মঙ্গলবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০১:০৪ পূর্বাহ্ন

বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা বিধান

ছবি : অনলাইন থেকে

ছবি : অনলাইন থেকে

ছবি : অনলাইন থেকে

।।এবাদত আলী।। সংবাদ বলতে আমাদের চারপাশে যে সকল ঘটনা অহরহ ঘটে চলেছে তাকে বুঝে থাকি। শুধু ঘটে যাওয়া ঘটনা নয় সে ঘটনাকে বিশেষ আঙ্গিকে সাজিয়ে গুছিয়ে তা যখন সংবাদ হিসেবে প্রকাশ পায় তখন সে সংবাদ সত্যিকার সংবাদ হিসেবে রূপ লাভ করে থাকে।

সংবাদ, সংবাদই, তা বৈচিত্রপূর্নই হোক আর বৈচিত্রহীনই হোক না কেন। কোন কোন সংবাদ পাঠকগণের কাছে বৈচিত্রতা আনতে সক্ষম নয় হেতু তা অনেক সময় পাঠক সমাজ অবহেলার চোখে দেখে থাকেন। আবার কোন কোন ধরনের এমন কিছু সংবাদ আছে যা খবরের কাগজের পাঠকরা লুফে নেন।

সংবাদ পত্রের ভাষায় এ ধরনের কিছু কিছু সংবাদকে হট কেক বলা হয়ে থাকে। আমাদের দেশে সাংবাদিকতার জগতে যেমন পেশাদার সাংবাদিক রয়েছেন তেমনি অপেশাদার বা সৌখিন সাংবাদিকও আছেন। তবে সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনের ক্ষেত্রে তাদের ধ্যান-ধারণা বলতে গেলে একই রকম। গত এক দশকে এদেশের সাংবাদিকতার জগৎ অনেক প্রসারিত হয়েছে।

সংবাদপত্রের পাশাপাশি যোগ হয়েছে নতুন নতুন মিডিয়া বিশেষ করে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল, এফএম রেডিও এবং সর্বশেষে যোগ হয়েছে ইন্টারনেটে অনলাইন সাংবাদিকতা।

সাংবাদিকতা হলো একটি যোগাযোগ প্রক্রিয়া। সমাজতত্ববিদ র্চালস কুলী বলেছেন “ মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক যে ক্রিয়া কৌশলের মধ্য দিয়ে বজায় থাকে ও বিকশিত হয় তা-ই যোগাযোগ। একজন সাংবাদিক এই যোগাগের বন্ধন তৈরি করেন সময়ের সাথে সময়ের মানুষের সাথে মানুষের এবং তা টেনে নিয়ে যান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।” এ কারণে সাংবাদিকতা এ্কটি দায়িত্বশীল পেশা। আবার মহান পেশাও। আর নিউজ বা সংবাদকে বলা হয় ‘ইতিহাসের প্রথম খসড়া।’

আজ যা খবর আগামি কাল তা ইতিহাস, সময়ের দলিল। এ প্রসঙ্গে এ কথা বলা অতুক্তি হবেনা যে, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময়ে এদেশের রাজাকার আল-বদর আর আল-শামস বাহিনী দম্ভভরে যে সকল উক্তি এবং কর্মকান্ডে লিপ্ত ছিলো তা তৎকালিন সময়ে তাদেরই একটি পত্রিকাসহ অন্যান্য পত্রিকায় ফলাও করে প্রচার করা হয়েছিলো যা পরবর্তীকালে সেই সকল রাজাকারেরা মানবতাবিরোধী অপরাধে বিচারের সম্মুখিন হলে ঐ সকল সংবাদ ও ফিচার আদালতে অকাট্য প্রমাণ হিসেবে গৃহিত হয়।

সংবাদকর্মি বা সাংবাদিকগণ যে আঙ্গিকে সংবাদ সংগ্রহ করে থাকেন তার অধিকাংশই ঝুঁকিপূর্ন। বিশেষ করে অপরাধ প্রবন তথ্যাদি সংগ্রহের ক্ষেত্রে ঝুঁকির মাত্রা অত্যাধিক। ঘি প্রস্তুতকারীগণ দুধকে মন্থন করে দুধের মধ্য হতে যেমন করে মাখন তুলে আনে।

সাংবাদিকগণকে ঠিক একই উপায়ে সংবাদের তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করতে হয়। সবচেয়ে বড় কথা সংবাদ পরিবেশন বা প্রকাশের পূর্বে সত্যতা যথার্থ যাচাই করা আবশ্যক। মিথ্যা বা ভিত্তিহীন কোন সংবাদ যা নাকি গুজব হিসেবে মানুষের মুখে মুখে প্রচারিত তা সংবাদ হিসেবে কোন গুরুত্ব বহন করেনা।

