মঙ্গলবার, ২১ মে ২০১৯, ০৫:১৪ পূর্বাহ্ন

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাবনার মাসব্যাপী ’২১ বইমেলার তৃতীয় সপ্তাহে পর্দাপন

সাইদ হাসান দারা

প্রতিবারের মতো এবারেও পাবনায় ভাষার মাসব্যাপী ’২১ বইমেলা ফেব্রয়ারি মাসের ১ তারিখে শুরু হয়েছিল।

শুরুটা যেমন হওয়া দরকার, তার কোনো ঘাটতি না রেখেই বইমেলা উদযাপন কমিটির আয়োজকেরা সেটা যথাযথভাবেই সম্পন্ন ও আয়োজন করেছিলেন।

বইমেলা আয়োজনের আগে অনেকের মাঝে কিছুটা সংশয় দেখা গিয়েছিল এবারে বইমেলা হয়তো কিছুটা ম্রিয়মাণ হতে পারে। কারণ মেলামাঠের অবস্থান যেহেতু পরিবর্তন হয়েছে। আর বলাই বাহুল্য সেই স্থানটি মুক্তমঞ্চের মতো অতো প্রসস্ত নয় এবং মেইন রোড় থেকে কিঞ্চিত দূরে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম মুক্তমঞ্চ এবং তার সম্পূর্ণ অবকাঠমো নতুন মাত্রায় নির্মাণাধীন থাকার জন্য এবারে অই স্থানে ’২১ বইমেলার আয়োজন সম্ভব হয়নি। সে কারণে বিকল্পস্থান হিসাবে যে স্থানে বইমেলার আয়োজন করা হয়েছে, সেখানে স্থান-সংকুলনের কারণে স্টল সংখ্যা হয়েছে কিছু কম।

কিন্তু তাতে বইমেলার আয়োজন-অনুষ্ঠানের কোনো ঘাটতি বা প্রভাব পড়েনি। সমস্ত মাঠের আয়তন হয়তো অনেক কম।

কিন্তু এবারের স্টলগুলোর অধিকাংশের আকার-আয়তন অনেক বড় এবং খোলামেলা। পাশাপাশি প্রতিদিনের নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য যে বর্ণালি মঞ্চ এবং দর্শক-শ্রোতাদের বসবার জন্য যে স্থান বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, সেটাও অত্যন্ত চমৎকার এবং খোলামেলাও বটে।

আর বলা বাহুল্য এই কারণে মেলার পূর্বে যে আশংকা করা হয়েছিল, তার কোনো প্রভাবই পড়েনি এবারের পাবনার মাসব্যাপী ’২১ বইমেলায়।

প্রায় তিন সপ্তাহ হয়ে এলো ’২১ বইমেলার বয়স। আলো ঝলমলে প্রসস্ত বইয়ের স্টলগুলোর শোভা পাচ্ছে দেশি-বিদেশি হাজার লেখকের বই। তবে লক্ষনীয় বিষয়: প্রতিটি স্টলেই আছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গল্প-উপন্যাস ও তথ্যভিত্তিক দুষ্প্রাপ্য বইপত্র এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের উপর লেখা নানা বইপত্র-দলিল-দস্তাবেজ।

এসব বই ছাড়াও দেশের এবং বিদেশের বরেণ্য লেখকদের অসংখ্য বইপত্র, অনুবাদগ্রন্থ ছাড়াও প্রয়োজনীয় নানা বইপত্র এই মেলায় পাওয়া যাচ্ছে।

ক্রেতার উপস্থিতি খুবই আশাব্যাঞ্জক। তবে এদের মধ্যে শিশু-কিশোররা এগিয়ে। বড়দের তুলনায় এই সব ক্ষুদে পাঠকরাই মেলাতে বেশি বেশি আসছে এবং তাদের পছন্দ মতো বইপত্র তারা নিজেরাই বেছে বেছে কিনছে। এসব দেখে মাঝে মাঝে মনে হয়, বড়রা যেন বইপত্র খুব একটা পছন্দ করছেন না।

