মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:৫৯ অপরাহ্ন

ভাষা-আন্দোলনে ইডেন কলেজ

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করিলি রে বাঙ্গালী : পর্ব- ৩

।। ড. এম আবদুল আলীম।।



[‘ভাষা-আন্দোলন গবেষণাকেন্দ্র, গৌরীগ্রাম, পাবনা’-এর প্রধান নির্বাহী, গবেষক-প্রাবন্ধিক ড. এম আবদুল আলীম-এর ভাষা-আন্দোলন বিষয়ক ১০০ পর্বের ধারাবাহিক ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করিলি রে বাঙ্গালী’-এর আজ প্রকাশিত হলো তৃতীয় পর্ব : ‘ভাষা-আন্দোলনে ইডেন কলেজ’। ভাষা-আন্দোলনের অজানা সব অধ্যায় সম্পর্কে জানতে চোখ রাখুন ‘নিউজ পাবনা ডটকম’-এর পাতায়।]

রাজধানীর আজিমপুর এলাকায় অবস্থিত নারী শিক্ষার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। ১৮৭৩ সালে ঢাকার ফরাশগঞ্জে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ভাষা-আন্দোলনের সময় এ কলেজ ছিল ঢাকা শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নারীশিক্ষার প্রতিষ্ঠান। এখানে দূর-দূরান্ত থেকে মেয়েরা পড়তে আসতো। অরফানেজ রোডে ছিল এই কলেজের ছাত্রীনবাস, যেখানে ছাত্রীরা ভাষা-আন্দোলনের নানা সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতো। ইডেন কলেজের ছাত্রী ও শিক্ষকদের ভাষা-আন্দোলনে বিশেষ অবদান রয়েছে। নানা বাধা-বিপত্তি ও প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে এই কলেজের ছাত্রীরা যেমন ভাষা-আন্দোলনের মিছিল-সমাবেশে অংশগ্রহণ করেছে, তেমনি শহীদ মিনার নির্মাণ করে শহীদদের স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রেখেছে। ১৯৪৮ সালে ভাষা-আন্দোলনে এই কলেজের ছাত্রীরা প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে। আটচল্লিশের ভাষা-আন্দোলনের পর সরকার আরবি হরফে বাংলা প্রচলনের নানা উদ্যোগ গ্রহণ করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, উডেন কলেজ, জগন্নাথ কলেজসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ড. মোহাম্মদ হান্নান লিখেছেন : ‘শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, পূর্ববাংলার সর্বত্র এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। জগন্নাথ কলেজ ও ইডেন কলেজে প্রতিবাদে সভা অনুষ্ঠিত হয়। ইডেন কলেজে উর্দু প্রচারকার্যে বাধা দেওয়ায় অধ্যক্ষ দুজন ছাত্রী বহিষ্কারের হুমকি দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা এর প্রতিবাদে ও আরবি হরফ প্রচলনের বিরুদ্ধে একটি ভিন্ন সভায় তার নিন্দা করে।’

ড. এম আবদুল আলীম

বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনে এ কলেজের ছাত্রীরা প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করে। ভাষা-আন্দোলনের সময় ইডেন কলেজ ছাত্রী-সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন রওশন আরা বেগম। তিনি ভাষা-আন্দোলন সংঘটনে ভূমিকা রাখেন। এছাড়া লুৎফুন্নেসা বেগম, আমিরুন্নেসা বেগম কলেজ ছাত্রীনিবাসে থাকতেন এবং ছাত্রীদের সংগঠিত করতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হালিমা বেগমসহ অনেকেই এই ছাত্রীনিবাসে এসে ছাত্রীদের সঙ্গে ভাষা-আন্দোলন বিষয়ে শলাপরামর্শ করতেন। ইডেন কলেজের আরবির অধ্যাপক ও ছাত্রীনিবাসের সুপার হালিমা খাতুন এবং ইংরেজির অধ্যাপিকা আফিয়া খাতুন (আওয়ামী লীগ নেতা শামসুল হকের স্ত্রী) ভাষা-আন্দোলনের ব্যাপারে নমনীয় থাকায় ছাত্রীদের অন্দোলনে যুক্ত হতে সমস্যা হতো না। ১৯৫২ সালের ২৭শে জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন পল্টন ময়দানের জনসভায় উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে ইডেন কলেজের ছাত্রীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ৪ঠা ফেব্রুয়ারির ছাত্র ধর্মঘট আহ্বান করা হলে ইডেন কলেজের ছাত্রীরা ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে প্রচারপত্র বিলি করে জনসাধারণকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানায়। ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট পালনের জন্য ইডেন কলেজের ছাত্রীরা ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় মাঠে সমবেত হন এবং পোস্টার হাতে মিছিলে অংশ নেন। ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলার সমাবেশেও তাঁরা উপস্থিত হন। ঐ দিনের স্মৃতিচারণ করে শরিফা খাতুন লিখেছেন : ‘২১ তারিখ সকালে কয়েকজন কয়েকজন করে দেয়াল টপকিয়ে বেরিয়ে যাই। … বড় সতর্কতার সঙ্গে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে যাই। সেখানেও পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ। কলাভবনের বাইরের রাস্তায় পুলিশ টহলরত। এর মাঝেও হাজার হাজার ছাত্রজনতা উপস্থিত। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। ঘন ঘন এ স্লোগান দেওয়া হচ্ছে। সব এলাকায় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি। … আমাদের সামনেই ছোট ছোট দলে ছাত্ররা বেরিয়ে পড়ল। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। … হঠাৎ হইচই ছোটাছুটি। পুলিশের লাঠিচার্জ ও টিয়ার শেল বর্ষণ। আমরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়লাম। … এরই মধ্যে কলাভবন ও মেডিকেল কলেজের দেয়াল ভেঙে একটি পথ হেয়েছে। হেনাসহ আমরা ইডেনের ছাত্রীরা সেই পথ দিয়ে মেডিকেল চত্বর পেরিয়ে হোস্টেলে ফিরে আসি। … এর মধ্যে গোলাগুলির শব্দ আরও তীব্র হলো। এর পরই সংবাদ এল, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর হাতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। সন্ধ্যার পর জানা গেল, আরো দুজন নিহত হয়েছেন।’

