সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১১:৩০ অপরাহ্ন

পাবনায় বধ্যভূমি-গণকবরগুলোর বেহাল দশা

পাবনায় বধ্যভূমি-গণকবরগুলোর বেহাল দশা

পাবনায় বধ্যভূমি-গণকবরগুলোর বেহাল দশা

পাবনায় বধ্যভূমি-গণকবরগুলোর বেহাল দশা

শাহীন রহমান : পাবনা জেলা শহরসহ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মৃতি বিজড়িত অসংখ্য গণকবর আর বধ্যভূমি।

তবে অধিকাংশ এসব গণকবর আর বধ্যভূমিগুলো বেহাল দশায় পড়ে আছে। অযত্ন আর অবহেলার মধ্যে পড়ে থাকা সেগুলো যেন দেখার কেউ নেই। অধিকাংশ গণকবর আর বধ্যভূমি এখন গোচারণভূমিতে পরিণত হয়েছে।

১৯৭১ সালে দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে যারা এতোটুকু কুণ্ঠিত হননি, আজ সেই সব শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও পাকবাহিনীর হাতে নিহত মুক্তিকামী সাধারণ মানুষ পায়নি তাদের যথাযথ মর্যাদা।

স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও কোনো সরকারই শহীদদের স্মৃতির প্রতি যথাযথ সম্মান দেখিয়ে গণকবর ও বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়নি। দুএকটি জায়গায় স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হলেও সেগুলোও অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে।

বংশীপাড়া গণকবর : জেলার আটঘরিয়া উপজেলার মাজপাড়া বংশীপাড়া ঘাট (শহীদ কালামনগর)। পাকবাহিনী ৬ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধা, গ্রামাবাসীর সঙ্গে হানাদার বাহিনীর সম্মুখযুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে ১২ জন বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ ৪০ জন সাধারণ গ্রামবাসী শহীদ হন।

দীর্ঘদিন অযত্ন আর অবহেলায় গোচারণভূমিতে পরিণত ছিল ওই স্থান। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে সেখানে শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। যথাযথ পরিচর্যা না করা আর অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে স্মৃতিসৌধটি।

তবে গ্রামবাসী যুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেকের স্মৃতি ধরে রাখতে খিদিরপুর বাজারে প্রতিষ্ঠা করেছে শহীদ আব্দুল খালেক স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালামের স্মৃতি ধরে রাখতে বংশীপাড়ার নাম দিয়েছে কালামনগর।

Pabna

ধুলাউড়ি গণকবর

ধুলাউড়ি গণহত্যা ও গণকবর : জেলার সাঁথিয়া উপজেলার ধুলাউড়ি গণহত্যা চালায় ১৯৭১ সালের ২৭ নভেম্বর। ১৮ জন মুক্তিযোদ্ধাকে পাকবাহিনী ধুলাউড়ি গ্রামে ধরে নিয়ে যায়। সেখানে তারা তৎকালীন আলবদর, আলশামস প্রধান মওলানা মতিউর রহমান নিজামীর হাতে ছেড়ে দেয়। নিজামীর উপস্থিতি এবং নির্দেশে ছাত্তার রাজাকারসহ তার সহযোগীরা বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে তাদের।

এ স্থানে খবির উদ্দিন, চাঁদ আলী, দারা মিয়া, মকছেদ আলী বিশ্বাস, আকতার আলম, মহসিন মধু, শাহজাহান আলী, মোসলেম উদ্দিন, ডা. আব্দুল আওয়াল, ডা. আবুল কাশেম ফকির, আব্দুর রশিদ ফকির, জহুরুল ইসলাম ফকির, ওয়াজেদ আলী সরকার, কোবাদ আলী বিশ্বাস, আব্দুল গফুর, আব্দুস সামাদ বিশ্বাস, আকতার হোসেন তালুকদারসহ ১৮ জন মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করা হয়। এর মধ্যে ১১ জনকে ওই সময় গণকবর দেওয়া হয়। গণকবরটি ইট দিয়ে বাঁধানো হলেও গ্রামবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবি স্মৃতিস্তম্ভ বা স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করার। যা আজও হয়নি।

Pabna

ডেমরার গণকবরের বর্তমান হাল

ডেমড়া গণকবর : জেলার সাঁথিয়া উপজেলার শেষ সীমানা এবং একই জেলার ফরিদপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা ডেমড়া। এলাকাটি নিরাপদ ভেবে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে ধণাঢ্য ব্যবসায়ীরা এ গ্রামে আশ্রয় নেন।