হয়তো তাদের পড়বার সময় নেই। হয়তো তাদের জানাবারও কিছু বাকি নেই। আবার এমনও হতে পারে, যে ছোটদের মতো বই কিনলে এবং পড়লে বড়রা যদি ছোট হয়ে যায়: এই অমূলক আশংকা বড়দের মনে কাজ করে কিনা কে জানে। অবশ্য এই বিষয়টি নিয়ে একজন মনোবিজ্ঞানির সাথে কথা বলতে পারলে ভালো হতো।

পাবনা জেলা আগাগোড়াই সৃজনশীল ও সাংস্কৃতিকমনা লোকজনে ভরপুর। এই জেলায় জন্মগ্রহণ করেছেন অগনিত দেশবরেণ্য শিল্পি, কবি-সাহিত্যিক ও গুনিন মানুষ।

বর্তমানকালেও রয়েছেন অগুনিত শিল্পি, কবি-সাহিত্যিক ও গুনিজন। এই সব গুনিন ব্যক্তিদের পদচারণায় ও তাদের লিখিত বইপত্রে পাবনার ’২১ বইমেলা প্রতিদিনই সমৃব্ধ হচ্ছে। এই সব গুনিন মানুষের সৃষ্ট উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছেন আরো একদল ভিন্ন গুনের মানুষ।

এরা হয়তো বইপত্র অর্থাৎ গল্প-কবিতা লেখেনও না পড়েনও না। বড়জোর বাচাকাচ্চার আবদার ঠেকাতে তাদেরকে একটা ফুলপরি বা কমিকসের অথবা একটা ভুতের গল্পের বই কিনে দিচ্ছেন। কিন্তু তারা নিয়মিত আসেন এবং এসেছেন পাবনার সুপরিচিত ও সংগীত জগতের গর্ব প্রলয় চাকীর সার্বিক পরিচালনায় যাদুভরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করতে।

পাবনার মাসব্যাপী ’২১ বইমেলার মাঠে এই অনুষ্ঠান এবং আয়োজন সত্যিকার অর্থেই প্রসংশার দাবীদার। এটা গতানুগতিক কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়। কেননা এই মেলামঞ্চে শহর বা পাবনা জেলার যেকোনো অঞ্চলের সাংস্কৃতিকগোষ্ঠি তাদের নিজেদের পারফমেন্স পরিবেশন করতে পারে।

গান গাইতে চাইলে তারা পারবেন, নাচতে চাইলেও হবে, নাটক মঞ্চায়ন করতে চাইলেও পারবে। অন্যদিকে পাবনা শহরের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা, নানা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠির শিল্পিরা এবং ব্যক্তিপর্যায়ে শিশু-কিশোর এবং তরুণ শিল্পিরা যেভাবে মেলামঞ্চ মন-মাতানো নাচে-গানে ভরিয়ে তুলছে তা আক্ষরিক অর্থেই আকর্ষণীয় এবং দুর্লভও বটে।

এবং তাদেরকে আরো প্রচণ্ডরকমের উৎসাহ দেয়াসহ তাদের ভেতরের সুপ্তবাসনা তথা শিল্পি হবার প্রেরণা জাগিয়ে তুলতে সংগীত শিল্পি, সুরকার এবং মিউজিক কম্পোজিসিয়ান শ্রী প্রলয় চাকী যেন নিজেকে উৎসর্গ করেছেন।

তার পরিচালনায় মেলামঞ্চে যে সব স্থানীয় গাইয়েরা গান করেছেন, তাদের কিছু কিছু কণ্ঠশিল্পির গান মেলামাঠের দর্শক শ্রোতাদের খুবই মুগ্ধ করেছে আর সেই তখনই তারা বলাবলি করেছে দেশের যেকোনো শিল্পির চেয়ে তারা বেশি কিছু।

