বুধবার, ১৯ জুন ২০১৯, ০৬:৪১ পূর্বাহ্ন

কারাগারে বসেই হত্যার নির্দেশ দেয় সিরাজ

ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে কারাগারে বসেই হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা। তার নির্দেশেই নুসরাতের শরীরে আগুন দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল পাঁচজন। কোথায়, কীভাবে তাকে পুড়িয়ে মারা হবে, সেই ছকও আঁটে তারা। গতকাল শনিবার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছে। পিবিআই জানায়, নুসরাত হত্যাকাণ্ডে এখন পর্যন্ত ১৩ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে দু’জন তরুণী। তাদের মধ্যে আটজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

গতকাল দুপুরে রাজধানীর ধানমণ্ডিতে পিবিআই সদরদপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, ৪ এপ্রিল  সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজের মুক্তির দাবিতে এ মামলার আসামি নুর উদ্দিনসহ কিছু লোক মানববন্ধন করে। তারা জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দেয়। ওইদিনই নুর উদ্দিনসহ কয়েকজন সিরাজের সঙ্গে কারাগারে দেখা করে। এ সময় সিরাজ নুসরাতকে হত্যার নির্দেশ দেন। নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় ৫ এপ্রিল মাদ্রাসার একটি হোস্টেলে বসে। এ জন্য তিনটি বোরকা ও কেরোসিন সংগ্রহ করার দায়িত্ব দেওয়া হয় এক তরুণীকে। অগ্নিসংযোগে সরাসরি অংশ নেওয়া চারজনের মধ্যে একজন শাহাদাত হোসেন শামীম। অন্য তিনজনের মধ্যে একজন তরুণী বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

পিবিআইপ্রধান বলেন, হত্যাকারীদের ধারণা ছিল, নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা তারা সামাল দিতে পারবে। আগে বহু অপকর্ম সামাল দিয়েছে তারা। নুসরাতের গায়ে তারা আগে একবার চুন মেরেছিল। তখন তিনি পাহাড়তলী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিলেন। সেই পরিস্থিতি তারা সামাল দিয়েছিল। এ কারণেই ভেবেছিল, পুড়িয়ে মারার ঘটনাও সামাল দিতে পারবে।

গত ৬ এপ্রিল পরীক্ষা দিতে গেলে বোরকা পরা চারজন নুসরাতের হাত-পা বেঁধে শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর আগে ২৭ মার্চ অধ্যক্ষ সিরাজের হাতে নির্যাতনের শিকার হন তিনি। এ ঘটনায় তার মা বাদী হয়ে সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। আসামিপক্ষ মামলা তুলে নিতে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করে। তবে এসব চাপ উপেক্ষা করেই নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন নুসরাত। এর জের ধরেই তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। তাকে ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। ১০ এপ্রিল রাতে তিনি মারা যান।

কারাগারে বসেই নির্দেশ: সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ৪ এপ্রিল অধ্যক্ষ সিরাজের সঙ্গে কারাগারে দেখা করতে যায় নুর উদ্দিনসহ কয়েকজন। তিনি নুসরাতকে হত্যার নির্দেশ দেন তাদের। এরপর ৫ এপ্রিল মাদ্রাসার পশ্চিম হোস্টেলে বসে নুর উদ্দিন, শাহাদাত, জাবেদ হোসেন, হাফেজ আব্দুল কাদেরসহ পাঁচজন হত্যার পরিকল্পনা করে। নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার প্রস্তাব দেয় শাহাদাত। পরে পরিকল্পনার বিষয়টি নিয়ে আরও পাঁচজনের সঙ্গে আলোচনা করে তারা। এই পাঁচজনের মধ্যে দু’জন ওই মাদ্রাসার ছাত্রী এবং তিনজন ছাত্র। এর মধ্যে এক তরুণীকে বোরকা ও কেরোসিন সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

যে কারণে পুড়িয়ে হত্যা: সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দুই কারণে নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। প্রথমত, অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করে নুসরাত দেশের আলেম সমাজকে হেয় করেছে বলে মনে করে তারা। দ্বিতীয়ত, নুসরাতকে দীর্ঘদিন ধরে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে আসছিল শাহাদাত। এতে প্রত্যাখ্যাত হয়ে সে ক্ষুব্ধ হয়। এই দুই কারণে তাকে গায়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যার সিদ্ধান্ত হয়। এ জন্য তিনটি বোরকা ও কেরোসিন আনার দায়িত্ব পালন করে এক তরুণী। সেও ওই মাদ্রাসার ছাত্রী। ৬ এপ্রিল ৭টা থেকে ৯টার মধ্যে ওই তরুণী তিনটি বোরকা ও পলিথিনে করে কেরোসিন এনে শাহাদাতের কাছে দেয়। আগুন দেওয়ার দিন ওই তরুণী, শাহাদাতসহ চারজন মাদ্রাসা ভবনের ছাদে দুটি টয়লেটে লুকিয়ে ছিল।

