বৃহস্পতিবার, ১৬ অগাস্ট ২০১৮, ১২:৫৪ পূর্বাহ্ন

কথার ব্যঞ্জনায়-শব্দ চয়নের কারিগর প্রফেসর নূরুন্নবী স্মরণে

।।এবাদত আলী।।

কথা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। সরল অথবা গরল, রূঢ় অথবা কোমল সে যেমনই হোক না কেন, কথাই মানুষের মানবিক গুনাবলির পরিচয়ের বাহক হিসেবে কর্ম সম্পাদন করে থাকে। মুর্খের মূর্খতার পরিচয় জ্ঞানী কিংবা গুণির গুনাবলির পরিচয় কেবল কথার মাধ্যমেই পরিস্ফুটিত হয়ে থাকে।

সামাজিক পরিমন্ডলে কথাই মানুষকে কাছে টানে আবার কথাই কাছ থেকে দুরে ঠেলে দেয়। জগৎ সংসার মূলত কথার বাঁধনে আবর্তিত । যার কথা যত সুন্দর তার ব্যক্তিত্বের পরিচয় ততো গভীরে। চিত্তাকর্ষক ও মনোমুগ্ধকর শব্দ চয়নে যিনি যত পারিমার্জনকারি, তিনি শ্রবনকারি শ্রোতাদেরকে ততই আকৃষ্ট করতে পারদর্শী বটে।

এমনি একজন স্পষ্টভাষি, সুমধুর শব্দ চয়নকারি, সৌন্দর্য পিপাসু চিত্তাকর্ষক ও মনোমুগ্ধকর বাক্যবানে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষকে যিনি গভীর জ্ঞানের কথায় মুগ্ধ করে রাখতেন সেই প্রফেসর নূরুন্নবী হঠাৎ করেই চলে গেলেন।

আমাদেরকে শোক সাগরে ভাসিয়ে বাঙালির শোকের মাস আগষ্টে শোকের মিটিং করতে করতেই তিনি চির দিনের জন্য হারিয়ে গেলেন। সে দিনটি ছিলো মঙ্গলবার, ৪ আগষ্ট-২০১৫।

পাবনা জেলা প্রশাসকের সন্মেলন কক্ষে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৫ আগষ্টে শাহাদৎ বার্ষিকী পালনের প্রস্তুতি সভা চলছিলো। সভার শেষের দিকে পাবনার জেলা প্রশাসক কাজি আশরাফ উদ্দিন তাঁকে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করলে তিনি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিয়ে বলেন, শোক দিবসে ঢের কথা বলা যাবে। এর পরপরই তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন।

তাৎক্ষণিকভাবে তাকে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সেখানে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দুপুর পৌনে ১ টায় তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

প্রফেসর নূরুন্নবী পাবনা সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজেরে সাবেক অধ্যক্ষ ছিলেন। জেলার শিক্ষা বিস্তারে সদালাপি এই মানুষটির ছিলো ঐকান্তিক ভূমিকা। মুক্ত চিন্তার অধিকারি সদা হাস্যোজ্জল এক অনন্য মানবীয় গুনের অধিকারি প্রফেরসর মুহাম্মদ নূরুন্নবীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সারা শহর জুড়ে নেমে আসে শোকের কালো ছায়া।

শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ তাঁর পাবনা শহরের শিবরামপুরস্থ বাসভবনে ছুটে যান।

এই প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, মুক্ত চিন্তার অধিকারি সদালাপি ব্যক্তির মৃত্যু সংবাদটি আমি পাই দৈনিক বিশ্ববার্তা সম্পাদক প্রফেসর শহিদুর রহমান শহীদের পাঠানো মোবাইল ফোনের এসএমএসএর মাধ্যমে। সংক্ষিপ্ত ইংরেজি শব্দ ‘‘ নূরুন্নবী স্যার নো মোর…।’’

এর পরপরই পাবনা প্রেসক্লাবের সাবেক সহ-সভাপতি সাংবাদিক কামাল আহমেদ সিদ্দিকী এবং বাংলাদেশ অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারি কল্যাণ সমিতি পাবনা জেলা শাখার যুগ্ম সম্পাদক আলহাজ মোজাহারুল ইসলাম বকুলসহ আরো দু একজনের ক্ষুদে বার্তা পাই।

