রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ০৯:০৩ অপরাহ্ন

পাবনার অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপত্যের নিদর্শন ‘জোড় বাংলা মন্দির’

বার্তাকক্ষ : পাবনা জেলার অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক স্থাপত্যের নিদর্শন জোড় বাংলা মন্দির।

মন্দিরটির নির্মাণশৈলী বাংলার অন্যান্য মন্দির স্থাপত্য থেকে ভিন্ন। ইট নির্মিত একটি অনুচ্চ বেদীর উপর মন্দিরের মূল কাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। মন্দিরটির উপরের পাকা ছাদ বাংলার দোচালা ঘরের চালের অনুরূপ।

পাশাপাশি দু’টি দোচালা ঘরের ছাদকে এক সঙ্গে জোড়া লাগিয়ে মন্দিরের ছাদ নির্মাণ করা হয়েছে। ছাদের মধ্যভাগ বেশ উঁচু হলেও ছাদের ধার উত্তর ও দক্ষিণ দিকে ক্রমশ ঢালু হয়ে গেছে। পশ্চিমমুখী মন্দিরের সামনে রয়েছে একটি বারান্দা এবং তাতে দু’টি স্তম্ভের সাহায্যে প্রবেশপথ রয়েছে ৩টি।

প্রবেশপথ এবং সংলগ্ন স্তম্ভ ও দেয়ালের নির্মাণ কৌশলে দিনাজপুরের কান্তনগর মন্দির এর সঙ্গে সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায়। দেয়াল ও স্তম্ভে এক সময় প্রচুর পোড়ামাটির চিত্রফলকে অলংকৃত ছিল।

১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ভূমিকম্পে মন্দিরের যথেষ্ট ক্ষতি সাধিত হয়।

মন্দিরের সঙ্গে সংস্থাপিত কোন শিলালিপি না থাকলেও স্থানীয়দের মতে, মুর্শিদাবাদের নবাবের তহশীলদার ব্রজমোহন ক্রোড়ী আঠারো শতকের মাঝামাঝি কোন এক সময়ে মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। বর্তমানে মন্দিরের সংস্কার কাজ হয়েছে।

প্রায় ২৬৬ বছরের পুরনো মন্দিরটির দোচালা স্থাপত্য রীতিতে পাশাপাশি ২টি চালা নিয়ে জোড় বাংলা মন্দির। পশ্চিম দিকটি মন্দিরের সদর। উত্তর ও পশ্চিম দিকে টানা বারান্দা, ২টি প্রবেশ পথও এই দুই বারান্দা দিয়ে (একটি মণ্ডপের ও অন্যটি গর্ভগৃহের)।

সামনের ঘরটি মণ্ডপ ও পেছনেরটি গর্ভগৃহ। মণ্ডপের সামনের বারান্দায় ৩টি খিলান আছে। উত্তর ও দক্ষিণদিকে ৪টি করে মোট ৮টি স্তম্ভের উপর মন্দিরটি দাঁড়িয়ে।

মন্দিরটির দৈর্ঘ্য ১৬ হাত, প্রস্থ ১৪ হাত, উচ্চতা ২২ হাত এবং প্রাচীরের বেড় তিন হাত। দোচালা মন্দিরের দুই শেষপ্রান্ত উচু হয়ে একসঙ্গে মিশেছে। দেয়ালগুলো অত্যন্ত প্রশস্ত হলেও কামরাগুলো খুব ছোট ছোট।

সামনের দিকে ছাড়া অন্য দিকগুলতে টেরাকোটার তেমন কোনো কাজ নেই। সাধারণ প্লাস্টার ও মাঝে মাঝে ২/১টা নকশা টেরাকোটা। তবে ছাদের ঠিক নিচদিয়ে তিন দিকের ওয়ালে টানা জ্যামিতিক কারুকাজ আছে।

সামনের দিকের টেরাকোটাগুলোর একটি বড় অংশ ছাঁচ টেরাকোটা। টেরাকোটায় রাম-রাবনের যুদ্ধ, পৌরনিক কাহিনী ও জ্যামিতিক নকশা স্থান পেয়েছে।

