শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৭:০৬ পূর্বাহ্ন

পিছনের বেঞ্চে বসা দরিদ্র পরিবারের সেই ছেলেটি এখন ভাঙ্গুড়ার গর্ব

ভাঙ্গুড়া প্রতিনিধি : এক সময়ের পড়ালেখায় দূর্বল, পরীক্ষায় একাধিক বিষয়ের ফেল করা, পিছনের বেঞ্চে বসা দরিদ্র পরিবারে সেই ছাত্রটি বর্তমানে বিসিএস ক্যাডার । এখন তাকে নিয়ে এলাকাবাসী গর্ব করে।

তিনি হলেন বিদ্যুৎ কুমার রায়, পিতা হরেন্দ্রনাথ রায় পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার উত্তর মেন্দার বাসিন্দা তিনি।

১৯৭৫ সালে এই উপজেলার উত্তর মেন্দা এলাকায় হত দরিদ্র সূত্রধর পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন বিদ্যুৎ কুমার। পিতা পেশায় ছিলেন একজন সাইকেল মেকার। ৫ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ৩য় সন্তান।

অর্থের অভাবে তার পিতা হরেন্দ্রনাথ ছেলেকে পড়া লেখার খরচ, বই-খাতা-কলম ও পোশাক যোগাড় করে দিতে পারেতন না।

কিন্তু কঠোর পরিশ্রম সাধনার দ্বারা শত বাধাকে অতিক্রম করে তিনি আজ বিসিএস ক্যাডার হয়েছেন।

বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কলেজ এডুকেশন ডেভলপমেন্ট এর টিচার ট্রেনিং এ প্রোগ্রাম অফিসার হিসেবে কর্মরত ও তার লেখা রসায়ন বইটি ৯ম-১০ম শ্রেণির পাঠ্যসূচীতে স্থান পেয়েছে।

জানা যায়, তিনি শরৎনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৮৫ সালে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন। ১৯৯০ সালের এসএসসি পরীক্ষায় গণিতে লেটার নিয়ে ভাঙ্গুড়া ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২য় বিভাগে পাশ করেন এবং ১৯৯৩ সালে হাজী জামাল উদ্দীন ডিগ্রী কলেজ থেকে ২য় বিভাগে এইচএসসি পাশ করেন।

পরর্বতীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাসায়ন বিভাগে ভর্তি হয়ে রেকর্ড পরিমান নম্বর নিয়ে ১৯৯৬ সালে বিএসসি(সম্মান) ১ম শ্রেণিতে ২য় হন ও ১৯৯৭ এমএসসিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। এ জন্য তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গোল্ডমেডেল ও বিশ্ববিদ্যালয় পুরস্কারে ভুষিত হন।

Displaying 65.jpg

বিসিএস ক্যাডার বিদ্যুৎ কুমার রায় (সহযোগী অধ্যাপক রসায়ন) তার অতীত জীবনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে মাধ্যমিকের ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় সকল শ্রেণিতেই অংক ও ইংরেজি বিষয়ে তিনি ফেল করেছিলেন।

মানুষ পাশ করে উপরের ক্লাসে উঠত আর তিনি ফেল করেই উপরের শ্রেণিতে উঠতেন। আর তিনি ফেল করেলেও তাঁর মা শিক্ষকদের নিকট গিয়ে অনুরোধ করে তাঁকে উপরের শ্রেণিতে তুলে দিতো। স্কুলে পড়া লেখা কিছুই পারতেন না। এ কারণে বসতে হতে তাকে পেছনের বেঞ্চে ।

কোনো রকমে পুরাতন পোশাক আর পুরাতন স্যান্ডেল পড়ে স্কুলে যেতেন । সহপাঠিরা প্রায়ই তাকে মারধর করত। কিন্তু কাউকেই তিনি কিছুই বলতেন না। কারণ সে সময় তিনি মনে করতেন যে, গরীবদের সাথে অন্যরা এমনই আচারণ করে।

ক্লাসে পড়া না পাড়ার কারণে শিক্ষকের নিকট প্রায় কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যায়ন কালে ফজলু স্যার তাঁকে একদিন দ্রুত হাতের লেখা লিখতে পারলে চকলেট দিবে বললে তিনি দ্রুত হাতের লেখা লিখতে আয়ত্ব করে ফেলেন।

এর পর থেকে তার সাথে দ্রুত লিখতে পারা আরও অনেকেই পারতেন না। এভাবে এসএসসিতে টেস্ট পরীক্ষায় ইংরেজি ও অংকে ফেল করে নারান ও ধীরন স্যারের কাছে পড়ে তিনি ১৯৯০ সালে এসএসসি পাশ করেন।