প্রফেসর নূরুন্নবী ছিলেন বাংলাদেশ অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারি কল্যাণ সমিতি পাবনা জেলা শাখার আজীবন সদস্য। ভাগ্যগুণে আমিও ঐ সমিতির আজীবন সদস্য হওয়ার সুযোগ লাভ করি। পাবনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় হতে জেলা কানুনগো হিসেবে কর্মরতবস্থায় ২০০৯ সালে অবসর গ্রহনের পরপরই আমি অবসর সমিতির সদস্য অন্তর্ভুক্ত হই এবং পরবর্তীতে সহ-সম্পাদকের পদ লাভ করি ।

সেসময় পাবনার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর মোঃ আব্দুল করিম সমিতির সভাপতি থাকাকালিন সময়ে গঠনতন্ত্র নিয়ে পাবনা জেলা শাখার বেশ কিছু সদস্যদের মাঝে মতানৈক্যের সৃষ্টি হয়। সেকারনে সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক ১৭ -০৪ -২০১২ সালে পাবনা জেলা প্রশাসককে ৬ মাসের জন্য একটি এডহক কমিটি গঠনপূর্বক নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করার জন্য অনুরোধ পত্র প্রদান করা হলে নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট মুকুল কুমার মৈত্রকে আহবায়ক এবং একে মির্জা শহীদুল ইসলামকে সদস্য সচিব করে ১১ সদস্য বিশিষ্ট একটি এডহক কমিটি গঠন করা হয়।

এই কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন প্রফেসর মুহাম্মদ নূরুন্নবী। সমিতির সদস্যদেরকে পুনরায় সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করার মানসে সমিতির আজীবন সদস্য, পাবনা প্রেসক্লাবের তদানিন্তন সভাপতি প্রফেসর শিবজিত নাগ, আজীবন সদস্য আলহাজ আব্দুল বাতেন, হেকিম আক্কেল আলী ও গোলাম রব্বানী দোহাকে নিয়ে আমি প্রফেসর মুহাম্মদ নূরুন্নবী স্যারের বাসায় যাই। একাধিকবার অনুরোধের পর তাঁকে সমিতির পাবনা জেলা শাখার সভাপতি পদে আসীন হবার বিষয়ে রাজি করাতে আমরা সক্ষম হই।

তিনি প্রফেসর শিবজিত নাগ এবং আমাকে (এবাদত আলীকে) তাঁর সহযোগি হিসেবে সহ- সভাপতি পদে থাকার প্রস্তাব দেন। ২০১২ সালের ২২ মার্চ পাবনা জেলা পরিষদের রশিদ হলে বার্ষিক সাধারণ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে প্রফেসর মুহাম্মদ নূরুন্নবীকে সভাপতি, প্রফেসর শিবজিত নাগ ও এবাদত আলীকে সহ-সভাপতি, একে মির্জা শহীদুল ইসলামকে সাধারণ সম্পাদক করে ২ বছর মেয়াদের একটি পূর্নাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়।

একমাত্র তাঁরই হস্তক্ষেপের কারণে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারি কল্যাণ সমিতির পাবনা জেলা শাখা দ্বিধা-বিভক্তির হাত থেকে রক্ষা পায়। তিনি ছিলেন পাবনা বই মেলা উদযাপন পরিষদের সভাপতি। রবীন্দ্র সঙ্গীত সন্মিলন পরিষদ পাবনা জেলা শাখার সভাপতি। এছাড়াও তিনি পাবনার বিভিন্ন সামাজিক- সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

তিনি পাবনা প্রেসক্লাবের দ্বি-বার্ষিক নির্বাচন পরিচালনার জন্য গঠিত নির্বাচন কমিশনের সদস্য। তিনি ছিলেন পাবনার সর্বস্তরের মানুষের অত্যন্ত প্রিয় এবং শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি। তাঁর মৃত্যু সংবাদ পাবার পরপরই সকলেই তাঁর জানাজা এবং দাফন কার্যে শরিক হবার জন্য উন্মুখ হয়ে অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁর মেঝ ছেলে মাহমুদুন্নবী হিল্লোল বেলজিয়ামে অবস্থান করার কারণে তিনি আসার পর তার নামাজে জানাজা এবং দাফনের ব্যবস্থা করা হবে।

