শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০১:৩৬ অপরাহ্ন

এই বর্বরতা শ্যামল নিসর্গের চিত্র হতে পারে না

।।সেলিনা হোসেন।।

এই বর্বরতা এ দেশের মানুষের বিবেকের প্রতিধ্বনি করে না। নৈতিকতাকে শ্রদ্ধা জানায় না। এই বর্বরতা শ্যামল নিসর্গের বাংলাদেশের চিত্র হতে পারে না। যে অমানিশা আমাদের মধ্যে ক্ষুব্ধতা-জিজ্ঞাসা-প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে সেই অমানিশা কাটবে কবে- এই প্রশ্নটিই বিদ্যমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে মুখ্য হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, সাম্প্রতিক কয়েকটি নৃশংস বর্বরোচিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। এমন সব ঘটনা যে আগে ঘটেনি, তাও নয়। যতবার এ ধরনের ঘৃণ্য-মর্মন্তুদ ঘটনা ঘটেছে ততবারই আমরা প্রত্যাশা করে দাবি জানিয়েছি- এ ধরনের ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়, এ জন্য সব রকম ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক।

২৮ আগস্ট রাত প্রায় সাড়ে ১০টার দিকে কয়েকজন সন্ত্রাসী পাবনায় নারী সাংবাদিক সুবর্ণা নদীকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। পাবনার অনলাইন নিউজ পোর্টাল দৈনিক জাগ্রত বাংলার সম্পাদক সুবর্ণা নদী ওই রাতে শহরে রাধানগর আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে দিয়ে বাসায় যাওয়ার পথে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন। পত্রিকান্তরে প্রকাশ, সাবেক স্বামীর পরিবারের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জের ধরে এ হত্যার ঘটনা ঘটতে পারে বলে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা। সুবর্ণা নদী একটি বেসরকারি টেলিভিশনের স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করতেন। এতটাই হিংস্রতার বহিঃপ্রকাশ তার ওপর সন্ত্রাসীরা ঘটিয়েছিল যে, স্থানীয় লোকজন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, সুবর্ণা আর বেঁচে নেই।

সুবর্ণার সাবেক স্বামী রাজিবুল রাজুর সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল প্রায় তিন বছর আগে। এক পর্যায়ে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয় এবং সুবর্ণা এ ঘটনায় রাজিবুল ও তার পরিবারের পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এই প্রতিকার চাওয়াটাই সুবর্ণার জন্য যে কাল হয়ে দাঁড়াল। যেদিন সুবর্ণা সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন, সেদিন সকালেই ওই মামলায় তিনি আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে এসেছিলেন। মৃত্যুর আগে হামলাকারীদের নাম বলে গেছেন সুবর্ণা। সাবেক স্বামী রাজিবুল ইসলাম রাজীব ও তার সহযোগী মিলনসহ চার থেকে পাঁচজন তাকে চাপাতি দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়েছে বলে জানিয়ে গেছেন সুবর্ণা নদী। সুবর্ণা নদীর হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তাৎক্ষণিকভাবে ফুঁসে ওঠেন শান্তিপ্রিয়রা।

আরেকটি ঘটনা ঘটেছে পাবনাতেই। ১৮ আগস্ট সকালে পাবনার সাঁথিয়ার নাগডেমরা গ্রামে ঈদের ছুটিতে বেড়াতে এসেছিলেন শিক্ষার্থী মুক্তি খাতুন। মুক্তির বাবা মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেল হকের সঙ্গে নাগডেমরা গ্রামের একটি উন্মুক্ত জলাশয়ের দখলকে কেন্দ্র করে ঝামেলা ছিল একই গ্রামের আবদুস সালামের। পত্রিকান্তরে প্রকাশ, এর জেরেই সালাম গ্রুপ নৃশংসভাবে মুক্তির শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়। এডওয়ার্ড কলেজের দর্শন বিভাগের স্নাতক সম্মান দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী মুক্তির আর কলেজে ফেরা হলো না। যেদিন মুক্তির বাবা মোজাম্মেল হকের প্রতিপক্ষের লোকজন তার বাড়িতে হামলা চালায়, সেদিন বাড়িতে কোনো পুরুষ মানুষ ছিলেন না। ওই পাষণ্ডরা মুক্তিকে ঘর থেকে ধরে এনে গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়ে বুনো উল্লাস করছিল- এই তথ্য জেনেছি গণমাধ্যমের কল্যাণে।

