শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০১:১৬ অপরাহ্ন

পাবনায় দুই ভুয়া ডাক্তারের দৌরাত্ম্য!

 

স্টাফ রিপোর্টার, পাবনা : একজন কোনোমতে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত লেখাপড়া করে ওষুধের দোকানের কর্মচারী ছিলেন, অন্যজন ৩ বার পরীক্ষা দিয়ে এসএসসি পাস করা নৌবাহিনীর ৪র্থ শ্রেণীর সাবেক কুক (বাবুর্চি)।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এরা দু’জনই এখন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। সেভেন পাস চিকিৎসক মধু ঘোষ নিজেকে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ বলে দাবি করেন। আর বাবুর্চি মোমিন সাইনবোর্ড-প্যাডে অদ্ভুত সব ডিগ্রি লাগিয়ে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বনে গেছেন।

পাবনার সাঁথিয়ার বনগ্রাম বাজারে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন এ দুই ভুয়া চিকিৎসক। তাদের অপচিকিৎসার শিকার হয়ে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়েছেন এলাকার অনেকে। বেশ ক’জনের অকাল মৃত্যু হয়েছে।

কেউ কেউ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। তারপরও তারা এলাকায় ‘চালু ডাক্তার’ হিসেবে পরিচিত। মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের কাছ তাদের রয়েছে বেশ কদর।

সম্প্রতি দুই ভুয়া চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন এ প্রতিনিধির হাতে আসে। তারা নিজ নিজ প্যাডে যেসব ডিগ্রির কথা উল্লেখ করেছেন আর যেসব ওষুধ লিখেছেন তা দেখে পাবনার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা রীতিমতো হতবাক।

সেভেন পাস মধু ঘোষ : জানা যায়, মধুকে পাবনার বনগ্রাম বাজারে মামাদের বাড়িতে রেখে ভারতে চলে যান তার বাবা-মা। মামার আশ্রয়ে থেকে স্থানীয় মিয়াপুর হাইস্কুলে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত লেখাপড়া করেন মধু।

এরপর তিনি বনগ্রাম বাজারে মামাদের ‘ঘোষ মেডিকেল হল’-এ কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। এ সময়ের মধ্যে ওষুধ কেনা-বেচায় দক্ষ হয়ে ওঠায় এলাকায় ব্যাপক পরিচিতি পান মধু। স্থানীয়রা জানান, সুচতুর মধু তার পরিচিতিকে ‘ডাক্তার মধু’ হিসেবে চালিয়ে দেন। শুরু করেন সর্বরোগের ওষুধ দেয়া।

এভাবেই এলাকার সহজ-সরল মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে চলেছেন তিনি। এখন শিশু, গাইনি, যৌন রোগ থেকে শুরু করে সব রোগের চিকিৎসা করে চলেছেন। শীতকালে শিশুরা নানা রোগে আক্রান্ত হয়। এ সময় গ্রামের সাধারণ মানুষ তার কাছে শিশুদের নিয়ে আসেন। আর এ সুযোগটিকে তিনি পুরাপুরি কাজে লাগান।

মধু ডাক্তারের পাশের দোকানদার আরমান আলী জানান, মধুর অপচিকিৎসার শিকার হয়ে কয়েক বছর আগে তার স্ত্রী মারা গেছেন। মধুর অপচিকিৎসার খপ্পরে পড়ে বামনডাঙ্গা গ্রামের গিয়াস উদ্দিন মৃধার ছেলে রানা পঙ্গু হয়ে গেছেন। রানা মৃধা জানান, পায়ের গোড়ালি কেটে যাওয়ায় তিনি মধু ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলেন।

মধু তাকে ইনজেকশন ও অন্যান্য ওষুধ দিয়েছিলেন। এরপর পায়ে পচন ধরে। পরে হাসপাতালে পায়ের চিকিৎসা হয়। এতে লাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছে। এখনও পা ভালো হয়নি।

