মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০১৯, ১০:৪৪ অপরাহ্ন

ভাষা-আন্দোলনে মওলানা ভাসানীর ভূমিকা

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করিলি রে বাঙালি : পর্ব-২


।। ড. এম আবদুল আলীম।।

[ভাষা-আন্দোলন গবেষণাকেন্দ্র, পাবনা-এর প্রধান নির্বাহী, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, গবেষক-প্রাবন্ধিক ড. এম আবদুল আলীমের ভাষা-আন্দোলনবিষয়ক লেখা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে ‘নিউজ পাবনা ডটকম’-এ। ১০০ পর্বের ধারাবাহিকের আজ বের হলো দ্বিতীয় পর্ব। আজকের বিষয় ভাষা-আন্দোলনে মওলানা ভাসানীর ভূমিকা।’]

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জন্ম ১৮৮০ সালের ১২ই ডিসেম্বর, জন্মস্থান সিরাজগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার ধনগড়া গ্রামে। পিতা হাজী শরাফত আলী খান, মাতা মজিরন বিবি। শিক্ষাজীবন শুরু গ্রামের মক্তবে, সেই মক্তবেই আবার শিক্ষকতা করেন। পরে টাঙ্গাইলের কাগমারীর একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের কালা গ্রামের একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। ১৮৯৭ সালে পীর সৈয়দ নাসিরুদ্দিনের সঙ্গে আসাম গমন করেন। ১৯০৩ সালে যুক্ত হন সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের সাথে। ইসলামিক শিক্ষাগ্রহণের জন্য ১৯০৭ সালে যান দেওবন্দ। দু বছর সেখানে শিক্ষাগ্রহণ করে আবার আসামে ফিরে যান। ১৯১৯ সালে কংগ্রেসে যোগদান করেন এবং খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে ১০ মাস কারাদ- ভোগ করেন। ১৯২৬ সালে আসামে সর্বপ্রথম কৃষক-প্রজা আন্দোলনের সূচনা করেন। তিনি ১৯২৯ সালে আসামের ধুবড়ী জেলার ব্রহ্মপুত্র নদের ভাসান চরে কৃষক সম্মেলন আয়োজন করেন। এ সম্মেলন থেকেই তাঁর নামের সাথে ‘ভাসানী’ শব্দটি যুক্ত হয়


ড. এম আবদুল আলীম

১৯৩১ সালে টাঙ্গাইলের সন্তোষের কাগমারীতে, ১৯৩২ সালে সিরাজগঞ্জের কাওয়াখোলায় এবং ১৯৩৩ সালে গাইবান্দায় বিশাল কৃষক সম্মেলন আয়োজন করেন। ১৯৩৭ সালে কংগ্রেসের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে মুসলিম লীগে যোগদান করেন। ঐ বছর আসামে বাঙালি নিপীড়নের হাতিয়ার ‘লাইন প্রথা’ চালু হলে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯৪০ সালের ২২ ও ২৩শে মার্চ শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের সঙ্গে যোগদান করেন লাহোরে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের সম্মেলনে। ১৯৪৪ সালে আসাম প্রদেশ মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন পাকিস্তান আন্দোলনে। ১৯৪৭ সালে তাঁকে আবারও গ্রেফতার করা হয়। ১৯৪৮ সালে মুক্তিলাভ করেন এবং পূর্ববঙ্গে চলে আসেন। ১৯৪৯ সালের ২৩শে জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে তাঁর সভাপতিত্বে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয় এবং তিনি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নির্বাচিত হন। ভূখা মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে ১৯৪৯ সালের ১৪ই অক্টোবর গ্রেফতার ও কারাবন্দি হন। ১৯৫০ সালের ডিসেম্বর মাসের দিকে সরকারের নির্যাতনের প্রতিবাদে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অনশন ধর্মঘট পালন এবং মুক্তিলাভ করেন।

