রবিবার, ১৬ জুন ২০১৯, ১০:৩৫ পূর্বাহ্ন

একুশে ফেব্রুয়ারী- আমার রাজনীতির প্রেরণা

।। আমিরুল ইসলাম রাঙা।

১৯৬৭ সালের একুশ আমার রাজনীতির প্রথম বর্ণমালা। আমি তখন ১৪ বছরের কিশোর।মাধ্যমিকের মধ্যম শ্রেনীতে পড়ি। পাবনার ঐতিহ্যবাহী আর,এম,একাডেমীর ছাত্র। একই আঙ্গিনায় দেশের অন্যতম বৃহৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এডওয়ার্ড কলেজ। শিক্ষা ও ক্রীড়ার পাশাপাশি এই প্রতিষ্ঠানটি ছিল রাজনীতির সুতিকাগার। তৎকালীন আন্দোলন, সংগ্রাম এবং কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচন আমাদের কিশোর মনের উপর ব্যাপক প্রভাব পড়তো । এডওয়ার্ড কলেজের আমতলায় ছাত্রনেতাদের জ্বালাময়ী বক্তৃতা শোনার নিয়মিত শ্রোতা ছিলাম। ছাত্রসংসদ নির্বাচনের সেই নৃত্য প্রচার এখনো চোখের সামনে ভেসে উঠে। ভোট দিচ্ছেন কাহাকে মুনছুর আলী চুনু কে । আরেকদল বলতো ভোট দিচ্ছেন কাহাকে সোহরাব উদ্দিন সোবা কে। বড়দের সাথে এমন প্রচারে আমরাও শরীক হতাম। এমনকি পাড়ায় এসে সমবয়সী বন্ধুদের সামনে জ্বালাময়ী ভাষন দেবার আসর বসাতাম। ভাল বক্তা হবার স্বপ্ন দেখতাম। এভাবেই মনের মধ্য রাজনীতির বীজ অঙ্কুরিত হয়ে পড়ে।

আর সেই ষাটের দশক হলো রাজনীতির স্বর্ণকাল। পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খানের এক দশকের শক্ত মসনদ ভেঙ্গে দেবার যুগ। যা থেকে অতি অল্পসময়ের মধ্যে বাঙালী জাতি অর্জন করলো আজকের বাংলাদেশ। আমার শিশুকালে দেখা অাইয়ুব শাহীর স্বৈরশাসন, ৬২ এর শিক্ষা কমিশন নিয়ে আন্দোলন, ঐ একই বছরে হিন্দু – মুসলিম দাঙ্গা, ৬৪ এর আইয়ুব খান আর ফাতেমা জিন্নার নির্বাচন, ৬৫ এর পাক – ভারত যুদ্ধের ঘটনা এখনো মানসপটে স্মৃতি হয়ে বেঁচে আছে।

১৯৬৬ এর ৮ই এপ্রিল শেখ মুজিবুর রহমান এলেন পাবনায়। টাউন হল ময়দানে বিশাল জনসভা। জীবনে প্রথম শেখ মুজিবকে কাছে থেকে দেখা এবং তাঁর বক্তৃতা শোনার সুযোগ পেলাম । শুধু তাই নয় উনার আগমনের পূর্বেই আয়োজকদের সাথে খুদে কর্মী হবার সুযোগ ঘটেছে। তখনই পাড়ার বড়ভাই এবং মুরুব্বীদের কাছে যাবার সুযোগ ঘটে। পাড়ার বড়ভাই মোখলেছুর রহমান মুকুল, সাঈদ আকতার ডিডু, মিজানুর রহমান তরুণ ( যারা তিনজনই পাবনার প্রথম সারির মুক্তিযোদ্ধা) বাড়ীর দুইশত গজ দুরে মক্তব মোড়ে আব্দুল মান্নান গোড়া ( মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার), মোহরম ( শহীদ মুক্তিযোদ্ধা) রমজান চাচা, মনছের, কাদের ভাই এবং সোলেমান দোকানদার ( মুক্তিযুদ্ধে নক্সাল পন্থিদের হাতে শহীদ) উনাদের সাথে শেখ মুজিব এর আগমন নিয়ে কাজ করি। উনার পাবনা আগমনের দিন মক্তবে অভ্যর্থনা এবং মিছিল করে টাউন হল পর্যন্ত যাওয়া সবই ছিল একজন রাজনৈতিক কর্মীর মত । সেদিন পাবনা টাউন হলে শেখ মুজিবের শ্রুতিমধুর ভাষন আমাকে বিমোহিত করেছিল। উনি সেদিন প্রথম জনসম্মুখে ৬ দফা ঘোষণা করেন এবং পরবর্তী দুইদিনের মধ্যে গ্রেপ্তার হন।

