রবিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৬:২৪ অপরাহ্ন

পাবনায় মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আব্দুর রব বগা মিয়া

 

।।আমিরুল ইসলাম রাঙা ।।

আব্দুর রব বগা মিয়া  পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারন সম্পাদক। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ছিলেন, পাবনার অন্যতম প্রধান সংগঠক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ট ও বিশ্বস্ত সহচর। শুধু এটুকু বললে ভুল হবে -!!? তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর কাছে শ্রদ্ধাভাজন বন্ধু !! বঙ্গবন্ধু যাকে বগা ভাই বলতেন। আর বগা মিয়া বঙ্গবন্ধুকে নাম ধরে ডাকতেন। অবশ্য প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধুকে নেতা বলে ডাকতেন। আব্দুর রব ( বগা মিয়া) সম্পর্কে লেখতে গেলে অপ্রাসঙ্গিকভাবে বলতে হবে, তৎকালীন সময়ে তিনি ছিলেন, পাবনায় আওয়ামী লীগ রাজনীতির বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা।

১৯৫৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আতাউর রহমান খান পাবনা সফরে এসে আওয়ামী লীগের পাবনা জেলা কমিটি গঠন করেন। সেই কমিটি বগা মিয়ার প্রস্তাবে তাঁর থেকে ৩ বছরের ছোট ক্যাপ্টেন এম, মনসুর আলীকে সভাপতি করা হয়। আর তিনি হয়েছিলেন সাধারন সম্পাদক। যদিও বঙ্গবন্ধু সহ সবাই চেয়েছিলেন, আব্দুর রব (বগা মিয়া) হোক সভাপতি। শুধু এটুকুই নয় রাজনীতিতে তাঁর অবদান, ত্যাগ ও সততার বিরল দৃষ্টান্ত রয়েছে। এরপর পাবনা জেলা আওয়ামী লীগে প্রায় ১৫ বছর সভাপতি ছিলেন, বয়সে তাঁর ৮ বছর ছোট মোঃ আমজাদ হোসেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট তাঁকে সুজানগর – বেড়া আসনে প্রার্থী ঘোষনা করার পর সে আসনেও তিনি না দাড়িয়ে শরীকদলের মাওলানা রইস উদ্দিনকে আসনটি ছেড়ে দেন।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিজয়ী হলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেরে বাংলা এ,কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে সরকার গঠন হয়। সেই সরকারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী মন্ত্রী হয়েছিলেন। ১৯৬২ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোঃ আমজাদ হোসেন এম,এন,এ নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই নির্বাচনে আব্দুর রব ( বগা মিয়া) ছিলেন প্রস্তাবকারী ও প্রধান পরিচালনাকারী। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে মোঃ আমজাদ হোসেন ( পাবনা, ঈশ্বরদী ও আটঘরিয়া আসন) এম,এন,এ নির্বাচিত হন এবং ১৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে পাবনা সদর আসন থেকে আব্দুর রব (বগা মিয়া) এম,পি,এ নির্বাচিত হন। এটাই আব্দুর রব ( বগা মিয়া) এর প্রথম নির্বাচন। সৌভাগ্য তিনি প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেন আর দুর্ভাগ্য হলো সেই সংসদে আর বসা হলোনা।

১৯৭১ সাল। এক বছরে ঘটে গেল শত বছরের ইতিহাস। জাতি হারালো ত্রিশ লক্ষ মানুষ। সম্ভ্রম হারালো দুই লক্ষ মা এবং বোন। দুই কোটি মানুষের বাড়ীঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হলো। রাস্তাঘাট, ব্রীজ কালভার্ট ধ্বংশ করা হলো। নয়মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অর্জন হলো স্বাধীন বাংলাদেশ। জাতি ফিরে পেল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। ফিরে আসতে পারলো না লক্ষ লক্ষ সূর্য সন্তান। এই এক বছরে পাবনায় আওয়ামী লীগ রাজনীতির দিকপালেরা এক এক করে হারিয়ে গেল।