পৈশাচিকতা-বর্বরতার উন্মত্ত এই বহিঃপ্রকাশ প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে, এ কোন অমানিশা গ্রাস করছে? শরীরের সিংহভাগ পুড়ে যাওয়া মুক্তি ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছিলেন, যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। অবশেষে মুক্তির চিরমুক্তি ঘটে ২৮ আগস্ট মধ্যরাতে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আবাসিক চিকিৎসক পার্থ শংকর পালের বরাত দিয়ে ২৯ আগস্ট সমকালের একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ, মুক্তির শরীরের ৬২ শতাংশই পুড়ে গিয়েছিল। নৃশংসতা-বর্বরতার শিকার মুক্তিরা অনেক প্রশ্ন দাঁড় করাচ্ছেন। আমাদের পীড়িত বিবেকও প্রশ্ন দাঁড় করাচ্ছে সমান্তরালে।

১ সেপ্টেম্বর সমকালে প্রকাশিত আরও একটি মর্মন্তুদ সচিত্র প্রতিবেদন প্রশ্নের সারি আরও দীর্ঘ করেছে। পার্বতীপুরের হরিরামপুর ইউনিয়নে গ্রাম্য সালিশে অন্য ধর্মের একটি ছেলের (মোজাহার আলী) সঙ্গে সম্পর্ক করার অপরাধে আদিবাসী তরুণী শ্যামলী হাসদাকে নির্মমভাবে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। শ্যামলী এই নির্যাতন সইতে পারেননি। চিরদিনের জন্য তিনি চলে গেছেন। বগুড়ার মিশন হাসপাতালে ডিপ্লোমা নার্সিংয়ের ছাত্রী শ্যামলী হাসদার ওপর এই নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ২৬ আগস্ট উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে নিভৃত আদিবাসী পল্লী লক্ষ্মী হোসেনপুর গ্রামে। সমকালের প্রতিবেদন থেকেই জেনেছি, পুলিশ ও জনপ্রতিনিধিরা নির্যাতনের ঘটনা প্রত্যক্ষ করার পরও অপরাধীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা নেননি! পিটিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হয় শ্যামলীর প্রিয় মানুষ মোজাহারকেও! সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তাদের ওপর পড়তে থাকে বর্বরতা-পৈশাচিকতার ছোবল।

আদিবাসী তরুণী শ্যামলী হাসদা একজন অন্য ধর্মের ছেলেকে ভালোবাসার কারণে নিজেদের গোত্রের লোকদের হাতে নির্মম নির্যাতনে নিহত হলেন। একজন শ্যামলী ও মোজাহার ভালোবাসার টানে ঘর বেঁধে সুস্থ-সুন্দর জীবনযাপনের অধিকার পাবেন না কেন? বিশ্বজুড়ে ভালোবাসার নজির স্বীকৃত সত্য। যে দৃষ্টিকোণ থেকে যে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই বিষয়টি দেখি না কেন, আমি স্পষ্টতই বলব, মানবিক অধিকারের জায়গা থেকেও তাদের দণ্ডিত করার অধিকার কারোরই নেই। মূল্যবোধের জায়গা থেকেও এই পাশবিকতা আমাদের সামনে নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত। আমরা যদি এভাবে বিষয়গুলো বিশ্নেষণ করি তাহলে বলতে হয়, অমানবিকতার ছোবল থেকে রেহাই পাওয়ার পথ যেন রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।

২ সেপ্টেম্বর পত্রিকান্তরে আরও দুটি বর্বরতা-পৈশাচিকতার সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। এর একটি হলো, টাঙ্গাইলে বঙ্গবন্ধু সেতুগামী বাসে প্রতিবন্ধী কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনা এবং অন্যটি, রাজধানীর পল্লবী এলাকার প্রেম করার অভিযোগে এক কিশোরীকে পিটিয়ে হত্যা। দুটি ঘটনাই যে সামাজিক অবক্ষয়ের ঘৃণ্য নজির, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের মনে আছে, ময়মনসিংহের একটি প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং বিভাগের কর্মী রূপা গত বছরের ১৫ আগস্ট রাতে বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ ফেরার পথে ওই টাঙ্গাইল এলাকায়ই ধর্ষিত হয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাকে হত্যা করে লাশ ফেলে দেওয়া হয়েছিল মধুপুর জঙ্গল এলাকায়। এবার ধর্ষিত হলেন একজন প্রতিবন্ধী নারী। আমাদের এও স্মরণে আছে, নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে দিনাজপুরে কিশোরী ইয়াসমিনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছিল। প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছিল সারাদেশ। এখনও ইয়াসমিনকে স্মরণ করা হয়। পালিত হয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস। কিন্তু তারপরও ইয়াসমিনদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ এখনও গড়তে পারেনি আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ।

