শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ০২:৩১ অপরাহ্ন

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও মুক্তিযুদ্ধকে জানি বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার


।।এবাদত আলী।।
বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক “ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধকে জানি” বিষয়ে নির্বাচিত প্রশ্নমালার মাধ্যমে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মুখোমুখি করা এবং তাদের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধেরসঠিক ইতিহাস সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করার মানষে একটি প্রোগ্রাম চালু করা হয়েছে।

এরই অংশ হিসেবে পাবনা সদর উপজেলার মালিগাছা ইউনিয়নের মালিগাছা-মজিদপুর দাখিল মাদরাসার পক্ষ থেকে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হলো। মাদরাসা সুপার মওলানা তেলাওয়াত হোসেন কর্তৃক রেজাউল করিমের মাধ্যমে আমার কাছে ৪১ টি প্রশ্ন সম্বলিত প্রশ্নমালার একপ্রস্থ কাগজ পাঠানো হলো। পাশাপাশি শিক্ষার্থীগণ প্রশ্নগুলো আগে থেকে পড়ে আত্মস্থ করবে এবং নির্ধারিত দিনে উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধাদেরকে নিজের ভাষায় প্রশ্ন উত্থাপন করবে।
অনেক দেরিতে হলেও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্মের নিকট মুক্তিযোদ্ধা কর্তৃক তা তুলে ধরার ব্যবস্থা করা সময় উপযোগি পদক্ষেপ বটে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে সপরিবারে হত্যা করার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার সকল স্তরের প্রকৃত ইতিহাস চিরতরে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিলো। এমনকি পাঠ্য পুস্তকের মাধ্যমেও কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরকে ভুল তথ্য শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো।

বাঙালির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নাম ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলার জোর প্রচেষ্টা হয়েছিলো। তৎকালিন সরকার বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদেরকে পুনর্বাসিত করে তাদেরকে বিভিন্নভাবে পুরুষ্কৃত করেছিলো। শুধু কি তাই? মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারি মানবতাবিরোধি ও যুদ্ধাপরাধি এদেশীয় দালাল রাজাকার, আলবদর আলশামস বাহিনীর লোকদেরকে মন্ত্রী বানিয়ে তাদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা লাগিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধকে পদে পদে অপমানিত করা হচ্ছিলো।

পরবর্তীকালে বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে এসে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের হাল ধরেন এবং বাংলাদেশের মানুষের অকুন্ঠ ভালোবাসায় সিক্ত জননেত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালের ১৫ জুন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন হন। তখন থেকেই তিনি তাঁর পিতার অসমাপ্ত কাজকে সমাপ্ত করার জন্য অর্থাৎ বাংলাদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত একটি সুখি ও সমৃদ্ধিশালী দেশ হিসেবে বিশ্ব দরবারে পরিচিতি লাভ এবং এদেশের দুখি মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য নিরলসভাবে দিনরাত কাজ করে চলেছেন।

তারই কল্যানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস পুনর্জাগরিত হতে থাকে। যেখানে বঙ্গবন্ধুর নাম নিশানা মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিলো, পাঠ্য পুস্তকে মহান স্বাধীনতার ইতিহাসকে পদে পদে বিকৃত করা হচ্ছিলো সেখানে তা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা চলছে।

যাক শিক্ষার্থী কর্তৃক মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার গহণের জন্য ৯ সেপ্টেম্বর- ২০১৯. ধার্য তারিখে উক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে হাজির হলাম। আরো দুজন মুক্তিযোদ্ধাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তারা হলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ময়েন উদ্দিন ও মোঃ ইন্তাজ আলী।

এই উপলক্ষে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সংবর্ধনা প্রদানের ও ব্যবস্থা করেছেন। আমাকে প্রধান অতিথি ও অপর দুজনকে বিশেষ অতিথির মর্যাদা দেওয়া হলো। মাদরাসার ছাত্র-ছাত্রী , শিক্ষক মন্ডলী ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্য বৃন্দসহ সকলে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনে শরীক হলেন।

মাদরাসা পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ও মালিগাছা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিমের সভাপতিত্বে মাদরাসার সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা ও সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠান পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সুচনা করা হলে স্বাগত বক্তব্য দেন মাদরাসার সুপার মওলনা তেলাওয়াত হোসেন। উক্ত সংবর্ধনা ও আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবাদত আলী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ময়েন উদ্দিন ও মোঃ ইন্তাজ আলী।

প্রশ্নোত্তর পর্বের সমন্বয়ক হিসেবে মাদরাসার সহকারি শিক্ষক মোঃ রকিব উদ্দিন, মোঃ সুলতান আহম্মেদ ও সাইদুল ইসলাম দায়িত্ব পালন করেন।

মাদরাসার ছাত্র-ছাত্রীদের পক্ষ হতে তিনটি গ্রুপের মাধ্যমে মাদরাসার ছাত্রী তমা খাতুন, সাদিয়া বিনতে মিম, সুরভি খাতুন ও মায়া খাতুন কর্তৃক বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরকে ‘ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী এবং মুক্তিযুদ্ধ’ বিষয়ে নানা ধরণের প্রশ্ন করা হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দান করেন এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী ও মহান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিষদভাবে আলোচনা করেন।

