রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৫:৫৮ অপরাহ্ন

কমিশনের নির্দেশনা পেলেই ইছামতি ও বড়াল নদীর দখলদার উচ্ছেদ- জেলা প্রশাসক

সৈয়দ আকতারুজ্জামান রুমী, পাবনা : পাবনার ইছামতি ও বড়াল নদী দখল করে অবৈধভাবে নানা স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে।

ভূমিদস্যু ও দখলদারেরা নদীর জমি গ্রাস করে গড়ে তুলেছেন বহুতল ভবন, কল-কারখানা, মার্কেটসহ নানা স্থাপনা।

স্থানীয় পর্যায়ে থেমে নেই নদীকে দখল ও দূষণ মুক্তির আন্দোলন।

এ অবস্থায় পাবনার জেলা প্রশাসক বলেছেন, আগের তালিকার সঙ্গে নতুন কিছু দখলদার বেড়েছে। নদীর সীমানা নির্ধারণ ও সমীক্ষার কাজ চলছে। সমীক্ষা শেষে তারা কমিশনের নির্দেশনা পেলেই প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর সহায়তায় যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে ইছামতি ও বড়াল নদীর দখলদার উচ্ছেদ করা হবে।

পাবনা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা ইছামতি নদী আর চাটমোহর উপজেলা দিয়ে বয়ে চলা বড়াল নদী।

নদী দুটিতে অপরিকল্পিত সুইচ গেট ও বাধ দেওয়ার ফলে পানি প্রবাহ কমে যাওয়াতে দখল দুষণের কবলে পৌর এলাকার আর্বজনার ভাগারে পরিণত হয়েছে।

পাবনা সদর, সাথিঁয়া ও ভাঙ্গুড়া উপজেলার সীমানায় ৮৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ইছামতি নদী।

এ ছাড়া বড়াল নদীর সীমানা জেলার জোনাইল থেকে বাঘাবাড়ি পর্যন্ত। যার দৈর্ঘ্যতা প্রায় ১০০ কিলোমিটার হলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড মরা আর লোয়ার এ দুটি শ্রেণীতে নদীটিকে বিভক্ত করার ফলে পাবনার অংশে বড়াল নদী ৬৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য দাবি করে।

যদিও রাজশাহীর চারঘাট থেকে পাবনা পর্যন্ত বড়াল নদীটির দৈর্ঘ্য ২২০ কিলোমিটার।

২০০৩ সালে ইছামতি নদীর যে অবৈধ দখলদার ও স্থাপনা গুলোর জরিপে ২৮৫ জনের তালিকা করা হয়। সেই তালিকার সাথে বর্তমানে নতুন কিছু দখলদার বেড়েছে।

পাশাপাশি বড়াল নদী রক্ষা আন্দোলন কমিটির জরিপে চাটমোহরের সোন্দভা থেকে বড়াই গ্রাম এই ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত রয়েছে শতাধিক দখলদার।

এক সময় যেখানে ২১ হাজার কিউসেক পানি প্রবাহ ছিলো, সেখানে সুইচ গেট দেওয়ার কারণে ৫ হাজার কিউসেক পানি আসতে শুরু করে। মূলত তখন থেকেই বড়ালের মৃত্যু শুরু হয়। পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় দখল দুষণ ও বাড়তে থাকে। নদীও সংকুচিত হয়ে পড়ে।

সীমানা জটিলতার কারণেই অবাধে নদী তীর দখল হয়েছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড মনে করে।

তবে নদী রক্ষা আন্দোলনকারীরা মনে করেন যে, নদীতে সুইচ গেট বসিয়ে পানি প্রবাহ কমে যাওয়াতেই নদী মরা খালে পরিণত হয়েছে এবং নদীর দখল ও দূষণ বেড়ে গেছে।

পাবনার বড়াল ও ইছামতি নদী দুটিকে রক্ষার জন্য নদী রক্ষা কমিশন ও স্থানীয় প্রশাসন বর্তমানে যথেষ্ট উদ্যোগী।

ইতিমধ্যে, নদী রক্ষা কমিশন সারাদেশে নদীর কথা বিবেচনা করে পাবনার অবস্থা জানতে চাইলে সে তথ্য জেলা প্রশাসন পাঠিয়ে দিয়েছে এবং ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি চলমান রয়েছে।

