সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ০২:২১ পূর্বাহ্ন

পাবনা-১ আ’লীগে প্রার্থীর ছড়াছড়ি, বিএনপি- জামায়াত বসে নেই

 

মনসুর আলম খোকন, সাঁথিয়া প্রতিনিধিঃ আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সরগরম ৬৮, পাবনা-১ (সাঁথিয়া-বেড়া) আসনটি।

গণসংযোগ, সভা- সমাবেশ, মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা, পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুনসহ সমাজসেবামূলক কাজের মাধ্যমে নিজেদের জানান দিচ্ছেন বিভিন্ন দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা।

আর এসব কার্যক্রমে ক্ষমতাসীন আ’লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা এগিয়ে আছেন।

যুদ্ধাপরাধীর অভিযোগে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত জামায়াতের আমীর ও সাবেক মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর নির্বাচনী এলাকা হওয়ায় এ আসনের প্রতি দৃষ্টি রয়েছে গোটা দেশবাসীর।

তাই এ আসনে রাজননৈতিক দলগুলো চুলচেরা বিশ্লেষণ করে প্রার্থী বাছাই করে থাকে।

জানা গেছে, নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে।

ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে অথবা জানুয়ারির প্রথমদিকে নির্বাচন সম্পন্ন করবেন বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন।

নির্বাচনকে সামনে রেখে পাবনা-১ (সাঁথিয়া-বেড়া) আসনে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীরা।

তবে ক্ষমতাশীন আ’লীগে দেখা দিয়েছে নানা ধরনের গুজব। কোন কোন নেতা বলছেন, তার মনোনয়ন নিশ্চিত।

আবার কেউ কেউ এটাকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের মনোনয়নের বিয়য়ে কর্মীদের আশ্বস্ত করছেন।

মনোনয়ন নিজেদের ঘরে আনতে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইতিবাচক সংবাদ ভাইরাল করছেন তারা।

অপরদিকে বিএনপি- জামায়াত নিরবে অন্তরালে কাজ করে যাচ্ছে।

৩ লাখ ৭৪ হাজার ভোটারের পাবনা-১ (সাঁথিয়া-বেড়া) আসনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ, স্বাধীনতার পর থেকে এ আসনে প্রতিদ্বন্দিতা করে আসছেন বিভিন্নদলের কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী নেতারা।

একটি বিষয় লক্ষণীয়, স্বাধীনতার পর এ আসন থেকে যিনি বিজয়ী হয়েছেন সেই দলই সরকার গঠন করেছে এবং নির্বাচিত প্রার্থী সরকারের মন্ত্রীত্ব বা গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন।

১৯৭০ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ নৌকা প্রতিক নিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

সে সময় তিনি বাংলাদেশ সংবিধান প্রণয়ন কমিটির আন্যতম সদস্য ছিলেন এবং পাবনার গভর্নর নিযুক্ত হন।

১৯৭৯ সালে সংসদ নির্বাচনে মির্জা আব্দুল হালিম নির্বাচিত হয়ে জিয়াউর রহমান সরকারের নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন।

১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মেজর (অবঃ) মনজুর কাদের নির্বাচিত হন।

১৯৮৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মেজর (অবঃ) মনজুর কাদের নির্বাচিত হয়ে পানি উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন সেক্রেটারী জেনারেল মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী বিজয়ী হন।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে বিএনপিতে আসা মেজর (অবঃ) মনজুর কাদের নির্বাচিত হন ।

১৯৯৬ সালের ১২ জুনের ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অধ্যাপক আবু সাইয়িদ সামান্য ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

সেময় তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দি ছিলেন বিএনপি’র মনজুর কাদের।
২০০১ সালের ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চার দলীয় জোটের ব্যানারে জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী বিজয়ী হয়ে জোট সরকারের শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্তাবধায়ক সরকারের অধীনে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এড. শামসুল হক টুকু নির্বাচিত হয়ে প্রথমে বিদ্যুত, খনিজ ও জ্বালানী মন্ত্রণালয় এবং পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী অধ্যাপক আবু সাইয়িদকে পরাজিত করে আওয়ামী লীগ প্রার্থী এড. শামসুল হক টুকু বিজয়ী হন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পাবনা-১ আসনের নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা।

মনোনয়নপ্রত্যাশীরা করছেন পথসভা, উঠোন বৈঠক, মোটরসাইকেল শোডাউন, র‌্যালী এবং জনসভা।

এবার আ’লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হলেন সংস্কারপন্থীখ্যাত সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ।

সংস্কারপস্থী হওয়ায় গত দু’টি সংসদ নির্বাচনে তিনি এ আসনে মনোনয়ন পাননি।

এ আসনে আ’লীগের অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী হলেন সাঁথিয়ার যুদ্ধকালীন কমান্ডার ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা নিজাম উদ্দিন।