অর্থাৎ ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা যখন ১৪৪ ধারা ভেঙে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান তুলে যখন রাজপথে নেমে আসে তখন তাঁদের সঙ্গে ইডেন কলেজের ছাত্রীরাও যুক্ত হন। ভাষাসংগ্রামী গুলে ফেরদৌস বলেছেন : ‘ইডেনের মেয়েরা তখন প্রায় সবাই ক্লাসে। আমরা জনাবিশেক মেয়ে দৌড়ে রাস্তায় নেমে সোজা অ্যাসেম্বলির দিকে এগিয়ে গেলাম। কিন্তু মাঝপথে আমাদের লক্ষ করে পুলিশ কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করলো। আমি ছিলাম দ্বিতীয় নম্বরে, সোজা চোখে এসে লাগলো বিষাক্ত ধোঁয়া।’

২১শে ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণের পর ইডেন কলেজের ছাত্রীরা এক জরুরি সভায় মিলিত হয়ে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষারূপে প্রতিষ্ঠিত করতে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের অঙ্গীকার করে, গুলিবর্ষণকারীদের শাস্তি দাবি করে এবং শহিদদের স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করে। ২৭শে ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ‘ইডেন ছাত্রী আবাসের সভায় প্রস্তাব গ্রহণ’ শিরোনামের এক সংবাদে বলা হয় : ২১শে ফেব্রুয়ারীর হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে ইডেন ছাত্রী আবাসে এক সভায় বাংলা ভাষাকে যে প্রকারে হোক রাষ্ট্রভাষারূপে প্রতিষ্ঠিত করা এবং তজ্জন্য সর্ব্বপ্রকার ক্ষতি স্বীকারের প্রস্তুতি জ্ঞাপন করিয়া একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। অপরাপর প্রস্তাবে গুলীবর্ষণকারীদের প্রকাশ্য বিচার ও শাস্তি, বর্তমান মন্ত্রীসভার পদত্যাগ ও শহীদেও লাশ ফেরৎ দেওয়ার দাবী জানান। পরিশেষে ছাত্রীগণ শহীদদের আত্মীয় পরিজনের শোকে সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।’

২২শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরের সর্বস্তরের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়লে ইডেন কলেজের ছাত্রীরা তাতে যোগ দেন। ২৩শে ফেব্রুয়ারি ‘শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ’ নির্মাণ হলে ইডেন কলেজের ছাত্রীরা ফুল নিয়ে সেখানে হাজির হন এবং শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেন। এছাড়া পরবর্তীকালে প্রভাতফেরি আয়োজন এবং একুশের চেতনা লালন ও বাস্তবায়নে রেখেছে অনন্য অবদান। ভাষা-আন্দোলনে ইডেন কলেজের ছাত্রীদের ভূমিকা প্রসঙ্গে রওশন আরা বাচ্চু লিখেছেন : ‘ইডেন কলেজ ছিল তখন আজিমপুর এলাকায় বকশি বাজারে। ইডেন কলেজের মেয়েদের সভা সমাবেশ ও মিছিলে অংশগ্রহণ ছিল নিষিদ্ধ। আমরা ইডেন কলেজ থেকে ছাত্রীদের আনতে গেলে খুবই কষ্ট হতো। সুপারিনটেনডেন্ট ও পিন্সিপ্যাল তাদেরকে আসতে দিত না। তারা মনে করত মেয়েরা ছেলেদের সঙ্গে মিশলে নষ্ট হয়ে যাবে। দারোয়ান আমাদের প্রবেশ করতে দিত না। মেয়েরা লুকিয়ে লুকিয়ে আসত। ইডেন কলেজের রওশন হেনা ও মনোয়ারার নাম মনে পরে। তারা প্রথম এগিয়ে আসে। ইডেন কলেজকে কেন্দ্র করে পুরো পুরো আজিমপুর এলাকার মেয়েরা ভাষা আন্দোলনে সচেতনতার পরিচয় দেয় এবং আমাদের সহযোগিতা করেন।’

