বুধবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৮, ১০:৫৬ পূর্বাহ্ন

ইমামে আজম হজরত আবু হানিফা (রহ.)

ছবি- সংগৃহীত

।। এবাদত আলী।।

যুগে যুগে বহু ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব পবিত্র ইসলাম ধর্মের সেবা করে অমর হয়ে আছেন। ইমামে আজম হজরত আবু হানিফা (রহ.) তাঁদের মধ্যে অন্যতম।

তিনি ইসলামের জ্ঞান ভান্ডারে যে অবদান রেখে গেছেন, কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ তার কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ইমামে আজম হজরত আবু হানিফা (রহ.)৬৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ৫ সেপ্টেম্বর মোতাবেক ৮০ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন।

ইমামে আজমের পূর্ব পুরুষেরা আদিতে কাবুলে অধিবাসি হলেও ব্যবসায়িক সুত্রে তাঁরা কুফাতে গিয়ে নিবাস গড়েন। তাঁর পিতা হজরত সাবিত ছিলেন একজন তাবেয়ি।

বিখ্যাত ব্যবসায়িক পরিবারের সন্তান হওয়ায় ইমামে আজম ছোট বেলা থেকেই পারিবারিক ব্যবসায়ে জড়িয়ে পড়েন। বাাল্যকালে তাঁর লেখা-পড়া পারিবারিক পরিবেশেই সীমাবদ্ধ ছিলো।
ষোল বছর বয়সে তিনি তাঁর পিতার সাথে হজে গমণ করে মসজিদুল-হারামের দরসের হালকায় বসে আল্লাহর নবী (সা.) এর একজন সাহাবীর জবানিতে হাদিস শ্রবণ করার মাধ্যমে এলমে হাদিসের সাথে তাঁর সরাসরি পরিচিতি ঘটে।

হজরত আবু হানিফা (রহ.) এর পৈত্রিক পেশা ছিলো কাপড়ের ব্যবসা। ইরান থেকে শুরু করে ইরাক, সিরিয়া ও হেজাজ পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল ব্যপি বিপুল পরিমান মুল্যের রেশমি কাপড়ের আমদানি ও রফতানি হতো।

পৈত্রিক এই ব্যবসার সুবাদেই তিনি প্রচুর বিত্তের মালিক হন। বিশিষ্ট ওলামাগণের মধ্যে সম্ভবত তিনি ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি রাষ্ট্রিয় পৃষ্ঠপোষকতা বা বিত্তবানদের হাদিয়া-তোহফা প্রাপ্তির পরোয়া না করে নিজ উপার্জনের দ্বারা জীবিকা নির্বাহ, এলমের সেবা, এবং তাঁর নিকট সমবেত গরিব শিক্ষার্থীদের যাবতিয় ব্যয়ভার নির্বাহ করার ব্যবস্থা করতেন।

তাঁর অর্থে লালিত এবং জ্ঞান চর্চার বিভিন্ন শাখায় সুপ্রতিষ্ঠিত মনিষীবর্গের তালিকা অনেক দীর্ঘ।
কিশোর বয়স থেকেই হজরত আবু হানিফা (রহ.)পিতার ব্যবসার কাজে যোগ দিয়েছিলেন। ব্যবসায়িক কাজেই তাঁকে বিভিন্ন বাজার ও বাণিজ্য কেন্দ্রে যেতে হতো।

ঘটনাচক্রে একদিন হজরত ইমাম শা’বী (রহ.) এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাত হয়ে যায়। প্রথম দর্শনেই হজরত ইমাম শবী (রহ.)হজরত আবু হানিফা (রহ.) এর নিষ্পাপ চেহারার মধ্যে প্রতিভার স্ফুরণ লক্ষ করলেন।

তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, বৎস! তুমি কি করো। এ পথে তোমাকে সব সময় যাতায়াত করতে দেখি। তিনি সকল কথা খুলে বল্লে হজরত ইমাম শা’বী (রহ.) বলেন এটা তোমার লেখা-পড়া করার বয়য়স।

কোন আলেমের শিক্ষায়তনে কি তোমার যাতায়াত আছে? তিনি না জবাব দিলে হজরত ইমাম শা’বী (রহ.) তাঁকে জ্ঞানার্জনে মনোযোগি হবার জন্য আগ্রহি করে তোলেন।

ইমাম হজরত আবু হানিফা বলেছেন, ইমাম শা’বীর সেই আন্তরিকতাপূর্ন উপদেশবাণীগুলো আমার অন্তরে গভীর ভাবে রেখাপাত করলো এবং এর পর থেকেই আমি বিপণিকেন্দ্রগুলোতে আসা-যাওয়য়ার পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাকেন্দ্রেও যাতায়াত শুরু করলাম।