নিজাম উদ্দীন বলেন, যুদ্ধকালীন কমান্ডার হিসেবে জননেত্রী শেখ হাসিনা তাকেই মনোনয়ন দেবেন বলে তিনি আশাবাদী। কিছুদিন আগে গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলে এসেছেন বলেও জানান।

তিনবার উপজেলা চেয়ারম্যান থাকার সুবাদে তিনি এলাকায় অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন বলে দাবি তার। তিনি প্রতিদিনই গণসংযোগ করছেন।

এ আসন হতে প্রার্থী হওয়ার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছেন অধিক ভোটার অধ্যুষিত উন্নয়নবঞ্চিত সাঁথিয়ার আরেক সন্তান, তরুণ সমাজসেবক ও কেন্দ্রীয় বঙ্গবন্ধু পেশাজীবী কল্যাণ পরিষদের সহ-সভাপতি শিল্পোদ্যোক্তা ওবায়দুল হক।

তিনি জানান, এলাকার তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার জন্য বেশকিছু কাজ হাতে নিয়েছেন এবং সাড়াও পেয়েছেন।

গরীব অসহায়, অসচ্ছল মহিলাদের সচ্ছলতা আনয়নের জন্য ছাগল বিতরণ, সেলাইমেশিন বিতরণসহ বিভিন্ন কাজ করছেন।

সাঁথিয়া বেড়ার অসহায় মানুষের আস্থার প্রতিক হয়ে উঠছেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জিবিত হয়ে গরীব, দুঃখী, মেহনতি মানুষের পাশে থেকে তিনি সেবা করতে চান।

সে কারণে তিনি জেলার গুরুত্বপূর্ণ পাবনা-১ আসনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী।

এ আসনে আ’লীগের অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী হলেন সাঁথিয়া পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান মরহুম মোজাম্মেল হক মাষ্টারের ছেলে সাবেক ছাত্রনেতা মোশারফ হোসেন স্কাই।

তিনি এলাকাতে ব্যানার, ফেস্টুন এবং সামাজিকযোগাযোগের মাধ্যমে নিজের প্রার্থীতা জানান দিচ্ছেন।

মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে তিনিও খুব আশাবাদী বলে জানান।

এদিকে এ আসনের বিএনপি’র প্রার্থী সাবেক প্রতিমন্ত্রী মেজর (অব:) মনজুর কাদের ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে জোটগত কারণে সিরাজগঞ্জের চৌহালী এলাকা থেকে নির্বাচন করায় এবং গত তিনটি নির্বাচনে বিএনপি’র কোন প্রার্থী না থাকায় এখানে বিএনপি’র শক্তিশালী কোন প্রার্থী হয়ে ওঠেনি।

বলা যায়, বিএনপি অনেকটা নেতৃত্ব সংকটেই রয়েছে এই আসনে।
তারপরেও প্রায় বারো বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি থেকে এ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদি তাঁতীদলের সহ-সভাপতি ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আলহাজ ইউনুস আলী।

যিনি এলাকাতে হাজী ইফনুছ বলে পরিচিত।

তিনি দরিদ্র, অসহায় এবং ছিন্নমুল মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবারকে নিজ জমিতে পুনর্বাসন করে তাদের নামে দলিল সম্পাদন করে দিয়েছেন।

দাতব্য চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান করে এলাকার হতদরিদ্র মানুষের চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করেছেন। তিনি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাবেন বলে আশাবদ ব্যক্ত করেন।

বিএনপি থেকে আরও যারা মনোনয়ন চাচ্ছেন তারা হলেন ধোপাদহ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন খান পিপিএম ও সাঁথিয়া উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক বর্তমানে কারাবন্দী শামসুর রহমান।

মহাজোটে থাকার কারণে গত দুই নির্বাচনে এ আসনে জাতীয় পার্টি থেকে কেউ প্রার্থী হননি। তবে এবার জাতীয় পার্টির সহ-সভাপতি সরদার শাজাহানের নাম শোনা যাচ্ছে।

অন্যদিকে জামায়াতের আমীর ও সাবেক মন্ত্রী যুদ্ধাপরাধের জন্য মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর বড় ছেলে ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মমিনের নামও মানুষের মুখে মুখে শোনা যাচ্ছে।
জামায়াতের একাধিক সূত্র জানায়, যদি জোটগত ভাবে নির্বাচন হয়, তাহলে পাবনা-১ আসন ছেড়ে দিবে ২০ দলীয় জোটের শরীক জামায়াতে ইসলামীর জন্য।

সে হিসেবে নিজামীর ছেলে ব্যারিস্টার মমিন প্রার্থী হবেন বলে তাদের ধারণা।

তবে এখনও কোন দলেরই প্রার্থী তালিকা প্রকাশ না হওয়ায় সবাই চিন্তিত রয়েছেন।

যার যার আবস্থান থেকে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন মনোনয়ন প্রাপ্তির লক্ষ্যে।

 

 


© All rights reserved 2018 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!