এরপর ১৯৯০- ১৯৯১ শিক্ষাবর্ষে হাজী জামাল উদ্দীন ডিগ্রী কলেজে ভর্তি হন। সেখানে বই কিনতে পারেননি। ক্লাসে পড়া ধরলে শিক্ষকে বলতেন বই কিনতে পারিনি তাই পড়া হয়নি। তাই কলেজের শিক্ষকরা বিভিন্ন সময়ে তাকে বই দিয়ে সহায়তা করত। এভাবেই এইচএসসি পরীক্ষায় পাশ করেন।

আশা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে কিন্তু মানুষ বলতো ‘তোমার বাবা সাইকেলের মেকার তাই সাইকেল মেরামত করেই জীবন চালাও। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খরচ যোগাতে পারবে না। ওই আশ ছেড়ে দাও।’

তাই সবার কথা শুনে জামাল উদ্দীন ডিগ্রী কলেজে বিএসএসে ভর্তি হন। সেখানে ফ্রি পড়ার আবেদন করলে হাফ ফ্রি পড়ার আবেদন মঞ্জুর হয়।

কিন্তু তার চেয়ে বড়লোকের ঘরের সন্তানরা পায় ফুল ফ্রি আর তিনি পান হাফ ফ্রি। মনে এই কষ্ট নিয়ে তিনি মনস্থির করেন, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া লেখা করবেন। তাই তিনি এক বছর বাদ দিয়ে পরের বছর ভর্তি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেন।

এরপর থেকে দিনরাত কঠোর পরিশ্রম ও শ্রমের বিনিময়ে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের পড়ার সুযোগ লাভ করেন। সেখানে ছাত্র জীবনে প্রচুর পড়াশোনার মধ্য দিয়ে সময় কাটিয়েছেন।

এমনটি পড়া লেখা ছাড়া অন্য কোনো জগৎ তিনি জানতেন না। সে কারণেই তিনি ১৯৯৬ সালের বিএসসি (সম্মান) ১ম শ্রেণিতে ২য় ও ১৯৯৭ সালের এমএসসি পরীক্ষায় রেকর্ড পরিমান নম্বর পেয়ে ১ম শ্রেণিতে ১ম স্থান লাভ করে। সে কারণে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গোল্ড মেডেল ও বিশ্ববিদ্যালয় পুরস্কারে ভুষিত হন।

তিনি আরও বলেন, ছাত্রজীবনে তিনি বন্ধুদের সাথে খেলতে গেলে গরীব বলে তাকে কেউ খেলা নিতো না । কারণ তারা বলতো তিনি খেলার কোনো সামগ্রী কিনতে পারবে না। তবে কখনো কখনো তাকে ফুটবল খেলায় গোলকিপার রাখতো। সেখানেও তিনি দেখিয়েছেন দক্ষতা। তার আশ পাশ দিয়ে কোনভাবেই বল যেতে পারত না। এজন্য তিনি ছিলেন একজন দক্ষ গোল রক্ষক।

এরপর তার অদম্য চেষ্টা ও ইচ্ছার কারণে ২২তম বিসিএস পরীক্ষায় সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে উত্তীর্ণ হন।

বর্তমানে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কলেজ এডুকেশন ডেভলপমেন্টের টিচার ট্রেনিং এ প্রোগ্রাম অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন।

Displaying biddut.jpg

তবে শনিবার সরকারি ছুটির দিন হলে জন্মভুমি ভাঙ্গুড়ায় ও পাশের উপজেলার এসে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছুটে যান এবং বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেওয়া সহ শিক্ষক শিক্ষার্থীদের বিষয়ে বিভিন্ন পরামর্শ প্রদান করেন।

প্রতিটি শিশুর মধ্যেই অদম্য মেধা রয়েছে শিক্ষকরাই পারেন সেটিকে ফুটিয়ে তুলতে এবং বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা আগামী দিনে পৃথিবী শাসন করবে এমন আশা ব্যক্ত করে তিনি আরও বলেন, তার মতো বাংলার প্রতিটি ঘরে একজন করে বিসিএস ক্যাডার তৈরি হোক।


    পাবনায় নামাজের সময়সূচি
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ০৫:০৮
    সূর্যোদয়ভোর ০৬:৩১
    যোহরদুপুর ১১:৫২
    আছরবিকাল ১৫:৩৭
    মাগরিবসন্ধ্যা ১৭:১৩
    এশা রাত ১৮:৪৩
© All rights reserved 2019 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!