বৃহস্পতিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০১৯, ০৪:৪০ অপরাহ্ন

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ইতিহাসের গৌরদীপ্ত অধ্যায়

 

।। এবাদত আলী।।

১৯৪৭ সালের ২৩ মার্চ বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক লাহোরে অনুষ্ঠিত এক কাউন্সিল অধিবেশনে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উপস্থাপন করেন।

লাহোর প্রস্তাবের পটভূমিকায় ভইসরয়/গভর্নর জেনারেল লিনলিথগো ঐ বছরের আগষ্ট মাসে নিরপেক্ষ নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ভারতের শাসনতন্ত্রভার ভারতীয়দের নিকট হস্তান্তরের লক্ষে গভর্নর জেনারেলের প্রশাসনিক পরিষদ সম্প্রসারনের প্রস্তাব দেন।

১৯৪৬ সালের ২৮ জুলাই বোম্বের কাউন্সিল অধিবেষনে মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ পূর্ণ স্বাধীনতার লক্ষে ডাইরেক্ট এ্যাকশন দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। ফলে কলকাতাসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে রক্তক্ষয়ি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। আগষ্টের ১৫ থেকে ১৮ তারিখ পর্যন্ত চলতে থাকে এই জঘন্য ধংসলীলা।

এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পিছনে ধর্মান্ধ প্রতিক্রিয়াশীল ভারতীয় ছাড়াও সাম্রাজ্যবাদের ইন্ধন ছিলো বলে অনেকেই মত পোষন করেছেন। সেপ্টেম্বর মাসে সাম্প্রদায়িকতার কবল থেকে ভারতকে বাঁচাবার আন্তরিক প্রচেষ্টা গ্রহন করেন তৎকালীন ভাইসরয় লর্ডওয়াভেল।
লর্ড ওয়াভেল বদলী হয়ে গেলে তদস্থলে বৃটিশ রাজ পরিবারের সদস্য লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন যোগদান করেন।

১৯৪০ সালের ৩ জুন লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া চুড়ান্ত করতে দিল্লী আসেন। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট ও ১৫ আগষ্ট “ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্ট এ্যাক্ট” আইনের বলে দ্বি-জাতি তত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে কমনওয়েলথ ভুক্ত দুটি দেশ জন্মলাভ করে। কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও কায়েদে মিল্লাত লিয়াকত আলী খান এবং লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন ও পন্ডিত জওহারলাল নেহেরু যথাক্রমে ভারত ও পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল ও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহন করেন।

দীর্ঘ অবাধ শোষন, নির্মম নির্যাতন ও শত শহীদের আত্মত্যাগের ইতিহাস সামনে রেখে পাকিস্তানের দুটি প্রদেশের আর্থ সামাজিক সাংস্কৃতিক অগ্রগতির জন্য দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হলেও জিন্নাহ সরকার পুর্ব পাকিস্তানের মানুষের মাতৃভাষা বাংলার ওপর প্রথম আঘাত হানে।

১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দানে এক বিশাল জনসভায় উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন। এ হেন একতরফা অযৌক্তিক ঘোষণায় হতবিহ্বল হয়ে পড়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষি মানুষ।

পাকিস্তান নামের মোহচ্ছন্নতার আবেশে এ কোন ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার হতে থাকে। চরম গণঅসন্তোষের সময় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর করাচিতে ইন্তেকাল করেন।

পরবর্তীকালে ১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান আততায়ীর হাতে নিহত হবার পর খাজা নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। তিনি ১৯৫২ সালের ৩০ জানুয়ারি তারিখে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষট্রভাষা করার ঘোষণা দেন।

এ সময় পূর্ব-পাকিস্তানের ছাত্র ও রাজনীতি সচেতন যুবসমাজ সোচ্চার হয়ে ওঠে। মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষে জগন্নাথ হলে প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশনে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টির ব্যাপারে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে রাষ্ট্রভাষা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়। অবস্থা আঁচ করতে পেরে প্রাদেশিক সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে।
এ দিন ঘটে যায় রক্তক্ষয়ী ও নজিরবিহীন হৃদয়বিদারক ঘটনা। সালাম, জব্বার, রফিক, বরকতের রক্তে রঞ্জিত আল্পনায় ভর করে এগিয়ে আসে শায়ত্বশাসনের আন্দোলন।

এদিকে জিন্নাহ সাহেবের জীবদ্দশাতেই পুর্ব-বাংলার জনগণ কেন্দ্রিয় নেতৃত্বের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে পড়ায় পাকিস্তানি নেতেৃত্বের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হোসেন শহীদ সহরাওয়ার্দী কর্তৃক মওলানা ভাসানী, শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোস্তাক প্রভৃতিকে নিয়ে আওয়ামী লীগ গঠন করা হয়।

