বুধবার, ১৯ জুন ২০১৯, ১২:৪৮ অপরাহ্ন

ভুল সবই ভুল; জীবনের পাতায় পাতায় যা লেখা সবই ভুল

।। এবাদত আলী।।

সুজাতা চক্রবর্তীর সেই বিখ্যাত গানের কলি দিয়েই শুরু করা যাক। তিনি ষাটের দশকে গেয়েছিলেন ভুল সবই ভুল, এ জীবনের পাতায় পাতায় যা লেখা সবই ভুল…, শ্রাবণে মোর ফাগুন জ্বলে….., প্রশ্ন করি নিজের কাছে কে আমি… ইত্যাদি ইত্যাদি।

গানটি সেসময় সঙ্গীত প্রেমিদের মুখে মুখে সময়ে অসময়ে উচ্চারিত হতো। আবার মহা কবি মাইকেল মধুসুদন দত্তের মেঘনাদ বধ কাব্যের ৬ষ্ঠ সর্গের সেই উক্তি “এতক্ষণে অরিন্দাম কহিলা বিষাদে।”

এমনি ছেড়াবেড়া অবস্থার মাঝে পড়ে বুক চাপড়ে চাপড়ে হা হুতাস করে অবশেষে সত্য স্বীকার করতে বাধ্য হলেন যে ব্যক্তি তিনি আর কেউ নন তিনি হলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের মহা নায়ক আব্দুল করিম খন্দকার ওরফে এ কে খন্দকার।

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারি অগণিত যোদ্ধাদের সঙ্গে তিনিও মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন অকুতভয় সৈনিক। সেসময় তিনি বিমান বাহিনীর এয়ার ভাইস মার্শালপদে নিয়োজিত ছিলেন।

১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল মুক্তি বাহিনীর উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা চা বাগানে পরিবৃত হবিগঞ্জের আধা পাহাড়িয়া এলাকা তেলিয়াপাড়ায় অবস্থিত দ্বিতীয় ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সদর দপ্তরে একত্রিত হন। সেখানে জেনারেল এমএ জি ওসমানি, মেজর কাজি নুরুজ্জামান, মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর নুরুল ইসলাম, মেজর শাফায়েত জামিল, মেজর ময়নুল হোসেন চৌধুরিসহ আরো অনেকে একত্রিত হন।

এই সম্মেলন থেকেই মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রথম দিক নির্দেশনা আসে।

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল তাজ উদ্দিন আহমদ এর নেতৃত্বে আনুষ্ঠানিকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের একটি প্রবাসি সরকার ‘মুজিবনগর সরকার’গঠিত হয়।

এ কে খন্দকার ১৫ মে তার দলবলসহ ভারতের আগরতলায় পৌঁছেন। ১৬ মে কলকাতায় গিয়ে মুক্তি বাহিনীর সর্বাধিনায়ক এমএ জি ওসমানির সঙ্গে সাক্ষাত করেন। তার পরামর্শে তিনি দিল্লীতে যান বিমান সংগ্রহের জন্য।

তিনি ভারত সরকারের কাছ থেকে ভারতীয় বিমান বাহিনীর একটা অটার একটা অলওয়েট হেলিকপ্টার এবং একটা ডিসি-৩ ডাকোটা বিমান প্রাপ্ত হন। এ নিয়ে মুক্তি বাহিনীর বিমান ইউনিট চালু করা হয়। এসময় একে খন্দকারকে মুক্তিবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব ষ্টাফ মনোনিত করা হয়। এই ইউনিট নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়ে তিনি বিশেষ সাফল্য অর্জন করেন।

একে খন্দকার এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রবাসি সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ মুক্তিবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ হিসেবে আমাকে (একে খন্দকার) ডেকে পাঠান। সেখানে তৎকালিন রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এম মনসুর আলী, খন্দকার মুশতাক সবাই উপস্থিত ছিলেন।