শিক্ষার্থীদের পক্ষ হতে প্রথম প্রশ্ন ছিলো, জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আপনি স্বচক্ষে দেখেছেন কিনা? দেখলে সেই অনুভুতি ব্যক্ত করুনঃ-
আমি (এবাদত আলী) তার উত্তরে জানাই যে, ১৯৬৬ সালে আমি তখন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্র এবং পুর্ব-পাকিস্তান ছাত্রলীগ পাবনা জেলার একজন সক্রিয় কর্মী। এবছর ৮ এপ্রিল তারিখে ৬ দফা দাবীর পক্ষে জনমত গঠনের লক্ষে শেখ মুজিবুর রহমান পাবনা টাউন হলে একটি জনসভায় ভাষণ দান করেন।
সেদিন তাঁর জনসভায় আগত লোকজনের বসার জন্য বাঁশের চাটাই বিছিয়ে দেওয়া এবং সভা শুরুর আগে মাইকে লোকজনকে সভাস্থলে আসার আহবান করার ঘোষণার দায়িত্ব পালনের বিরল সুযোগ আমি লাভ করেছিলাম। এরপর ১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নগরবাড়ি ঘাটে “মুজিব বাঁধের” উদ্বোধন অনুষ্ঠানে মঞ্চের পাশে থেকে তাঁকে দেখেছি এবং তাঁর কন্ঠে ভাষণ শুনেছি। ১৯৭২ সালের ১০ মে তারিখে পাবনা ষ্টেডিয়ামের জনসভায় তাঁকে মঞ্চের পাশে থেকে দেখেছি এবং ভাষণ শুনেছি। এসম্পর্কে অপর দুজন ও তাদের মতামত ব্যক্ত করেন।

মোট ৪১ টি প্রশ্নের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য প্রশ্ন ছিলো ১৯৩৮ সালে অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক এবং শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর গোপালগঞ্জ শহরে আগমণ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানমালায় স্কুল ছাত্র হয়েও বঙ্গবন্ধু স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, এ বিষয়ে আপনার অভিমত কি?
বঙ্গবন্ধু ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি স্তরেই গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা পালন করেছেন।

বঙ্গবন্ধুর এহেন ভুমিকাকে কিভাবে মুল্যায়ন করা হয়। ১৯৬৬ সালের ৬ দফা, ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু বলেন, “ জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি- আজ হইতে পাকিস্তানের পুর্বাঞ্চলের প্রদেশটির নাম পুর্ব পাকিস্তানের পরিবর্তে শুধু মাত্র বাংলাদেশ।” ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৬৭ টি আসন লাভ করে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন ‘ প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। ’ এরপর ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণা ‘ এটাই আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন’ এরপর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন এবং প্রশ্নের আলোকে বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ তাদের অনুভুতি ব্যক্ত করেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট শিক্ষার্থীদের আরো প্রশ্ন ছিলো, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সময় আপনার/ আপনাদের বয়স কত ছিলো? যে এলাকা ও সেক্টর থেকে আপনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন তার বিবরণ দিন। আপনার/ আপনাদের উল্লেখযোগ্য সহ যোদ্ধার নাম। আপনার / আপনাদের পরিবারে আর কেউ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন কিনা। কেউ শহীদ হয়েছেন কিনা। যুদ্ধে যাওয়ার জন্য কোথায় ট্রেনিং প্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় কোন বিশেষ উল্লেখযোগ্য ঘটনা থাকলে তা ব্যক্ত করা। চুড়ান্ত বিজয় সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করা। আপনার / আপনাদের এলাকায় কোন বধ্যভুমি, গণকবর আছে কিনা? ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় যে মানবতা বিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে সে বিষয়ে এবং পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সহযোগী দেশীয় শক্তিসমুহ রাজাকার, আল বদর ও আল শামস বাহিনীর নির্মমতা সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি।

সব শেষে এর বাইরে যদি কোন মন্তব্য থাকে তাও মুক্তিযোদ্ধারকে ব্যক্ত করার অনুরোধ জানানো হয়। আমরা মুক্তিযোদ্ধাগণ শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেই এবং ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ের বিভিন্ন স্মৃতি কথা তুলে ধরি। এতে তারা সন্তোষ প্রকাশ করেন।

এভাবেই সেদিনের সাক্ষাৎকার পর্বের ইতি টানা হয়।

(লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও কলামিস্ট)


    পাবনায় নামাজের সময়সূচি
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ০৪:৩৯
    সূর্যোদয়ভোর ০৫:৫৭
    যোহরদুপুর ১১:৪৪
    আছরবিকাল ১৫:৫৩
    মাগরিবসন্ধ্যা ১৭:৩০
    এশা রাত ১৯:০০
© All rights reserved 2019 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!