ভাষা-আন্দোলনের শুরু থেকেই মওলানা ভাসানী এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৮ সালে তিনি আসাম থেকে সিরাজগঞ্জে চলে আসেন এবং তাঁর অনুসারীদের ভাষা-আন্দোলনে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেন। ১৯৪৮ সালের ১৫ই মার্চ পূর্ববাংলা ব্যবস্থাপক সভায় সকলকে ইংরেজি বর্জন করে বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দেওয়ার জোর দাবি জানিয়ে উচ্চারণ করেন : ‘জনাব সদর সাহেব, এখানে যাঁরা সদস্য আছেন তাঁরা সকলেই স্বীকার করবেন যে, এটা বাংলা ভষাভাষীদের দেশ, এই Assembly-র যিনি সদর তিনিও নিশ্চয়ই বাংলাতেই বলবেন। আপনি কি বলেন আমরা তা’ বুঝিতে পারি না, আপনি যা বলেন তার সহিত সদস্যদের discussion-এর কোন সংশ্রব থাকতে পারে না। আপনি যদি বাংলায় ruling না দেন তা হলে আমরা আপনার আলোচনায় শরীক হ’ব কি ক’রে, আমি আশা করি আপনি ruling দিবেন যেন সকলেই বাংলাতে বলেন এবং আপনিও বাংলাতে ruling দিবেন। … আপনি কোন্ ভাষায় বলবেন? সদর সাহেব, আমি আশা করি ইংরেজী বর্জ্জন করে বাংলা ভাষাতেই যাতে সকলে বলেন তার ব্যবস্থা করবেন।’

৫২-র ভাষা-আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে নেতৃত্বদান করেন। বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার আন্দোলনকে বেগবান করার লক্ষ্যে ঢাকা বার লাইব্রেরি হলে ১৯৫২ সালের ৩১শে জানুয়ারি তাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় গঠিত হয় ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা পরিষদ’। তিনি ছিলেন এই সংগ্রাম পরিষদের প্রধান নেতা। ১৯৫২ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি বিকেলে তাঁর সভাপতিত্বে ঢাকা বার লাইব্রেরি হলে আয়োজিত ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম সংগ্রাম পরিষদ’-এর সভায় ‘২১শে ফেব্রুয়ারি সরকার প্রদেশব্যাপী এক সাধারণ সাধারণ ধর্মঘট আহ্বানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।’ ৬ই ফেব্রুয়ারি ডন পত্রিকায় ভাষা-আন্দোলনকারীদের কর্মকান্ডে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও প্রাদেশিকতার অভিযোগ তুলে সম্পাদকীয় প্রকাশিত হলে মওলানা ভাসানী এর তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং বিবৃতি প্রদান করে বলেন : ‘আমি দেখিয়া মর্ম্মাহত হইলাম যে, পশ্চিম পাকিস্তানের কতিপয় সংবাদপত্র আমাদের বাংলাভাষা আন্দোলনের কদর্য্য ও ভুল ব্যাখা করিবার প্রয়াস পাইয়াছে এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ভাইদের মনে বিদ্বেষ সৃষ্টির দুরভিসন্ধিতে মাতিয়া উঠিয়াছে। ইহা দ্বারা পত্রিকাগুলি কায়েমী স্বার্থের দালালদের ভেদনীতিকেই চাঙ্গা করিয়া রাখিয়া দেশের প্রতি দুষমনী করিতেছে।’ এরপর ২১শে ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি সফল করতে তিনি দেশের বিভিন্ন স্থানে সফর করেন। আহমদ রফিক বলেছেন : ‘এ সফর ভাসানীর নিজস্ব রাজনৈতিক কর্মসূচি ভিত্তিক হলেও সরকারবিরোধী এ প্রচার জনতার মনে প্রভাব ফেলেছে। স্বভাবতই রাষ্ট্রভাষা বাংলার অধিকার প্রতিষ্ঠায় সূচিত একুশে পালনের আহ্বানে সাড়া দেওয়া জনসাধারণের পক্ষে সহায় হয়ে ওঠে।’