পাশাপাশি পাবনাবাসীর প্রাণের দাবি ইছামতি নদী রক্ষা। ইছামতি নদীতে ২০০৩ সালে অবৈধ স্থাপনা গুলোর জরিপে ২৮৫ জন দখলদারের তালিকা থাকলেও বর্তমানে দখলদারের সংখ্যা বেড়ে গেছে।

চাটমোহরে বড়াল নদী পাড় দখল করে অবৈধ জায়গায় মার্কেট গড়ে তুলা হলেও উচ্ছেদ হচ্ছে কেবল দুর্বল মানুষের স্থাপনা।

কচুরিপানা আর নানা ধরণের শিল্পবর্জ্য এবং পৌর এলাকার আর্বজনার ভাগারে নদী দুষণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

অন্যদিকে নদীর বুকে ব্রীজ তৈরি ক্ষেত্রে প্রশস্ত ও উচু করে তা নির্মাণ করা ছাড়াও নদীর বুকের সমস্ত সুইচ গেট অপসারণ করার জোড় দাবি উঠেছে।

স্থানীয়রা বলছেন, এই পরিস্থিতির মুখে যদি নদী সচল করে দেওয়া হয় তাহলে এই নদীর পানির দ্বারা অনেক উপকার হবে।

জেলে পরিবার বলছে, নদীতে পানি নেই মাছ নেই, এ অবস্থায় তাদের জীবন ধারণ অসম্ভব কষ্টের হয়ে পড়েছে।

বড়াল নদী রক্ষা আন্দোলনের সদস্য জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন- যেখানে ২১ হাজার কিউসেক পানি আসতো সেখানে সুইচগেট দেওয়ার ফলে ৫ হাজার কিউসেক পানি আসতে শুরু করে, তখন থেকেই বড়াল নদীর মৃত্যু শুরু। এরপর যখন নদীতে পানি প্রবাহ কমে গেলো তখন থেকে আস্তে আস্তে মানুষের দখল দুষণ বেড়ে যেতে থাকলো।

বড়াল রক্ষা আন্দোলনের আহবায়ক, ডা:অঞ্জন ভর্ট্রাচার্য্য বলেন- আমাদের দাবি নদীর বুকে প্রতিটি ব্রীজ যেন প্রশস্ত এবং উচু করে তৈরি করা হয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা নদী গুলোর দখল এবং দুষণ। এটা মুক্ত করতে না পারলে এবং ড্রেজিং করতে না পারলে আমাদের সকল আন্দোলন ব্যর্থ হয়ে যাবে।

সরকার যদিও পদক্ষেপ নিচ্ছে কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে কাজের ক্ষেত্রে ধীরগতি হচ্ছে। পাশাপাশি অধিক গুরুত্বের সাথে সুইচগেট গুলো সম্পূর্ণরুপে অপসারণ করতে হবে। সকল নদীকে ক্যাপিটেল ড্রেজিংয়ের আওতায় আনতে হবে।

পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ড এর উপ পরিচালক, মোশারফ হোসেন জানান, পাবনায় আমাদের দুইটা নদী, বড়াল ও ইছামতি। বড়ালের ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি প্রায় শেষের পথে। আইডাব্লুউএস স্ট্যাডি টি করছে।

আর ইছামতি নদীর ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি নিয়ে কাজ করছে বুয়েটের একটা উংই। যা পরিচিত আইডাব্লুউএফএম বলে। বর্তমানে তাদের কাজ চলমান।

চাটমোহরের অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক শাজাহান আলী জানালেন, তিনি দীর্ঘদিন বড়াল রক্ষা কমিটির সাথে জড়িত। তাদের শৈশবের বড়াল নদী আজ ডাষ্টবিনের মত পড়ে আছে। পৌরসভা অবর্জনার ভাগার । সরকারি ভাবে পদক্ষেপ নিয়ে যদি নদীটা সচল করে দেয়; তাহলে এই নদীর পানির দ্বারা আমরা অনেকে উপকৃত হবো। কৃষি জমি আবাদের জন্য এবং আমাদের জীবন ধারণের জন্য।

