শুক্রবার, ১৭ অগাস্ট ২০১৮, ০৭:০২ অপরাহ্ন

বিশ্ব আদিবাসী দিবস আজ- হাতের পাঁচ কৃষিকাজও হাতছাড়া চলনবিলে

কলের লাঙল এসেছে। মেশিন দিয়ে ধান নিড়ানি হচ্ছে, মাড়াই করা হচ্ছে। কৃষিকাজে তাই তাদের প্রয়োজন ফুরিয়ে আসছে। সে কারণে এখন ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালাতে শুরু করেছেন ৩০ বছরের কমলেশ মাহাতো। চলনবিলের তাড়াশের বোয়াইল গ্রামের এই কৃষক জানান, কৃষিক্ষেত্রে যতই আধুনিক প্রযুক্তি আসছে, ততই ছিটকে পড়ছেন তার মতো সমতলের সব আদিবাসী। অথচ ভূমি সমতল অঞ্চল হওয়ায় আর বিল এলাকা ও বনজঙ্গল কমে আসায় কৃষিকাজই তাদের শেষ সম্বল। এই হাতের পাঁচও হাতছাড়া হতে চলেছে আধুনিক কৃষি উপকরণের কারণে।

এমনই এক পরিস্থিতির মধ্যে উদযাপিত হতে চলেছে আজ ৯ আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবস। ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতি বছর জাতিসংঘ ঘোষিত এ দিবস উদযাপিত হয়ে আসছে। বিশ্বজুড়ে আদিবাসীরা এ দিনকে ঘিরে উদ্দীপ্ত থাকলেও বাংলাদেশের পরিস্থিতি বেশ আলাদা। তাড়াশের দত্তবাড়ী গ্রামের কলেজ প্রভাষক প্রদীপ মাহাতো সমকালকে বললেন, আগে আদিবাসী দিবস এলে তাদের বেশ খোঁজখবর নেওয়া হতো। কয়েক বছর ধরে এখানে এ দিবসটিও আর ঘটা করে পালন করা হয় না। চলনবিলের সমতল এলাকার কৃষি শ্রমিকরা মূলত বিত্তশালী ভূস্বামীদের কৃষিকাজ করে থাকেন, যাদের মধ্যে সিংহভাগ এই আদিবাসী। ‘শস্যের ভাণ্ডার’ বলতেই একসময় চোখের সামনে ভেসে উঠত চলনবিলের ছবি। অবারিত এ অঞ্চলের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো- এখানকার বিভিন্ন বসতভূমে বাস করে আদিবাসী সম্প্রদায়। তবে নানা প্রতিকূলতায় তাদের সংখ্যা ক্রমেই কমে আসছে। এর পরও চলনবিল সংলগ্ন সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় এখনও বাস করছে ১৪-১৫টি সম্প্রদায়ের কমপক্ষে ৪৫ থেকে ৪৭ হাজার আদিবাসী। ওঁরাও, মাহাতো, সাঁওতাল, মুড়ারী, রবিদাস, কনকদাস, সিং, তেলী, তুড়ি, বরাইক ইত্যাদি গোত্রভুক্ত তারা। ৮০-৯০ শতাংশ আদিবাসীই ভূমিহীন। তাই জন খেটে কিংবা কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয় তাদের। পরিশ্রমী এবং প্রতিকূল কাজেও পিছপা হন না বলে আদিবাসী কৃষকদের বেশ চাহিদাও ছিল অতীতে। গৃহস্থ বাড়িতে বার্ষিক অর্থচুক্তিতে তাদের নিয়োগ করা হতো।

এখন সময় পাল্টেছে। কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। সমতলের কৃষিনির্ভর এই আদিবাসীরাও পড়েছেন অসুবিধায়। তাদের স্থান দখল করে নিচ্ছে আধুনিক কৃষি উপকরণ। শুধু কৃষি শ্রমিকের কাজ করে আর জীবন নির্বাহ করতে পারছেন না তারা। কেননা বিত্তশালী কৃষকরা আর তাদের প্রয়োজন অনুভব করছেন না। লালুয়া মাঝিড়া গ্রামের বিত্তশালী কৃষক আইয়ুব হোসেন দুদু (৪৭) জানালেন, বাপ-দাদার আমল থেকেই তাদের বাড়িতে আদিবাসী কৃষি শ্রমিক বছরে ৮-১০ মাস লাগাতার কাজ করতেন। এই কৃষি শ্রমিকরাই বীজতলা তৈরি করতেন, শস্য উৎপাদন ও পরিচর্যা থেকে শুরু করে গৃহপালিত গবাদিপশুও পালন করতেন। তিনি জানান, বর্তমানে আবাদি জমির সংখ্যা বাড়লেও আধুনিক পদ্ধতি ও উপকরণ ব্যবহারের কারণে কৃষি শ্রমিকের প্রয়োজন ক্রমেই ফুরাচ্ছে। ফলে চলনবিলের কর্মঠ আদিবাসী নারী-পুরুষ কৃষি শ্রমিকরাও বেকার হয়ে পড়ছেন।