শৈরাচারী মুসলিম লীগকে রাজনৈতিক জবাব দিতে কুটকৌশলবিদ সোহরাওয়ার্দী সাহেব কৃষক প্রজাপার্টির শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকসহ কয়েকজন নেতৃবৃন্দকে সাথে নেন। যুক্তফ্রন্ট গঠন করা হয়।

পূর্ব-বাংলার স্বার্থ রক্ষার্থে এবং পাকিস্তানের উভয় অংশের মাঝে সম্পর্ক উন্নয়নে যুক্তফ্রন্টের সময়োচিত পদক্ষেপের ফলে হক-ভাসানী সোহরাওয়ার্দীর অকল্পনীয় বিজয় সূচিত হয়। মুসলিম লীগের শিকড় সমূলে উৎপাটিত হয়।

পাকিস্তানের শোষণ বঞ্চনার বেড়াজাল ছিন্ন করে যুক্তফ্রন্টের প্রাদেশিক সরকার যখন পূর্ব-বাংলার গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়তে সচেষ্ট ঠিক তখুনি কেদ্রের পরোক্ষ ষড়যন্ত্রে হিংসাত্মক ও রক্তক্ষয়ি দাঙ্গা শুরু হয় বিশ্বের বৃহত্তম শিল্পকারখানা আদমজি জুটমিলে।

বাঙালি বিহারি দাঙ্গার রূপ দিয়ে কেন্দ্রিয় সরকার অত্যন্ত অন্যায়ভাবে বাতিল করে পুর্ব বাংলার প্রাদেশিক সরকার। ১৯৫৪ সালের ২৯ মে ৯২,ক ধারার ছত্রছায়ায় প্রতিরক্ষা সচিব ইস্কান্দার মির্জাকে পুর্ব-বাংলার গভর্ণর নিয়োগ করা হয়। দীর্ঘ দিনের সুযোগ সন্ধানি নেপথ্যের নায়ক জেনারেল আইয়ূব খান ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর ইস্কান্দার মির্জাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং পরে প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হন।

আইয়ূব খানের ক্ষমতার পথ নিষ্কন্টক রাখতে প্রথমেই নজরে পড়ে আওয়ামী লীগের মুল নেতা হোসেন শহীদ সহরওয়ার্দীর উপর। তারপর একে একে গ্রেফতার করা হয় হামিদুল হক চৌধুরী, আবুল মনসুর আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, আবদুল হামিদ চৌধুরী ও কোরবান আলীকে। ১২ অক্টোবর গোপালগঞ্জ হতে গ্রেফতার করা হয় শেখ মুজিবকে।

এর পরের ইতিহাস বাঙালি জাতির উপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠির নির্মম অত্যাচার নিপিড়নের ইতিহাস আর অন্য দিকে বীরত্বপূর্ণ আন্দোলনের ইতিহাস।

১৯৬২ সালে দেশের শিক্ষামানকে ধ্বংস করার লক্ষে কুখ্যাত হামিদুর রহমান রিপোর্ট বাঙালি জাতির উপর চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চালানো হয়। সচেতন ছাত্রসমাজ ও জনতা এর বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে।

ওয়াজি উল্লাহ্, বাবুল, মোস্তফাসহ বহু রক্ত ঝরে, বহু ছাত্রনেতা অন্তরীণ হন। আন্দালন স্তব্ধ করার জন্য আইয়ুব শাহী গ্রেফতার করেন সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবসহ বহু রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে। কিছুদিন পর সোহরাওয়ার্দী মুক্তিলাভ করেন। তত দিনে তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছে। তিনি চিকিৎসার জন্য বৈরুতে গেলে ১৯৬৩ সালে সেখানেই তিনি ইন্তেকাল করেন।

তার আগে শেরে বাংলা মৃত্যুবরণ করলে আওয়ামী লীগের সামগ্রিক দায়িত্ব এসে পড়ে শেখ মুজিবের ওপর। ফলে আইয়ূবের উৎকন্ঠা আরো বেড়ে যায়। আইয়ূব-মোনেমের ষড়যন্ত্রের থাবা নতুন করে বিস্তার লাভ করে। আইয়ূব মোনেম ও তার দোসররা প্রগতিশীল শক্তিকে ভারতীয় চর ও দালাল বলে আখ্যায়িত করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপপ্রয়াসে লিপ্ত হয়।

