রবিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৭:৩৬ অপরাহ্ন

এক শেকড় সন্ধানী গবেষক ড. এম আবদুল আলীম

 

।। এবিএম ফজলুর রহমান।।

পুঁজিবাদী দুনিয়ার সকলে যখন বৈষয়িক স্বার্থসিদ্ধির নানা ফন্দি-ফিকিরে ব্যস্ত, তখন বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর শেকড়ের সন্ধানে দেশের আনাচে-কানাচে নিরন্তর ছুটে চলছেন এক তরুণ।

সংগ্রহ করছেন পুরনো দিনের গান-ছড়া-পুঁথি; খুঁজছেন সেকালের পত্র-পত্রিকা, দলিল, ডকুমেন্ট, চিঠিপত্র।

লাইব্রেরির চার দেয়ালের মধ্যেই তাঁর বিচরণ, থরে থরে সাজানো বইয়ের সঙ্গেই তাঁর মিতালি।

তিনি হলেন শেকড়-সন্ধানী গবেষক ড. এম আবদুল আলীম।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য; বিশেষ করে আধুনিক বাংলা কবিতা, লোকসংস্কৃতি, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্থানীয় ইতিহাস, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী তাঁর অনুসন্ধিৎসার ক্ষেত্র।

লেখালেখির শুরু অল্প বয়সেই। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, জার্নাল, লিটল ম্যাগজিনে অগণিত লেখা প্রকাশিত হয়েছে।

এ পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থ ১৪টি : পাবনা অঞ্চলের লোকসংস্কৃতি (২০০৮), বন্দে আলী মিয়া : কবি ও কাব্যরূপ (২০০৯), বাংলা কাব্যের স্বরূপ ও সিদ্ধি-অন্বেষা (২০০৯), রবীন্দ্রত্তোর বাংলা কাব্যে বিচ্ছিন্নতার রূপায়ণ (২০১০), বাংলা বানান ও উচ্চারণ-বিধি (২০১১), রবীন্দ্রনাথ : পঞ্চম দশ বছর (২০১১), পাবনার ইতিহাস (২০১৩), পাবনায় ভাষা আন্দোলন (২০১০), সুচিত্রা সেন (২০১৫), পাবনায় রবীন্দ্রনাথ নজরুল বঙ্গবন্ধু (২০১৬), মুক্তিযুদ্ধের কিশোর ইতিহাস : পাবনা (২০১৭), রবীন্দ্রনাথ উত্তর-আধুনিকতা ও বাংলা ভাষার বিশ্বায়ন (২০১৮), সবুজপত্র ও আধুনিক বাংলা সাহিত্য (২০১৮), সিরাজগঞ্জে ভাষা আন্দোলন (২০১৮)।

এম আবদুল আলীম পল্লির নিভৃত কুটিরে কুটিরে ঘুরে সংগ্রহ করেছেন লোকসংস্কৃতি-ভান্ডারের অমূল্য সম্পদ।

এসব বিষয় স্থান পেয়েছে তাঁর ‘পাবনা অঞ্চলের লোকসংস্কৃতি’ ও বাংলা একাডেমির ‘লোকজসংস্কৃতি-গ্রন্থমালা : পাবনা’র মধ্যে।

তিনি পিএইচডি গবেষণা করেছেন আধুনিক বাংলা কাব্যের প্রধান পাঁচ কবি জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে ও অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা নিয়ে।

তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভ ‘রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কাব্যে বিচ্ছিন্নতার রূপায়ণ’ প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমি।

তাঁর বৃহৎ-কলেবর (১২০০ পৃষ্ঠার) গ্রন্থ ‘পাবনার ইতিহাস’ স্থানীয় ইতিহাসের আকর-গ্রন্থে পরিণত হয়েছে।

এছাড়া তাঁর শেকড়-সন্ধানী গবেষণার অনন্য দৃষ্টান্ত ‘পাবনায় ভাষা আন্দোলন’, ‘সিরাজগঞ্জে ভাষা আন্দোলন’ প্রভৃতি গ্রন্থ।

