানি শাসকগণ কোন ক্রমেই বাঙালিদের হাতে শাসন ক্ষমতা যে, ছেড়ে দিবেনা তা প্রায় সকল বাঙালির কাছেই দিবালোকের মতো পরিষ্কার ছিলো। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে ৩১০ আসনের মধ্যে ১৬৭ আসনে জয় লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের ম্যান্ডেট লাভ করে।

‘বাঙালি শাসন মেনে নেয়া যায়না’ এই নীতিতে পাকিস্তানি সামরিক শাসকগণ নির্বাচিত এই জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠে। বঙ্গ বন্ধুর নেতৃত্বে বাংলা জাতীয় নেতৃবৃন্দএর প্রতিবাদে রুখে দাঁড়ায়। শুরু হয় অধিকার আদায়ের সংঘাত।

পুর্ব-পাকিস্তানের ছাত্র সমাজ এই আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। বঙ্গবন্ধু ছাত্রদের এক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে পুর্ব বাংলার ম্যাপ অঙ্কিত একটি পতাকা প্রদান করেন। এই পতাকাই পরবর্তীতে বাংলাদেশের পতাকা হিসেবে গৃহীত হয়। ছাত্রদের এই সংগঠন প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে ১৯ টি জেলা ও উক্ত জেলাধীন প্রতিটি মহকুমা শহর এবং গ্রাম-গঞ্জে শুরু হয় স্বেচ্ছাসেবকদের যুদ্ধ প্রস্তুতি মহড়া।

কোন কোন স্থানে সশস্ত্র মহড়াও অনুষ্ঠিত হতে থাকে। জাতীয়তাবাদি এই আন্দোলনে ছাত্র ও যুব সমাজের অংশগ্রহণ জন সমাজকে আরো উৎসাহিত করে তোলে।

পাবনা শহরের পাবনা জেলা স্কুল ছিল প্রধান ট্রেনিং ক্যাম্প। আর এর সহায়তাকারী ছিলেন পাবনা জেলা স্কুলের হেড মওলানা কছিম উদ্দিন আহমেহ। (স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে ১০ জুন ১৯৭১ শহীদ)। পাবনা জেলার উল্লাপাড়ায় তার বাড়ি।

তিনি কোলকাতা আলিয়া মাদরাসায় পড়াশোনা শেষে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে লেখাপাড়া করেন। ছাত্র জীবনে স্কাউটিংএ জড়িত ছিলেন। কর্মজীবনে তিনি পাবনা জেলা স্কুলে হেড মওলানা ছিলেন। পাবনার সকলের কাছেই তিনি হেড মওলানা স্যার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন শিক্ষানুরাগি ও সমাজ সেবক।

তিনি ছিলেন পাবনার যুব সমাজের দেশ প্রেম ও নৈতিক মনের প্রেরণা। পাবনা নৈশ মহাবিদ্যালয়, পাবনা ইসলামিয়া কলেজ (বর্তমানে শহীদ বুল বুল কলেজ ) তাাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পুর্বে পাবনা জেলা স্কুলের স্কাউটিংএর সামগ্রি সরবরাহ করে যুদ্ধের প্রস্তুতিমুলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন।

সে সময় পাবনা জেলা স্কুলে ট্রেনিং গ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন ছাত্রলীগের পাবনা জেলা শাখার সভাপতি আব্দুস সাত্তার লালু, সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বকুল। সেলিম (শহীদ সেলিম, যার নামানুসারে সেলিম নাজির উচ্চ বিদ্যালয় আছে) তখন পাক আর্মিতে চাকুরী করতেন। তিনি একটি পিস্তল নিয়ে আসেন। পরে আর তিনি চাকুরিতে ফিরে যাননি। গোলাম আলী কাদেরী, সানিক দিয়ারের হাবিব রেজা, বিড়ি শ্রমিক রাজা, গফুর তাদের সঙ্গে ছিল।

সুবাস বাবু তখন এক ধরনের পেট্রোল বোমা তৈরি করতে পারতেন। তার কাছ থেকে এই বোমা তৈরি শিখতেন বেবী ইসলাম, জহুরুল ইসলাম বিশু, রকু, বাবু প্রমুখ।