এরপর আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের উপর নতুন করে আবার নির্মম অত্যাচার শুরু হয়ে যায় । বলা যায় এই উপমহাদেশের প্রাচীন এই দলটি সৃষ্টির পর কঠিন দুইটি সময় পার করেছে একটি আইয়ুব খাঁনের শাসনকালে এবং আরেকবার ৭৫ এ বঙ্গবন্ধু স্ব-পরিবারে নিহত হবার পরে। এ ব্যাপারে একটি বিষয়ে অপ্রাসঙ্গিকভাবে বলি, এদেশের দুটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগ ও জাসদ সৃষ্টির জননী হলো ছাত্রলীগ। আরেকটি ব্যাপার হলো দুটি দলই সৃষ্টির সময় ভূমিকম্পের মত কম্পন করে সৃষ্টি হয়েছিল। তবে দুদলের ব্যতিক্রম ও ব্যবধান অনেক। আওয়ামীলীগ সৃষ্টির অল্পদিনের মধ্য স্বল্প সময়ের জন্য পাকিস্তানের ক্ষমতায় বসার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তানের কুচক্রীমহল ষড়যন্ত্র করে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে প্রথমে জেনারেল সাঈদ ইসকেন্দার ও পরে জেনারেল আইয়ুব খান অবৈধভাবে সেনা রাজত্ব কায়েম করে। ক্ষমতাচ্যুতির পর ৫৭ সালে আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী দলত্যাগ করে ন্যাপ গঠন করেন।

আওয়ামীলীগের এই বিভক্তি পাকিস্তান সামরিক জান্তার মসনদ দখলে রাখার সহায়ক হয় । পরবর্তীতে পাক সরকার ন্যাপকে নিরাপদে রেখে আওয়ামীলীগ নির্মুলে দমন নিপীড়ন চালানো শুরু করে । ৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে ফাঁসিতে লটকানোর চক্রান্ত শুরু করে। ইতিমধ্যে ন্যাপের ছাত্র সংগঠন ছাত্রইউনিয়নের সম্মেলনকে কেন্দ্র করে মতিয়া ও মেনন গ্রুপ বিভক্ত হলে ন্যাপও ভেঙ্গে যায়। যা ন্যাপ ( ভাসানী) ও ন্যাপ ( মোজাফ্ফর) নামে দুইদল হয়। এমনতর সময় রাজনীতির নতুন মেরুকরন ঘটতে থাকে। আগরতলা মামলা প্রত্যাহার ও রাজবন্দীদের মুক্তি ও সামরিক শাসন অবসানের দাবীতে সারাদেশে ছাত্র, শ্রমিক ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা ব্যাপক আন্দোলন শুরু করলে ১৯৬৯ প্রথমার্ধে আইয়ুব খানের দশ বছর শাসনের অবসান ঘটে।

যাক এবার প্রসঙ্গ একুশে ফেব্রুয়ারী উদযাপন । ৫২ এর ভাষা আন্দোলনের পরে ৬৭ সালে পাবনায় শ্রেষ্ঠ একুশ উদযাপন করা হয়। বলা যায় ৬৭ – ৬৮ – ৬৯ -৭০ এর একুশ ছিল বাঙালী জাতীয়তা বাদের চেতনা ও প্রেরণার প্রতীক। একুশ হয়ে উঠে পাকশাসকের বিরুদ্ধে মরনাস্ত্র। সেই অস্ত্র বুকে ধারন করে ৬৭ সালে প্রথম একুশ উদযাপনে শরীক হয়েছিলাম । সামরিক শাসন দীর্ঘ সময় চলার কারনে রাজনীতি অনেকটাই অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলো। কিন্তু ঐ সময়ে সারাদেশে ছাত্র ও শ্রমিক সংগঠনগুলি শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। পাবনায় তখন ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন ( মেনন) গ্রুপ খুবই শক্তিশালী। ছাত্রলীগ ( মতিয়া) গ্রুপ তাদের নেতাকর্মীর সংখ্যা কম হলেও তারা ছিল খুব শৃঙ্খলিত ও প্রগতিশীল। তখন ছাত্রলীগের প্রধান নেতা ছিলেন আঃ সাত্তার লালু, আলী রেজা, রবিউল ইসলাম, আবুল এহসান গোরা, হুকু ভাই, সোবা প্রমুখ।

