সোমবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৬:১৭ পূর্বাহ্ন

ঐক্যফ্রন্টে বাড়ছে টানাপোড়েন

অস্থিরতা কমছেই না জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই ভেতরে ভেতরে চলছে নানা টানাপোড়েন। প্রায় এক বছর পরও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি নেই। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে বিভক্ত হয়ে পড়ছেন জোটের শীর্ষ নেতারা। মুখ থুবড়ে পড়েছে জোটের কার্যক্রম। ফ্রন্টের শীর্ষ নেতাদের এমন আচরণের বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝেও। হতাশ হয়ে পড়ছেন তারা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নির্বাচনকেন্দ্রিক গড়া জোটটির ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ছেন নেতাকর্মী অনেকে।

নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করে আবার শপথ নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে জোট থেকে অনেক আগেই বেরিয়ে গেছে কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগ। টানাপোড়েন চলছে গণফোরামে। আবার রাজনৈতিক মতপার্থক্যে বিদ্রোহ শুরু হয়েছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডিতে। ঢিমেতালে চলছে নাগরিক ঐক্য। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কার্যকর কোনো তৎপরতাও নেই। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতে পিছুটানসহ সার্বিকভাবে শরিক দলের শীর্ষ নেতাদের আচরণে ক্ষুব্ধ বিএনপি।

জোটের শীর্ষ নেতারা জানান, বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার পর ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটকে সক্রিয় করার উদ্যোগ নেয় বিএনপি। দলটির উদ্যোগে বেশ কয়েকটি কর্মসূচিও পালন করা হয়। তবে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে সাক্ষাতের কর্মসূচি নিয়ে আবারও জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের বিরোধিতায় ফ্রন্টের ঘোষিত এ কর্মসূচি অনিশ্চয়তায় পড়েছে। তিনি খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে রাজি না হওয়ায় চটেছেন বিএনপির শীর্ষ নেতারাও। তাদের সঙ্গে ফ্রন্টের অন্য শরিক দলগুলোও হতাশ হয়ে পড়েছেন। ড. কামাল হোসেনের এমন আচরণে ক্ষুব্ধ হয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার তাগিদ থেকে ছোট, বড়, মাঝারি দলসহ অনেক দল নিয়ে ঐক্য করেছি। আবার ফ্রন্টও করেছি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যারা আছেন তাদের সম্মান করি ও গুরুত্ব দিই। কিন্তু তারা যদি ঘাড়ে চেপে তাদের নিজস্ব টার্গেট নিয়ে চলতে চান, সেই পথচলা বিএনপির জন্য বোকামি হবে। খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য তাদের কেন মঞ্চে চিরকুট দিতে হবে প্রশ্ন করে তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির কথা তারা কেন বলতে পারবেন না? যার বিরুদ্ধে আমরা রাজনীতি করি তাদের কথা জোরেশোরে আমাদের সামনে কেন বলা হয়। তারপরও শুধু জাতীয় ও জনগণের স্বার্থে তা সহ্য করি।

ঐক্যফ্রন্টের একজন নেতা সমকালকে বলেন, কারাবন্দি ও অসুস্থ খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করার বিষয়টি ঐক্যফ্রন্টের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত। সেই আলোকে ফ্রন্টের নেতা ও জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করার আবেদন করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও তাদের অনুরোধের বিষয়ে আগ্রহ দেখান। এরপরই ড. কামাল হোসেন নিজের অসুস্থতার প্রসঙ্গ সামনে এনে বিএসএমএমইউতে না যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নেন। এতে বিস্মিত হন বিএনপি নেতারা। একইসঙ্গে ফ্রন্টের শীর্ষ নেতারাও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা মনে করেন, খালেদা জিয়াকে অন্যায়ভাবে কারাগারে রাখা হয়েছে- এটা ড. কামাল হোসেনও একাধিকবার বলেছেন। এখন খালেদা জিয়া অসুস্থ। তার অসুস্থতার প্রকৃত চিত্র জানার জন্যই ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে এ ধরনের কর্মসূচি ঠিক করা হয়।

ফ্রন্টের নেতারা বলেন, বিএনপির শক্তির সঙ্গে একাট্টা হয়ে রাজনীতি করবেন, নির্বাচন করবেন, তবে তাদের নেত্রীর সঙ্গে দেখা করবেন না এটা দ্বৈত নীতি। এতে যে কেউ ক্ষুব্ধ হবেন। ড. কামাল হোসেনের অনাগ্রহে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করার কর্মসূচি অনেকটা ঢিমেতালে এগোচ্ছে। সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঐক্যফ্রন্টের ৫ নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করার জন্য আইজি প্রিজনকে চিঠি দেবেন। সেখানে ড. কামাল হোসেনের নামসহ বিএনপির কোনো নেতার নাম থাকবে না বলে জানা গেছে।

