বুধবার, ১৯ জুন ২০১৯, ০৮:৪৩ পূর্বাহ্ন

পরস্পরকে দুষছেন বিএনপি নেতারা

একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিপর্যয়ের নেপথ্যে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগের পাশাপাশি নিজেদের ভুল ও দুর্বলতা নিয়েও নানামুখী হিসাব-নিকাশ কষছে বিএনপি। একইসঙ্গে নির্বাচনী কৌশলে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নানা দুর্বলতার জন্য এখন পরস্পরকে দায়ী করছেন দলের শীর্ষ নেতারা।

দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দৌড়ঝাঁপ করেও ভূ-রাজনীতি নিজেদের ‘অনুকূলে’ আনতে পারেননি দলটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। এটিকে এখন বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন একপক্ষের নেতারা। একইসঙ্গে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত থাকা জামায়াতে ইসলামীকে জোটে রেখে নির্বাচনে ‘ধানের শীষ’ প্রতীক দেওয়ার বিষয়টিও ভুল হয়েছে বলে মনে করছেন দলের বেশিরভাগ নেতা। স্বতন্ত্র প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত থাকলেও শেষ মুহূর্তে কীভাবে জামায়াত ‘ধানের শীষ’ প্রতীক পেল- তা নিয়ে দল ও জোটের নেতারাও বিস্মিত।

আবার জনপ্রিয় ও ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে দুর্বল প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে বলেও মনে করেন অনেক নেতাকর্মী। দুর্বল প্রার্থীর পাশাপাশি প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করার মতো সাহসী ও যোগ্য নেতৃত্বের অভাবও ছিল। এজন্য অনেক ভোটকেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট দেওয়া যায়নি। এটিকেও একটি বড় ব্যর্থতা হিসেবে মনে করছে দলের হাইকমান্ড। মনোনয়নদানকারী নীতিনির্ধারক নেতা ও মনোনয়নপ্রাপ্ত নেতা- দু’পক্ষকেই দোষারোপ করছেন দলের বড় একটি অংশের নেতারা।

নির্বাচনের আগে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লাহ বুলুর ফাঁস হওয়া ফোনালাপেও দলের ভেতর পরস্পরের বিরুদ্ধে দোষারোপের বিষয়টি প্রকাশ পায়। ওই ফোনালাপে দুই নেতাই নির্বাচনে থাকায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দোষারোপ করে কথা বলেন। যদিও ফোনালাপটি ভুয়া বলে দাবি করেন ওই দুই নেতা।

এ পরিস্থিতিতে গতকাল শুক্রবার রাতে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে বৈঠক করেন।

অবশ্য নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, ‘উদ্ভূত’ পরিস্থিতিতে কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও লন্ডনে অবস্থানরত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সিনিয়র নেতাদের রাজনৈতিক ‘কৌশলে’র প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তারা দলের নেতাকর্মীদের কারও বক্তব্য-বিবৃতিতে বিভ্রান্ত না হয়ে ঐক্যবদ্ধ থেকে নির্দলীয় সরকারের অধীনে পুনর্নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। খালেদা জিয়া দলের নেতাদের ‘বিশেষ বার্তা’য় সরকারের নানামুখী চাপের মুখে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটকে ঐক্যবদ্ধ রেখে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে নির্বাচনে লড়তে পারায় শীর্ষ নেতাদের ওপর সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তার অনুপস্থিতিতে সিনিয়র নেতারা ঝুঁকি নিয়ে দেশি-বিদেশি শক্তির সঙ্গে যে ‘লড়াই’ ও ‘কৌশল’ গ্রহণ করেছেন- এর চেয়ে আর বেশি কী করার আছে।

তবে বিএনপির অনেক নেতাকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষী বুদ্ধিজীবী দলের চেয়ারম্যান ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সন্তুষ্টির সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন। তাদের দাবি, নির্বাচনে বিএনপি কিছু ইতিবাচক কৌশল নিলেও অনেক ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে ড. কামাল হোসেনসহ জাতীয় নেতাদের দেশে-বিদেশে ইতিবাচক ভাবমূর্তিকে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে। তবে বিএনপির সংকটের বড় কারণ বৈশ্বিক রাজনীতি অনুধাবন করতে না পারা। বিএনপির কৌশল প্রভাবশালী প্রতিবেশী দেশগুলোকে আশ্বস্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানে সারা বিশ্ব ইসলামী জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়ছে। আওয়ামী লীগ সরকার সফলভাবে বিএনপি জোটের অন্যতম শরিক দল জামায়াতে ইসলামীকে পাকিস্তানের জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে বলে বিদেশিদের কাছে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে।

