মঙ্গলবার, ২১ মে ২০১৯, ০৪:৩৮ পূর্বাহ্ন

পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হোক

।।খুশী কবির।।

সত্যিকারের মানব সমাজে আলাদাভাবে নারীর অধিকারের ব্যাপারে সোচ্চার হওয়ার প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয় না। এমন সমাজে প্রয়োজনমতো নারী ও পুরুষের অধিকার থাকবে। নারী-পুরুষের অধিকারের এ সমতাই মানবিকতার পথে, মানুষের সমাজের অগ্রগতির পথে আরও একটি ধাপ। কিন্তু এটি বুঝতেও আমাদের দীর্ঘ সময় ধরে ধাপে ধাপে নারী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আজকের এই পর্যায়ে আসতে হয়েছে।

আজ যে নারী দিবস দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে উদযাপনের ব্যাপক আয়োজন চলছে, তার পেছনে রয়েছে শত বছরের অধিক সময় ধরে চলা এই নারী আন্দোলন। ১৮৫৭ সালে মজুরি বৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মার্কিন নারীরা নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমেছিলেন। তারা ছিলেন সুতা কারখানার নারী শ্রমিক। তারা দৈনিক শ্রমঘণ্টা ১২ থেকে কমিয়ে আট ঘণ্টায় আনা, ন্যায্য মজুরি এবং কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন। মিছিলে অংশগ্রহণ করেছিলেন ১৫ হাজার নারী। আন্দোলন করার অপরাধে গ্রেফতার হন বহু নারী। তিন বছর পর ১৮৬০ সালের একই দিনে গঠন করা হয় ‘নারী শ্রমিক ইউনিয়ন’। ১৯০৮ সালে পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের কারখানার প্রায় দেড় হাজার নারী শ্রমিক একই দাবিতে আন্দোলন করেন। অবশেষে তারা দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ করার অধিকার আদায় করে নেন। জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম এই আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ক্লারা ছিলেন জার্মান রাজনীতিবিদ; জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির স্থপতিদের একজন। এর পর ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন। এ সম্মেলনে ক্লারা প্রতি বছর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব দেন। জার্মানির এই নেত্রী ক্লারা জেটকিন ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। সিদ্ধান্ত হয়- ১৯১১ সাল থেকে নারীদের সমঅধিকার দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হবে। এগিয়ে আসেন বিভিন্ন দেশের সমাজতন্ত্রীরা। ১৯৭৫ সালের ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।

এখনও নারীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, পাঠ্যপুস্তক, সিনেমা ও দৈনন্দিন কর্মে অসংখ্য রকমের অবমাননাকর শব্দের শিকার হন। শব্দকে তৈরি করা হয় নারীর বিরুদ্ধে। নারীত্ব কোনো দুর্বলতা নয়। শব্দকে লিঙ্গায়ন করা হয়। শব্দকে তৈরি করা হয় নারীর জন্য। শব্দের মধ্যে লিঙ্গ ব্যবহার করা একদম উচিত নয়। এসব পরিস্থিতির মধ্যে কর্মক্ষেত্রে নারীদের সব সময় প্রমাণ করে যেতে হয়- তারাও পারে। সামাজিকীকরণের মাধ্যমে নারীদের একটা গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে রাখা হয়। এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৮৮ শতাংশ নারী রাস্তায় চলার পথে অপমানজনক মন্তব্যের মুখোমুখি হন। এদের মধ্যে ৮৬ শতাংশ গাড়িচালক ও তার সহকারীর দ্বারা এবং ৬৯ শতাংশ দোকানদার ও বিক্রেতার মাধ্যমে যৌন নির্যাতনের শিকার হন।

বর্তমান পটভূমিতে আরেকটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। নারী নির্যাতন সমাজে সব সময়ই ছিল। কিন্তু এখন গণধর্ষণ ও নারী নিপীড়নের চিত্র ইলেকট্রনিক বা ইন্টারনেট মাধ্যমে ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার মাত্রা বেড়ে গেছে। এ ধরনের বর্বরতা বেড়ে যাওয়ায় অসংখ্য নারীর

জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। একদিকে নারী শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নিজ যোগ্যতায় এগিয়ে যেতে চাচ্ছে;

অন্যদিকে তার অগ্রযাত্রায় বাধা দিতে দুর্বৃত্তরা নিপীড়নকে হাতিয়ার করছে।

তবে নারী নির্যাতনের হার বেড়ে যাওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে আইনের প্রয়োগ না হওয়া। আইন থাকা সত্ত্বেও দেখা যাচ্ছে প্রায়োগিক ক্ষেত্রে নিপীড়িত নারী ন্যায়বিচার পাচ্ছেন না। বরং নানা সময়ে তাকেই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়; তাকেই অপমান করা হয়- এমন ধরনের প্রশ্ন তার দিকে ছুড়ে দেওয়া হয়। এভাবে নিপীড়নের শিকার নারীর জীবন আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। নির্যাতকদের আইনমাফিক শাস্তি না দেওয়ার কারণে বা তারা নানাভাবে ছাড় পেয়ে যায় বলে এটাকে এক ধরনের প্রশ্রয় বলা যায়। একুশ শতকে নারীর অগ্রযাত্রা এতে বাধাগ্রস্ত হবে।