বিস্ময়কর ও চরম উদ্বেগের কারণ যে প্রতিবন্ধী অসহায় নারীরও রেহাই নেই দুর্বৃত্তদের ছোবল থেকে! বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির এক পরিসংখ্যান চিত্র বলছে, গত ১৫ মাসে সারাদেশে গণপরিবহনে ১২১ নারী ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বস্তুত গণপরিবহনে যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি। সম্প্রতি একটি পত্রিকায় ভিন্ন একটি প্রতিবেদন থেকে আরও জানা গেল, গণধর্ষণের পর হত্যার মতো অপরাধে মাত্র ২ শতাংশ বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে। বাকি ৯৮ শতাংশ অপকর্মকারী থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, বিচারহীনতার অপসংস্কৃতির নিরসন না হলে এই অমানিশা কাটবে না। বিদ্যমান পরিস্থিতি এ প্রশ্নও দাঁড় করিয়েছে, সামাজিক অবক্ষয়ের সূচক আর কত নামবে? একেকটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটলে আমরা সোচ্চার হয়ে উঠি বটে; কিন্তু যাদের এসব মর্মন্তুদ ঘটনাবলির প্রতিকার নিশ্চিত করার কথা, ত্বরিত সবরকম ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, তারা কি তাদের দায়দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন?

একটা কথা অস্বীকারের কোনো পথ নেই যে, প্রতিবাদের জায়গায় দাঁড়িয়ে মানুষ ঠিকই জানান দিচ্ছে বটে; কিন্তু ওই যে বললাম বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি; এ কারণে মূল্যবোধের ক্রম ধস নামছে। এ জন্য একদিকে যেমন আইন প্রয়োগের ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করতে হবে, অন্যদিকে অন্যায় অপরাধের যে কোনো মহলের প্রশ্রয় ও প্রশাসনের কতিপয়ের দুর্নীতিজনিত শৈথিল্যের অবসান ঘটাতে হবে। আবারও বলি, বিচারহীনতার অপসংস্কৃতির নিরসন ঘটাতেই হবে। এসব বর্বর যুগীয় ঘটনায় প্রমাণিত হয়, সমাজকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যে পিছু শক্তি প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে, তাদের দাপট কমেনি বরং নানাভাবে বেড়ে চলেছে। মুক্তি, শ্যামলী, নদীদের মর্মন্তুদ ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয় বরং বলা যায়, সামাজিক অবক্ষয়েরই বর্ধিত রূপ। সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলো অবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, আমরা এখনও কত পিছিয়ে আছি।

যৌতুকের অপচ্ছায়াও অপসারিত হয়নি সমাজ থেকে এখনও। পারিবারিক পরিমণ্ডলেও নানাভাবে যে নারী নির্যাতন চলছে, এর পেছনে সিংহভাগ ক্ষেত্রেই কারণ হচ্ছে যৌতুক। অন্য একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতায় প্রতি বছর ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির ২ শতাংশ। যেসব বর্বরোচিত-পৈশাচিক ঘটনা ঘটেছে এর একমাত্র প্রতিবিধান হচ্ছে, যথাযথ কঠোর আইনি প্রতিকার। নদী, মুক্তি, শ্যামলীদের মর্মান্তিক ঘটনার দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার চাই। কঠিন আইনি বিচারে অপরাধীদের শাস্তি চাই। সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলোর চিত্র পত্রিকার পাতায় দেখে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি। ভাবনা তোলপাড় করে ওঠে। এমন বর্বরতা-নৃশংসতা কি আমার দেশের মানুষের? যারা মুক্তিযুদ্ধের সাহসী যোদ্ধা, চরম ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করে প্রতিষ্ঠা করেছেন সার্বভৌম রাষ্ট্রের, এই রক্তস্নাত শ্যামলী নিগর্সের বাংলায় এসব কী হচ্ছে! এই অমানিশা কাটাতেই হবে।

কথাসাহিত্যিক ও চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ শিশু একাডেমি

 

 


© All rights reserved 2018 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!