অবশ্য বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মনে করেন, নির্বাচনে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করতে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই বিএনপি ও জোটের নেতারা সব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ থাকলে ফলাফলের চিত্র উল্টোটা হতো। দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয় বলে তারা যে দাবিতে আন্দোলন করছেন তাই সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। দল ও জোটের নেতারা সবাই বিষয়টি বোঝেন। এ নিয়ে দল ও জোটের মধ্যে কোনো মতপার্থক্য নেই বলে তিনি দাবি করেন।

বিএনপি নেতারা জানান, ‘প্রভাবশালী রাষ্ট্র ভারত জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগের জন্য বিএনপির প্রতি অনেক আগে থেকেই অনুরোধ জানিয়ে আসছে। ২০১২ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা থাকাকালে ভারত সফরের সময়ও জামায়াতের ব্যাপারে আপত্তি তুলেছিল। জামায়াত পাকিস্তানের জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত অভিযোগ করে ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ বলে জানিয়েছিল তারা। এমনকি তাদের কাছে প্রমাণাদি রয়েছে বলেও দাবি করেছিল ভারত। ভারতের বিরোধিতার বিষয়টি আমলে নেওয়া উচিত ছিল মনে করেন দলটির অনেক নেতা।’

বিএনপির ওই অংশের নেতারা আরও দাবি করেন, দেশের ভেতর ও বাইরে নানা পক্ষের বিরোধিতার পরও জামায়াতকে জোটে রাখার কৌশল বিএনপির ভুল ছিল। তার পরও কৌশলী ভূমিকা নিয়ে ভোটব্যাংকের চিন্তা করে নিবন্ধনহারা জামায়াতকে স্বতন্ত্র প্রতীকে জোটে রেখে স্থানীয়ভাবে ছাড় দেওয়ার কথা হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে গভীর রাতে জামায়াতকে কেন ‘ধানের শীষ’ প্রতীক দেওয়া হলো, তা জানেন না বিএনপি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলের শীর্ষ নেতারা।

অবশ্য এ নিয়ে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন ভারতের একটি পত্রিকায় সাক্ষাৎকারেও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, জামায়াত ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করবে জানলে ঐক্যফ্রন্টের দায়িত্ব নিতেন না। সম্প্রতি তিনজন শুভাকাঙ্ক্ষী বিএনপির শীর্ষস্থানীয় এক নেতার উদ্দেশে ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘স্বপ্নের খোয়াবে’র মধ্যে না থেকে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে চিন্তা করুন। নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের ভালো ইমেজ ছিল; অন্যদিকে ২০ দলীয় জোটের মধ্যে জামায়াতের কর্মী-সমর্থকদের শক্তি ছিল। কিন্তু নির্বাচনের পর দেখা গেল, ঐক্যফ্রন্ট পেল ‘দুটি লাড্ডু’ আর ২০ দল পেলে ‘শূন্য’। তাদের যুক্তি, নানামুখী বিরোধিতার পরও যে জামায়াতের শক্তি ও ভোটব্যাংককে গুরুত্ব দিয়ে ২২টি আসন দেওয়া হলো- একটিতেও তারা কোনো শক্তি দেখাতে পারল না কেন?