গুড়পিপুল গ্রামের আদিবাসী কৃষি শ্রমিক অরুণ চন্দ্র বড়াইক বললেন, এমনিতেই আদিবাসীদের নিজস্ব জমিজমা নেই। এখন কৃষি শ্রমিক হিসেবেও তাদের প্রয়োজন ফুরাচ্ছে। এ কারণে বেকারত্ব ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে তাদের ভেতর। বেকারত্বের ধাক্কায় অনেকেই বিকল্প কর্মসংস্থানের পথে পা বাড়াচ্ছেন। এমনকি যেসব আদিবাসী ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করতেন, তারাও এখন বেকার হয়ে পড়ছেন। বিকল্প কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রও তাদের সীমিত। সরকারি চাকরির কোটা সুবিধা সমতলের আদিবাসীদের কপালে তেমন জোটে না বলে মনে করেন স্থানীয় ওঁরাও ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক যোগেন্দ্র নাথ টপ্প্য। তিনি অভিযোগ করেন, কোটা সুবিধার সুযোগ মূলত পাহাড়ি আদিবাসীরাই পেয়ে থাকেন। পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের জন্য সরকারি চাকরিতে পৃথক কোটা সুবিধার দাবি জানান তিনি।

শিক্ষার্থী শীলা রানী মাহাতো জানালেন, সরকারি গেজেটে আদিবাসীদের সব গোষ্ঠীর নাম না থাকায় আদিবাসী হিসেবে অনেক সম্প্রদায়ের সদস্যকেই প্রশাসন প্রত্যয়ন সনদ দিতে চায় না। এ কারণে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আদিবাসী কোটায় তারা ভর্তি হতে পারছেন না। এতে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও তারা পিছিয়ে পড়ছেন। অনেকে প্রতিকূলতা পেরিয়ে উচ্চশিক্ষা নিলেও চাকরি ক্ষেত্রে কোটা সুবিধা নিতে পারছেন না।

সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, রায়গঞ্জ ও উল্লাপাড়া, নাটোরের বড়াইগ্রাম ও সিংড়া, পাবনার চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়ার অনেক এলাকাজুড়ে বিস্তৃত চলনবিল। এক অর্থে, চলনবিল ও আদিবাসীদের ইতিহাস পরস্পরবিজড়িত। জনশ্রুতি রয়েছে, মোগল আমলে বিশেষত পূর্ববঙ্গে জমিদারি শাসন পরিচালনার সময় বিভিন্ন জমিদারি এলাকায় বন-জঙ্গল কেটে বসতভূমি, ফসলি জমি ও পথঘাট তৈরি করতে গিয়ে সাহসী এই আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোকে কাজে লাগানো শুরু হয়। পূর্ববঙ্গে রেললাইন তৈরির সময়ও তাদের কাজে লাগানো হয়।

সিরাজগঞ্জে আদিবাসীদের বাসভূমি মূলত জেলা সদর থেকে ৪০ কিলোমিটার পশ্চিম-উত্তর কোণের তাড়াশ ও রায়গঞ্জ উপজেলায়। তাড়াশ উপজেলার আটটি ইউনিয়নের দেশীগ্রাম, তালম, নওগাঁ, মাধাইনগর, বারুহাঁস, তাড়াশ সদর ও মাগুরা বিনোদ গ্রামে এবং রায়গঞ্জ উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের সোনাখাড়া, ধুবিল, ধামাইনগরসহ চলনবিলের বিভিন্ন গ্রামে তারা বসবাস করেন।

আদিবাসীদের দারিদ্র্যকে পুঁজি করে তাদের ধর্মান্তকরণের প্রচেষ্টাও করে আসছে বিভিন্ন মহল। এ ধরনের ঘটনা তাড়াশ, বড়াইগ্রাম, সিংড়া ও রায়গঞ্জ উপজেলার আদিবাসী পল্লীগুলোতেই বেশি ঘটছে। সিরাজগঞ্জ জেলা আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সুশীল কুমার মাহাতো এ সম্পর্কে বলেন, ‘সহজ-সরল ও দরিদ্র আদিবাসীরা নানা সুযোগ-সুবিধার জন্য তাদের আদি ধর্ম ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।’

অভিযোগ রয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে মহাজন ও ক্ষুদ্র ঋণভিত্তিক এনজিওগুলোর দৌরাত্ম্যে অনেক আদিবাসী পরিবারই ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েছে। প্রসঙ্গত, তাড়াশ উপজেলার আদিবাসী বহুমুখী সমিতির সভাপতি বীরেন্দ্রনাথ বলেন, ‘চলনবিলের শত শত আদিবাসী পরিবার ভূমিসংক্রান্ত নানা সমস্যায় আক্রান্ত। গ্রাম্য এক শ্রেণির টাউট-বাটপার সব সময় আদিবাসীদের ঠকাতে তৎপর রয়েছে।’

সাম্প্রতিক সময়ে তাড়াশের আদিবাসী নারীদের বিভিন্ন অর্থনৈতিক উদ্যোগ অনেকেরই দৃষ্টি কেড়েছে। তাদের অনেকেই নিজেদের উদ্যোগে ঝুড়ি, টুকরি, ঝাড়ু, বিন্না ফুলের তৈরি বিশেষ ফুলঝাড়ূ বানিয়ে তা বিক্রি করছেন। অনেকে মাঠে ও ইটের ভাটায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

তাড়াশের আদিবাসীদের সমস্যা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম ফেরদৌস ইসলাম জানান, সরকার ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকল্পে বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। তারই ধারাবাহিকতায় তাড়াশ উপজেলার ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নেও বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে কাজ করা হচ্ছে।


© All rights reserved 2018 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!