রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ০৪:১৬ অপরাহ্ন

পাবনার মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় মৃত্যু্ঞ্জয়ী শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী

 

।।মো. মহিউদ্দিন ভূইয়া।।

আজ ৩ নভেম্বর ২০১৮ জাতীয় চারনেতার তেতাল্লিশতম শাহাদতবার্ষিকী। বাঙালি জাতির বিশ্বস্ত ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শে লালিত জাতীয় চারনেতা- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামারুজ্জামান হেনাকে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ভোররাতে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

এই হত্যাকাণ্ড বাঙালি জাতির জন্য এক কলংকিত অধ্যায়, নির্মম ইতিহাস।

শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী :

বাংলাদেশের রাজনীতিতে শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর নাম চিরদিন অমর হয়ে থাকবে। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং দূরদর্শিতা তাঁকে এক বিরল সম্মান দান করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা- সংগ্রামে এবং মুক্তিযুদ্ধে তিনি যে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁর অবদান অক্ষয়কীর্তি হিসেবে অম্লান হয়ে থাকবে।

শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী তৎকালীন পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহকুমার রতনকান্দি ইউনিয়নের অন্তর্গত কুড়িপাড়া গ্রামে ১৯১৯ সালের ১৬ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন।

পিতা হরফ আলী পেশায় একজন কৃষক হলেও সামাজিক নানা কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সর্বদাই জড়িত ছিলেন। তাছাড়া শিক্ষার প্রতি হরফ আলীর আগ্রহ ও শ্রদ্ধা ছিল গভীর।

জমিজমা নিয়ে তিনি একজন মাথাতোলা কৃষক হিসেবে যথেষ্ট সম্মান লাভ করেছিলেন। মনসুর আলীর মাতা রওশন আরা ছিলেন গৃহিণী। চার ভাইয়ের মধ্যে ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী কনিষ্ঠ।

পিতামাতার উৎসাহে মনসুর আলীর শিক্ষাজীবনের সূচনা হয় পার্শ্ববর্তী গান্ধাইল ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে। এই স্কুল থেকেই মনসুর আলী স্কলারশিপ নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন।

তিনি সিরাজগঞ্জ বিএল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৩৫ সালে ম্যাট্রিক এবং পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে ১৯৩৭ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে আই এ পাস করেন।

কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে ১৯৪১ সালে বিএ এবং আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৪ সালে অর্থনীতিতে এমএ ও এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন।

ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ১৯৫১ সালে পাবনা বারে যোগ দেন। ১৯৫৮ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্ট বিভাগে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।

১৯৬৪ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাবনা বারের কার্যনির্বাহী পরিষদের দায়িত্ব পালন করেছেন যথাক্রমে সম্পাদক ও সভাপতি হিসেবে। আইনজীবী হিসেবেও তাঁর সুখ্যাতি ছিল গোটা দেশজুড়ে। সে সময় তিনি পাবনা শহরের দক্ষিণ রাঘবপুরে স্থায়ীনিবাস গড়ে তোলেন।

ইসলামিয়া কলেজে অধ্যয়নকালে ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে এবং তাঁর সঙ্গেই রাজনীতিতে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন।

ছাত্রজীবনেই শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী প্রমুখ রাজনীতিবিদদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে।

তখন থেকেই তিনি অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির দিকে আকৃষ্ট হন।
ব্রিটিশদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে- এই প্রতিজ্ঞা সেদিন সকল রাজনীতি-সচেতন ছাত্রকে যেমন উদবুদ্ধ করেছিল, মনসুর আলীও তেমনি সেই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ওঠেন।

এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই তৎকালীন মুসলিম লীগে একজন বিশিষ্ট কর্মী হিসেবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

এর ফলেই তিনি পাবনা জেলা মুসলিম লীগের একজন বলিষ্ঠ নেতা হিসেবে জনগণের নিকট থেকে শ্রদ্ধার আসন লাভ করেন।

১৯৪৮ সালে পাকিস্তান ন্যাশনাল গার্ড (পিএনজি) গঠন করা হলে মনসুর আলী এই বাহিনীতে যোগ দেন।

যশোর সেনানিবাসে প্রশিক্ষণের পর ক্যাপ্টেন পদে উন্নীত হন এবং সেখানে কিছুদিন কাজ করেন। এই সুবাদেই তাঁর নামের পূর্বে ‘ক্যাপ্টেন’ শব্দটি এমনভাবে সংযোজিত হয় যে, এরপর ক্যাপ্টেন মনসুর আলী নামেই তিনি সমধিক পরিচিতি লাভ করেন।

১৯৪৬-৫০ সাল পর্যন্ত তিনি পাবনা জেলা মুসলিম লীগের সহ-সভাপতি, একই সঙ্গে মুসলিম লীগের গার্ডবাহিনীর পাবনা জেলা শাখার ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৫১ সালে তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দেন। ১৯৫৩-৬৫ ও ১৯৬৬-৭৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী পরিষদের অন্যতম সদস্য ও সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