১৯৭০ সালের ১৭ ডিসেম্বর নির্বাচনের পর ২২ ডিসেম্বর রাতে পাবনা শহরের দক্ষিণ রাঘবপুর নিজ বাসভবনের সামনে নক্সালদের হাতে খুন হন সাঁথিয়া – বেড়া থেকে নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য ( এম,পি,এ) পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদ রফিক। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান আর্মী পাবনা শহরের গোপালপুর মহল্লার নিজ বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি ও ঈশ্বরদী – আটঘরিয়া থেকে নব নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য ( এম,পি,এ) এডভোকেট আমিন উদ্দিনকে। পাকিস্তানী আর্মীরা ২৮ মার্চ বিসিক শিল্পনগরীর সেনাক্যাম্পে তাঁকে হত্যা করে। এর এক সপ্তাহ পরে ৬ এপ্রিল পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও নব নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্য ( এম,এন,এ) মোঃ আমজাদ হোসেন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরন করেন। মাত্র ৩ মাসের ব্যবধানে তিন প্রধান নেতাকে হারানোর পর পাবনায় আওয়ামী লীগ রাজনীতির হাল ধরেন আব্দুর রব ( বগা মিয়া)।

মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে আব্দুর রব ( বগা মিয়া) অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সততার সাথে তাঁর দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রপতি এক অধ্যাদেশ জারী করে ১৯৭০ সালে নির্বাচিত ১৬৯ জন এমএনএ এবং ৩০০ জন এমপিএ কে এমসিএ ( মেম্বার অব প্রভিশনাল কন্সটিটিউশন) করা হয়। আব্দুর রব ( বগা মিয়া) জাতীয় সংসদে এমসিএ হিসেবে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেন। তিনি বাংলাদেশের সংবিধান রচনা কমিটির সদস্য ছিলেন। এছাড়া তিনি পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পান। অবিতর্কিত এবং জনপ্রিয় এই নেতা ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র ১০ দিন আগে ২৫ ফেব্রুয়ারী সকালে নির্বাচনী প্রচারনায় যাবার সময় বর্তমান বাসটার্মিনাল সংলগ্ন বিআরটিসি ডিপোর সামনে জীপ গাড়ী দুর্ঘটনায় পতিত হন। মারাত্মক আহতবস্থায় পাবনা সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

১৯৭৩ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারী আব্দুর রব (বগা মিয়া) যখন মারা যান তখন বঙ্গবন্ধু নাটোর উত্তরা গনভবনে অবস্থান করছিলেন। দুর্ঘটনার সংবাদ শুনার সাথে সাথে তিনি পাবনায় ছুটে আসেন। তখনও বগা মিয়ার মরদেহ হাসপাতালে ছিল। হাজার হাজার মানুষ হাসপাতালে জোড় হয়েছে। বঙ্গবন্ধু পাবনা সদর হাসপাতালে গিয়ে বগা মিয়ার লাশ দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। বগা মিয়ার লাশ জরিয়ে ধরে শিশুর মত কাঁদতে থাকেন। বঙ্গবন্ধু বুক চাপরিয়ে চাপরিয়ে কাঁদচ্ছিলেন আর বগা মিয়ার প্রতি ভালবাসার কথা ব্যক্ত করছিলেন। ১৯৫৩ সালে পাবনা এসে যে বগা মিয়াকে তিনি পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক বানিয়ে গিয়েছিলেন ঠিক ২০ বছর পর ১৯৭৩ সালে পাবনায় এসে সেই বগা মিয়াকে চীরবিদায় জানালেন। বঙ্গবন্ধু তার রাজনৈতিক জীবনে যতবার পাবনায় এসেছেন তার বেশীরভাগ সময় তাঁর প্রিয় বগা ভাইয়ের বাড়ীতে এসেছেন। সেখানে খাওয়া দাওয়া করেছেন। উনি স্বাধীনতার পর ৩ বার পাবনায় এসেছেন। ১৯৭২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারী, ১০ মে এবং শেষবার ৭৩ এর ২৫ ফেব্রুয়ারী।