তৎকালীন রাজাকার, আলবদর, আল শামস প্রধান মওলানা মতিউর রহমান নিজামীর নির্দেশে তার স্থানীয় দোসর আসাদ রাজাকারের নেতৃত্বে এ গ্রামে ২৫০ জন ধণাঢ্য হিন্দু ব্যবসায়ীসহ প্রায় সহস্রাধিক মুক্তিযোদ্ধা এবং স্থানীয় গ্রামবাসীকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। সেই সঙ্গে তারা এই এলাকায় ব্যাপক লুটতরাজ ও নারী ধর্ষণের ঘটনা ঘটায়। ২৫০ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে সারিবদ্ধভাবে মাটি চাপা দেওয়া হয়।

এ ছাড়া বাকি শহীদ মুসলমানদের লাশগুলোও সারিবদ্ধভাবে দাফন করা হয়। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা গেছে, উত্তরাঞ্চলের দ্বিতীয় বৃহৎ গণহত্যা চালায় পাকবাহিনী এই ডেমড়া গ্রামে।

বর্তমানে ঝোঁপ আর জঙ্গলে পরিপূর্ণ এ গণকবরটি। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সম্প্রতি সেখানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়।কিন্তু পরিচর্যার অভাবে সেটিও বেহাল দশায় পড়ে আছে।

শহীদনগর ডাববাগান গণকবর : রাজধানী ঢাকা ও উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে খ্যাত পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার শহীদনগর ডাববাগান। এ স্থানে ১৯৭১ সালের ১৯ এপ্রিল মুক্তিযোদ্ধা, স্থানীয় গ্রামবাসীর সঙ্গে হানাদার বাহিনীর সম্মুখযুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে ১৯ জন ইপিআরসহ প্রায় দুই শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা, হিন্দু ব্যবসায়ী ও নিরীহ গ্রামবাসীকে নির্মমভাবে হত্যা করে পাকবাহিনী।

ডাববাগানের এ যুদ্ধের স্মৃতি ধরে রাখতে ওই গ্রামকে শহীদনগর নামকরণ করা হয়েছে। শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধার্থে তৎকালীন আওয়ামী লীগের তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ ও স্থানীয় বিভিন্ন ইউপি চেয়ারম্যানদের আর্থিক সহযোগিতায় ‘বীরবাঙালি’ নামে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে।

Pabna4

নাজিরপুর গণকবর

নাজিরপুর বাবুরবাগান গণকবর : পাবনা সদর উপজেলার দাপুনিয়া ইউনিয়নের নাজিরপুর বাবুরবাগান। স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে পাবনার শান্তি কমিটির প্রধান রাজাকার-আলবদর বাহিনীর দলপ্রধান মওলানা আব্দুস সুবহানের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ ইঙ্গিতে হানাদার বাহিনী ওই বাগানে গর্ত করে পাবনা শহরের মহররমসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও গ্রামবাসীকে গুলি এবং বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যার পর লাশ ফেলে রেখে যায়। পরে স্থানীয় গ্রামবাসী ওই বাগানের কয়েকটি স্থানে লাশগুলো গণকবর দিয়ে মাটি চাপা দেয়।

এমনিভাবে বাবুরবাগানের আশপাশে আরো কয়েকটি গণকবর রয়েছে। তবে গণকবরগুলো সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। গ্রামের একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, এখানে রাজাকাররা পাকবাহিনীর সহযোগিতায় প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জন মুক্তিকামীসহ সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে।

টেবুনিয়া কৃষি খামারের গণকবর : দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম টেবুনিয়া কৃষি খামার। স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে পাবনা শহরের নূরপুর ডাকবাংলোর টর্চারসেল থেকে রাজাকার ও শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান মওলানা আব্দুস সুবহানের দেওয়া খবরের ভিত্তিতে আকবর হোসেন আকু ড্রাইভার, হাসান খাঁ, দুলাল, হায়দার, পুলিশের সিপাহী আল্লাহ রেখা খান, মনু মিয়া ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক শিক্ষকসহ ২০ জনকে পাকবাহিনী কালো কাপড়ে চোখ ও মুখ বেঁধে নিয়ে টেবুনিয়া ডাল ও তেলবীজ খামারের শেষ প্রান্তের একটি জঙ্গলের মধ্যে নিয়ে আসে। পাকবাহিনী নিষ্ঠুর ও নির্মমভাবে ওই ২০ জনকে গুলি করে ও বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে।