একে খন্দকারকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে প্রতিনিধিত্ব করার কথা বলা হলো। প্রস্তাবটি শুনে এ কে খন্দকার বিমোহিত হয়ে যান। কারণ তিনি একটি ইতিহাসের অধ্যায়ের স্বাক্ষী হতে যাচ্ছেন।

তড়িঘড়ি করে তিনি যোগাযোগ করেন ভারতীয় সামরিক বাহিনীর হেডকোয়ার্টারের সাথে। সেখান থেকে তাকে কলকাতা দমদম বিমান বন্দরে যাবার জন্য বলা হলে তিনি সেখানে যান। গিয়ে দেখেন সেখানে জেনারেল অরোরা, জেনারেল জেকবসহ ভারতীয় সামরিক বাহিনীর উর্দ্ধতনকর্মকর্তারা উপস্থিত রয়েছেন।

তাদের সঙ্গে ঐতিহাসিক একটি মুহুর্তের স্বাক্ষী হতে প্রথমে আগরতলায় আসেন তিনি। তারপর সেখান থেকে ঢাকায় পদার্পণ করেন। পরাজিত পাকিস্তান সেনা বাহিনীর জেনারেল নিয়াজি তাদেরকে বিমান বন্দরে স্বাগত জানান।

সেদিনের সেই ঐতিহাসিক মৃহুর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, আমরা বিমান বন্দর থেকে সোজা রেসকোর্সের মাঠে গেলাম। সেখানে আস্তে আস্তে লোকের ভিড় হচ্ছিল। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু যেখান থেকে ভাষণ দিয়েছিলেন সেখানে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিলো। জনগণ আনন্দ উল্লাসে ফেটে পড়েছিলো।

তারা জেনারেল অরোরাকে কাঁধের উপর উঠিয়ে নেয় এবং বিজয় উল্লাসে মেতে ওঠে।বাংলাদেশের মুক্তি বাহিনী ও ভারতীয় মিত্র বাহিনীর নিকট মোচনীয় পরাজয় বরণ করে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যসহ জেনারেল নিয়াজি আত্মসমর্পণ করে। এসময় জেনারেল নিয়াজিকে খুব বিমর্ষ দেখা যাচ্ছিলো।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয়ের পর বঙ্গবন্ধু সরকার এই বীর সেনানীকে “ বীর উত্তম” খেতাবে ভুষিত করে। ২০১১ সালে তিনি স্বাধীনতা পদক লাভ করেন।

আব্দুল করিম খন্দকার যিনি একে খন্দকার নামেই সমধিক পরিচিত। তাঁর জন্ম ১৯৩০ সালের ১ জানুয়ারি, পিতার কর্মস্থল রংপুর শহরে। তাঁর পিতা খন্দকার আব্দুল লতিফ তৎকালিন ব্রিটিশ আমলে ডেপুটি ম্যজিষ্ট্রেট ছিলেন এবং মাতা আরেফা খাতুন ছিলেন একজন আদর্শ গৃহিনী।

তার পৈত্রিক নিবাস পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার ভারেঙ্গা গ্রামে। পাবনা শহরে খেয়াঘাট রোডেও তার বাসা রয়েছে।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর একে খন্দকার নবগঠিত বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা চিফ অব ষ্টাফ হন এবং বিমান বাহিনীর প্রধান হিসেবে বিমান বাহিনীর যথেষ্ট উন্নতি সাধন করেন। তিনি বিমান বাহিনীর চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত অষ্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাই কমিশনার এবং ১৯৮২ থেকে ৮৬ সাল পর্যন্ত ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি ১৯৮৬ সালের সেপ্টেম্বর হতে নভেম্বর পর্যন্ত মহামান্য রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা হিসেবে এবং একই বছরের নভেম্বর মাসের শেষ দিকে বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন।

১৯৯০ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তিতে তিনি ১৯৯৮ সালের ১০ ডিসেম্বর পাবনা -২ (বেড়া- সুজানগর) নির্বাচনি এলাকা থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বচিত হন।

