বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০১৯, ০৮:৪৯ পূর্বাহ্ন

বই পাগল এম. এল. নজরুল ইসলাম; ৫০ বছর ধরে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন

বই পাগল এম. এল. নজরুল ইসলাম

।। আলাউল হোসেন ।।  বয়স ৬৫। চেহারায় বার্ধক্যের ছাপ স্পষ্ট। হালকা গড়নের শরীরটি যে দূর্বল তা দেখেই বোঝা যায়, কিন্তু শারিরীক দুর্বলতা ও বয়স তার অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে দমন করতে পারেনি।

এখনও তিনি তার প্রতিষ্ঠিত উত্তরণ লাইব্রেরীতে রাত্রী যাপন করে মূল্যবান বইগুলো পাহারা দিয়ে থাকেন। আর এ কাজটি তিনি করে চলেছেন আজ প্রায় ৫০ বছর।

পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার হরিদেবপুর গ্রামের এই বই পাগল মানুষটির নাম এম. এল. নজরুল ইসলাম। শৈশব থেকেই বই পড়ার পোকা ছিলেন তিনি। তৎকালীন রাজশাহী জেলা বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার পার্বতীপুর আড্ডা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১ম শ্রেণি থেকে ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন।

তাঁর বাবা মৃত হামিজ উদ্দিন মিঞা রেলওয়ে বিভাগের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন । বাবার বদলীজনিত কারণে পরবর্তীতে ফরিদপুর গমন ও বসন্তপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনি ৪র্থ ও ৫ম শ্রেণিতে লেখাপড়া করেন।

এরপর রাজশাহী লোকনাথ হাইস্কুলে ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। আবারও বাবার বদলীজনিত কারণে ঈশ্বরদী সাড়া মারোয়ারী হাইস্কুলে ৯ম ও ১০ম শ্রেণিতে অধ্যয়ন করেন এবং ১৯৬২ সালে কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিক পাশ করে ভর্তি হন ঢাকার সরকারি বাংলা কলেজে।

তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজী দীন মোহাম্মদ প্রিন্সিপ্যাল, ইব্রাহিম খাঁ, লেখক শাহেদ আলী, প্রফেসর আশরাফ ফারুকীসহ অনেক স্বনামধন্য ব্যক্তিবর্গ অবৈতনিক নৈশকালীন ক্লাস নিতেন বাংলা কলেজে।

এম. এল. নজরুল ইসলামের সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁদের সাহচর্যে যাওয়ার ও স্নেহভাজন হওয়ার। ফলে লাইব্রেরী গড়ে তোলার প্রতি আগ্রহ জন্মে তখন থেকেই।

বাংলা কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যে অনার্স কোর্সে ভর্তি হন এম.এল. নজরুল ইসলাম। কিন্তু সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার নেশায় পড়ে তার লেখাপড়ায় ভাটা পরে।

অনার্স ২য় বর্ষে অধ্যয়নকালীন ঢাকার ‘মূডী ফ্লিমস কর্পোরেশন’ নামে একটি বেসরকারি সংস্থায় তিনি চাকরি নেন এবং শিক্ষা জীবনের সেখানেই সমাপ্তি ঘটে।

সে সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানে এত সিনেমা হল ছিল না। কাজেই ‘মুডী ফিল্মস কর্পোরেশন’ নিজস্ব প্রজেক্টর মেশিনে শহর বন্দর, গ্রাম-গঞ্জে পাকিস্থানি ও ভারতীয় ছবিগুলো প্রদর্শন করতো দেশব্যাপী।

চাকরির শুরুতেই এম. এল নজরুল ইসলামকে ‘পাবনা ডিক্ট্রিক অর্গানাইজার’ হিসাবে দায়িত্ব দেয়া হয়। দীর্ঘ ৩ বছর পর অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণে ‘মুডী ফিলম কর্পোরেশন’ এর বিলুপ্তি ঘটলে এম. এল নজরুল ইসলামও চাকরি হারান।

পরে তিনি গ্রন্থাগার পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার উপর উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণ করেন এবং কয়েক মাস পর ঈশ্বরদীতে গড়ে তোলেন নিজস্ব উদ্যোগে ‘কসমিক সাধারণ পাঠাগার’।

শত শত যুব সম্প্রদায়কে বইমুখি করতে সক্ষম হন। তার কয়েক মাস পর পাঠাগার পরিচালনার পাশাপাশি তিনি ঈশ্বরদীতে গড়ে তোলেন কসমিক শিল্পী গোষ্ঠী।

তৎকালীন সিনেমা সাপ্তাহিক পত্রিকা সিনেমা ও চিত্রালীতে বিজ্ঞাপন দিয়ে দেশের খ্যাতনামা শিল্পীদের নিয়ে তিনি এ শিল্পী গোষ্ঠী গড়ে তোলেন।

ঈশ্বরদী, পাবনা বনমালী ইনস্টিটিউটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কসমিক শিল্পী গোষ্ঠী বিভিন্ন নাটকসহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবশেন করে দীর্ঘ ৩ বছর। সে সময় কসমিক শিল্পী গোষ্ঠীর কার্যক্রম দেশে সাংস্কৃতিক জোয়ার সৃষ্টি করে ও ব্যাপক প্রশংসিত হয়।

১৯৬৯ সালে আরও বৃহত্তর কিছু করার লক্ষ্যে এম. এল নজরুল ইসলাম সপরিবারে ঢাকায় চলে যান। তিনি ঢাকার মুগদাপাড়ায় একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলেন ‘মৌচাক ভ্রাম্যমান লাইব্রেরি’।