ইতোমধ্যে, পানির উচু স্তর নিচুতে নেমে গেছে। চাপকলে চাপ দিলে আর পানি পড়ে না। যদি না সাবমার্সেল থাকে। বর্তমানে বড়ালে কচুরিপানা অবমুক্ত করাও জরুরি। নইলে মশা মাছির উপদ্রব মারাত্মক আকার ধারণ করবে।

চাটমোহরের বড়াল পাড়ের জেলে পরিবারের শ্রী মতি শিখা রানী হলদার ও সাগরিকা হলদার বলেন, আমরা নদীর মুক্তি চাই। নদীতে আগের মত মাছ ধরে জীবন ধারণ করতে চাই। আমাদের সংসার আর চলছে না, আমরা কোন দিকে শান্তি পাচ্ছি না। ছেলে মেয়ে মানুষ করা কঠিন। দেশে সবদিককার নদী খোলসা করার দাবী তাদের মুখে।

তারা বলছেন, বড়াল পাড়ের হিন্দু পরিবার গুলো নদীতে পানি না থাকায় খুব কষ্ট পাচ্ছে। না পাড়ছে নদীতে মাছ ধরতে, না পাচ্ছে অন্য কোন কাজ করে খেতে। এমনিতেই থালাবাসন মাজা, গোসল, রান্না ময়লা কাপড় ধোয়ার পানি সংকটে জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়েছে। তার উপর বসতি জমি দখলের কবলে তারা দিশেহারা হয়ে পড়ছে।

পাবনার জেলা প্রশাসক মো. জসিম উদ্দিন বলছেন, নদী রক্ষা কমিশন সারাদেশের নদীর কথা বিবেচনা করে পাবনার অবস্থা জানতে চাইলে আমরা তা পাঠিয়ে দিয়েছি নদী রক্ষা কমিশনে।

পুর্বে দখলদারদের যে লিষ্ট ছিলো। সেটার সাথে নতুন করে যারা দখল করছে তাদের টাও সংযোজন করে আমরা পাঠিয়েছি। সরকারের ডেল্টা প্লান্টের অধীনে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দে খনন কাজ চলমান প্রায় ১০টি নদীর।

যদিও খনন ও উচ্ছেদ প্রকল্পসহ নদী রক্ষার জন্য বর্তমানে ইছামতি ও বড়াল নদীর উন্নয়ন বরাদ্দ হলেই কর্ম প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে যাবে। এ জন্য জনগণের সহযোগিতা, সমর্থন এবং সদইচ্ছার বিকল্প নেই।

পাবনা ইছামতি নদী উদ্ধার আন্দোলনের আহবায়ক এস.এম.মাহবুব আলম জানান, ২০০৩ সালে যে অবৈধ দখলদার স্থাপনা গুলোর জরিপে ২৮৫ জনের লিষ্ট করা হয়। বর্তমানে আবার নতুন করে জরিপ কাজ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহায়তায় জেলা প্রশাসন।

বড়াল রক্ষা আন্দোলন (চাটমোহর) এর সদস্য সচিব; এস.এম.মিজানুর রহমান জানায়, প্রশাসন দখল মুক্ত করছে। তবে যারা প্রভাবশালী তাদের উচ্ছেদ করছেনা। তারা প্রতিদিন দখল করছে।

সম্প্রতি চাটমোহর পৌর মেয়র বড়াল নদীর পাড় দখল করে অবৈধ মার্কেট গড়ে তুলেছেন। সার্বিক পরিস্থিতিতে সরকারের সদইচ্ছা এবং প্রভাবমুক্ত প্রশাসন ছাড়া নদী রক্ষা সম্ভব নয়।

নদী দখলদারদের উচ্ছেদসহ তাদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তা না হলে এই উচ্ছেদ অর্থহীন হবে এবং পুনরায় দখলদারীত্ব প্রতিষ্ঠাপাবে।

পাবনার ইছামতি ও বড়াল কে দখল মুক্ত করে নদী খনন ও পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা হোক এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।


    পাবনায় নামাজের সময়সূচি
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ০৪:২৯
    সূর্যোদয়ভোর ০৫:৪৭
    যোহরদুপুর ১১:৫১
    আছরবিকাল ১৬:১৪
    মাগরিবসন্ধ্যা ১৭:৫৫
    এশা রাত ১৯:২৫
© All rights reserved 2019 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!