এখনও অনেক বৈষম্য দৃশ্যমান। প্রতিনিয়ত নারীরাই এর মুখোমুখি হচ্ছে। তারপরও নারী আন্দোলনের সামগ্রিকভাবে অনেক অর্জনই দেখানো যেতে পারে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হওয়া জাতীয় নির্বাচনের পর নোয়াখালীর সুবর্ণচরে গণধর্ষণের শিকার হওয়া নারী পারিবারিকভাবে সহানুভূতি পেয়েছে, সামাজিকভাবে সহায়তা লাভ করেছে। নানা বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও আইনি সহায়তাপ্রাপ্তিতে তার পক্ষে জোরালো চাপ রয়েছে। কিন্তু আমরা যদি কিছুটা পেছনে তাকাই, তাহলে এগুলো অসম্ভব মনে হবে। আমি নিজেও ওখানে কাজ করেছি। এ রকম ধর্ষণের শিকার নারীদের সামাজিকভাবে তো দূরের কথা, পারিবারিভাবেই জায়গা মিলত না। স্বামীরা তালাক

দিয়ে দিত। তাই আমার কাছে মনে হয়, অনেক কিছুই হয়তো নির্মূল হয়নি; কিন্তু অগ্রগতি হয়েছে। এটি একটি ভালো উদাহরণ।

এ ছাড়াও ধর্মচর্চার সুযোগে ধর্ম শিক্ষকদের দ্বারা শুধু নারীরা নয়; ছেলেশিশুরাও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এগুলো আগে বলা যেত না, এখন বলা যায়। বিষয়গুলো গণমাধ্যমে আসছে। আমরাও অনেক কিছু জানতে পারছি। ফলে এর বিরুদ্ধে অনেক ধরনের ব্যবস্থা বা সচেতনতার উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। সামাজিক ব্যবস্থা, পরিস্থিতি, মানুষের মনোজগৎ সার্বিকভাবে আগের চেয়ে ভালো হয়েছে।

এর পেছনে দীর্ঘ সময় ধরে নারী আন্দোলন একটি ভূমিকা রেখেছে। এসব দিবস পালন মানে বছরের ৩৬৫ দিনে আমাদের দাবিগুলো ভুলে থাকা নয়। বিশেষ দিবস পালন মানে একটি দিনে বিশেষভাবে ভাবা, কথা বলা, পদক্ষেপ নেওয়া। গোটা বিশ্বের মানব সমাজ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে অঙ্গীকার করবে- তারা নারীর প্রতি সমাজ ও

রাষ্ট্র্রে বিদ্যমান সব ধরনের বৈষম্য ও দমনমূলক

নিয়মনীতির অবসান ঘটাবে। সমাজ-রাষ্ট্রের মূল স্রোতে নারীকে গতিশীল করে তার মর্যাদা প্রতিষ্ঠাই নারী দিবসের মূল চেতনা।

বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশে আন্তর্জাতিক নারী দিবস আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে রাশিয়া, আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান, কিরঘিজস্তান, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বেলারুশ, বুরকিনা ফাসো, কম্বোডিয়া, কিউবা, জর্জিয়া, গিনি বিসাউ, ইরিত্রিয়া, লাওস, মলদোভা, মঙ্গোলিয়া, মন্টেনিগ্রো, উগান্ডা, ইউক্রেন, ভিয়েতনাম ও জাম্বিয়া। এ ছাড়াও চীন, মেসিডোনিয়া, মাদাগাস্কার, নেপালে শুধু নারীরাই এই সরকারি ছুটি ভোগ করেন।

আমি মনে করি, নারীর প্রতি অতীত ও বর্তমানে যত সহিংসতা হয়েছে বা হচ্ছে, তা রুখে দিতে হবে। এটা শুধু নারীর একার দায়িত্ব নয়। নারী সংগঠনগুলোই শুধু এ নিয়ে কথা বলবে, তা হয় না। সমাজে নারী-পুরুষ উভয়ে বসবাস করেন। পুরুষ তো পশু নয়; তাদের নিপীড়ক হিসেবে ভাবতে চাই না। তাতে পুরুষেরও অমর্যাদা হয়। নারী যদি পুরুষের দ্বারা নিপীড়িত হওয়ার ভয়ে নিজেকে লুকিয়ে রাখে, তাহলে পুরুষের অবস্থানও নিচে নেমে যায়। তাই পুরুষের মানসিকতার পরিবর্তনও খুব জরুরি। পুরুষ নিজে যখন বুঝতে শিখবে- এ ধরনের আচরণ দ্বারা সে নিজেই নিজের অবমূল্যায়ন করছে, তখন নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হবে। তাই নারী ও পুরুষ উভয়কে সচেতন হতে হবে। মানুষকে যারা ভালোবাসেন, মর্যাদা দেন, তারা নারীকে নিপীড়ন করতে পারেন না। তারা নিজের সম্মান ও অধিকার বোঝেন, অন্যের ব্যাপারেও সচেতন থাকেন। আমরা মানবিক সমাজের পথে কিছুটা হলেও এগিয়ে যাব।

মানবাধিকার কর্মী ও ‘নিজেরা করি’
সংগঠনের সমন্বয়কারী

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  


    পাবনায় নামাজের সময়সূচি
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ০৩:৪৭
    সূর্যোদয়ভোর ০৫:১৪
    যোহরদুপুর ১১:৫৫
    আছরবিকাল ১৬:৩৪
    মাগরিবসন্ধ্যা ১৮:৩৬
    এশা রাত ২০:০৬

পাবনা এলাকার সেহেরি ও ইফতারের সময়সূচি

© All rights reserved 2019 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!