তাই সেদিনের মত তাঁর জন্মস্থান আতাইকুলা থানার কাজিপুর গ্রামে তার মরদেহ নিয়ে গিয়ে নামাজে জানাজা শেষে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়।

৭ আগষ্ট শুক্রবার বাদ জুমা মরহুমের দ্বিতীয় জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয় পাবনা শহরের চাঁপা বিবির মসজিদে। এরপর সেখান থেকে তাঁকে শেষ বারের মত শ্রদ্ধা জানানোর জন্য তাঁর মরদেহ নেয়া হয় শহরের বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুল পৌর মিলনায়তনে।

জুমা নামাজের পর থেকেই পৌর মিলনায়তন চত্তরে মানুষের ঢল নামতে থাকে। মানুষের উপস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, পৌর মিলনায়তনের সামনের আব্দুল হামিদ সড়কটিতে আধা ঘন্টার জন্য যান বাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। সেখানে জানাজা নামাজের আগে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়।

পাবনা সদর আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফারুক প্রিন্স, সহ সভাপতি রেজাউল রহিম লাল,আব্দুল হামিদ মাষ্টার ও সরদার মিঠু আহমেদের নেতৃত্বে পাবনা জেলা আওয়ামী লীগ, পাবনা জেলা পষিদ প্রশাসক এম সাইদুল হক চুন্নু, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার মোঃ হেলাল উদ্দিন আহমেদ, পাবনার জেলা প্রশাসক কাজী আশরাফ উদ্দন, পুলিশ সুপার মোঃ আলমগীর কবীর, পাবনা প্রেসক্লাবের সভাপতি রবিউল ইসলাম রবির নেতৃত্বে প্রেসক্লাবের সাংবাদিকগণ,

বাংলাদেশ অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারি কল্যাণ সমিতি পাবনা জেলা শাখার সভাপতি একে মির্জা শহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে সমিতির সদস্যবৃন্দ, পাবনা পৌর সভার মেয়র কামরুল হাসান মিন্টু, সুচিত্রা সেন স্মৃতি পরিষদের সভাপতি এম সাইদুল হক চুন্নু, সাধারণ সম্পাদক ডা. রাম দুলাল ভৌমিক, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক ঐক্য জোট, ঐক্য ন্যাপ সভাপতি রনেশ মৈত্র, মহিলা পরিষদ সভাপতি পুরবী মৈত্র, অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরী, পাবনা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার হাবিবুর রহমান তোতা, জেলা যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক রকিব হাসান টিপু, সরকারি শহীদ বুল বুল কলেজের সাবেক ভিপি শেখ রাসেল আলী মাসুদ, সাবেক ভিপি আব্দুল আজিজ ও মোর্শেদসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মি ও সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

সমগ্র অনুষ্ঠানটির উপস্থাপনায় ছিলেন পাবনা সংবাদপত্র পরিষদের সভাপতি, দৈনিক জোড়বাংলা পত্রিকার সম্পাদক ও বিটিভি পাবনা জেলা প্রতিনিধি আব্দুল মতীন খান। জানাজা শেষে তাঁকে পাবনা সদর গোরস্থান আরিফপুরে দাফন করা হয়।

গত জানুয়ারি মাসে মাছ রাঙা টেলিভিশন পাবনা স্টুডিও থেকে “রাঙা সকাল” এর ‘পদ্মা তীরে’ অনুষ্ঠানে প্রফেসর নূরুন্নবীর একটি সাক্ষাৎকার প্রচার করা হয় যা, গত ৭ আগষ্ট পূনঃপ্রচারিত হয়।

সেই সাক্ষাৎকারের শেষাংশে তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ হাসি হেসে বলেছিলেন ‘নটা গাছটি মুড়ালো আমার কথা ফুরালো….।’

(লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)

 


© All rights reserved 2018 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!