বুকশেলফসহ বড় ধরনের ভ্যান গাড়িতে করে ঢাকার বিভিন্ন বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে পাঠকদের পছন্দমত বই আদান-প্রদান করত এই মৌচাক ভ্রাম্যমান লাইব্রেরি। এইভাবে ঢাকায় হাজার হাজার নতুন পাঠক সৃষ্টি করেছিল এই লাইব্রেরিটি।

পাঠাগার পরিচালনার পাশাপাশি খিলগাঁয়ে আরেকটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে এম. এল নজরুর ইসলাম গড়ে তোলেন দেশের প্রখ্যাত শিল্পীদের নিয়ে মৌচাক শিল্পী গোষ্ঠী। যে শিল্পী গোষ্ঠী সেগুনবাগিচা সংগীত বিদ্যালয়, রেলওয়ে মাহবুব আলী ইনস্টিটিউট, বেইলী রোডের থিয়েটার পাড়াসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন রঙ্গমঞ্চ ভাড়া নিয়ে নাটক, নৃত্য নাট্য, কবিগানসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এ দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জোয়ার সৃষ্টি করেছে।

এছাড়াও তিনি ৩টি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যকার ও ৫টি সিনেমার সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

সর্বশেষ ১৯৮৭ সালে পাবনার কাশীনাথপুরে তিনি নিজ এবং ৯ অক্টোবর ১৯৮৭ সালে একটি ভাড়া ঘরে প্রতিষ্ঠা করেন উত্তরণ লাইব্রেরি (সাধারণ পাঠাগার)।

বিভিন্ন পদ্ধতিতে স্থানীয় জনগণকে বই পড়তে উদ্বুদ্ধ করে এলাকায় হাজার হাজার পাঠক সৃষ্টি করেছেন। অর্থনৈতিক টানাপোড়নের মাঝেও গত ২৭ বছর ধরে সম্পূর্ণ অবৈতনিকভাবে পাঠাগার পরিচালনা করে আসছেন।

বর্তমানে পাঠাগারটি তার নিজস্ব জমিতে আধাপাকা ভবনে রূপান্তরিত হয়েছে। এক সাথে ৫০ জন বসে বই ও বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা পড়াশোনা করতে পারেন।

এম. এল নজরুল ইসলাম স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সাথে গভীরভাবে জড়িত। উত্তরণ লাইব্রেরির ব্যানারে সরকারি, বেসরকারি প্রতিটি দিবস পালন করে আসছেন।

সাংস্কৃতিক জীবন ধারায় জোয়ার সৃষ্টিতে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন। অসংখ্য ছড়া, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, কবিতা, উপন্যাস লিখেছেন। প্রকাশিতও হয়েছে ৭টি গ্রন্থ । উত্তরণ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন ৪৯ সংখ্যা।

প্রায় ৫০ বছর ধরে মানুষকে বই পড়িয়ে আনন্দ পাচ্ছেন। নিজের সংসারের দিকে ঠিকমতো নজর না দিলেও বইয়ের দিকে তার নজর থাকে সবসময়ই। তার প্রতিষ্ঠিত উত্তরণ লাইব্রেরী সম্পর্কে আলাপকালে এ অঞ্চলের কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক জানান, তার এই উত্তরণ লাইব্রেরীর কারণেই তারা আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পেরেছেন।

তারা জানান, ছোটবেলা থেকেই উত্তরণ লাইব্রেরীতে গিয়ে বই পড়ার সুযোগ পেয়েছিলাম বলে লেখাপড়ার প্রতি প্রবল আগ্রহ জন্মে এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও তাই ভালো ফলাফলের দেখা পাই।

বিশিষ্ট কবি গোবিন্দলাল হালদার বলেন, তার লাইব্রেরীতে এসে কবিতা আর ছড়ার বই পড়তাম। একসময় পড়তে পড়তে লিখতে আগ্রহী হলাম। তরুণ গল্পকার রুহান রাতুলও তার গল্প লেখার পেছনে এই লাইব্রেরীকেই প্রধান শিক্ষক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

আলাপকালে এম.এল নজরুল ইসলাম বলেন, উত্তরণ লাইব্রেরীর স্থায়িত্ব সম্পর্কে আমি চিন্তিত নই। কারণ, প্রতিষ্ঠার পর একক উদ্যোগে বেশ কিছুদিন পরিচালনার পর স্থানীয় হিংসা-বিদ্বেষ ও গ্রাম্যরাজনীতি আমাকে ঘিরে ধরলে গ্রন্থাগারটির স্বার্থেই স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে একটি শক্তিশালী কার্যনির্বাহী পরিষদ গঠন করি।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গ্রন্থপ্রেমিক, সাংস্কৃতিকমনা, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, স্থানীয় স্কুল-কলেজ ও কিন্ডারগার্টেনসমূহের প্রধানদের নিয়ে একটি শক্তিশালী উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়।

তারাই পাঠাগারটি পরিচালনা করছেন। আমি আজীবন অবৈতনিক গ্রন্থাগারিক মাত্র। আমার মৃত্যুর পর এই কার্যকরী পরিষদ ও বিজ্ঞ-অভিজ্ঞ উপদেষ্টা পরিষদই জনকল্যাণকর এই গ্রন্থাগারটি রক্ষা করে যাবেন ও যুগ যুগ ধরে প্রজন্ম বিনির্মাণে উত্তরণ লাইব্রেরী (সাধারণ পাঠাগার) কাজ করে যাবে বলে আমি আশাবাদী।


    পাবনায় নামাজের সময়সূচি
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ০৩:৫৪
    সূর্যোদয়ভোর ০৫:২২
    যোহরদুপুর ১২:০৫
    আছরবিকাল ১৬:৪৪
    মাগরিবসন্ধ্যা ১৮:৪৭
    এশা রাত ২০:১৭
© All rights reserved 2019 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!