নানা বিধি-নিষেধের মধ্যেও কীভাবে ইডেন কলেজের মেয়েরা ভাষা-আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে সে সম্পর্কে মনোয়ারা ইসলাম লিখেছেন : ‘আন্দোলনের দিনগুলোতে ইডেন কলেজের ছাত্রীরাও যে সক্রিয় অংশ নেয়, তাদের অবদানও যে অনেকখানি সে কথা তেমনভাবে বলা হয় না। ইডেন কলেজের মেয়েরা তখন যে কাজগুলো করেছিলাম, ভাষা আন্দোলনে তার অবদান রয়েছে বৈকি। তখনকার সময়ে আমরা কড়া বিধি-নিষেধের মধ্যে থেকেও আমরা ইডেন কলেজের ছাত্রীরা যেটুকু করেছিলাম আন্তরিকভাবে, স্বতঃস্ফুর্তভাবেই করেছিলাম।’

ইডেন কলেজের ছাত্রীরা ভাষা-আন্দোলনে নানাভাবে ভূমিকা রেখেছে। সভা-সমাবেশ ও মিছিলে অংশগ্রহণ, আন্দোলনের তহবিল সংগ্রহ, লিফলেট লেখা ছাড়াও তাঁরা ভাষা-আন্দোলনের বন্দিদের খাবার সরবরাহে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে। আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য যে, ইডেন কলেজের শিক্ষক ও ছাত্রীরা ভাষা-আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে যেমন প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছেন-তেমনি এই কলেজের অনেক অধ্যক্ষ এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী ভাষা-আন্দোলনের বিরোধিতাও করেছেন। প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ বলতে হয় তৎকালীন অধ্যক্ষ ফজিলাতুন্নেসার কথা, যিনি ‘১৯৫৩-তে ইডেন কলেজে শহীদ নির্মাণে বাধা দান’ করেন। তবে অধ্যক্ষের বাধা উপেক্ষা করে ইডেন কলেজের ছাত্রীরা শহিদ মিনার নির্মাণ করে। এভাবে ইডেন কলেজের ছাত্রীরা ভাষা-আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে এই কলেজকে ইতিহাসে গৌরবময় স্থান দান করেছেন।

তথ্যসূত্র
উইকিপিডিয়া
বাংলাপিডিয়া
ড. মোহাম্মদ হান্নান, বাংলাদেশের ছাত্রআন্দোলনের ইতিহাস ১৮৩০ থেকে ১৯৭১, তৃতীয় মুদ্রণ, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা : জুন ২০০৬
শরিফা খাতুন, ‘ভাষা আন্দোলনে ইডেন কলেজ’ দৈনিক বণিক বার্তা, ২১শে ফেব্রুয়ারি ২০১৭
তুষার আবদুল্লাহ, বাহান্ন’র ভাষা কন্যা, নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা, ঢাকা : ১৯৮৭
দৈনিক আজাদ, ২৭শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২
এম আর মাহবুব, আজিমপুরে ভাষা অন্দোলন, শোভা প্রকাশ, ঢাকা : সেপ্টেম্বর, ২০০৯
দৈনিক প্রথম আলো, ১৬ই ফেব্রুয়ারি ২০০৫
মোস্তফা কামাল, ভাষা আন্দোলন : সাতচল্লিশ থেকে বায়ান্ন, পৃ. ১৯৩
সেলিনা হোসেন ও নূরুল ইসলাম (সম্পাদিত), বাংলা একাডেমী চরিতাভিধান, ঢাকা : ২০০৩


    পাবনায় নামাজের সময়সূচি
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ০৪:২৭
    সূর্যোদয়ভোর ০৫:৪৫
    যোহরদুপুর ১১:৫৩
    আছরবিকাল ১৬:১৮
    মাগরিবসন্ধ্যা ১৮:০১
    এশা রাত ১৯:৩১
© All rights reserved 2019 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!