বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ০২:০৭ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :

বিলুপ্তি প্রায় পানির উৎস্য ইঁদারা

 

এম এ হান্নান : লম্বা দড়িতে বালতি বা কঁলস বেধে ইঁদরা থেকে পানি তোলার চিত্র দেখা যায় না আর!

কালের আবর্তনে সময়ের পরিধিতে, বৈজ্ঞানিক যুগের আধুনিকতার স্পর্শে প্রাচীনকাল থেকে বিশুদ্ধ খাবার পানির প্রধান উৎস আবহমান গ্রাম বাংলার ঐহিত্যবাহী ‘ইঁদারা’বর্তমানে পুরোপুরি প্রায় বিলুপ্তি’র পথে!

অতীতকালে সরকারিভাবে সারকারি যায়গায় সারকারি অর্থায়নে রাজা বাদশা ও ধনাঢ্য ব্যাক্তি, সমাজসেবক ও ব্যাক্তি পর্যায়ে ‘ইঁদারা’নিমার্ণ করে দেওয়া হলেও সংস্কারের অভাবে ও নলকূপের প্রভাবে কালের আবর্তে তা হারিয়ে যেতে বসেছে দেশ থেকে।

প্রাচীনকাল থেকে দেশের বিশুদ্ধ খাবার পানির পুরোটাই ‘ইঁদারা’ থেকে যোগান দেওয়া হতো।

কিন্তু নলকূপ আবিস্কার ও ব্যবহারের প্রচলন শুরু হবার পর থেকেই ঐহিত্যবাহী সুপেয় পানির প্রধান উৎস ‘ইঁদারা’র কদর কালক্রমে কমতে কমতে প্রায় শূণ্যের কোঠায় নেমে এসেছে ।

শাহজাদপুরে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছারিবাড়িতে একটি, উপজেলার মণিরামপুর বাজারের মোক্ষদার মোড় সংলগ্ন শারমিন ইলেকট্রনিক্স ও পশ্চিমের দোকানের অভ্যন্তরীণ জায়গায় একটি ,বটেশ্বর মিষ্টির দোকান সংলগ্ন এলাকায় একটি এবং স্থানীয় সাব-রেজিট্রি অফিসের অভ্যন্তরে একটি হারিয়ে যাওয়া একটি ‘ইঁদারা’ই প্রাচীনকালে সুপেয় বিশুদ্ধ পানির প্রধান উৎস হিসেবে এলাকায় বহুল ব্যবহৃত হতো বলে ইতিহাস আজও স্বাক্ষ্য দেয়।

জানা গেছে, প্রাচীনকালে মানুষ যখন ডোবা ও নদীর অপরিশুদ্ধ পানি পান করতো তখনকার বিজ্ঞানীরা অনেক গবেষণাকার্য সম্পন্ন করার পর গভীর ইঁদারার প্রচলন শুরু হয় ।

জমিদাররা ‘ইঁদারা’ থেকে প্রাপ্ত পানিকে আরও পরিশুদ্ধ করতে ‘ইঁদারা’র মধ্যে পাইপ লাগিয়ে পানি উত্তোলন করতো।

পর্যায়ক্রমে মানুষ যখন সভ্য, সুশিক্ষিত ও জ্ঞান বিজ্ঞানে সমৃদ্ধশালী হলো তখন নলকূপের সৃষ্টি হলো।

ভাষা বিশারদগণের মতে, সংস্কৃত ইন্দ্রাগার শব্দটি ইন্দ্র ও আগার থেকে এসেছে। ইন্দ্র অর্থ বৃহৎ এবং আগার অর্থ পাত্র অর্থাৎ ইন্দ্রাগার শব্দের অর্থ হলো বৃহৎ কূপ।

ওই সংস্কৃত শব্দ ইন্দ্রাগার পরিবর্তিত হয়ে ‘ইঁন্দারা’য় এবং আরও পরে পরিবর্তিত হয়ে ‘ইঁদারা’ নাম ধারণ করে ।

ধারনা করা হয়, এ অঞ্চলে নবাবী ও সুলতানী আমল থেকে পরিশুদ্ধ পানির প্রধান উৎস হিসাবে ‘ইঁদারা’র প্রচলন শুরু হয়।

ওই সময়ের নবাব বা শাষকগন রাস্তার ধারে, বাজার এলাকায় বা কোন প্রতিষ্ঠান অথবা জজনবসতিপূর্ণ এলাকায় সরকারি অর্থায়নে খাবার পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে ‘ইঁদারা’ স্থাপন করেছিলেন ।

শাহজাদপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ আজাদ রহমান ও বগুড়া আজিজুল হক কলেজের বাংলা বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান বিশিষ্ট রবীন্দ্র গবেষক প্রফেসর নাছিম উদ্দিন মালিথা জানান, ‘অতীত কালের অসভ্য সমাজ ব্যবস্থা কালক্রমে সভ্যতায় রূপ নেয়ায় জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রসারে ডোবা বা নদীর পানি পান না করে কূপ খনন করে ‘ইঁদারা’র জন্ম দেওয়া হলেছিল বলেই ধারনা করা হয়।

তৎকালীন বৃহত্তর পাবনা (পাবনা+সিরাজগঞ্জ) জেলা পরিষদে প্রায় ২২ বছর কর্মরত চেয়ারম্যান শাহজাদপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি হুসেইন শহীদ মাহমুদ গ্যাদনের পিতা আব্দুর রশিদ মাহমুদ ওরফে সকিম উদ্দিন (সকিম উদ্দিন নামটি এভিডেভিটের মাধ্যমে আব্দুর রশিদ মাহমুদ পরিবর্তন করেছিলেন) সরকারি জায়গায় ও সরকারি অর্থায়নে শাহজাদপুর বাসীর জন্য সুপেয় বিশুদ্ধ পানির যোগান নিশ্চিত করতে শাহজাদপুর উপজেলার মণিরামপুর বাজারের মোক্ষদার মোড় সংলগ্ন শারমিন ইলেকট্রনিক্সের ভেতরে ১টি, বটেশ্বর মিষ্টির দোকান সংলগ্ন এলাকায় ১টি ও স্থানীয় সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসে একটি ‘ইঁদারা’ নির্মাণ করেছিলেন।

ওই সময় শাহজাদপুর পৌরসদরসহ থেকে দুর-দুরান্ত থেকে লোকজন এসে এসব ‘ইঁদারা’থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতো।’

ওই ‘ইঁদারা’গুলি কালের চক্রে ও সময়ের পরিধিতে বর্তমানে পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। আধুনিক যুগে বিজ্ঞানভিত্তিক নলকূপের ব্যাপক ব্যাবহার ও প্রচলন শুরু হওয়ায় শুধু ওইসব ‘ইঁদারা’ই নয়,শাহজাদপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তৈরি করা ‘ইঁদারা’ কালের আবর্তে সময়ের বিবর্তনে পুরোপুরি প্রায় হারিয়ে গেছে দেশ থেকে।

আর স্মৃতি হিসেবে এখনও দু’একটি ইঁদারা কালেভাদ্রে দেখা মিললেও তাও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বা মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। ফলে বিলুপ্তি প্রায় পানির উৎস্য ‘ইঁদারা’।

 

 


© All rights reserved 2018 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!