হজরত ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর বয়স যখন আঠারো কিংবা ঊনিশ বছর তখন তিনি হজরত ইমাম হাম্মাদ (রহ.) এর সান্নিধ্য লাভ করেন এবং দীর্ঘ আঠারো বছরকাল তাঁর একান্ত সান্নিধ্যেজ্ঞানার্জনে নিমগ্ন থাকেন।

হজরত ইমাম হাম্মাদ ((রহ.) ইন্তেকাল করলে তিনি উস্তাদের স্থথলাভিসিক্ত হয়ে তাঁর শিক্ষকেন্দ্রের পুর্ণ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

সে জামানার দরসের হালকা বা শিক্ষাঙ্গনের চিত্র ছিলো, উস্তাদ কোন একটি উঁচু আসনে বসে তকরির করতেন। ছাত্রগণ চারদিকে হাঁটু গেড়ে বসে নিতান্ত নিবিষ্টতার সাথে তকরির শ্রবণ করতেন।

অনেকেই তকরির শুনে তা আয়ত্ব করার পাশাপাশি লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। এসব তকরির উস্তাদ কর্তৃক অনুমোদিত হলে যিনি তকরির করতেন তাঁর নামেই সেগুলো গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হতো।
এই শিক্ষাদানকালে কোন কোন মাসয়ালা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়ে যেতো। সে তর্ক কয়েকদিন পর্যন্তও চলতো। শেষ পর্যন্ত কোরআন ও সুন্নাহর দৃষ্টিতে যা সাব্যস্ত হতোসেটাই লিপিবদ্ধ হতো।
কোন কোন মাসয়ালায় উস্তাদ ও সাগরেদের মতভেদ অমীমাংসিতই থেকে যেতো।

সেই মতপাথ্যক্যগুলোও স্ব-স্ব যুক্তি সহকারেই কিতাবে লিপিবদ্ধ করা হতো। এভাবেই হানাফি মাজহাবের মৌলিক গ্রন্থগুলি সংকলিত হয়েছে।

তিনি প্রথম যখন শিক্ষাদান শুরু করেন, তখন শুধু হজরত ইমাম হাম্মাদ (রহ.) এর সাগরেদগনই তাতে শরিক হতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তাতে কুফার সর্বস্তরের মানুষ, বিশিষ্ট জ্ঞানী-গুণি, এমনকি ইমাম সাহেবের উস্তাদগণেরও কেউ কেউ এসে শরিক হতেন।

বিখ্যাত তাবেয়ি মাসআব ইবনে কোদাম, ইমাম আমাশ প্রমুখ নিজে আসতেন এবং অন্যদেরকেও দরসে যোগ দিতে উৎসাহিত করতেন।

এক মাত্র স্পেন ব্যতীত তখনকার মুসলিম বিশ্বের এমন কোন অঞ্চল ছিলোনা যেখানকার শিক্ষার্থীগণ হজরত ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর দরসে সমবেত হননি।

মক্কা-মদীনা, দামেস্ক, ওয়াসেত, মুসেল, জায়িরা, নসীবাইন, মিসর, ফিলিস্তিন, ইয়ামান,আহওয়াজ, উন্তুর আবাদ, জুরজান, নিশাপুর, সমরকন্দ, বুখারা, কাবুল-হেমস প্রভৃতিসহ বিখ্যাত এমন কোন জনপদ ছিলোনা যেখান থেকে শিক্ষার্থী গণ এসে ইমাম হজরত আবু হানিফা (রহ.) এর নিকট শিক্ষা লাভ করেননি।

ইমামে আজম হজরত আবু হানিফা (র.) সৌভাগ্রক্রমে আল্লাহর রাসুল (সা.) এর সান্নিধ্য ধন্য বেশ কয়েকজন সাহাবির সঙ্গ লাভ করে তাবেয়ি হওয়ার পরম সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন।

তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন, হজরত ওয়াসেনা ইবনে আসকি (রা.) ৮৫ হিজরি, হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আউফ (রা.) ৮৭ হিজরি, হজরত সাহল ইবনে সা’দ (রা.) ৮৮ হিজরি, হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) ৯৩ হিজরি, হজরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) ৯৪ হিজরি, হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইদি (রা.) ৯৯ হিজরি, হজরত আবু তোফাইল (রা.) ১১০ হিজরি।
তাবেয়িগণের মধ্যে পবিত্র কোরআন ও হাদিস এবং আনুসঙ্গিক বিষয়ে সর্বাধিক জ্ঞানী এবং তাকওয়া পরহেজগারিতে তিনি ছিলেন অনন্য।

হজরত ইমামে আজম আবু হানিফা (রহ.) এর অনুপম শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের বদৌলতে সে যুগে এমন কিছুসংখ্যক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের সৃষ্টি হয়েছিলো, যাঁরা মুসলিম উম্মাহর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আকাশে এক একজন জোতিষ্ক হয়ে রয়েছেন।

