বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ০৩:০৫ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :

আমার স্মৃতিতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ

।। এবাদত আলী।।

( এক)
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাঙালি জাতির জীবনে দুযোগ পুর্ণ একটি কালো রাত। পুর্ব-পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের মানুষ যখন গভীর নিদ্রায় সমাচ্ছন্ন তখন অতর্কিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সয়ংক্রিয় অস্ত্র, কামান, মর্টার ও ট্যাংক বহর নিয়ে তাদের উপর আক্রমণ করে রক্তের হলি খেলায় মেতে ওঠে।

এঘটনার পিছনে যে, ইতিহাস রয়েছে তাহলো:- ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ভারত থেকে বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান নামের একটি রাষ্ট্রের জন্ম লাভ হয়। যার দুটি ডানা ছিলো। একটি পশ্চিম পাকিস্তান ও অপরটি পুর্ব পাকিস্তান। এ দুটি রাষ্ট্রের আবার ব্যবধান ছিলো প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার। শুরু থেকেই ভাষা, অর্থনীতি, সামাজিক আচার আচরণ, সাহিত্য-সংস্কৃতি, কৃষ্টিসহ প্রায় সকল ক্ষেত্রেই পশ্চিম পাকিস্তান আর পুর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে বৈরি ভাব বিরাজ করতে থাকে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের বীরদের আত্মাহুতির মাঝ দিয়ে বিষয়গুলো আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৭০ সালের গণভোটে শেখ মুিজবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা লাভ করেও জাতীয় পরিষদে পার্লামেন্টে যেতে পারেনা। পাকিস্তানের তদানিন্তন প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ূব খানই এর জন্য দায়ী।

পরবর্তীকালে গণঅভ্যুত্থানের জোয়ারে আইয়ূব খান সরে দাঁড়াতে বাধ্য হলেন। কিন্তু উত্তরাধিকার সুত্রে রেখে গেলেন তারই পদাঙ্ক অনুসরণকারি আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানকে। ই্য়াহিয়া খান পিন্ডির মসনদে বসে ফিল্ড মার্শাল আইয়ূব খানের নীতিমালা অনুসরণের কসরত করতে লাগলেন। তার সঙ্গে যোগ দিলেন পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো।

এদিকে বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গণআন্দোলন আরো জোরদার হতে লাগলো।

১৯৭১ সালের ৩ মার্চ হতে সারা পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়ে গেল। ৭ মার্চ তারিখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দানে দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দান করেন। এই ঐতিহাসিক ভাষণ দিতে গিয়ে বজ্রকন্ঠে উচ্চারণ করেন “ আমাদের সংগ্রাম-মুক্তির সংগ্রাম। আমাদের সংগ্রাম- স্বাধীনতার সংগ্রাম। তিনি দ্ব্যার্থহীন কন্ঠে বলেছিলেন, রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআললাহ।”

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনী বাঙালি নিধনের যে নীল নকশা তৈরি করেছিলো তার নাম ছিলো অপারেশন সার্চ লাইট ।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই নীল নকশার অধীনেই ২৫ মার্চের মধ্যরাতে ঢাকাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহর চট্রগ্রাম , রাজশাহী, খুলনা , যশোর , রংপুর , সৈয়দপুর , কুমিল্লায় একই সময় অপারেশন শুরু করে । নীল নকশার মুল নায়ক পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান অপারেশন সার্চ লাইট শুরুর আগে রাতের আঁধারে ঢাকা থেকে রাওয়ালপিন্ডি পালিয়ে যান। অপারেশনের মুল দায়িত্বে রেখে যান বেলুচিস্তানে ঈদের জামাতে মুসলমান হত্যাকারি কুখ্যাত লে. জেনারেল টিক্কা খানকে। পুর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক মধ্য রাতে ঘুমন্ত নিরস্ত্র নিরপরাধ বাঙালিদেরকে নির্বিচারে হত্যা করা হয় ।

একটি বিশেষ গ্রুপের (কমান্ড ) এক প্লাটুন সৈন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ৩২ নম্বর সড়কের বাড়ি আক্রমণ করে । ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবন আক্রান্ত হওয়ার আগে আগত সহকর্মি ও দেশবাসীর উদ্দেশ্যে তিনি ঘোষণা করেন ‘‘ আজ থেকে (২৬ মার্চ )বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র । একে এখন যে করেই হোক রক্ষা করতে হবে ।’’রাত ১২-২০ মিনিটে তিনি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলেন ।