১৭ই জানুয়ারি বক্তৃতা করেন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ মাঠের ছাত্রসভায়। ঐ ছাত্রসভার আয়োজক, এডওয়ার্ড কলেজ ছাত্র-সংসদের তখনকার জি.এস. ও পাবনা জেলা রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক আবদুল মমিন তালুকদার লিখেছেন : ‘মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী তার জামাতা পাবনার বিশিষ্ট এডভোকেট আব্দুস সবুর খান সাহেবের বাড়িতে যান এবং আমাকে তার সঙ্গে দেখা করার জন্য লোক দিয়ে ডেকে পাঠান। আমি দেখা করতে গেলে আমরা বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে কি করছি জিজ্ঞাসা করেন। আমরা তার সঙ্গে আলোচনা করে ১৭ ফেব্রুয়ারি এডওয়ার্ড কলেজ মাঠে একটি ছাত্র-জনসভা করার সিদ্ধান্ত নিই এবং ওই সভায় বক্তব্য রাখার জন্য অনুরোধ করি। … ১৭ ফেব্রুয়ারি সমগ্র পাবনা শহরে উত্তেজনা। বিকাল ৩টায় কলেজ মাঠে বিশাল ছাত্র-জনতার সমাগম ঘটে। … অবশেষে মওলানা সাহেব এলেন কিন্তু সামান্য বক্তব্য রাখলেন ২১শে ফেব্রুয়ারির আন্দোলনের ডাক সম্পর্কে।’

২১শে ফেব্রুয়ারি সরকারের নির্মমতা ও পুলিশের গুলিবর্ষণে হতাহতের ঘটনায় মওলানা ভাসানী বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও অপরাধীদের প্রকাশ্য শাস্তি দাবি করে বিবৃতি দেন। বিবৃতিটি ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এভাবে : ‘পূর্ব্ব পাকিস্তান আওয়ামী মোছলেম লীগের সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী তাঁহার বিবৃতিতে বলেন, কর্তৃপক্ষ কি করিয়া এই রূপ নির্মম ব্যবস্থা অবলম্বন করিতে পারেন তাহা আমার পক্ষে বুঝা শক্ত। প্রতিবাদ দিবসের প্রাক্কালে ১৪৪ ধারা জারী করার কোনোই যৌক্তিকতা ছিল না। এই বিষয়ে আর বেশি কিছু আলোচনা না করিয়া ঘটনার জন্য আমি একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং অপরাধীদের প্রকাশ্য বিচারের দাবী করিতেছি।’

ভাষা-আন্দোলনের সময় ১৯৫২ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি থেকে নিরাাপত্তা-বন্দি শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিন আহমদ কারাগারে অনশন শুরু করলে ‘মানবতার নামে’ শীর্ষক এক পৃথক বিবৃতিতে তাঁদের ‘মুক্তির দাবি জানান।’ রাজবন্দিদের অনশন ধর্মঘট সম্পর্কে ঐ বিবৃতিতে তিনি বলেন : ‘আমি জানিতে পারিয়াছি যে, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি হইতে নিরাপত্তা বন্দি শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিন আহমেদ আনশন ধর্মঘট শুরু করিয়াছেন। জনসাধারণ অবগত আছেন যে, শেখ মুজিবুর রহমান দীর্ঘদিন হইতে মারাত্মক রোগে ভুগিতে ছিলেন এবং কিছুদিন পূর্বে চিকিৎসার জন্য তাঁহাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও স্থানান্তরিত করা হইয়াছিল। কিন্তু তাঁহাকে রোগ মুক্তির পূর্ব্বেই আবার জেলে প্রেরণ করা হয়। মহিউদ্দিনের স্বাস্থ্যও দ্রুত অবনতির দিকে যাইতেছে। এমতাবস্থায় আমরা সহজেই বুঝিতে পারিতেছি যে, এই অনশন ধর্মঘট তাঁহাদের ভগ্ন স্বাস্থ্যের পরিণতি ঘটাইবে। তাঁহাদিগকে আটক রাখার সম্বন্ধে কর্তৃপক্ষের অনমনীয় মনোভাব দেখিয়া আমি অত্যন্ত মর্মাহত হইয়াছি। আমি মানবতার নামে সরকারের নিকট এই আবেদন করিতেছি যে তাঁহারা মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিনকে মুক্তিদান করেন।’

