বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৫:৩০ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশকে বিশ্বে পরিচিত করতে চাই- বিশেষ সাক্ষাৎকারে অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু

 

বার্তা সংস্থা পিপ, পাবনা : জনাব অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু। ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্কয়ার টয়লেট্রিজ ও মাছরাঙা টেলিভিশন। এ ছাড়া রয়েছে তারা নানা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। দেশকে রক্ষা করতে মাটির টানে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। সংস্কৃতি তার মন মননে।

আজ বৃহস্পতিবার (১৫ নভেম্বর) থেকে রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী ‘ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্ট-২০১৮’। মাটির সুরে মাটির গানের এই উৎসবের আয়োজক তিনি।

এ আয়োজন ও অন্যান্য প্রসঙ্গ নিয়ে বার্তা সংস্থা পিপ এর প্রধান সম্পাদক এবিএম ফজলুর রহমানকে তিনি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতেই এই আয়োজন।

পিপ- ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্ট-২০১৮-এর আয়োজনে বিশেষ কী থাকছে ?

অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু- এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো আয়োজিত হচ্ছে ‘ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্ট-২০১৮’। ধারাবাহিকভাবে এই আয়োজন করতে পেরে আমরা খুবই খুশি। পাশাপাশি কৃতজ্ঞ দেশের আপামর দশক-শ্রোতা থেকে শুরু করে বাংলাদেশ সরকারের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের প্রতি।

আমরা যখন এটি শুরু করেছিলাম, তখন থেকেই একই মূলমন্ত্রে আছি। প্রথম আয়োজনে আমাদের দেশের লোকসঙ্গীত শিল্পীদের নিয়ে শুরু করেছিলাম। এরপর আস্তে আস্তে আন্তর্জাতিক শিল্পীদের সঙ্গে দেশবাসীর পরিচয় করিয়ে দিতে শুরু করেছি। গতবারের চেয়ে এবার বিদেশি শিল্পীদের ক্ষেত্রেও ভিন্নতা আনা হয়েছে।

পিপ-  টানা চতুর্থবারের মতো এই আয়োজন করতে পেরে কেমন লাগছে?

অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু- খুব ভালো লাগছে। প্রথমদিকে আমার নিজের মধ্যে বেশ সংশয় ছিল। এ বছর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে এই আয়োজনটি করতে পারব কি-না। যদিও আমরা সরকারের কাছ থেকে অনেক আগেই সবুজ সংকেত পেয়েছিলাম।

পিপ- এমন আয়োজনের উদ্দেশ্য কী ?

অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু- যখন এই আয়োজনটি শুরু করি তখন থেকেই আমাদের চিন্তা ছিল ছোট কোনো আয়োজন নয়। বড় পরিসরে দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান শিল্পীদের এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করব। যাতে আমাদের দেশের দর্শক-শ্রোতা নিজেদের গান শোনার পাশাপাশি অন্যান্য দেশের লোকগানের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে। পাশাপাশি আমাদের শিল্পীদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। মূলত আমাদের দেশের শিল্পীদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত করার লক্ষ্যেই এ আয়োজন। আমি মনে করি এই আয়োজনের দাবিদার পুরো বাংলাদেশ।

পিপ- এবারের আয়োজনের বিশেষত্ব কী?

অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু- প্রতিবারই যেরকম হয়- বিশ্বের নতুন শিল্পীদের সঙ্গে এদেশের দর্শকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। এটাই এর বিশেষত্ব। আমাদের এই আয়োজনে পুরনো শিল্পীর পাশাপাশি নতুন শিল্পীরা পারফর্ম করেন। এবারও আমরা বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশের জনপ্রিয় লোকসঙ্গীত শিল্পীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি।

পিপ- লোকগানের প্রসারে এ আয়োজন কেমন ভূমিকা রাখতে পারে…

অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু- লোকগানের প্রসারে এমন আয়োজন কেমন ভূমিকা রাখতে পারে এটা বলা মুশকিল। কিন্তু প্রতিবছরই আয়োজনের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। একটা উদাহরণ দিলে বোঝা যাবে, দুই বছর আগে উদ্বোধনী আয়োজন শেষ করে আমি যখন স্টেজ থেকে নামছি, তখনই আমার মোবাইল ফোনে ক্যালিফোর্নিয়া আর নিউইয়র্ক থেকে অনুষ্ঠানটি নিয়ে কথা বলেছে।