তাঁর সরাসরি সাগরেদগণের মধ্যে ২৮ ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে কাজি (বিচারক)এবং শতাধিক ব্যক্তি মুফতির দায়িত্ব পালন করেছেন। ইসলামের ইতিহাসে এক ব্যক্তির প্রচেষ্টায় এত বিপুল সংখ্যক প্রাজ্ঞ ব্যক্তির আবির্ভাব আর কোথাও দেখা যায়না।

খলিফা মনসুরের সময় হজরত ইমাম আবু হানিফকে (রহ.) প্রধান বিচারপতির পদ গ্রহণের জন্য আহ্বান জানানো হয়।

তিনি উক্ত প্রস্তাব প্রত্যখ্যান করে খলিফাকে সম্বোধন করে বলেন, কোন ব্যাপারে আমার ফয়সালা যদি আপনার বিরুদ্ধে যায় এবং আপনি আমাকে হুকুম দেন যে, হয়তো সিদ্ধান্ত পাল্টাও না হলে তোমাকে ফোরাত নদীতে ডুবিয়ে মারা হবে।

তখন আমি ডুবে মরতে প্রস্তুত থাকবো তবু নিজের সিদ্ধান্ত পাল্টাতে পারবোনা। তাছাড়া আপনার দরবারে এমন অনেক লোক রয়েছে যাদের মনতুষ্টি করার মত কাজির প্রয়োজন।

খলিফার প্রস্তাব প্রত্যখ্যান করে এ ধরনের কথা বলায় তাকে ত্রিশটি বেত্রঘাত করা হয়। যার ফলে তাঁর সারা শরীর রক্তাক্ত হয়ে পড়ে।

তখন খলিফা মনসুরের চাচা আব্দুস সামাদ ইবনে আলী তাকে এজন্য খুবই তিরস্কার করে বলেন, ইনি শুধু ইরাকের ফকিহ নন, সমগ্র প্রাচ্যবাসির ফকিহ।

এতে খলিফা মনসুর লজ্জিত হয়ে প্রত্যেক চবুকাঘাতের বদলে এক হাজার দিরহাম ইমাম আবু হানিফা (র) এর কাছে পাঠান। কিন্তু ইমাম উক্ত দিরহাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান।

তখন তাকে বলা হয় তিনি এ অর্থ গ্রহণ করে নিজের জন্য না রাখলেও দুঃখি-গরিবদের মাঝে যেন বিলিয়ে দেন। এর জবাবে ইমাম বলেন, তার কাছে কি কোন হালাল অর্থ রয়েছে?

খলিফা মনসুর এবার প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে এবং ইমামকে আরো চাবুকাঘাত করা হয়। তাঁকে বন্দি করে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয় এবং পানাহারে নানাভাবে কষ্ট দেওয়া হয়। এরপর একটি বাড়িতে নজরবন্দি করে রাখা হয়।

তাঁকে দৈহিক নির্যাতন করার সময়কালে তাঁর মা জীবিত ছিলেন। তিনি পুত্রের প্রতি এই নির্যাতনে নিদারুনভাবে মর্মাহত হন।

হজরত ইমাম আবু হানিফা (রহ.) তখন বলেছিলেন, ওরা আমাকে যে ক্লেশ দিচ্ছে তাতে আমি কিছুই মনে করিনা, তবে এতে আমার মা কষ্ট পাচ্ছেন তাই আমি ব্যথিত। তিনি ছিলেন কোমল হৃদয়ের মানুষ। যে কারো দুঃখ বেদনায় তিনি কাতর হয়ে পড়তেন।

খলিফা মনসুর তাকে বেত্র্রাঘাত করে সদাসর্বদা শঙ্কিত ছিলেন, তাই তাকে বল প্রয়োগের মাধ্যমে বিষপান করিয়ে হত্যা করা হয়।

তিনি হিজরি ১৫০ সন মোতাবেক ৭৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ জুন বৃদ্ধ বয়সে সিজদারত অবস্থায় সাহাদত বরন করেন।

নির্মম নির্যাতনের শিকার হজরত ইমাম আবু হানিফা (রহ.) মৃত্যুর আগে অছিয়ত করে যান যে, খলিফা মনসুর জণগনের অর্থ অন্যায়ভাবে দখল করে বাগদাদের যেই এলাকায় শহর নির্মাণ করেছে সে এলাকায় যেন ইন্তেকালের পর তাকে দাফন করা না হয়।

অছিয়ত অনুসারে তাঁকে খাজরান নামক স্থানে তাঁর শিষ্য ইমাম আবু ইউছুফ ও ইমাম মহাম্মদের মাঝখানে দাফন করা হয়।

তাঁর প্রথম জানাজায় লোকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিলো ৫০ হাজারেরও উপরে। দাফনের পরেও ২০ দিন পর্যন্ত তাঁর কবরের পাশে জানাজা নামাজ আদায় করা হয়।

(লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।


© All rights reserved 2018 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!