ঢাকা বেতার ততক্ষনে পাকিস্তানি বাহিনীর দখলে চলে যাওয়ায় বলধা গার্ডেনে রক্ষিত ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু তার স্বাধীনতার ঘোষনা পত্রটি চট্রগ্রাম বেতার কেন্দ্রে পৌঁছে দিতে সক্ষম হন । ঘোষণা পত্রটি ছিলো ইংরাজী ভাষায় লিপি বদ্ধ। ২৬ মার্চ তারিখে চট্রগ্রাম বেতার কেন্দ্রের কয়েকজন কর্মকর্তা তা বাংলায় অনুবাদ করেন এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এমএ হান্নান শেখ মুজিবের স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রটি প্রথম মাইকিং করে প্রচার করেন। পরে ২৭ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বাঙালি অফিসার মেজর জিয়াউর রহমান চট্রগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবের পক্ষে তা প্রচার করেন।

এদিকে রাত ১-২০ মিনিটের দিকে বঙ্গবন্ধুকে তার বাসভবন থেকে গ্রেফতার করা হয় । এর তিন দিন পর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় করাচিতে । ২৫ মার্চ রাতের বেলা বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালিদের উপর অতর্কিতে আক্রমণ করে বসে।

তারা নির্বিচারে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে। বাংলার অকুতভয় জনগণ তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। বাংলার দামাল ছেলেরা জীবন বাজি রেখে স্বেচ্ছায় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজেদের নাম লিপিবদ্ধ করিয়ে প্রতিবেশী বন্ধু রাষ্ট্র ভারত থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবাদত আলী

কিন্তু বড়ই দুখ ও পরিতাপের বিষয় এদেশের কিছু ধর্মান্ধ ব্যক্তি ইসলাম ধর্মের দোহাই দিয়ে পুর্ব-পাকিস্তানকে রক্ষার নামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর হিসেবে তাদেরকে সর্বোতভাবে সাহায্য সহযোগিতা করতে থাকে। তারা পিস কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আল শামস বাহিনী গঠন করে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। শুধু তাই নয় তারা এদেশের সাধারণ মানুষের ঘর-বাড়িতে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, নারী ধর্ষণ ও এদেশের বুদ্ধিজীবীসহ সকল স্তরের মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করতে থাকে। এক কথায় তারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পুর্ণ সাহায্য সহযোগিতা করতে থাকে।

১৯৭১ সালের শুরুতেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মাঝে কেমন যেন আন্দোলনের ঢেউ খেলতে থাকে।

আর এর সুচনা হয় ১৯৭০ সালের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। সরকারি চাকুরির সুবাদে এই দু‘টি নির্বাচনেই আমি (এবাদত আলী) পাবনা জেলার ফরিদপুর থানার বৃ লাহিড়িবাড়ি ইউনিয়নের বাশুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে পোলিং অফিসারের দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাই। ১৯৭০ সালের ৭ ও ১৭ই ডিসেম্বর উক্ত ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।

তাতে ফরিদপুর, চাটমোহর ও শাহজাদপুর থানা নিয়ে গঠিত নির্বাচনী এলাকায় জাতীয় পরিষদ সদস্য (এম এন এ) পদে পুর্ব পাকিস্তান আওয়াী লীগের প্রার্থী শাহজাদপুরের সৈয়দ হোসেন মনসুর এবং চাটমোহর ও ফরিদপুর নিয়ে গঠিত প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য পদে মোজাম্মেল হক সমাজী নিরঙ্কুশ ভোটে জয়লাভ করেন।

শুধু এখানেই নয়। সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানেই আওয়ামী লীগের নেতাগণ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেন। পাবনা ৫ আসন অর্থাৎ পাবনা সদর, আটঘরিয়া ও ঈশ্বরদী থানা নিয়ে গঠিত জাতীয় পরিষদ এলাকার এমএনএ নির্বাচিত হন আমজাদ হোসেন এবং পাবনা সদরের এমপিএ নির্বাচিত হন আব্দুর রব বগা মিয়া এবং আটঘরিয়া ও ঈশ্বরদীর এম পি এ নির্বাচিত হন এ্যাডভোকেট আমিনুদ্দিন।

বেড়া, সাঁথিয়া ও সুজানগর নির্বাচনী এলাকার এম এন এ নির্বাচিত হন অধ্যাপক আবু সাঈদ এবং সাথিয়া ও সুজানগরের এমপিএ মাস্টার আহমেদ তফিজ উদ্দিন এবং বেড়া ও সাথিয়ার এমপিএ নির্বাচিত হন আহমেদ রফিক। ক্রমশঃ।

(লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও কলামিস্ট)

 

 


© All rights reserved 2018 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!