বাবুর্চি মোমিন আলী : পদ্মবিলা গ্রামের ময়েজ উদ্দিন মিয়ার ছেলে মোমিন আলী মিয়াপুর হাইস্কুল থেকে দু’বার এসএসসি ফেল করে পরের বার কোনোমতে পাস করেন। এরপর নৌবাহিনীতে ৪র্থ শ্রেণীর কুক (বাবুর্চি) পদে চাকরি নেন।

৪-৫ বছর হল চাকরি থেকে অবসর নিয়ে এলাকায় এসে নিজেকে নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ডাক্তার বলে চালাচ্ছেন। বনগ্রাম বাজারে দুটি ফার্মেসিতে আগে রোগী দেখলেও এখন পুলিশ মার্কেটে নিজস্ব চেম্বারে রোগী দেখেন। বনগ্রাম বাজারের অদূরে নিজ বাড়িতে লাগিয়েছেন সাইনবোর্ড। আর সাইনবোর্ড ও প্রেসক্রিপশনে লিখে রেখেছেন অদ্ভুদ সব ডিগ্রি।

মোমিনের প্রেসক্রিপশনে যা লেখা রয়েছে : ডা. এমএ মোমিন (অবসরপ্রাপ্ত বাংলাদেশ নৌবাহিনী), সিআইপি, মেডিসিন, টেকনিক্যাল কলেজ, ঢাকা; সিআইপিডিটি, ইউএন্ডআইএ, ইউনিভার্সিটি অফ ঢাকা।

চিকিৎসা সেবাসমূহ- মাইনর অপারেশন, কাটা, আঘাত লাগা, ফোড়া, টিউমার, চর্ম, যৌন, নাক-কান-গলা, চক্ষু, লিভার, হার্ট, পেটের যাবতীয় সমস্যা, গাইনি, মুখের রোগ, বাতব্যথা, কোমর, হাঁটু ব্যথা, শিশুরোগসহ সকল রোগের সুচিকিৎসা করা হয়। ইনভেস্টিগেশন : চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড অ্যান্ড হংকং।

সাইনবোর্ডে এসব ডিগ্রি ও রোগ সারানোর বয়ান দেখে জেলার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা হতবাক।
পাবনার প্রবীণ চিকিৎসক ডা. ক্যাপ্টেন (অব.) সরোয়ার জাহান ফয়েজ বলেন, এটা অন্যায় ও প্রতারণা। সবচেয়ে বড় অন্যায় তিনি নৌ বাহিনীকে ডিগ্রির মধ্যে গুলিয়েছেন। তার বিদ্যার জোর এসব লেখা দেখেই বোঝা যায়।

পাবনা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. রিয়াজুল হক জানান, যারা পল্লী চিকিৎসক হিসেবে সনদ জোগাড় করেছেন, তাদেরও নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে তারা কোন ওষুধ লিখতে পারবেন, কোনগুলো লিখতে পারবেন না। কিন্তু তারা সবই লিখছেন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছেন। এসব প্রতারকদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা দরকার।

পাবনা জেনারেল হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও বিএমএ পাবনার সেক্রেটারি ডা. আকসাদ আল মাসুর আনন এসব ডিগ্রির কথা শুনে বিস্মিত। তিনি বলেন, এরকম ডিগ্রির কথা জীবনে শুনিনি। এসব হাতুড়ে ডাক্তার কিছু রোগ সারান বটে। তবে কার কি মাত্রার ওষুধ দেয়া লাগবে বা মাত্রা কি হবে তা সঠিকভাবে দিতে পারেন না।

তারা নিজেদের চিকিৎসক জাহির করতে সাধারণ ওষুধের ক্ষেত্রে হায়ার অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে থাকেন। এর ক্ষতিকর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এক সময় দেখা যাবে এসব রোগীর শরীরে আর কোনো অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করবে না।

পাবনার সিভিল সার্জন ডা. তাহাজ্জেল হোসেন বলেন, এদের কোনো প্রেসক্রিপশন লেখা তো দূরের কথা, রোগী দেখারই অধিকার নেই। এদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

 

 


© All rights reserved 2018 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!