তরুন নেতা ছিলেন, রফিকুল ইসলাম বকুল, শাহাবুদ্দিন চুপ্পু , পাকন, লাল, আঃ কাদের, অখিল রন্জন বসাক, আওয়াল কবীর, ইশারত প্রমুখ। ছাত্র ইউনিয়ন ( মেনন) গ্রুপে ছিলেন, টিপু বিশ্বাস, আব্দুল মতিন, বারী সরদার, মন্তাজ বিশ্বাস । তরুন নেতারা হলেন, মাসুদ, শহীদ, হুমু, তোতা, হালিম, বাচ্চু প্রমুখ। ছাত্র ইউনিয়ন ( মতিয়া) গ্রুপের প্রধান নেতা ছিলেন, মতিউর রহমান বাচ্চু, শফি আহমেদ। তরুন নেতারা ছিলেন, রবিউল ইসলাম রবি, শিরীন বানু মিথিল, জাহিদ, সুলতান আহমেদ বুড়ো, শহীদ, রইচ, মতিয়ার প্রমুখ। এই তিন সংগঠনের প্রধান দুইটি দল ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন ( মেনন) গ্রুপের তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার সাথে প্রায়ই মারামারি হতো। এমনকি দুইগ্রুপের বহুবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। এই রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই চলতে থাকে আইয়ুব শাহীর বিরুদ্ধে আন্দোলন।

৬৭ এর একুশে ফেব্রুয়ারীতে ছাত্রলীগের ব্যাপক প্রস্ততি শুরু হলো শহীদ দিবস পালনের জন্য। পাড়ায় পাড়ায় ছোট বড়, মুরুব্বী সবার মধ্য তোড়জোড়। কোন দল সবচেয়ে বেশী লোক জড়ো করতে পারবে। আগের রাতে রাধানগর মক্তব পয়েন্টে নেতাদের উদ্যোগে সারারাত জেগে মাঝ রাতে খিচুড়ী খাওয়া, ফুল সংগ্রহ মালা বানানো আর লোক জড়ো করার কাজ করা হলো । তখনতো ২১ শে ফেব্রুয়ারীর প্রধান কর্মসূচি হলো প্রভাত ফেরী করে দিবসের সুচনা করা। তখন কোথাও শহীদ মিনার নাই। এডওয়ার্ড কলেজের ব্যায়ামাগার ও টেনিস কোর্টের মাঝে বাঁশ, খুটি আর কাগজ কেটে অস্থায়ী শহীদ মিনার বানানো। আমরা ভোরের সূর্যোদয়ের আগে পাড়া মহল্লা থেকে দলে দলে প্রভাত ফেরী বের করে শহরের সকল প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে একসাথে ছাত্রলীগের দীর্ঘ মিছিল নিয়ে শহীদ মিনারে গিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পন করলাম। এটাই হলো রাজনীতিতে আমার হাতে খড়ি।

এরপর ছাত্রলীগের স্কুল কমিটি গঠন, রাজবন্দী দের মুক্তির দাবীতে প্রায়ই মিটিং,মিছিলে শরীক হওয়া, পাবনায় বহুল আলোচিত ভুট্টো আন্দোলনে মিছিল করা, পাড়া ছেড়ে শহরমুখী হওয়া, পার্টির অফিসে যাওয়া আসা, ঢাকায় ছাত্রলীগের সম্মেলনে শরীক হওয়া সহ ফুলটাইম রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নিয়োজিত হলাম। ৬৮ -৬৯ এ তুমুল গনআন্দোলনে মিছিল সমাবেশ থেকে বাদ পড়েছি বলে মনে হয়না। স্কুল ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন সহ ৬৯ এ গনআন্দোলনের সময় ছাত্র ইউনিয়নের দুইগ্রুপ ও ছাত্রলীগের সম্বন্বয়ে বৃহত্তর পাবনা জেলা স্কুল ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহবায়ক হওয়া, ৭০ এর জানুয়ারীতে দেশব্যাপী পাকিস্তান দেশ ও কৃষ্টি বই বাতিলের দাবীতে আন্দোলন গড়ে তোলার নিরস্ত্র সৈনিক ছিলাম। তখন জেল জুলুম নির্যাতন, মৃত্যু ভয়কে উপেক্ষা করে নিরন্তন চেষ্টা করেছি সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারের মত শহীদ হওয়ার আশায়। তবে শহীদ হতে না পারলেও ১৮ বছর বয়সে ভয়ানক নির্যাতন সহ প্রায় তিন বছর জেলে থাকার সৌভাগ্য হয়েছে।