আবার নাচের আসরেও ব্যাপারটা যেন তেমনি। যদিও মঞ্চে নৃত্য অনুষ্ঠানের জন্য আরো অনেক কিছুর প্রয়োজন আছে তথাপিও ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা যেভাবে তাদের নাচ দেখিয়ে যাচ্ছে তাতে স্পষ্ট করে বলা যায়, এদেরকে উপযুক্ত পরিচর্যার মধ্যে লালন-পালন করলে এরা অবশ্যই দেশবরেন্য শিল্পিতে পৌঁছাতে পারতো।

প্রতিদিনের এই মনমাতানো অনুষ্ঠান যথযথা পরিবেশনার মধ্যে দিয়ে উপস্থাপন করায় সংগীতগুরু প্রলয় চাকীকে সার্বিকভাবে সহযোগীতা করে যাচ্ছে আরো একদল নিবেদিত প্রাণের শিল্পি যারা সর্বদা পরদার আড়ালে থেকে যায়। অর্থাৎ বাজানদার ও অন্যান্যরা। কণ্ঠশিল্পিরা যদি মঞ্চের আলো হয় তাহলে এরা প্রদ্বীপের জ্বালানি। তাই খুব সংক্ষেপে হলেও এদের নাম বলতে হচ্ছে যেমন মিজান, লিমর, রবিন, রিতমপ্রমুখ।

শীত চলে যায়নি বটে:, যাবো যাবো করছে কিন্তু যাচ্ছেও না। শহরের উপত্যাকা থেকে ফিরে ফিরে আসছে। এই অবস্থার ভেতরে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারি অধ্যাপক ড. হাবিবুল্লার কপালে ঘামের ঘামাচি স্পষ্ট। শুধু তিনিই না তার সাথে আরো ঘামছেন অ্যাড. কণিকা। কারণ তাদের দুজনকে প্রতিদিনই নিয়মিত আলোচনা অনুষ্ঠান পরিচালনা ও সঞ্চালন করতে হচ্ছে।

কোনোদিন, শহরের কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে, কোনোদিন হাসপাতালের ডাক্তারদের নিয়ে, কোনো স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েদের নিয়ে, কোনোদিন বইমেলার স্টল মালিকদের নিয়ে এবং কোনোদিন আর আর সব মানুষের নিয়ে: মেলা-সংক্রান্ত বা তার পেশার হালহকিত ইত্যাদির উপর আলোচনা-অনুষ্ঠান করতে হচ্ছে। আর প্রতিদিনের এই অতিথিদের কাছে তারা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আর কী প্রশ্ন করতে পারেন, তাই খুঁজতে হয়রান হয়ে পড়েছেন।

তাদের সেই হতচকিত অবস্থা হঠাৎই যেন আমাকে অবাক করে দিল, আমার মনে হলো মানুষের যতো-না জ্ঞিজ্ঞাসা আছে তারচেয়ে তার অনেক বেশি আছে উত্তর!

এই আলো ঝলমলে প্রাণের মিলন মেলা শিগগিরি শেষ হয়ে যাচ্ছে। আসছে ২৮ তারিখে মেলার মেয়াদ শেষ হবে। সুদীর্ঘ ভাষার মাসব্যাপী এই প্রাণের ’২১ বইমেলা পুনশ্চ পাবনার যথাস্থানে শুরু হবে এই আশার প্রদ্বীপ পুনশ্চ পরিচর্যার তাগিদ পাবনার সৃজনশীল-মননশীল মানুষেরা টের পেয়ে গেছেন; ফলে ক্রমেই যেন খানিকটা ম্রিয়মাণ হয়ে যাচ্ছেন তারা আবার এক বছর পরে..!

