সোমবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৯, ০৩:৪৩ পূর্বাহ্ন

চাটমোহরের কিংবদন্তি ঢাকবাদক অমল ঢুলির কথা

।।তপন দাশ।।

বড়াল নদীর পাড়। বোঁথর চড়কবাড়ি গ্রাম। গ্রাম বললে খানিকটা ভুল হয়। শহরের সব ছোঁয়াই আছে সেখানে। পাবনার চাটমোহর পৌর সদর থেকে মাত্র আধা কিলোমিটার দূরে, বিলচলন ইউনিয়নের মধ্যে। ৪৭টি নদীর শাখা-প্রশাখা আর অসংখ্য ছোট-বড় বিলের সমষ্টি যে চলনবিল, তারই একটি খইলসাগাড়ী বিল। ১৫ মিনিটও হাঁটতে হয় না বিলটি দেখতে চাইলে। বড়াল নদীও মিশেছে চলনবিলে। সেই বড়ালপাড়ে অমল চন্দ্র শীলের ছোট্ট সংসার।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ নাটকের অমল খুব ছোট্টবেলায় গাঁয়ের রাস্তা দিয়ে হাঁক দিতে দিতে যাওয়া দইওয়ালাকে দেখে নিজে দইওয়ালা হতে চেয়েছিল। বোঁথরের অমল হতে চেয়েছিলেন ঢুলি। মস্ত বড় ঢুলি। হয়তো হয়েছেন, নয়তো নয়। কিন্তু ভেতরে ভেতরে কখন কিংবদন্তি বনে গেছেন, তা তিনি নিজেই জানেন না। দেশখ্যাত বোঁথরের চড়কপূজায় অমল শীলের বিকল্প ভাবেনই না কেউ। মরা চড়কগাছও প্রাণ পায় তার ঢাকের বাদ্যে। চাটমোহরের সাংস্কৃতিক সংগঠক আসাদুজ্জামান দুলাল তো কাব্য করে বলেই ফেললেন-

অমল ঢুলির ঢোলের বোলে,
চড়ক ঝোলে হৃদয় দোলে।

অমল শীল জাত ব্যবসা ধরেননি। করেনওনি। হয়েছেন ঢাকাল (ঢাকবাদক)। ঢাকালগিরি তার পেশা নয়। নেশা। ঢাকের বাজনায় মোড়ানো তার স্বপ্ন। ভালোবাসা। খাপখোলা ভালোবাসা না থাকলে কি বিনে পয়সায় ঢাক বাজানো যায়? শুধু চড়কপূজা নয়, দুর্গাপূজায় জয়ঢাক (বড় ঢোল) বাজিয়েও তিনি পারিশ্রমিক নেন না। প্রশ্ন উঠতেই পারে- তাহলে সংসার চলে কীভাবে? চলত কীভাবে?

৭৫ বছর বয়সী অমল চন্দ্র শীল ঢাক বাজান ১০-১২ বছর বয়স থেকে। বাবা ব্যবসা করতেন। সংসারের ঘানি টানতেন তিনিই। স্বপ্নবাজ কিশোর অমলের বুকে তখন ঢাকের নাচন। যেখানে ঢাকের বাদ্যি, সেখানেই অমল হাজির!

চৈত্র মাসে চড়কপূজা। বোঁথরে বসে লাখো মানুষের মেলা। মণ্ডা-মিঠাই আর খেলনা নিয়ে বসে দোকানিরা। চড়কগাছ ঘুরছে। পিঠে বিশাল বড়শি গেঁথে গাছের মাথায় ঘুরছেন ‘সন্ন্যাসী’। ছিটাচ্ছেন গুড়-চিনির বাতাসা। ছোট ছেলেমেয়েরা হুড়োহুড়ি করে কুড়াচ্ছে। কোনো দিকে অমলের দৃষ্টি নেই, কান নেই।

অমল দাঁড়িয়ে সেখানে, যেখানে ঢাক বাজছে। নাটোরের লালপুরের ওস্তাদ বৈদ্যনাথ, চাটমোহরের ওস্তাদ কালীপদ- মন-প্রাণ উজাড় করে নেচে নেচে বাজাচ্ছেন ঢাক। অমল কান খাড়া করে শুনছেন বাজনা। অপলক চোখে দেখছেন পায়ের গোড়ালি দিয়ে তালে তালে মাটিতে ঠুকুনি। মনোযোগ দিয়ে পড়ছেন ওস্তাদদের। এভাবেই বছরের পর বছর নীরবে তালিম নিয়েছেন তিনি। একদিন কাঁধে তুলেছেন ঢাক। হাতে নিয়েছেন বাঁশের কাঠি। ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছেন আজকের ‘অমল ঢুলি’।

অমল শীল শুধু চড়কেই ঢাক বাজান না, দুর্গাপূজায়ও তাঁর কাঁধে ঢাক ওঠে। কীর্তনের আসরেও তিনি খোল (মাটির তৈরি এক ধরনের ঢোল) বাজিয়েছেন। সর্বশেষ গত চৈত্রে চড়কে, আশ্বিনে দুর্গাপূজাতেও ঢাকের তালে মাতিয়েছেন সবাইকে। শোনালেন চড়ক আর দুর্গাপূজার ঢাকের বাজনার আদ্যোপান্ত। ঢাকের অনেকগুলো বোলও শোনালেন। চড়কগাছ পুকুর থেকে তুলে ডুবানো পর্যন্ত নানা রকম বাজনা। দুর্গাপূজাতেও পঞ্চমীতে ঘট স্থাপন থেকে দশমীতে বিসর্জন পর্যন্ত একেক দিন একেক বাজনা।