ভাষা-আন্দোলনে নেতৃত্বদানের কারণে ১৯৫২ সালের ১৩ই মার্চ তাঁর নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। তিনি ১০ই এপ্রিল, ১৯৫২ ঢাকার জেলা ম্যজিস্ট্রেটের নিকট আত্মসমর্পণ করেন। ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে তিনিসহ ভাষা-আন্দোলনের বন্দিরা অমানবিক কষ্ট সহ্য করেন। তাঁর কারাসঙ্গীদের একজন লিখেছেন : ‘এক রাতে মওলানা সাহেব ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সে রাতে মওলানা সাহেবের চীৎকার এবং কষ্ট দেখে আমাদের অনেকের চোখে পানি এসে গিয়েছিল। আমরা সবাই তার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে ছটফট করতে দেখেছি।’

১৬ মাস কারাভোগ করে ১৯৫৩ সালের ২১শে এপ্রিল তিনি মুক্তিলাভ করেন। ঐ সময় পাসবান পত্রিকায় ভাষা-আন্দোলন সম্পর্কে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর একটি বক্তব্য বিকৃত করে ছাপা হয়। এর প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সহ-সভাপতি আতাউর রহমান খান এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান বিবৃতি দেন, বিবৃতিটি ঢাকা প্রকাশ, আজাদ, ইত্তেফাক প্রভৃতি পত্রিকায় ‘রাষ্ট্রভাষা ও ভাসানী’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। দৈনিক আজাদ পত্রিকায় বলা হয় : ‘গত রবিবার ঢাকার কোনও একখানি বাংলা দৈনিকে (আজাদে নহে) “পাসবানে”র ষ্টাফ রিপোর্টারের সহিত মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে যে বিবরণ প্রকাশিত হইয়াছে, তাহার প্রতিবাদে পূর্ব্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের জনাব আতাউর রহমান খান ও জনাব শেখ মুজিবুর রহমান এক বিবৃতিতে বলেন যে, রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে মওলানা ভাসানীর অভিমত অত্যন্ত সুপরিচিত এবং তৎসম্পর্কে কোনরূপ অপপ্রচারের অবকাশ নাই। মওলানা ভাসানী এবং আমরা সব সময়েই উর্দ্দুর সহিত বাংলাকেও পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা হউক বলিয়া দাবী করিয়া আসিয়াছি। মওলানা ভাসানীর বক্তৃতার বিবরণের মধ্যে এমন একটি ছত্র নাই যেখানে তিনি বলিয়াছেন যে, উর্দ্দুই পাকিস্তানে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হইবে।’

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী জেল থেকে মুক্ত হয়েই বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও একুশের চেতনা বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগকে মোকাবেলা করার জন্য ১৯৫৩ সালের ৩রা ডিসেম্বর সমমনা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রমুখের সাথে গড়ে তোলেন যুক্তফ্রন্ট। এরই মধ্যে ১৯৫৪ সালের ২৪শে ডিসেম্বর প্রকাশ করেন সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকা। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহারে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার ও একুশের চেতনা বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট কর্মসূচি ছিল। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠনের পর মওলানা ভাসানী বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে যোগদান করতে বার্লিন যাত্রা করেন। ১৯৫৪ সালের ৩০শে মে কেন্দ্রীয় সরকার ৯২-ক ধারা জারি করে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙে দেয় এবং ভাসানীর দেশে প্রত্যাবর্তনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ১১ মাস পর তাঁর ওপর থেকে বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা হলে তিনি ১৯৫৫ সালের ২৫শে এপ্রিল দেশে ফেরেন।