বাংলা ভাষার বিশুদ্ধ ব্যবহারের কথা চিন্তা করে তিনি প্রণয়ন করেছেন ‘বাংলা বানান ও উচ্চারণ-বিধি’ নামক গ্রন্থ।

বাংলা সাহিত্যের দুই প্রধান কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে তিনি গ্রন্থ রচনা করেছেন।

সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবন ও সংস্কৃতি নিয়েও তিনি কাজ করেছেন। তাঁর গবেষণাকর্ম ইতিমধ্যে সুধীজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

হাসান আজিজুল হক, আবু তাহের মজুমদার, বিশ্বজিৎ ঘোষ, আহমদ রফিক প্রমুখ পন্ডিত তাঁর গবেষণার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

আহমদ রফিক লিখেছেন : ‘লেখককে ধন্যবাদ জানাই ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে তার পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গির জন্য ; যা আবশ্যিক মাত্রায় নির্মোহ, আবেগমুক্ত, তথ্যনিষ্ঠ ও গবেষক-সুলভ।’

এম আবদুল আলীমের জন্ম ১৯৭৬ সালের ১লা ডিসেম্বর, পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার গৌরীগ্রামে।

পিতা আব্দুল কুদ্দুস, মাতা জাহানারা বেগম।

তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হাঁড়িয়াকাহন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর সাঁথিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং সাঁথিয়া সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন।

পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক (সম্মান), স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম স্থান এবং স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় লাভ করেন প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান।

তিনি বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ ও ঢাকা কলেজে শিক্ষকতা করেছেন।

বর্তমানে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করছেন।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান এবং মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি কালবৈশাখী, রুদ্র, সাহিত্য-গবেষণাপত্র, উদ্ভাবন প্রভৃতি পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন।

সাহিত্য-সংস্কৃতির গবেষণার পাশাপাশি নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘জাহানারা বেগম স্মৃতি পাঠাগার’।

এছাড়া মাদক, জুয়া ও জঙ্গিবাদ বিরোধী নানা সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে সমাজের অন্ধকার দূরীকরণে কাজ করছেন এই গবেষক।

গত সপ্তাহে তাঁর বাসভবনে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। বর্তমানে ‘ভাষা-আন্দোলন কোষ’ প্রণয়নে কাটছে তাঁর সময়।

ড. এম আব্দুল আলীম বলেন : ‘জাতির উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্য বিশেষভাবে প্রয়োজন তার ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অন্বেষণ, তথা তার শেকড়ের সন্ধান।

শেকড়হীন বৃক্ষ যেমন বাঁচতে পারে না, তেমনি ইতিহাস-ঐতিহ্য বিমুখ জাতি কখনো মাথা উঁচু করে চলতে পারে না। আর সেজন্য দরকার আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সন্ধান বা শেকড়ের অন্বেষণ।’
নতুন প্রজন্মের কাছে প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরা এবং বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের মেলবন্ধন স্থাপন করার মানসেই চলছে তাঁর নিরন্তর পথচলা।

তিনি মনে করেন যার শেকড় যত গভীরে তার শক্তি তত বেশি, তাই দৃঢ়চেতা ও শক্তিশালী প্রজন্ম গড়ে তুলতে হলে সবেচেয়ে বেশি প্রয়োজন তাদের মধ্যে বাঙালির নিজস্ব ইতিহাস, চিরায়ত সংস্কৃতি, ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঞ্চার ঘটানো।

এম আবদুল আলীম গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে লাভ করেছেন নানা পুরস্কার ও সম্মাননা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : কাহ্নপা সাহিত্যচক্র সম্মাননা, কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সাঁথিয়া-এর সম্মাননা প্রভৃতি।

তাঁর স্ত্রী শবনম মোস্তারী খানম একজন বিদূষী নারী। পুত্র নির্ঝর, কন্যা নিষ্ঠাকে নিয়ে তাঁর সংসার জীবন আবর্তিত।

লেখক : এবিএম ফজলুর রহমান, প্রধান সম্পাদক, বার্তা সংস্থা পিপ, পাবনা।

 

 


বিজয় নিশান উড়ছে ঐ…

© All rights reserved 2018 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!