মেলামাঠে কয়েকজন পুলিশ সদস্যদের রোজই দেখা যাচ্ছে। সাবধানতা অবলম্বন এবং শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করতে তাদের উপস্থিতি। বরাবরের মতো পুলিশ সদস্যরা মেলামাঠের নিরাপত্তা ও অন্যান্য নজরদারী যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছেন। তারা পুলিশ বলে মেলামাঠে ভয় দেখিয়ে বেড়াননি; বরং শ্রোতার মুগ্ধতা দিয়ে মঞ্চের অনুষ্ঠান উপভোগ করেছেন এবং কয়েকজনকে ডিউটির ফাঁকে ফাঁকে স্টল ঘুরে পছন্দের বইও কিনেতেও দেখা গেছে। এতে বোঝা গেল অনেকই পুলিশ সদস্যই বই পড়েন।

বইমেলা কমিটির হাবিব ভাইকে (মুক্তিযোদ্ধা) দেখা গেল, তিনি পরিবার নিয়ে মেলার স্টলগুলোয় ঘুরছেন এবং অনেক বইপত্র কিনেছেন। কৃষিবিদ জাফর সাদিক সাহেবও মেলা কমিটির সদস্য। তিনি প্রতিদিন স্বস্ত্রীক মেলায় আসছেন। তার পুত্র-কন্যারা প্রায় মেলায় আসে, বইপত্র কেনে এবং কথাবার্তায় বোঝা গেল তারা বাবা-মায়ের মতোই পড়ুয়া।

প্রবীণ সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিককর্মি হিসাবে বিষেশভাবে সুপরিচিত আব্দুল মতীন খানের একটি বিরাট ও বিশেষ ভূমিকা আছে বইমেলার বিষয়ে। একমাস ব্যাপী মেলা, যা-তা বিষয় নয়।

সার্বিক চিন্তাভাবনা-পরিকল্পনা-সুষ্ঠব্যবস্থাপনা-সুষ্ঠপরিচারনা-নিরাপত্তা এবং সর্বপরি সৌন্দর্যের মাহিমায়, আনন্দমুখর পরিবেশের মধ্যে দিয়ে এটাকে উদযাপন করতে হবে। ব্যাপারটা অনেকটা পিতার কণ্যা-সম্প্রদানের মতোই। তার কর্মে সকলে সন্তুষ্ট, কৃতজ্ঞ।

মেলা কমিটির অন্যতম সদস্য অ্যাড. আব্দুল হান্নান। তিনি বেশ একটা শারদীয় প্রভায় উজ্জ্বল হয়ে রোজই মেলামাঠে আসছেন। হাসি ছাড়া তার মুখে আর যেন কিছু নাই। তবে এখনো তাকে বইপত্র কিনতে দেখা যায়নি। এরকম আরো অনেক মেলাকমিটির সদস্য আছেন, যাদের ব্যাপারে স্টল মালিকরা কিঞ্চিত নাখোশ তারা বইপত্র কিনছেন না বলে।

এবারের ’২১ বইমেলায় বেচাবিক্র মন্দ নয়। তাদের মধ্যে এগিয়ে আছে, বই আড্ডা, উত্তরণ প্রকাশনী, মশাল প্রকাশনী, পাঠশালাসহ বেশ কিছু স্টল। তবে তাদের মধ্যে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ-এর নামেও একটা বড় বইয়ের স্টল আছে।

এই স্টলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের উপর লেখা এতো মূল্যবান এবং সংগ্রহে রাখার মতো এতো বইপত্রের সমাহার ঘটিয়েছে যা অকল্পনীয়। প্রত্যেকটি বই অতিদরকারী। তথ্য এবং ত্বত্ত উভয়ের সমাহারের এই সব দুঃপ্রাপ্য বইগুলো যখন-তখন সংগ্রহ করা দুষ্কর।

কাজেই যারা কেনার এবং সংগ্রহ করার ইচ্ছা রাখেন, তারা ছাত্রলীগের বকুস্টলে ভীড় জমাচ্ছেন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  


    পাবনায় নামাজের সময়সূচি
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ০৩:৪৭
    সূর্যোদয়ভোর ০৫:১৪
    যোহরদুপুর ১১:৫৫
    আছরবিকাল ১৬:৩৪
    মাগরিবসন্ধ্যা ১৮:৩৬
    এশা রাত ২০:০৬

পাবনা এলাকার সেহেরি ও ইফতারের সময়সূচি

© All rights reserved 2019 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!