যেভাবে ছাদে ডাকা হয় নুসরাতকে: সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আলিম পরীক্ষা দেওয়ার জন্য ৬ এপ্রিল নুসরাত মাদ্রাসায় ঢোকামাত্র পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী এক তরুণী তাকে বলে, তার বান্ধবী নিশাতকে ছাদের ওপর কারা যেন মারধর করছে। এই খবর পেয়ে নুসরাত ছুটে যান ছাদে। সেখানে গিয়ে তিনি বোরকা পরা চারজনকে দেখতে পান। তারা ওড়না দিয়ে হাত-পা বেঁধে নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর তারা সিঁড়ি বেয়ে পালিয়ে যায়।

গেট পাহারায় পাঁচজন: পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী তারা নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার আগেই মাদ্রাসার প্রধান গেটের বাইরে অবস্থান নেয় নুর উদ্দিন, হাফেজ আব্দুল কাদেরসহ পাঁচজন। ব্যাকআপ টিম হিসেবে তারা সেখানে অবস্থান নেয়। তারা গেট পর্যবেক্ষণ করে। সরাসরি অংশ নেওয়া চারজন বেরিয়ে যাওয়ার পর এই পাঁচজনও সরে পড়ে।

নুসরাত হত্যাকাণ্ডে এখন পর্যন্ত ১৩ জনের সংশ্নিষ্টতা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পিবিআই। ১৩ জনের মধ্যে আটজন এজাহারভুক্ত আসামি। নুসরাতের গায়ে যে চারজন সরাসরি আগুন দেয় তার মধ্যে এক তরুণীসহ দু’জনকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। তাদের মধ্যে শাহাদাতকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে তাকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত পিবিআইর কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। তাকে নিয়ে ময়মনসিংহসহ কয়েকটি এলাকায় জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

জাহারভুক্ত সাতজন গ্রেফতার: এ ঘটনায় শাহাদাতসহ এজাহারভুক্ত সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার অন্যরা হলো- মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ (৫৫), সোনাগাজী পৌর কাউন্সিলর ও পৌর আওয়ামী লীগ নেতা মাকসুদ আলম (৪৫), মাদ্রাসার ছাত্র নুর উদ্দিন (২০), জোবায়ের আহম্মেদ (২০), জাবেদ হোসেন (১৯) এবং আফসার উদ্দিন (৩৫)। এজাহারভুক্ত হাফেজ আব্দুল কাদের পলাতক। অন্য আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

এ ছাড়া সন্দেহভাজন সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা হলো- সাইদুল ইসলাম, কেফায়েত উল্লাহ জনি, জসিম উদ্দিন, আরিফুল ইসলাম, আলাউদ্দিন, নুর হোসেন হুনা মিয়া ও উম্মে সুলতানা পপি।

নুসরাতকে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের মধ্যে দু’জন তরুণী বলে জানিয়েছেন ডিআইজি বনজ কুমার। তিনি বলেন, নুসরাত মৃত্যুর আগে এক তরুণীর নাম বলে গেছেন। আঞ্চলিক ভাষায় নুসরাত নামটি বলেছেন। তিনি শম্পা নাকি চম্পা উচ্চারণ করেছেন। তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

তবে উম্মে সুলতানা পপি নামে যাকে গ্রেফতার করা হয়েছে সে ওই ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে সংশ্নিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বনজ কুমার বলেন, আগুন দেওয়ার পরপরই ঘটনার ছায়া তদন্ত শুরু করে পিবিআই। তবে মামলাটি পিবিআইর কাছে আসে ৯ এপ্রিল। আগে ছায়া তদন্তের কারণে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফল পাওয়া সম্ভব হয়েছে। শুরু থেকেই অতিরিক্ত পুলিশ সুপার খালেদা বেগমসহ দু’জন বার্ন ইউনিটে নুসরাতের খোঁজখবর রাখেন। সুযোগ বুঝে নুসরাতের সঙ্গে তারা কথা বলার চেষ্টা করেছেন। কথা বলার সময় মাঝে মধ্যে ‘ওস্তাদ’ শব্দটি বলার চেষ্টা করেছেন নুসরাত। কে সেই ‘ওস্তাদ’, তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  


    পাবনায় নামাজের সময়সূচি
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ০৩:৪১
    সূর্যোদয়ভোর ০৫:১২
    যোহরদুপুর ১২:০০
    আছরবিকাল ১৬:৪০
    মাগরিবসন্ধ্যা ১৮:৪৮
    এশা রাত ২০:১৮
© All rights reserved 2019 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!