একইভাবে নেতাদের আস্থা ও সমন্বয়হীনতার অভাবে ফ্রন্টের অন্যান্য কার্যক্রমও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে বলেও জানান নেতারা। আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে রাজধানীতে সমাবেশের কর্মসূচিও আর হয়ে ওঠেনি। একই দাবিতে গত ৬ নভেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে রক্তের অক্ষরে শপথের স্বাক্ষর কর্মসূচিতেও বিএনপির কোনো নেতা অংশ নেননি। ড. কামাল হোসেনের ভূমিকায় অসন্তুষ্ট বিএনপিও গ্রহণ করেছে ‘ধীরে চলো নীতি’। ফলে দ্রুত সময়ের মধ্যে ঐক্যফ্রন্টকে সক্রিয় ভূমিকায় দেখা যাবে না বলে আশঙ্কা ফ্রন্টের নেতাকর্মীদের।

এ বিষয়ে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না সমকালকে বলেন, তারা সময়ের কোনো দাবিই পূরণ করতে পারেননি। ভোট ডাকাতির এই সরকারকে সরাতে হলে এখন তাদের সেই সময়ের দাবি বুঝতে হবে। সেভাবে কাজ করতে হবে। তাহলেই ঐক্যফ্রন্ট সফল হবে। এর বাইরে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ঐক্যফ্রন্টের এমন অনিশ্চিত ভবিষ্যতে শরিক দলগুলোর মধ্যেই বিদ্রোহের ডামাডোল চলছে, বিশেষ করে জেএসডির অভ্যন্তরে। ফ্রন্টকে কেন্দ্র করেই বিভক্ত হয়ে পড়েছে পুরো দলটি। মূল অংশে জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব থাকলেও বিদ্রোহের নেতৃত্বে রয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করেই মূলত জেএসডির অভ্যন্তরে দ্বন্দ্বের শুরু। দলটির অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা ঐক্যফ্রন্ট গঠনে মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন। তবে নির্বাচনে তাদের অনেকে মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ায় এখন জোট ভাঙার পক্ষে সক্রিয় হয়ে উঠছেন তারা।

গণফোরামের মধ্যে আওয়ামী লীগ ‘সমর্থক’ কট্টরপন্থি নেতাদের প্রবল আপত্তি রয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে। নির্বাচনের আগে ও পরে তারা ফ্রন্ট থেকে বেরিয়ে আসার সব চেষ্টাই করেছেন। দলের বিশেষ কাউন্সিল নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। গত ১২ অক্টোবর গণফোরাম সভাপতিকে দলের ৫ জন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও একজন স্থায়ী সদস্য লিখিতভাবে জানান, দলীয় গঠনতন্ত্র বিরোধী স্বেচ্ছাচারী কায়দায় কতিপয় ব্যক্তির স্বার্থে অগণতান্ত্রিকভাবে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া দলীয় আদর্শ, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য জলাঞ্জলি দিয়ে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির সঙ্গে ঐক্যফ্রন্ট গঠন করা হয়েছে। এতে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ ও হতাশ। এ অবস্থায় অনৈতিকভাবে করা কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে ডিসেম্বরের মধ্যে কনভেনশনের আহ্বান জানাতে বলেছেন তারা। অপরদিকে গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরীর নেতৃত্বে দলের পাঁচ নেতাও পাল্টা চিঠি দিয়েছেন ড. কামাল হোসেনকে।

৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের ঘোষণা দেয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এর মধ্যে নতুন নির্বাচনের দাবি, ফ্রন্টের নির্বাচিত এমপিদের শপথ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত, নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা, ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়াতে সারাদেশ সফর করার মতো কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু জোটের সিদ্ধান্তকে অমান্য করে গণফোরামের দুই সংসদ সদস্য শপথ গ্রহণ করেন। তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে বিএনপির নির্বাচিত এমপিরাও শপথ নেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ঐক্যফ্রন্টের শরিক বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ জোট ত্যাগ করেন।

গণফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসিন মন্টুসহ দলের একটি বড় অংশ এর বিরোধিতা করে হাইকমান্ডের রোষানলে পড়েছেন। চরম অস্থিরতায় গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসিন মন্টুকে দলের সাইডলাইনে বসিয়ে দেওয়া হয়। বহিস্কার করা হয় গণফোরাম নেতা রফিকুল ইসলাম পথিককে। গ্রুপিং কোন্দলে বিপর্যস্ত গণফোরাম। সর্বশেষ বিএনপির এমপিদের শপথ নেওয়ার ঘটনায়ও দলটির মধ্যেও তৈরি হয়েছে নানা সন্দেহ-সংশয়। দলের হাইকমান্ডের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি দৃশ্যত স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে বিরাজ করছে ক্ষোভ ও অসন্তোষ।


    পাবনায় নামাজের সময়সূচি
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ০৫:০৬
    সূর্যোদয়ভোর ০৬:২৯
    যোহরদুপুর ১১:৫০
    আছরবিকাল ১৫:৩৬
    মাগরিবসন্ধ্যা ১৭:১২
    এশা রাত ১৮:৪২
© All rights reserved 2019 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!