পূর্ব পাকিস্তানে খাদ্যজনিত দুর্ভিক্ষ রোধ করার জন্য তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে ৫০ কোটি টাকা আদায়ের দাবিতে ১৯৫৬ সালের ৭ই মে ঢাকায় অনশন ধর্মঘট আরম্ভ করেন। সরকার দাবি মেনে নিলে ২৪শে মে ধর্মঘট প্রত্যাহার করেন। ঐ বছর ১২ই সেপ্টেম্বর সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ-রিপাবলিকান পার্টির কোয়ালিশন সরকার গঠিত হলে মওলানা ভাসানী সরকারের মার্কিন-ঘেঁষা নীতির বিরোধিতা করেন। ১৯৫৭ সালের ৭ ও ৮ই ফেব্রুয়ারি কাগমারী সম্মেলনে ‘পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি’ বাতিলের দাবি জানান। প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করলে ১৮ই মার্চ আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেন। এ-বছর ২৫শে জুলাই ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে ‘ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি’ (ন্যাপ) গঠন করেন এবং সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৫৭ সালের ৭ই অক্টোবর দেশে সামরিক আইন জারি হলে জেনারেল আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করে রাজনৈতিক কর্মকা- স্থগিত করেন এবং ন্যাপসহ সকল রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এ-বছর ১২ই অক্টোবর মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতাল থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং ৪ বছর ১০ মাস বন্দি রাখা হয়। বন্দি অবস্থায় ১৯৬২ সালের ২৬শে অক্টোবর থেকে ২রা নভেম্বর পর্যন্ত বন্যাদুর্গতদের সাহায্য, পাটের ন্যায্যমূল্য, মোহাজেরদের পুনর্বাসন ও বন্যানিয়ন্ত্রণের দাবিতে অনশন ধর্মঘট পালন করেন। এরপর ৩রা নভেম্বর তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।

মুক্তিলাভের পর এন. ডি. এফ-এর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হন। ১৯৬৩ সালের মার্চ মাসে আইয়ুব খানের সাথে দেখা করেন। এ-বছর ২৪ সেপ্টেম্বর চীনের বিপ্লব দিবস (১লা অক্টোবর) উৎসবে যোগ দিতে পিকিং যাত্রা করেন। সাত সপ্তাহ সেখানে অবস্থান করে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান মাও সেতুং, প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং পাকিস্তান-চীনের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলাপ করেন। ১৯৬৪ সালের ২৯শে ফেব্রুয়ারি ন্যাপ পুনরুজ্জীবিত করেন এবং পার্টির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই বছর ২১শে জুলাই সম্মিলিত বিরোধী দল (কপ) গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৫ সালের ২রা জানুয়ারি মৌলিক গণতন্ত্র প্রথায় দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হলে কপের প্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহর নির্বাচনী প্রচারে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৫ সালের ১৭ই জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আইউব খানের পররাষ্ট্র নীতি সমর্থন করেন। এ-বছর ২৬শে জুলাই তাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ন্যাপের কাউন্সিল সভায় দেশে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক উপস্থাপিত ৬-দফা কর্মসূচির বিরোধিতা করেন। ১৯৬৭ সালের ২২শে জুন জাতীয় পরিষদে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য ও বেতার মন্ত্রী খাজা সাহাবুদ্দিন রেডিও এবং টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে ভাসানী এ-সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেন। ১৯৬৭ সালের নভেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাবে ন্যাপ দ্বিখ-িত হলে তিনি চীনপন্থি গ্রুপের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। একই বছর ন্যাপের এ-অংশের সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত হন।