সেখানে প্রশিক্ষণ প্রদানকারীদের মধ্যে ছিলেন এক্স আর্মি আব্দুল হাই, নগরবাড়ির আব্দুল কাদের। সেই প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর আরো অসংখ্য সদস্য অংশ গ্রহণ করেন।

১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় আমাদের সাথে ট্রেনিং নিয়েছিলেন পাবনা সদরের গাছপাড়ার নুরুল ইসলাম নুরু। তিনিও তাঁর গাছপাড়া এলাকায় স্বেচ্ছাবেকদেরকে ট্রেনিং দিতে আরম্ভ করেন। আর তখন আমাদের একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল সব সময়।

এদিকে‘৭০ এর ডিসেম্বরের নির্বাচনে জয়লাভের পর পাকিস্তানের সামরিক শাসক আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সরকার গঠনে মত দিতে অস্বীকার করেন। একটি রাজনৈতিক দল জনগণের ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের ম্যন্ডেট লাভ করেছে । তারা সরকার গঠন করবে এটাই ছিলো বাস্তবতা।

কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক শাসকগণ সরকার গঠন বা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে এক আলোচনা শুরু করে। কিসের জন্য এই আলোচনা সেটা বুঝতে বাঙালি নেতৃবৃন্দের খুব একটা সময় লাগেনি। জাতীয় সংসদের নির্ধারিত অধিবেষন স্থগিতের প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৯৭১ এর ১ মার্চ দেশ ব্যাপি অসহযোগের আহবান জানান।

সর্বস্তরের জনগণ একবাক্যে বঙ্গবন্ধুর এই আহবানে সাড়া দিয়ে পুর্ব-পাকিস্তানের সমস্ত প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে অচল করে তোলে। ২ মার্চ ‘ ৭১ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের পতাকা প্রদর্শিত হয়। ৩ মার্চ ‘ ৭১ এ রমনা রেসকোর্স (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে) স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে ‘ স্বাধীনতার ইসতেহার’ পাঠ করা হয়। এই ইসতেহারে ‘ আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটিকে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
৬ই মার্চ সন্ধ্যায় বিবিসির খবরে শুনলাম পুর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর ভাইস এডমিরাল এসএম আহসানকে আকস্মিকভাবে অপসারণ করে লে.জেনারেল টিক্কা খানকে নয়া গভর্ণর নিয়োগের কথা ঘোষণা করা হয়েছে।

অপর দিকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় ২৫শে মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহ্বানের ঘোষণা দিলেন, কেননা ৭ মার্চ তারিখে রমনা রেসকোর্স ময়দানের প্রস্তাবিত জনসভায় বঙ্গবন্ধুর পরবর্তী প্রোগ্রাম সম্পর্কে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা অনিশ্চিত ছিলো।

কিন্তু পুর্ব-পাকিস্তানের যেসকল প্রবীন আওয়ামী লীগ নেতা ছিলেন তারা পাকিস্তানি সামরিক জান্তা আর পাকিস্তান পিপুলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর সকল ষড়যন্ত্রে কথা আগাম জেনে গিয়েছিলেন। পাবনায় এমন উল্লেখযোগ্য নেতাদের মধ্যে ছিলেন ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী। যিনি অবিভক্ত পাবনার কাজিপুর থানার কুঠিপাড়া গ্রামে ১৯১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন।

কিন্ত জীবনের বেশিরভাগ সময়ই পাবনায় কাটিয়েছেন। তিনি তখন ছিলেন পাবনা উকিল বারের সভাপতি। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত ঘনিষ্ঠ সঙ্গি। তাই ৭০ এ ৭ ও ১৭ তারিখের নির্বাচনের পরপরই পাবনার নেতৃবৃন্দের সঙ্গে শলা পরামর্শ করে সদা সর্বদাই ঢাকাতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে অবস্থান করতেন। আর সেখান থেকে নির্দেশ পাঠাতেন (ক্রমশঃ)

(লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও কলামিস্ট)


© All rights reserved 2018 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!