মঙ্গলবার, ২১ মে ২০১৯, ০৪:২৮ পূর্বাহ্ন

নাগরিকত্ব দিয়ে ফেরত নিতে হবে রোহিঙ্গাদের- ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বরতার জন্য মিয়ানমার দায়ী, তাদেরই এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিকত্ব দিয়ে ফেরত নিতে হবে মিয়ানমারকে।

শুধু ফেরত নিলেই হবে না, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মর্যাদার সঙ্গে নাগরিক হিসেবে যাতে তারা বৈষম্যহীনভাবে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারে, সে জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। ফেরত নেওয়ার পর রোহিঙ্গাদের উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও মর্যাদার জন্য মিয়ানমার সরকার কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করতে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে রাখাইনে অবাধ প্রবেশাধিকার দিতে হবে। গতকাল সোমবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি এসব কথা বলেন।

স্বচক্ষে দেখা পরিস্থিতি এবং সংকট সমাধানের উপায় সম্পর্কে নিজের অবস্থান তুলে ধরতে ওই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন ইউএনএইচসিআরের প্রধান ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি।

নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিধনের বর্ণনা শুনে অধিবেশন ফেলে বাংলাদেশ সফরে আসেন ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি। গত শনি ও রবিবার কক্সবাজার, কুতুপালংসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে মিয়ানমার থেকে এসে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি দেখেছেন তিনি। রোহিঙ্গাদের মুখে শুনেছেন হত্যা, ধর্ষণ, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়াসহ বর্বরতার নানা কাহিনী।

নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোয় বাংলাদেশ সরকার ও এ দেশের জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়ে ইউএনএইচসিআরের হাইকমিশনার বলেন, ‘বিভিন্ন দেশ শরণার্থীদের আশ্রয় দেয় না।

বরং কোনো শরণার্থী যাতে ঢুকতে না পারে, সে জন্য সীমান্ত সিলগালা করে দেয়। সেখানে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের প্রাণ বাঁচাতে এ পর্যন্ত ছয়-সাতবার সীমান্ত খুলে দিয়েছে। বাংলাদেশের সরকার ও জনগণ তাদের প্রতি যে আতিথেয়তা দেখিয়েছে, তাতে আমি আন্তরিকভাবে শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানাই। ’

রোহিঙ্গাসহ কেউ সারা বিশ্বে যাতে শরণার্থী হতে বাধ্য না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে না পারা জাতিসংঘ বা ইউএনএইচসিআরের জন্য লজ্জার বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রহীন করে রেখেছে উল্লেখ করে গ্রান্ডি বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের উত্স মিয়ানমারে, সমাধানও তাদেরই করতে হবে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নিউ ইয়র্কে আমাকে এ কথাই বলেছেন, আমিও তাঁর সঙ্গে পুরোপুরি একমত। বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা আসছে মিয়ানমার থেকে। তাই মিয়ানমারকেই তাদের ফেরত নিতে হবে। তবে শুধু ফেরত নিলেই হবে না। সহিংসতার মূল কারণ হলো রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব না দেওয়া। তাই তাদের নাগরিকত্ব দিতে হবে। তাদের নিরাপদভাবে  মর্যাদার সঙ্গে বসবাসের অধিকার দিতে হবে। রাখাইনে থাকা অন্য নাগরিকদের মতো বৈষম্যহীনভাবে রোহিঙ্গাদের সব ধরনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। রাখাইন রাজ্যের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। আর রাখাইনে এখনই জরুরি ভিত্তিতে সব ধরনের সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। সেখানে উচ্ছেদ হওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে ত্রাণ সরবরাহ করার জন্য ত্রাণকর্মীদের প্রবেশাধিকার দিতে হবে। ’

গ্রান্ডি বলেন, কফি আনান কমিশনের সুপারিশেই এই সংকটের সমাধানের কথা বলা আছে। সেখানে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেওয়া ও রাখাইন রাজ্যের উন্নয়নের কথা বলা আছে। মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের কথা বলেছেন। ইউএনএইচসিআর চায়, দ্রুত আনান কমিশনের বাস্তবায়ন শুরু করবে মিয়ানমার।