মহান একুশের ৬৪ বছর পার হয়ে যাচ্ছে। যার প্রায় ৫০ বছর দেখার সৌভাগ্য হলো। গত ৬৪ বছর একুশ কখনো এসেছে নীরবে, কখনো সরবে, কখনো অনাড়ম্বর, কখনো আড়ম্বর। পাকজান্তাদের সময়ের একুশ, স্বাধীনতাত্তোর যুদ্ধ ও রাজনীতি বিধ্বস্ত একুশ কখনো হেসেছে – কখনো কেঁদেছে। 

আমার জীবনে একুশ অনেক দিয়েছে। আমাকে রাজনীতির পাঠশালায় স্বরবর্ণ শিখেয়েছে। ইতিহাসের সব দারুন দারুন তীর্থস্থান দর্শন করিয়েছে।

৬৯ এর এক স্মৃতি এখনো মনে লেপটে আছে। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলনে ঢাকায় গিয়ে ” জীবন থেকে নেওয়া ” ছবির শহীদ মিনারের শ্যুটিংএ আমরা পাবনার একদল তরুণ অংশ নিয়েছিলাম। ( যাদের মধ্য পাবনার মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বর্তমান কমান্ডার হাবিব, ডিপুটি কমান্ডার সেলিম, কাফি সহ অনেকেই বেঁচে আছে।) আমার জীবনের ৬৭ – ৬৮ – ৬৯ – ৭০ এর একুশ যেমন দেখেছি তেমন দেখছি গত কয়েক দশকের ঐতিহ্যমন্ডিত একুশ। একুশ আজ দলমত নির্বিশেষে সার্বজনীন উৎসব। একুশ আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্ব দরবারে মর্যাদার আসন অর্জন করেছে।

এই প্রাপ্তির সাথে অপ্রাপ্তি অনেক – অনেক। 

রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে সর্বত্র বাংলা চালু হয়নি। শহীদের মর্যাদা দিবসকেন্দ্রীক রয়ে গেছে। শহীদ মিনার সংরক্ষন এবং অবমাননা চলছেই। শহীদ দিবসের ঐতিহ্য প্রভাত ফেরি আজ বিলীন।শোক প্রকাশের বদলে আনন্দ উৎসবে পরিনত। কালো কাপড় বিলীন হয়ে রঙ্গীন কাপড় স্থান পেয়েছে। একুশের অনুষ্ঠান আজ বইমেলা কেন্দ্রীক হয়েছে। ভাষা শহীদ, ভাষা সংগ্রামী আর রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা একুশের দিবসে উপেক্ষিত। এখন মধ্যরাতে প্রভাতফেরী করা হয় যা একুশের চেতনায় বিলুপ্ত ব্যান্জনবর্ণের মত !! এমন একুশ কি কাম্য -? আমি মনে করি অবশ্যই নয় !! পরিশেষে কামনা করবো অবিলম্বে একুশের প্রকৃত চেতনা আমাদের মাঝে ফিরে আসুক ।।

শহীদ স্মৃতি অমর হোক – 
মহান একুশ অমর হোক।

আমিরুল ইসলাম রাঙা
রাধানগর মজুমদার পাড়া
পাবনা।
২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৬

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  


    পাবনায় নামাজের সময়সূচি
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ০৩:৪১
    সূর্যোদয়ভোর ০৫:১১
    যোহরদুপুর ১১:৫৯
    আছরবিকাল ১৬:৩৯
    মাগরিবসন্ধ্যা ১৮:৪৭
    এশা রাত ২০:১৭
© All rights reserved 2019 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!