৫২’র ভাষা আন্দোলনে পাবনায় নেতৃত্ব দেন ও কারাভোগ করেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট্রের মনোনয়নে পূর্ববঙ্গ আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৫৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ-কংগ্রেস দলীয় পূর্ববঙ্গ কোয়ালিশন সরকারের মন্ত্রী নিযুক্ত হন।
আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী (সেপ্টেম্বর ১৯৫৬-মার্চ ১৯৫৭), খাদ্য ও কৃষিমন্ত্রী (মার্চ ১৯৫৭-মার্চ ১৯৫৮) এবং বাণিজ্য, শ্রম ও শিল্পমন্ত্রী (মার্চ ১৯৫৮-অক্টোবর ১৯৫৮) হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৬৭ সালের মার্চে তৎকালীন সামরিক শাসক আইউব খানের রেশনে দেয়া বিষাক্ত ভুট্টা নিয়ে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে তিনি গ্রেফতার হন।

১৯৭০ সালের ১৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনে পাবনা-১ (বর্তমানে সিরাজগঞ্জ-১) আসন থেকে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের অর্থ ও বাণিজ্যমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় লাভের পর অর্থ, শিল্প, প্রাকৃতিক সম্পদ ও বাণিজ্যমন্ত্রী নিযুক্ত হন।

বঙ্গবন্ধু সরকারের পুনর্গঠিত মন্ত্রিসভার যোগাযোগমন্ত্রী (১২ জানুয়ারি ১৯৭২-৭ জুলাই ১৯৭৪) এবং স্বরাষ্ট্র ও যোগাযোগমন্ত্রী (৮ জুলাই ১৯৭৪-২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি পাবনা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি দেশে সংসদীয় সরকারের পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন।

১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠিত হলে তিনি সেক্রেটারি জেনারেল নিযুক্ত হন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলে ২৩ আগস্ট তিনি গ্রেফতার হন।

খন্দকার মোস্তাকের মন্ত্রিসভায় তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পদ দেয়ার প্রস্তাব তিনি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন।

এর ফলে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ভোররাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি অবস্থায় পাকিস্তানিদের দোসর ও কুখ্যাত মোস্তাকের নির্দেশে সশস্ত্র বাহিনীর কতিপয় বিপদগামীর গুলিতে ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী শাহাদতবরণ করেন।

ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী একজন নিবেদিতপ্রাণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। বৃহত্তর পাবনার সামাজিক, শিক্ষা, সংস্কৃতি, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়।

১৯৭০ সালে তিনি পাবনা আইন কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৭২ সাল পর্যন্ত তিনি উক্ত কলেজের অবৈতনিক অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

পরে তাঁর উদ্যোগে কলেজের নামকরণ করা হয় “শহীদ আমিন উদ্দিন আইন কলেজ”।

কলেজের জন্য তিনি নিজস্ব ভবনের ব্যবস্থা করেন।

সুজানগরে শহীদ দুলাল উচ্চ বিদ্যালয়, কাশিনাথপুরে শহীদ নুরুল হোসেন মহাবিদ্যালয় ও পাবনায় শহীদ সাধন সংগীত মহাবিদ্যালয় স্থাপনে তিনি পৃষ্ঠপোষকতা করেন; শহীদ বুলবুল মহাবিদ্যালয়ে বিএসসি খোলার নির্দেশ দেন এবং শহীদ আমজাদ হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়ের জন্য বালিয়াহালটে জমির বন্দোবস্ত ও ভবন নির্মাণের পদক্ষেপ নেন।

১৯৭৩ সালে পাবনায় হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠায় পৃষ্ঠপোষকতা করেন।

আটঘরিয়ায় কৃষি কলেজ স্থাপনের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে একান্ন বিঘা ঘাস জমির বন্দোবস্ত তিনিই করেছিলেন।

১৯৭৩-৭৪ ও ১৯৭৪-৭৫ শিক্ষাবর্ষে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে এমএ এবং এমকম কোর্স চালুর ব্যবস্থা করেন।

১৯৭২ সালে পাবনা-ত্রিমোহিনী সড়ক ও পাবনা-পাকশি সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ ও বগামিয়া সড়ক নামে আখ্যায়িতকরণ, ঈশ্বরদী-নগরবাড়ি রেললাইন স্থাপনে ভূমি অধিগ্রহণ সহ মাটি ভরাটের কাজ এবং মুলাডুলির সন্নিকটে শহীদ আমিন উদ্দিন স্মরণে ১৯৭৩ সালে “শহীদ আমিননগর রেলস্টেশন” উদ্বোধনসহ নানাভাবে পাবনার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে তিনি অবদান রাখেন।

এছাড়া বৃহত্তর পাবনার অসংখ্য শিক্ষিত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়ে তিনি পাবনাবাসীর আপামর জনগণের হৃদয়ের মণিকোঠায় নিজেকে স্থান করে নিতে সক্ষম হন।

আমরা দেশপ্রেমিক এই মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম পরিচালক ও মানবদরদি ব্যক্তির প্রতি জানাই সশ্রদ্ধ সালাম ও তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। আমিন।


© All rights reserved 2018 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!