উল্লেখ্য যে ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ ১ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে আব্দুর রব (বগা মিয়া) কে মনোনয়ন দেওয়া হলে পাবনার প্রভাবশালী কিছু আওয়ামী লীগের নেতা অধ্যক্ষ আব্দুল গনিকে মোমবাতি মার্কায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাড় করিয়েছিলেন। সেই নির্বাচনে জাসদের মশাল মার্কায় প্রার্থী ছিলেন মোঃ ইকবাল হোসেন এবং ন্যাপের কুঁড়ে ঘর মার্কায় প্রার্থী ছিলেন আমিনুল ইসলাম বাদশা। উক্ত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় বঙ্গবন্ধু খুবই অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু ঢাকায় ফিরে গিয়ে পাবনার ১৩ জন আওয়ামী লীগ নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছিলেন। কথিত আছে এদের বহিষ্কার করে বঙ্গবন্ধু তাঁর নিকটজনদের কাছে বলেছিলেন তাঁর মৃত্যুর পরেও যেন প্রধান চক্রান্তকারীকে দলে না নেওয়া হয়। সেই বহিষ্কৃত নেতাদের দুই একজন আওয়ামী লীগে ফিরতে পারলেও বেশীর নেতা আর কোনদিনই ফিরতে পারে নাই। যাইহোক আব্দুর রব ( বগা মিয়া) মারা যাবার পর পাবনার নির্বাচন স্থগিত হয়ে যায়। পরবর্তীতে তফসিল ঘোষনা করা হলে এডভোকেট আমজাদ হোসেন ( ছোট আমজাদ) আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন । সেই নির্বাচনে এডভোকেট আমজাদ হোসেন বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য ( এমপি) নির্বাচিত হন। পরে মরহুম আব্দুর রব (বগা মিয়া) এর সহধর্মিণী জাহানারা রবকে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসন ( পাবনা ও বগুড়া জেলা) থেকে সাংসদ সদস্য ( এমপি) করা হয়।

আব্দুর রব ( বগা মিয়া) এর পূর্ন নাম সৈয়দ ফজলে এলাহী আব্দুর রব ওরফে বগা মিয়া। পিতা মোঃ ছাবকাত হোসেন এবং মাতা মহিতুন নেছা । ঠিকানা পাবনা শহরে শিবরামপুর মহল্লায়। বাবা ছিলেন অবিভক্ত ভারতের ডিভিশনাল ইন্সপেক্টর। বাবার চাকুরীসুত্রে ১৯১৬ সালের ৩১ অক্টোবর রংপুর শহরে আব্দুর রব ( বগা মিয়া) জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষাজীবন এবং পরবর্তীতে কলকাতাতেই বসবাস। সেখানেই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখ নেতৃবৃন্দের সাথে পরিচয় এবং সম্পর্ক হয়। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর পাবনা শহরে এসে বসবাস শুরু করেন। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার সাথে জড়িত হন। পাবনায় ব্যবসা বানিজ্য শুরু করেন। পাশাপাশি রাজনীতি এবং সামাজিক কর্মকান্ডে জড়িত হন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ৬২ সালের শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলন, ৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলন, ৬৭ সালে ভূট্টা আন্দোলন, ৬৮ থেকে ৬৯ এর গণআন্দোলন করতে গিয়ে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়।

আব্দুর রব ( বগা মিয়া ) ১৯৭৩ সালে ২৫ ফেব্রুয়ারী মাত্র ৫৭ বছর বয়সে মৃত্যবরন করেন। মৃত্যুকালে স্ত্রী, এক ছেলে ও পাঁচ মেয়ে রেখে যান।

সমাপ্ত –

লেখক পরিচিতি –

আমিরুল ইসলাম রাঙা
রাধানগর মজুমদার পাড়া
পাবনা।
১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮
তথ্যসুত্র :-
১. বঙ্গবন্ধু রচিত অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থ
২. শেখ মোহাম্মদ সুমন – গবেষক, নীলমন গ্যালারী

 

 


বিজয় নিশান উড়ছে ঐ…

© All rights reserved 2018 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!