চড়কগাছ পুকুর থেকে তোলা, মাটিতে পোঁতা, পাট মাঙ্গা, ফুল ভাঙা, কালী নাচা, ভরণ নাচা, হাজরা ছাড়া, গাছ ঘুরানো- প্রতিটি পর্বে ঢাকের বোল আলাদা আলাদা। একটা বোল শুনতে চাইলে নিজ ঘরে বিছানায় বসা অমল বাবু হাঁটুতে ডান হাতের আঙুল ঠুককে ঠুকতে তালে তালে সুরে সুরে বলতে থাকলেন হাজরা ছাড়ার বোল- ঢা ঢা ঢা ঢা না না নাকুর টানা, ঢা ঢা ঢা ঢা ঢা না না নাকুর টানা…। মুহূর্তেই চোখের সামনে ভেসে উঠল গভীর রাতে কোনো এক গ্রামের উঠানে বিশালদেহী দুই ‘হাজরা’ মুখে লাল জবা ফুল গুঁজে উদ্যাম তালে বুনো নাচে মেতেছে। এখনই ছুটে যাবে গ্রামের মেঠোপথ বেয়ে। অন্ধকারে বিল-বাদাড়ে খুঁজবে শিবকে তুষ্ট করার উপচার।

দুর্গাপূজার ঢাক বাজানোর প্রতি আলাদা ভক্তি-শ্রদ্ধা অমল শীলের। পুরোহিত পূজা শুরু করলে ঢাক তার কাঁধে উঠে যায়। সঙ্গে বাজে ঘণ্টা-কাঁসর। ধূপের গন্ধ আর ধোঁয়ায় সৃষ্টি হয় মোহময় পরিবেশ। ভাবাবেগে আচ্ছন্ন অমল শীল ঢাক বাজানোর সঙ্গে সঙ্গে চড়কির মতো ঘুরতে থাকেন। পুরোহিতের ঘণ্টার গতি বাড়ে। পাল্লা দিয়ে তাল-লয় বাড়ে ঢোলের বোলের। সঙ্গে কাঁসরের। পূজা শেষে প্রতিদিন সন্ধ্যায় আরতির পালা। পুরোহিতের আরতির বাজনা একরকম। আবার ছেলেমেয়েদের আরতির বাজনা একটু আলাদা। অমল শীলের প্রতিমা বিসর্জনের বাজনা নাকি কান্না হয়ে কানে ধাক্কা দেয়। দুর্গাপূজার বাজনার একটা বোলও শুনিয়েছেন অমল ঢুলি- ঢা ঢা ঢা ঢান ঢান নাকু নাকুর টান, ঢা ঢা ঢা ঢান ঢান নাকু নাকুর টান…।

ঘর-সংসার করেননি অমল ঢুলি, তা কিন্তু বলা যাবে না। স্ত্রী রেখা রানী, দুই ছেলে সুজিত ও মিলন, মেয়ে কনিকা। তিন সন্তানকেই বিয়ে দিয়েছেন। বড় ছেলে সেলুনে কাজ করে। ছোটটা গার্মেন্টে। সংসারের জোয়ালটা কাঁধে চাপে ৩১-৩২ বছর বয়সে, যখন বিয়ে করেন। নিরুপায় ঢুলি তখন ব্যবসায়ী সাজেন। হাটে হাটে গিয়ে কাপড় বিক্রি করতেন। চাটমোহর রেলবাজার, জোনাইল হাট, গুয়াখাড়া, অষ্টমনিষা-মির্জাপুর হাট। সপ্তাহের ভিন্ন ভিন্ন দিনে যেতেন ভিন্ন ভিন্ন হাটে। সেই আয়েই চলত সংসার। ফাঁকে ফাঁকে চালিয়ে যেতেন ঢাক বাজানো। এখন আর তাকে হাট করতে হয় না। ছেলেরা সংসারের হাল ধরেছে।

ঢুলি হওয়ার স্বপ্ন কেন দেখলেন? এমন প্রশ্নে অমল শীল কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ। তারপর লাজুক মুচকি হাসি। নিচু স্বরে মাত্র দুই শব্দে উত্তর দিলেন- ‘ভালো লাগত।’ এই ভালো লাগা এক সময় ভালোবাসায় রূপ নিয়েছে। মন পুড়েছে। দেহ পুড়েছে। পুড়তে পুড়তে বেরিয়ে এসেছে আজকের ধবল অমল।

ঢাক কাঁধে আর কতদিন নাচতে চান, মানুষকে নাচাতে চান? এ প্রশ্ন অমল শীলকে কিছুটা বিব্রত করে। বুকের গভীর থেকে বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস। যেন অনেক মনোকষ্ট নিয়ে বলতে থাকেন- ‘ঢাক বাজাতে অনেক শক্তি আর দম লাগে। আমার শরীরে আর কুলায় না। হয়তো বেশিদিন আর বাজাব্যার পারব না।’ পাশে বসা ছেলে ও স্থানীয়রা সাহস দিলে তিনি বলেন- ‘ঢাক কাঁধে নিয়্যা দাঁড়ায়্যা বাজাব্যার পারব না। যদি বইস্যা বাজাব্যার দ্যায়, তাইলে দু-এক বছর বাজাব্যার পারি।’

অমল শীলের আফসোস একটাই- তিনি কোনো যোগ্য শিষ্য রেখে যেতে পারলেন না। বললেন- ‘অনেককে ঢাক বাজাইন্যা শিখাইছি, কিন্তুক কারু বাজনা কানে লাগে না।’

 

 


    পাবনায় নামাজের সময়সূচি
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ০৫:১২
    সূর্যোদয়ভোর ০৬:৩০
    যোহরদুপুর ১২:১২
    আছরবিকাল ১৬:১৮
    মাগরিবসন্ধ্যা ১৭:৫৫
    এশা রাত ১৯:২৫
© All rights reserved 2019 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!