গ্রান্ডি জানান, ইউএনএইচসিআর আগামী সপ্তাহে জেনেভায় বোর্ডসভার আয়োজন করছে, যেখানে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হবে। তিনি বলেন, খুবই স্বল্প সময়ের প্রস্তুতি নিয়ে তিনি বাংলাদেশে এসেছেন। বাংলাদেশে আসার আগে মিয়ানমারে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। লজিস্টিক সাপোর্টের অভাবে যেতে পারেননি। তবে শিগগিরই মিয়ানমার সফরে গিয়ে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে দেশটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করবেন।

সেফ জোন জটিল প্রক্রিয়া : জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তত্ত্বাবধানে রোহিঙ্গাদের জন্য রাখাইনে সেফ জোন প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের প্রস্তাব সম্পর্কে ইউএনএইচসিআরের অবস্থান জানতে চাইলে গ্রান্ডি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সেফ জোন প্রতিষ্ঠা নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করতে পারে। তবে সবচেয়ে জরুরি হলো কিভাবে রাখাইনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে, রোহিঙ্গাদের জন্য রাখাইন ও মিয়ানমারকে নিরাপদ রাখা হবে। সিরিয়ায় সেফ জোন হয়েছে। সেফ জোন করতে হলে সে দেশের সম্মতি লাগে। সংশ্লিষ্ট দেশ সম্মতি না দিলে সেফ জোন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হতে হয়। এটা বেশ জটিল প্রক্রিয়া। আমরা রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা চাই, সেটাই সর্বাগ্রে জরুরি। ’

এমন কিছু করা উচিত যাতে নিজেরাই ফিরে যেতে চায় : মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও উগ্র জাতীয়তাবাদীদের বর্বর হামলায় সেখানে চোখের সামনে স্বজনকে খুন হতে দেখেছে যারা, সেসব রোহিঙ্গা রাখাইনে আর ফিরতে চাইবে কি না—জানতে চাইলে গ্রান্ডি বলেন, ‘রোহিঙ্গারা সব কিছু হারিয়েছে। অনেকে স্বজন হারিয়েছে, অনেকে ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তারা সেখানে ফিরতে আগ্রহী হবে না। তবে নির্যাতনের শিকার হওয়া রোহিঙ্গারা এক দিনেই ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে না। তারা যাতে মিয়ানমারে ফিরতে আগ্রহী হয়, সে জন্য কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ দীর্ঘ সময় ধরে নিশ্চিত করতে হবে মিয়ানমারকে। কেউ ফিরে যেতে না চাইলে, তাকে আমরা জোর করে পাঠাতে পারি না। সে জন্য আমাদের এমন কিছু করা উচিত, যাতে তারা নিজেরাই ফিরে যেতে চায়। আর ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গারা নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে থাকতে পারে, সে জন্য সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে রাখাইনে প্রবেশাধিকার দিতে হবে। ’

আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে কাজ করতে চাই : গ্রান্ডি বলেন, ‘এমনিতেই রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে যেতে নিরাপদ অনুভব করবে না। এ জন্য মিয়ানমার সরকারকে অনেক কাজ করতে হবে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনায় নিরাপদ বোধ করার মতো পরিবেশ সৃষ্টির অনেক ফর্মুলা রয়েছে। সেগুলো নিশ্চিত করতে হবে। রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা কিভাবে নিশ্চিত করা যায়, সেটা জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা করা দরকার। এ দায়িত্ব মিয়ানমারের। কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের কথা মিয়ানমার কয়েকবার বলেছে। তারা একটি কমিটি গঠন করেছে। এটি বাস্তবায়নে আমরা কাজ করতে চাই। ’

দুই মাসের মধ্যে বাংলাদেশে দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশ সফরের কথা উল্লেখ করে ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি বলেন, এই দুই মাসে পরিস্থিতিতে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। রোহিঙ্গাদের যে ঢল নেমেছে, তা এই অঞ্চলে তো বটেই সম্ভবত সারা বিশ্বের মধ্যে এটি সবচেয়ে দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকা শরণার্থী সমস্যা। কক্সবাজারে দুই দিন রোহিঙ্গাদের মধ্যে ঘোরার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, পাহাড় ও নদীর পাড়ে কম জায়গায় অনেক কষ্ট করে বিপুলসংখ্যক মানুষ রয়েছে। কুতুপালং ও টেকনাফ থেকে আসা অনেকের কাছে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো ভয়ংকর নিষ্ঠুরতার বিবরণ শুনেছেন তিনি।