২০০৮ সালেও তিনি তার নিজ নির্বাচনি এলাকা পাবনা-২ থেকে পুনরায় জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে তিনি আওয়ামী লীগ নেতৃতাধীন সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যেসকল রাজাকার আলবদর আল শামসরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর হিসেবে খুন, রাহাজানি, নারী ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজের সাথে জড়িত ছিলো সেই সকল যুদ্ধ অপরাধিদের বিচারের জন্য সেক্টর কমান্ডার ফোরামের তিনি ছিলেন চেয়ারম্যান।

শুধু তাই নয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে কজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সৎ ও আদর্শবান নেতা হিসেবে পরিচিত এ কে খন্দকার তাঁদের মধ্যে অন্যতম।

কিন্তু বড়ই দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় যে তিনি তাঁর জীবনে বিরাট ভুল করে ফেলেছেন। তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের পাতায় পাতায় যা লেখা আছে তা হয়তোবা সবই ভুল প্রমাণিত হয়েছে। কারণ তিনি ২০১৪ সালে মন্ত্রীত্ব ছাড়ার পর প্রকাশ করেন নিজের আত্ম জীবনী ‘‘১৯৭১’-ভেতরে বাইরে।’’ উক্ত বইয়ের ৩২ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের শেষে ‘জয় পাকিস্তান ’ বলেছিলেন।
এই তথ্য উল্লেখ করায় গোটা বাঙালি জাতির সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। সেক্টর কমান্ডার ফোরামের পদ হতে ইস্তফা দিতে তিনি বাধ্য হন। দেশের সচেতন মহলের নিকট তিনি গাল ধরা মান কচু হিসেবে চিহ্নিত হন। সকল মহলই তার সমালোচনায় মুখর। এই বইকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদেও তোলপাড় হয়।

আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সাংসদদের মতে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল ও অসত্য তথ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করেছেন।
সাংসদেরা এ কে খন্দকারের বইটি নিষিদ্ধের দাবি জানিয়ে বলেন, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই অথবা অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের টাকায় উদ্দেশ্যমুলকভাবে তিনি এ বই লিখেছেন। বইটি প্রকাশের কারণে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করারও কথা উঠেছিলো সেসময়।

কিন্তু এতদিন পরে হঠাৎ করে এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার কুম্ভকর্ণের মত ঘুম থেকে জেগে উঠে সেই বইটির জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাইলেন।

গত ২৮ মে-২০১৯ দৈনিক সিনসা পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ হতে জানা যায়, “১৯৭১: ভেতর বাইরে” বইয়ে ভুল তথ্যের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের উপ অধিনায়ক এবং সাবেক মন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার (বীর উত্তম)।

রোববার যমুনা টেলিভিশনকে দেয়া একান্ত সাক্ষাতকারে এ কে খন্দকার বলেন, ভুল করেছি যে পাকিস্তান কথাটা বলেছি। ওটা ভুল, আমার ভুল হেেয়ছে। একেবারে সম্পুর্ণ ভুল।

এ যেন মহাকবি মাইকেল মধুসুদন দত্তের মেঘনাদ বধ কাব্যের ৬ষ্ঠ সর্গের বিভিষণকে বলা সেই কথা “এতক্ষণে অরিন্দম কহিলা বিষাদে।”
কিংবা সুজাতা চক্রবর্তীর সেই বিখ্যাত গানের কলি ভুল সবই ভুল, এ জীবনের পাতায় পাতায় যা লেখা সবই ভুল।

(লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  


    পাবনায় নামাজের সময়সূচি
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ০৩:৪১
    সূর্যোদয়ভোর ০৫:১২
    যোহরদুপুর ১২:০০
    আছরবিকাল ১৬:৪০
    মাগরিবসন্ধ্যা ১৮:৪৮
    এশা রাত ২০:১৮
© All rights reserved 2019 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!