অর্থাৎ বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনই একজন সাংবাদিকের মূল দায়িত্ব। কিন্তু এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সংবাদকর্মি বা সাংবাদিকদেরকে নানা ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হয়। যে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠির বিদ্ধুদ্ধে নির্ভেজাল সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে সাংবাদিকদেরকে প্রায়শ্চই নাজেহাল হতে হয়।

২০১৫ সালে সারা দেশে ২শ ৪৪ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নির্যাতন, হয়রানি, হুমকি ও পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েছেন। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ ও আসকের নিজস্ব সুত্রের ভিত্তিতে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।

গত ১৭ নভেম্বর দৈনিক এ যুগের দ্বীপ পত্রিকার সম্পাদক সরকার আরিফুর রহমান আরব আলীকে পিটিয়ে আহত করা হয়েছে। বার্তা সংস্থা পিপ জানায়, পাবনায় সরকার আরিফুর রহমান ওরফে আরব আলী (৬০) নামের এক সাংবাদিককে পিটিয়ে আহত করেছে দুর্বৃত্তরা। তাকে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

বেড়া উপজেলার কালি মন্দিরের সামনে বৃহস্পতিবার (১৭ নভেম্বর-২০১৬) রাত ৮টার দিকে এ হামলার ঘটনা ঘটে। আরব আলী পাবনা থেকে প্রকাশিত ‘ দৈনিক এ যুগের দ্বীপ’ নামের একটি পত্রিকার সম্পাদক। এছাড়া তিনি পাবনা সংবাদপত্র পরিষদের সহ-সভাপতি।

প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন জানান, রাত ৮টার দিকে বেড়া পৌর এলাকার কালি মন্দিরের কাছে চায়ের দোকানে বসেছিলেন আরব। এ সময় দুরবৃত্তরা হকিস্টিক, লোহার রড ও কাঠের বাটাম দিয়ে তাকে বেধড়ক পেটায়। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কম্পেক্সে ভর্তি করা হয়। পরবর্তী সময়ে অবস্থার অবনতি হওয়ায় চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে রাত সাড়ে ১০টার দিকে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

আহত সাংবাদিকের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করে জানানো হয়, সম্প্রতি বেড়া পৌর সদরেরর এক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ‘ দৈনিক এ যুগের দ্বীপ’ পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরই জের ধরে ঐ ব্যবসায়ীর লোকজন হামলা চালিয়েছে।

এদিকে সরকার আরিফুর রহমানের ওপর সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে ২০ নভেম্বর বেলা ১২টায় পাবনা সংবাদপত্র পরিষদ, পাবনা প্রেসক্লাব, ইয়াং জার্নালিস্ট ফোরামসহ বিভিন্ন সংবাদ কর্মিরা মানব বন্ধন কর্মসুচি পালন করে।

১৯৯৫ সালের ২০ নভেম্বর সংবাদ প্রকাশের কারণে দৈনিক ইনকিলাবের পাবনা জেলা সংবাদদাতা মুরসাদ সুবহানিকে সন্ত্রাসীরা মারপিট করে গুরুতর আহত করেছিলো। তাঁকে মরনাপন্ন অবস্থায় প্রথমে পাবনা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হলে তাৎক্ষণিক ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়।

সেখানে এক বছরকাল যাবত চিকিৎসার পর তিনি কোনমতে আরোগ্য লাভ করেন। থানায় মামলা করা হয়েছিলো। প্রথমে খুব তোড়জোড় হলে মামলাটি সিআইডিতে ন্যস্ত করা হয়। কিন্তু পরবর্তীকালে বলতে গেলে মামলাটি ধামাচাপা পড়ে যায়।

২০১২ সালের ১১ মে পাবনার বেড়া উপজেলায় কর্মরত দৈনিক কালের কন্ঠের আঞ্চলিক প্রতিনিধি আব্দুললাহ আল মামুনের ওপর সন্ত্রাসীরা হামলা করে তাকে গুরুতর আহত করলে পাবনা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। স্থানীয় সংসদ সদস্য অর্থাৎ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকার মাঠ পর্যায়ের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ পাওয়ায় স্বরাষ্ট প্রতিমন্ত্রীর ভাতিজা এবং তার লোকজন মামুনকে পিটায়।

সাংবাদিক আব্দুললাহ আল মামুনের অপরাধ হলো তিনি “টিআর-কাবিখা-টেন্ডার পান এমপি টুকুর স্বজনরা” শিরোনামে কালের কন্ঠে একটি সংবাদ প্রকাশ করেছিলেন। সংবাদ প্রকাশের পর হতেই তাকে প্রাণ নাশের হুমকি দেয়া হয় এবং হত্যার উদ্দেশ্যে তার উপর হামলা করা হয়।

এই ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয় সাংবাদিকরা সোচ্চার হয়ে হামলাকারিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে মিছিল ও প্রতিবাদ সভা করে। পাবনা প্রেসক্লাবের সাংবাদিকরাও প্রতিবাদ সভা করে।
এঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এ বছরের ১৯ মে দৈনিক সমকালের পাবনা জেলা প্রতিনিধি, এনটিভির পাবনা প্রতিনিধি ও পাবনা প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবিএম ফজলুর রহমানকে কুপিয়ে আহত করা হয়।

পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের শিক্ষক পরিচয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদানের কথা বলে তাকে মোবাইল ফোনে ডেকে নেওয়া হয়। দিন কয়েক আগে এডওয়ার্ড কলেজ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বেশ কিছু খবর দৈনিক সমকালে প্রকাশিত হয় এবং এডওয়ার্ড কলেজে নবীন বরণ অনুষ্ঠানে কলেজের একজন শিক্ষক ভাড়াটিয়া নর্তকির হাত ধরে মঞ্চে অশালিন নৃত্য করলে ছবিসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হলে সাংবাদিক ফজলুর ওপর দোষ চাপানো হয়।

উচিৎ শিক্ষা দিবার জন্য কলেজ শিক্ষকের পরিচয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়ার নাম করে বার বার মোবাইল ফোনে তাকে কলেজে যাবার জন্য অনুরোধ জানানো হয়।

ঘটনার দিন তিনি কলেজ ক্যাম্পাসে পোঁছা মাত্র কয়েকজন যুবক তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার উপর আক্রমণ চালায়। গুরুতর আহতাবস্থায় তাকে পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এঘটনার পরপরই পাবনায় কর্মরত সাংবাদিকরা শহরের প্রাণকেন্দ্র আব্দুল হামিদ রোডে অবস্থান নেয়।

শহরের যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে পাবনায় অবস্থানরত স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাড শামসুল হক টুকু দুস্কৃতকারিদের দ্রুত গ্রেফতারের আশ্বাস দিলে সাংবাদিকরা তাদের অবস্থান তুলে নেয়। পরে অবশ্য পুলিশ আসামিদের গ্রেফতার করে এবং ৯জনের বিরুদ্ধে চার্চশিট দাখিল করে। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।

সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা যেন দিন দিন বেড়েই চলেছে। মানবাধিকার সংগঠন ‘ অধিকার’ এর তথ্য অনুযায়ী পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিক দলন ও নির্যাতনের ঘটনা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।

সংগঠনটি জানিয়েছে, ২০০৯ সালে সারা দেশে বিভিন্ন ঘটনায় ১৪৫ জন সাংবাদিক পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের আক্রমণের শিকার হয়েছেন। ২০১০ ও ২০১১ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাড়ায় যথাক্রমে ১৭৮ ও ২০৬ জনে।’

সংবাদকর্মী বা সাংবাদিকদেরকে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অমূল্য জীবন বিসর্জন দিতে হয়েছে তার সংখ্যাও কম নয়। বাংলাদেশে গত দেড় যুগে ৩৯ জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন।

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি খুন হয়েছেন সাংবাদিক দম্পতি মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সারওয়ার ও তার স্ত্রী এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার মেহেরুন রুনি। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাদের লাশ কবর থেকে উত্তোলন করে পুনরায় ময়না তদন্ত করা হলেও হত্যাকান্ডের রহস্য এখনো উৎঘাটন করা সম্ভব হয়নি।

বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের আশায় সত্য উদঘাটন করতে খবর সংগ্রহকারি সাংবাদিকরা নিজেরাই খবরের শিরোনাম হচ্ছেন। অপর দিকে সরকারের তরফ থেকে সাংবাদিকদের ব্যাপারে সরকার সহানুভূতিশীল বলে বলা হচ্ছে।

একটি গনতান্ত্রিক দেশের জনগণের সার্বিক নিরাপত্তা বিধান করা রাষ্ট্রের জন্য জরুরী। নাগরিক জীবনের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কোন বিকল্প নেই। সাংবাদিকরা জাতির বিবেক বলে বিবেচিত। তাই তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করে থাকেন।

আর্থ সামাজিক উন্নয়নে সমাজ ও রাষ্ট্রের নানাবিধ অনিয়ম অবিচার ও অসঙ্গতি কলমের ডগায় তুলে আনেন বা বিভিন্ন মাধ্যমে তা জাতির সামনে তুলে ধরেন। সকল প্রকার ভয়-ভীতি ও রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করেই তারা সে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে থাকেন।

বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করতে গিয়ে তাই পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয় এমনকি জীবন পর্যন্তও বিসর্জন দিতে হয়। সাংবাদিকদের জীবনের নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিত করতে সরকারকে তাই এগিয়ে আসতে হবে। (লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।


    পাবনায় নামাজের সময়সূচি
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ০৪:৩০
    সূর্যোদয়ভোর ০৫:৪৮
    যোহরদুপুর ১১:৫১
    আছরবিকাল ১৬:১২
    মাগরিবসন্ধ্যা ১৭:৫৩
    এশা রাত ১৯:২৩
© All rights reserved 2019 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!