সেখানে বর্তমানে শহীদদের গণকবরের কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই। বর্তমানে সেখানে গরু-ছাগল চড়ানো হয়। পাকবাহিনী মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ লোকজনকে ধরে নিয়ে গিয়ে যেখানে হত্যা করেছিল ওই স্থানে কৃষি খামারের স্থানীয় কর্মচারীদের উদ্যোগে ‘টেবুনিয়া বধ্যভূমি’ নামে একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

রেলওয়ে কলোনি : ঈশ্বরদী উপজেলার রেলওয়ে কলোনি অর্থাৎ লোকোশেড পাম্প হাউজ স্টেশনের কাছে রয়েছে একটি বধ্যভূমি। সেখানে পাবনার ওয়াপদা পাকবাহিনীর টর্চারসেল থেকে হত্যার পর লাশ ওই স্থানে নিয়ে ফেলা হতো।

বর্তমানে সেখানে কোনো স্মৃতিচিহ্নও নেই। এমননিভাবে এই উপজেলার রেলওয়ে কলোনির আশপাশে আরো কয়েকটি স্থানে গণকবর ও বধ্যভূমি রয়েছে। তবে সেখানে কোনো সরকারি উদ্যোগে শহীদদের সম্মাননা জানানো হয়নি। সংরক্ষণের উদ্যোগও নেওয়া হয়নি।

এদিকে পাবনা জেলার বিভিন্ন উপজেলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে হানাদার বাহিনী ও এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামসদের হাতে নির্মমভাবে নিহত ও শহীদদের গণকবরগুলো অবহেলা আর অযত্নে বর্তমানে নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে।

জেলার বিভিন্ন স্থানের গণকবরগুলো ওই সময়ের বয়োজ্যেষ্ঠদের সহযোগিতা ছাড়া সহজে চেনার উপায় নেই। বর্তমান মুক্তিযুদ্ধের সরকার পাবনার বিভিন্ন এলাকার অবহেলিত এসব গণকবর ও বধ্যভূমিগুলো চিহ্নিত করে সরকারিভাবে রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেবে এমন আশায় বুক বেঁধেছেন স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়ে স্বজনহারা মানুষ ও গ্রামবাসী।

Pabna

নাজিরপুরে গণহত্যার স্থানটি চিহ্নিত হয়নি আজও

পাবনার বিশিষ্ট কলামিস্ট ও মুক্তিযোদ্ধা এবাদত আলী বলেন, একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এটা আমার কাছে খুবই কষ্টের ব্যাপার যে, গণকবর বা বধ্যভূমিগুলো এখনও চিহ্নিত করে সংরক্ষিত করা হচ্ছে না। বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকার, তাই বিশ্বাস করি তারা এ বিষয়টি আন্তরিকতার সঙ্গে দেখবে, যাতে গণকবরগুলো অবহেলিত অবস্থায় না থাকে।

জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার মো. আব্দুল বাতেন জানান, আসলে বর্তমান প্রেক্ষাপটে জেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বধ্যভূমি ও গণকবর আমাদের ঐতিহাসিক সম্পদ। সেগুলো চিহ্নিত করে রক্ষা করা খুবই দরকার। আমরা সে দাবি বারবার জানিয়ে আসছি। কিন্তু দুএকটি ছাড়া তেমন উদ্যোগ চোখে পড়ে না।

এ বিষয়ে পাবনার জেলা প্রশাসক রেখা রানী বালো জানান, পাবনা জেলার মধ্যে ৩৫টি বধ্যভূমি চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে বেশকিছু বধ্যভূমিতে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে। বাকিগুলো খুব শিগগির কাজ শুরু হবে। এ বিষয়ে বর্তমান সরকার খুবই আন্তরিক।


    পাবনায় নামাজের সময়সূচি
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ০৪:৩০
    সূর্যোদয়ভোর ০৫:৪৭
    যোহরদুপুর ১১:৫১
    আছরবিকাল ১৬:১৩
    মাগরিবসন্ধ্যা ১৭:৫৪
    এশা রাত ১৯:২৪
© All rights reserved 2019 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!