গ্রান্ডি বলেন, ‘যারা নানা ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছে, তাদের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। তারা দেখেছে গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দিতে, পরিবারের সদস্যদের গুলি করতে অথবা ধরে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলতে। নারী ও মেয়েদের ওপর পাশবিকতা হয়েছে। অনেক শরণার্থী বলেছে, তারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে চায়। তবে এ জন্য তারা চায় সহিংসতার অবসান এবং অধিকার রক্ষার নিশ্চয়তা। ’

বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের এখনই ‘শরণার্থী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষে নয়—এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গ্রান্ডি বলেন, ‘আমাদের দৃষ্টিতে রাখাইন থেকে যারা এসেছে, তারা শরণার্থী। তারা বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা, সন্ত্রাস, হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন-নিপীড়নের মধ্য থেকে আসছে। তবে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তাদের নিয়ে নিজের মতো করে ভাবতে পারে। আমরা রোহিঙ্গাদের নিবন্ধনের কাজে সরকারকে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছি। ’

অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হলে একটি চরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার উদ্যোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইউএনএইচসিআরের হাইকমিশনার বলেন, এটি ভালো উদ্যোগ। গত জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর এ বিষয়ে কথা হয়েছে। এ ধরনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলে বাংলাদেশকে কারিগরি সহায়তা দেওয়া হবে।

ছয় মাসে ৭ কোটি ৭০ লাখ ডলারেরও অনেক বেশি সহায়তা লাগবে : গত ২৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা চার লাখ ৩৬ হাজার উল্লেখ করে গ্রান্ডি বলেন, ‘আমরা বলেছিলাম, আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় আগামী ছয় মাসে ৭৭ মিলিয়ন ডলার লাগবে। এখন মনে হচ্ছে, এর চেয়েও অনেক বেশি পরিমাণ সহায়তা লাগবে। ’ বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতায় জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিভিন্ন দেশকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

গ্রান্ডি বলেন, ‘কক্সবাজার জেলায় ২৫ লাখ বাংলাদেশি রয়েছে। সেখানে আরো চার লাখ ৩৬ হাজার যোগ হলো। প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য অসাধারণ আতিথেয়তার কারণে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই। কারণ, বাংলাদেশ ছোট দেশ, বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যা, সম্পদও কম। তার মধ্যে এত বেশিসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া ও তাদের মানবিক সহায়তা দেওয়া সত্যিই মহত্ত্ব্বের কাজ। অনেক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন ছোট ছোট ট্রাকে করে রোহিঙ্গাদের যা যা প্রয়োজন, তা সরবরাহ করছে। এসব দেখে আমি সত্যিই অভিভূত। ’

মানবিক সহায়তায় বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের বিপুল অংশগ্রহণ সত্ত্ব্বেও রোহিঙ্গাদের অবস্থা খুবই শোচনীয় উল্লেখ করে শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার আরো বলেন, তাদের থাকার ব্যবস্থা করা ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। সুশৃঙ্খলভাবে খাদ্য বিতরণ চালানোর চেষ্টা হচ্ছে। তা সত্ত্ব্বেও অনেক পরিবার ঠিকমতো খাবার পাচ্ছে না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা। অনেক শিশু এই প্রথমবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে পারছে না।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  


    পাবনায় নামাজের সময়সূচি
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ০৩:৪৭
    সূর্যোদয়ভোর ০৫:১৪
    যোহরদুপুর ১১:৫৫
    আছরবিকাল ১৬:৩৪
    মাগরিবসন্ধ্যা ১৮:৩৬
    এশা রাত ২০:০৬

পাবনা এলাকার সেহেরি ও ইফতারের সময়সূচি

© All rights reserved 2019 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!