নতুন কুটকৌশলে ১৯৬৪ সালে পুর্ব পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়ে দেওয়া হয়। একই ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় ১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পাক-ভারত যুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়া হয়। ১৭ দিনের যুদ্ধে বাঙালিদের কাছে দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, শৈরশাসন দীর্ঘায়িত করার একটি কুটকৌশল মাত্র।

১৯৬৬ সালের প্রথম দিকে আইয়ুব খান রাওয়ালপিন্ডিতে গোলটেবিল বৈঠক ডাকেন। তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তান থেকে মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিব, নুরুল আমিন, মাহমুদ আলীসহ বহু নেতা সে বৈঠকে যোগদান করেন। বৈঠকে বাঙালি জাতির পক্ষে শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা কর্মসূচি পেশ করেন।

পুর্ব পাকিস্তানের কোন নেতাই তা সমর্থন করেন নি। শেখ মুজিব গোলটেবিল বৈঠক থেকে ঢাকায় ফিরে এলেন এবং বিমান বন্দরে অপেক্ষমান সাংবাদিকদের বলেন বাঙালি জাতির মুক্তি সনদ হচ্ছে ৬ দফা। তিনি ৬ দফা কর্মসুচি নিয়ে আন্দোলনের ডাক দিলেন। পুর্ব পাকিস্তানের নামি দামি নেতারা এর বিরোধিতা শুরু করে দিলেন।

অপর দিকে শাসকগোষ্ঠি জনগণের ওপর ষ্টিম রোলার অব্যাহত রাখলো। বাংলার জনগণ ৬ দফার মধ্যে মুক্তির পথ খুঁজে পেলেন। শেখ মুজিব যেখানেই সভা করতে যান সেখানেই স্বতস্ফুর্ত জনতার ঢল নামে। ৬ দফার পক্ষে জনগণের ব্যাপক সাড়া দেখে শাসকগেষ্ঠি ভীত হয়ে পড়ে। ১৯৬৬ সালের ৮ মে শেখ মুজিবকে প্রতিরক্ষা আইনে গ্রেফতার করা হলো।

আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য সারা দেশের ৩০ হাজার নেতা-কর্মিকে গ্রেফতার করা হলো। এর প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ এককভাবে ৭ জুন তারিখে হরতালের ডাক দিলে মনুমিয়াসহ ১১ জন আইয়ূব মোনেম শাহী পুলিশের গুলিতে নিহত হলেন। ১৯৬৮ সালে সেনাবাহিনীর কিছু সদস্যকে জড়িয়ে শেখ মুজিবকে এক নম্বর আসামি করে আগরতলা মিথ্যা মামলা দায়ের করা হলো।

বিচারের নামে শুরু হলো প্রহসন। ১৯৬৯ সালে সর্বদলীয় ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হলো। ছাত্ররা ৬ দফাকে অন্তর্ভূক্ত করে ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা দিয়ে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়লো। ‘৬৯ এর ২০ জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে নিহত হন ছাত্রনেতা আসাদ। আপামর ছাত্র-জনতা বাঁধভাঙা জোয়ারের মত রাস্তায় নেমে পড়লো। ছাত্র-জনতার মুখে স্লেগানে স্লোগানে তখন সারা দেশ প্রকম্পিত। আন্দোলনের আগ্নেয়গিরিতে রূপান্তরিত সেই সময়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন নবকুমার ইনস্টিটিউটের মতিউর সহ অনেকে।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে ১৯৬৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি অবস্থায় গুলি করা হলো। বিক্ষুব্ধ জনতা কয়েকজন মন্ত্রির বাড়িসহ আগরতলা মামলার ট্রাইব্যুনালের বিচারক জাষ্টিস এস এ রহমানের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিলো। পুলিশের গুলিতে নিহত হলেন অনেক ছাত্র-জনতা।

সান্ধ্য আইন জারি করা হলে ছাত্র-জনতা তা ভঙ্গ করে রাস্তায় নেমে পড়ে। অগত্যা ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্র্রয়ারি ছাত্র-জনতার বিজয় সুচিত হয়। আইয়ূব সরকার নিরুপায় হয়ে শেখ মুজিবসহ মিথ্যা মামলায় জড়ানো অন্যান্যদেরকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের নাগরিক সংবর্ধনা প্রদানের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভুষিত করা হয়।

১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একক বিজয় অর্জিত হয়। কিন্তু সরকার গঠনের সুযোগ না দিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৩ মার্চ থেকে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলনের আহ্বান জানান।

তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে সারা দেশ অচল হয়ে পড়ে। তিনি ৭ মার্চ ঢাকা রমনা রেসকোর্স ময়দানে এক ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতার ডাক দেন। তিনি লাখো জনতার উপস্থিতিতে বজ্রকন্ঠে উচ্চারণ করেন“ এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনী বাঙালি নিধনের যে নীল নকশা তৈরি করেছিলো তার নাম ছিলো অপারেশন সার্চ লাইট । পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই নীল নকশার অধীনেই ২৫ মার্চের মধ্যরাতে ঢাকাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহর চট্রগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, যশোর, রংপুর , সৈয়দপুর , কুমিল্লায় একই সময় অপারেশন শুরু করে ।

নীল নকশার মুল নায়ক পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান অপারেশন সার্চ লাইট শুরুর আগে রাতের আঁধারে ঢাকা থেকে রাওয়ালপিন্ডি পালিয়ে যান। অপারেশনের মুল দায়িত্বে রেখে যান বেলুচিস্তানে ঈদের জামাতে মুসলমান হত্যাকারি কুখ্যাত লে. জেনারেল টিক্কা খানকে। পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক মধ্য রাতে ঘুমন্ত নিরস্ত্র নিরপরাধ বাঙালিদেরকে নির্বিচারে হত্যা করা হয় ।

একটি বিশেষ গ্রুপের (কমান্ড ) এক প্লাটুন সৈন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ৩২ নম্বর সড়কের বাড়ি আক্রমণ করে । ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবন আক্রান্ত হওয়ার আগে আগত সহকর্মি ও দেশবাসীর উদ্দেশ্যে তিনি ঘোষণা করেন ‘‘ আজ থেকে (২৬ মার্চ )বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র । একে এখন যে করেই হোক রক্ষা করতে হবে ।’’ রাত ১২-২০ মিনিটে তিনি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলেন ।

ঢাকা বেতার ততক্ষনে পাকিস্তানি বাহিনীর দখলে চলে যাওয়ায় বলধা গার্ডেনে রক্ষিত ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু তার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি চট্রগ্রাম বেতার কেন্দ্রে পৌঁছে দিতে সক্ষম হন ।

ঘোষণাপত্রটি ছিলো ইংরাজী ভাষায় লিপিবদ্ধ। ২৬ মার্চ তারিখে চট্রগ্রাম বেতার কেন্দ্রের কয়েকজন কর্মকর্তা তা বাংলায় অনুবাদ করেন এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এমএ হান্নান শেখ মুজিবের স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রটি প্রথম মাইকিং করে প্রচার করেন।

পরে ২৭ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বাঙালি অফিসার মেজর জিয়াউর রহমান চট্রগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবের পক্ষে তা প্রচার করেন। এদিকেরাত ১-২০ মিনিটের দিকে বঙ্গবন্ধুকে তার বাসভবন থেকে গ্রেফতার করা হয় । এর তিন দিন পর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় করাচিতে । ২৫ মার্চ রাতের বেলা বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালিদের উপর অতর্কিতে আক্রমণ করে বসে।

তারা নির্বিচারে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে। বাংলার অকুতভয় জনগণ তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। বাংলার দামাল ছেলেরা জীবন বাজি রেখে স্বেচ্ছায় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজেদের নাম লিপিবদ্ধ করিয়ে প্রতিবেশী বন্ধু রাষ্ট্র ভারত থেকে এবং স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষন গ্রহণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

কিন্তু বড়ই দুখ ও পরিতাপের বিষয় এদেশের কিছু ধর্মান্ধ ব্যক্তি ইসলাম ধর্মের দোহাই দিয়ে পূর্ব-পাকিস্তানকে রক্ষার নামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর হিসেবে তাদেরকে সর্বোতভাবে সাহায্য সহযোগিতা করতে থাকে। তারা রাজাকার, আলবদর, আল শামস বাহিনী গঠন করে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।

শুধু তাই নয় তারা এদেশের সাধারণ মানুষের ঘর-বাড়িতে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, নারী ধর্ষণ ও এদেশের বুদ্ধিজীবীসহ সকল স্তরের মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করতে থাকে। এক কথায় তারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পূর্ণ সাহায্য সহযোগিতা করতে থাকে।

এ দিকে মুক্তিযুদ্ধকে তরাম্বিত করার লক্ষ্যে ১০ এপ্রিল তারিখে কুষ্টিয়ার মেহেরপুরে মুজিব নগর সরকার গঠন করা হয় এবং ১৭ এপ্রিল এই মুজিব নগরে শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে গঠিত সরকারের শপথ গ্রহন অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ নয় মাস একটানা যুদ্ধ করে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সহায়তায় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন হয়।

৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর ২লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর উদিত হয় বাংলার স্বাধীনতার লাল সূর্য। বাংলাদেশের ইতিহাসে যা এক গৌরদীপ্ত অধ্যায়।

(লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।

 

 

  • 84
    Shares


© All rights reserved 2018 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!