‘পাবনা জেলার ইতিহাস’ গ্রন্থের লেখক রাধারমণ সাহার দেয়া তথ্য অনুযায়ী এককালে এখানে গোপীনাথের মূর্তি ছিল, নিয়মিত তার পূজাও হতো। সেখান থেকে মন্দিরটি গোপীনাথের মন্দির হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

এখানে রাধা-কৃষ্ণের মূর্তি ছিল বলেও জানা যায়। এখানে সর্বশেষ কবে পূজা হয় সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১৯১০ সালে স্থানীয় কালী মন্দিরে গোপীনাথের মূর্তিটি সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তখন থেকে তা ওখানেই আছে।

ষোড়শ শতাব্দী থেকে বাংলায় একের পর এক মন্দির নির্মাণ কার্যক্রম শুরু হয়। এইসব মন্দিরের সাথে মিশে আছে একাধিক রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক ঘটনা।

রাজনৈতিক দিক থেকে বলতে গেলে, এই সময়টা ছিল সম্রাট আকবরের এবং পরবর্তীতে জাহাঙ্গীরের। একই সময়ে গৌদিয়া বৈষ্ণবের উদ্ভব হওয়ায় তখনকার পদ্য কিংবা সামগ্রিক সাহিত্যে কালীর প্রতি ভক্তি বা চৈতন্যের একটি বার্তা পৌঁছাতে থাকে ঘরে ঘরে।

তাই ভিন্ন ধর্মের প্রজারা যাতে সম্রাটদের উপর নাখোশ না হয় তা মাথায় রেখেই বেশি করে মন্দির নির্মাণ শুরু করেন সম্রাটরা। একটি ধারা যখন শুরু হয়ে যায় তখন তা নিয়ে নানারকমের গবেষণাও চলতে থাকে।

নাগারা, চালা, রত্ন, রেখা, জোড় বাংলা এই সব স্থাপত্য শৈলী আসলে তৎকালীন গবেষণারই ফলাফল। পাবনার এই জোড় বাংলা মন্দিরের দুটি চালা একত্রে ইংরেজি ‘M’ অক্ষরের মতো আকৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পূর্বের চালাটিকে বলা হয় ‘মান্দাপা’ আর পশ্চিমের চালাটি ‘গর্ব গৃহ’ নামে পরিচিত। পরেরটিকে বাংলা ভল্টও বলেন কেউ কেউ।

এই মন্দিরটির নির্মাণ শৈলী বাংলার অন্যান্য মন্দির থেকে কিছুটা ভিন্ন। দোচালা ঘরের দুই প্রান্ত নিচু, মাঝখানে শিরদাঁড়ার মতো করে উঁচু একটি কাঠামোর দেখা পাওয়া যায়।

এই ইমারতটি ভাস্কর্য শিল্পের একটি দারুণ নিদর্শন। আকারে ছোট হলেও দৃশ্যত বেশ কিছু সুন্দর ছোট ছোট পোড়া ইটের কারুকাজ করা নকশা মন জুড়িয়ে দেয়। দেয়ালগুলো বেশ প্রশস্ত কিন্তু সেই তুলনায় ভেতরের কামরাগুলো অপ্রশস্ত বলা চলে।

দেশ ভাগের পর দীর্ঘদিন যাবত অনাদরে, অবহেলায় পড়ে ছিল মন্দিরটি। যার ফলে বেশ ক্ষতি হয়ে যায় ইমারতটির। পরবর্তীতে আইয়ুব খানের আমলে ১৯৬০ এর দশকে পাবনা জেলা প্রশাসকের প্রচেষ্টায় ইমারতটির আমূল সংস্কার করা হয়।

মন্দিরটি পাবনা পৌর শহরের তালপুকুর সংলগ্ন স্থানে অবস্থিত।


    পাবনায় নামাজের সময়সূচি
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ০৪:৫৩
    সূর্যোদয়ভোর ০৬:১৪
    যোহরদুপুর ১১:৪৩
    আছরবিকাল ১৫:৩৭
    মাগরিবসন্ধ্যা ১৭:১২
    এশা রাত ১৮:৪২
© All rights reserved 2019 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!