১৯৬৯ সালে মওলানা ভাসানী আইউব-বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং ছাত্রসমাজের ১১-দফা কর্মসূচির প্রতি জোরালো সমর্থন জ্ঞাপন করেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারসহ শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্যান্য আসামীর মুক্তি দাবি করেন। ১৯৬৯ সালের ৮ই মার্চ পশ্চিম পাকিস্তান সফরে যান। পাকিস্তানে জনগণের গণতন্ত্র কায়েমের লক্ষ্যে ১৯৬৯ সালের ১০ই মার্চ পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে রাজনৈতিক সমঝোতামূলক এক চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ১৯৬৯ সালে রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানের জন্য আইউব খান কর্তৃক আহুত গোলটেবিল বৈঠক প্রত্যাখ্যান করে শ্রমজীবী ও চাকুরিজীবীদের আন্দোলনে উৎসাহ দেন। এ-বছর ২৬শে মার্চ গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আইয়ুব খানের পতন হয়। ক্ষমতায় আসেন ইয়াহিয়া খান। ইয়াহিয়া খান নির্বাচনের ঘোষণা দিলে মওলানা ভাসানী তা প্রত্যাখ্যান করে ‘ভোটের আগে ভাত চাই’, ‘ইসলামিক সাংস্কৃতিক বিপ্লব সংগঠন’ ও ‘ইসলামিক সমাজতন্ত্র’ কায়েমের ঘোষণা দেন। ১৯৭০ সালের ৬ ও ৮ই আগস্ট পূর্ব পাকিস্তানে বন্যাসমস্যা সমাধানের দাবিতে সন্তোষে অনশন ধর্মঘট পালন করেন। এরপর নির্বাচনে অংশগ্রহণের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেন। নির্বাচনে ন্যাপ প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র দাখিল করেন এবং নির্বাচনের আগে ১২ই নভেম্বর উপকূলে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় হলে দুর্গত এলাকায় ত্রাণকার্যে অংশগ্রহণের জন্য নির্বাচন থেকে সড়ে দাঁড়ান। ১৯৭০ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর ঢাকার পল্টন ময়দানে ‘স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান’ দাবি উত্থাপন করেন। ১৯৭১ সালের ৩রা থেকে ২৫শে মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন সমর্থন দেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারতে গমন করেন। তিনি মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মনোনীত হন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ২২শে জানুয়ারি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। এ-বছর ২৫শে ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক হক কথা প্রকাশ করেন। ১৯৭২ সালের ‘বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি’র বিরোধিতা করলেও, মুজিব সরকারের ব্যাংক-বীমা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ নীতি সমর্থন করেন। বাংলাদেশের সংবিধানকেও তিনি সমর্থন করেন। ১৯৭৩ সালের ১৫ থেকে ২২শে মে খাদ্যের দাবিতে ঢাকায় অনশন ধর্মঘট পালন করেন। ১৯৭৪-এর ৮ই এপ্রিল ‘হুকুমতে রাব্বানিয়া’ সমিতি গঠন করেন। এ-বছর জুন মাসে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করলে সন্তোষে গৃহবন্দি হন। ৭৫-পরবর্তীকালে গঠিত খোন্দকার মোশতাক আহমদের সরকার ও মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের সরকারের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেন। ১৯৭৬ সালের ১৫ই মে ফারাক্কা মিছিলে নেতৃত্ব দেন। এ-বছর ১লা অক্টোবর তাঁর নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘খোদাই খিদমতগার সংগঠন’। আজীবন শোষিত মানুষের কল্যাণ ও মুক্তির জন্য সংগ্রাম করে তিনি ‘মজলুম জননেতা’ হিসেবে পরিচিতি হন। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলো হলো : দেশের সমস্যা ও সমাধান (১৯৬২), মাও সেতুং-এর দেশে (১৯৬৩)। ১৯৭৬ সালের ১৭ই নভেম্বর এই বরেণ্য রাজনীতিবিদ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে টাঙ্গাইল জেলার সন্তোষে সমাধিস্থ করা হয়।


    পাবনায় নামাজের সময়সূচি
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ০৩:৫২
    সূর্যোদয়ভোর ০৫:২১
    যোহরদুপুর ১২:০৪
    আছরবিকাল ১৬:৪৪
    মাগরিবসন্ধ্যা ১৮:৪৮
    এশা রাত ২০:১৮
© All rights reserved 2019 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!