শুধু দেশি পরিচিত বন্ধুরা নয়, ওখানকার লোকাল বন্ধুরাও। যখনই একটি সফল আয়োজন সম্পন্ন হয়, তখন এর ব্যাপকতাও বেশি হয়। আমরা এই আয়োজন নিয়ে কোনো নেতিবাচক কিছু করিনি। গত তিনবার সবার সহযোগিতায় সফলভাবে অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে পেরেছি। আশা করছি এবারও পারব।

পিপ- এবারের আয়োজন নিয়ে আপনার চাওয়া কী?

অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু- গতবারের আয়োজনে যে ভুলত্রুটি হয়েছিল, এবার যেন সেই ভুলগুলো কাটিয়ে উঠে দর্শকদের সুষ্ঠু আর সুন্দর একটি অনুষ্ঠান উপহার দিতে পারি। আমি আশা করছি, দর্শকরা খুব শান্তিপূর্ণভাবে এ আয়োজনে অংশ নেবেন। দেশ-বিদেশের শিল্পীদের লোকগান শুনবেন। বাংলাদেশের আরেকটি সাফল্য যেন তুলে ধরতে পারি, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। আগামীবারের আয়োজনটি আরও বড় করে করার পরিকল্পনা করছি।

পিপ- আপনি দেশের সংস্কৃতির উন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে থাকেন। আগামীতে আপনার পরিকল্পনা কী?

অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু- দেখুন প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই কিন্তু আমি চিন্তা করি না যে সংস্কৃতির জন্য কী করব, কী করব না। এই চিন্তাভাবনা আপনা-আপনি আসে। একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, সেটি ধরে এগিয়ে যাই। ফোক ফেস্টের এত বড় আয়োজনের সূত্রপাত হয়েছিল আমাদের মাছরাঙা টিভির রিয়েলিটি শো ‘ম্যাজিক বাউলিয়ানা’ থেকে।

একটি আইডিয়া থেকে নতুন আরেকটি আইডিয়ায় রূপান্তর হয়। পাবনায় ‘বনমালি’ নামের একটি পুরনো ইনস্টিটিউট আছে। আমি দেখেছি ছোটবেলায় আমার বাবা-মা সেখানে গিয়ে নাটক দেখতেন, গান শুনতেন। এই প্রতিষ্ঠানটি এখন সুন্দরভাবে চলছে। প্রতি মাসে অনুষ্ঠান হচ্ছে।
এখানে যেসব নাট্যদল রয়েছে তাদের নাটক নির্মাণ করতে কোনো স্পন্সর লাগে না। ‘বনমালি’ থেকে আমরাই স্পন্সর করি। বনমালি ইন্সটিটিউট নাম বদলে এখন দেওয়া হয়েছে বনমালি শিল্পকলা কেন্দ্র। পাবনার বেশকিছু সংস্কৃতমনা মানুষ এখানে সব সময় সহযোগিতা করেন।

পিপ- আপনার পিতা স্যামসন এইচ চৌধুরী ছিলেন আপনার পথপ্রদর্শক ও শিক্ষক। বাবাকে কতটা মিস করেন?

অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু- বাবাকে খুব মিস করি। আমি আজকে যে পর্যায়ে এসেছি এর সবটাই বাবা আর মায়ের কৃতিত্ব। আমাদের নিজস্ব কোনো কৃতিত্ব নেই। আমি আমার সন্তানদের বলি- আমার মাত্র কয়টা শার্ট ছিল। খেলনা ছিল দুইটা। কিন্তু কখনও কোনো কিছুর অভাব বোধ করিনি।

বাবা-মা দু’জনই ছিলেন সংস্কৃতিমনা। বাসায় রেডিও ছিল। টেপ রেকর্ডার প্রথম আমার বাবাই পাবনায় নিয়ে এসেছিলেন। বাবা গান শুনতেন। তার গানের সংগ্রহ ছিল ব্যাপক। ‘বনমালি’র কথা বললাম- বাবার প্রেরণায় আমরা সবাই মিলে সেটি আধুনিকায়ন করার উদ্যোগ নেই।

পিপ- ছোটবেলায় সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণেই কি মাটির গানের প্রতি আগ্রহী হওয়ার…

অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু- অনেকটা তেমনই। আমার জন্ম পাবনা জেলায়। পাবনার পার্শ্ববর্তী জেলা কুষ্টিয়া। মাঝে পদ্মা নদী। প্রায়ই নদী পেরিয়ে কুষ্টিয়ায় গিয়ে শুনতাম কিংবদন্তি বাউল লালন সাঁইয়ের গান। সেই থেকে হৃদয়ে গেঁথে আছে বাউল গানের কথা ও সুর। লালনের গানের বাণী যতটা ভাবিয়ে তুলত, ততটাই মুগ্ধ হতাম ভাটিয়ালি ও ভাওয়াইয়া শুনে।
আব্বাসউদ্দীন, আবদুল আলীমের পরিবেশনা আজও স্মৃতিতে অম্লান।

পিপ- এর আগে বলেছিলেন, এমন আয়োজন আপনি আপনার নিজের জেলা পাবনায় করতে চান…

অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু- এখনও করতে চাই। কিন্তু পাবনায় এমন একটি আয়োজন করতে গেলে যে লজিস্টিক সাপোর্ট প্রয়োজন, তা এখনও আমাদের কাছে নেই। পাবনায় পর্যাপ্ত পরিমাণের ভালো হোটেল নেই, যেখানে আমি বিদেশি শিল্পীদের রাখতে পারব। মাঝে মাঝে মনে হয় বড় আয়োজনে না হলেও একটু ছোট আয়োজনে করব। এখন পাবনার অনেক উন্নয়ন হচ্ছে।

পিপ- অনেকেই বলেন অনুষ্ঠানটি কি সারারাত করা যেত না?

অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু- সার্বিক পরিস্থিতির কথা চিন্তা করেই অনুষ্ঠানটি মধ্যরাত পর্যন্ত করার পরিকল্পনা করেছি। দর্শক-শ্রোতারা সবসময়ই চান সারারাত গান চলুক। কিন্তু আমাদের দর্শকের নিরাপত্তার কথাটাও তো চিন্তা করতে হবে। যে কারণে আমরা সবার নিরাপত্তার স্বার্থে সবকিছু সাজিয়ে-গুছিয়ে করছি। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই চেষ্টা করব, যাতে করে সব শিল্পীর গান দর্শক-শ্রোতারা আনন্দ নিয়ে শুনতে পারেন।

পিপ- এই আয়োজনে অংশ নেওয়ার জন্য অনেকেই চেষ্টা করে রেজিস্ট্রেশন করতে পারেননি…

অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু- গত বছরও নভেম্বর মাসে ঢাকায় অনেক আয়োজন হয়েছে। কিন্তু এবার একটাই। বরাবরের মতো এবারও আমাদের অনুষ্ঠানের রেজিস্ট্রেশন করাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়েছে। এবার আমাদের নিজস্ব ওয়েবসাইট, গ্রামীণফোনের অ্যাপস আর সহজ ডটকম থেকে রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। এত বেশি দর্শকের চাপ ছিল রেজিস্ট্রেশনের জন্য, যা বলার নয়। যে কারণে একটা নির্দিষ্ট সময়ে সাইটটি ওপেন করা হতো। আর এটা করা হয়েছে এই কারণে যে, আর্মি স্টেডিয়ামের একটা ধারণক্ষমতা আছে। একসঙ্গে ২০-২৫ হাজার দর্শক নিরাপত্তার সঙ্গে অনুষ্ঠান দেখতে পারেন। তবে যারা রেজিস্ট্রেশন করতে পারেননি, তারাও আমাদের এই আয়োজন দেখতে পারবেন গ্রামীণফোনের বায়োস্কোপ ও মাছরাঙা টিভিতে।

পিপ- পৃথিবীর অনেক দেশের লোকসঙ্গীত আপনি শুনেছেন। সবচেয়ে ভালো লেগেছে কোন দেশের?

অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু- আমার দেশের। পৃথিবীর নানা দেশের গান শুনলেও আমার দেশের গানের ধারে-কাছে তারা নেই। কারণ আমাদের গানে আছে এক অদ্ভুত মায়া। আমার জীবনটাই শুরু হয়েছে লালন দিয়ে।

 

 

  • 4.5K
    Shares


বিজয় নিশান উড়ছে ঐ…

© All rights reserved 2018 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!