বিএনপির তরুণ একজন নেতা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি এবং তরুণ প্রজন্ম মনে করে, জামায়াতে ইসলামী যুদ্ধাপরাধীদের দল। তরুণ ভোটাররাও জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়া এবং বিএনপিদলীয় ধানের শীষ প্রতীক দেওয়াকে ভালো চোখে দেখেননি। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলও তরুণ প্রজন্মের অনুভূতির বিষয়ে একাত্মতা প্রকাশ করে সুফল নিয়েছে বলে মনে করেন তারা।

বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্নেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ সমকালকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিএনপির উচিত হবে ধৈর্য ধারণ করা। তাদের কোনো ভুলত্রুটি থাকলে তা খুঁজে বের করে সংশোধন করা। এ মুহূর্তে কোনো হঠকারী চিন্তা-ভাবনা ও কর্মসূচি গ্রহণ না করাই ভালো। পরিস্থিতি অনুযায়ী ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এখন ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের নেতৃত্বে এনে তৃণমূল থেকে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করে সামনে এগোতে হবে।

যোগ্য ও ত্যাগী নেতাদের মনোনয়ন না দেওয়া :বিএনপির নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ মনে করেন, দলের মনোনয়ন সঠিকভাবে দেওয়া হয়নি। বিশেষ করে দলের যোগ্য ও ত্যাগী নেতাদের মধ্যে দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান খান দুদু, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসন আলাল, বিশেষ সম্পাদক ও আন্তর্জাতিক উইংয়ের সদস্য সচিব ড. আসাদুজ্জামান রিপন, আন্তর্জাতিক সম্পাদক ও সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ড. এহছানুল হক মিলন, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল প্রমুখকে মনোনয়ন না দেওয়ায় ক্ষুব্ধ তারা। ছাত্র রাজনীতিতে থেকে জাতীয় রাজনীতিতে আসা নারী নেত্রীদের মধ্যে শিরীন সুলতানা, রেহানা আক্তার রানু, হেলেন জেরিন খান, নিলুফার চৌধুরী মনি, শাম্মী আক্তার, রাশেদা বেগম হীরা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম নেতা-নেত্রীদের মধ্যে বেবী নাজনীন, মনির খান, হেলাল খান এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে জয়ন্ত কুণ্ডের মতো ত্যাগী নেতাদের মনোনয়ন না দেওয়ায় অবমূল্যায়নের ‘ভুল’ বার্তা পেয়েছেন নেতাকর্মীরা।

বিএনপির ক্ষুব্ধ এক নেতা জানান, দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সিনিয়র একজন সদস্যকে দুটি আসনে মনোনয়ন দেওয়ায় তিনি নির্বাচনী এলাকা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। ভোটের সময় ঢাকায় থেকে তার পক্ষে দলের কৌশল ও নীতিনির্ধারণী ভূমিকা রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার আরেকজন স্থায়ী কমিটির গুরুত্বপূর্ণ নেতা দুটি আসনে নির্বাচন করতে চাইলেও তাকে না দেওয়ায় তিনি অসন্তুষ্ট হয়ে নির্বাচনী আসনে ব্যস্ত সময় পার করেন। অথচ তারও নির্বাচনের আগে ঢাকায় থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলে ভালো হতো। ঢাকা মহানগর বিএনপির সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেলকে বঞ্চিত করে দলের স্থায়ী কমিটির আরেক গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে দুটি আসন দেওয়ায় অসন্তুষ্ট হন ছাত্র ও যুবনেতারা।

এ ছাড়া দলের অন্যতম অঙ্গ সংগঠন জাতীয়তাবাদী যুবদলের সভাপতি সাইফুল আলম নিরব ও সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিন টুকুকে মনোনয়ন দিলেও অন্য দুটি বড় অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের একজনকেও মনোনয়ন না দেওয়ায় ক্ষুব্ধ তারা। তারা সক্রিয়ভাবে মাঠে না নামার এটিও একটি বড় কারণ বলে জানা গেছে। যুবদলের সঙ্গে প্রতিযোগিতাকারী সংগঠন জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবু, সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল ও সাংগঠনিক সম্পাদক ইয়াসিন আলী এবং ছাত্রদলের সভাপতি রাজিব আহসান ও সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসানকে মনোনয়ন না দেওয়ায় সংগঠন দুটির নেতাকর্মীরা অনেকটা হতাশ হয়ে নিষ্ফ্ক্রিয় ছিলেন।- সমকাল

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  


    পাবনায় নামাজের সময়সূচি
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ০৩:৪১
    সূর্যোদয়ভোর ০৫:১২
    যোহরদুপুর ১২:০০
    আছরবিকাল ১৬:৪০
    মাগরিবসন্ধ্যা ১৮:৪৮
    এশা রাত ২০:১৮
© All rights reserved 2019 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!