রবিবার, ১৮ অগাস্ট ২০১৯, ০৬:৫২ অপরাহ্ন

‘মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের স্মৃতিকথা’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন ও বীর পুলিশ মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা

লেখক: এবাদত আলী, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

।। এবাদত আলী ।।

“তখনও শিশুটি মায়ের কোলে ঘুমিয়ে। সবেমাত্র কর্মক্লান্ত মানুষগুলো গা এলিয়ে দিয়েছে বিছানায়। হঠাৎ গগণ বিদারী আওয়াজে জেগে ওঠে রাজারবাগ। রাতটি ছিল ভয়াল ২৫ মার্চ। পাক হায়েনারা প্রথম আক্রমণ চালায় রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে। কারণ তারা জানত বাংলার মানুষের অতন্দ্র প্রহরী পুলিশকে পরাস্ত করতে না পারলে জয় সুদুর পরাহত। অতর্কিতে আক্রমণে দিশেহারা হলেও হাল ছাড়েনি বাংলার বীর পুলিশ সদস্যগণ। সামান্য থ্রি নট থ্রি রাইফেল নিয়ে সমুচিত জবাব দিয়েছে পাক হানাদার বাহিনীর। অকাতরে শাহাদৎ বরণ করেছেন তারা। কিন্তু মাথা নত করেননি।” কথাগুলো এভাবেই ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল এ কে এম শহীদুল হক বিপিএম, পিপিএম।

বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার ৪৬ তম বিজয় দিবসের আমেজে পাবনার পুলিশ সুপার জিহাদুল কবির পিপিএম এর উদ্যোগে সম্প্রতি ‘মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের স্মৃতিকথা: প্রেক্ষিত পাবনা’ শীর্ষক যে বইটি প্রকাশিত হয়েছে সে বইয়ের “বাণী” তে তিনি তাঁর অভিব্যক্তি এভাবেই প্রকাশ করেছেন।
পুলিশের আইজিপি আরো লিখেছেন “এর পরের ইতিহাস আমাদের জানা। সারা বাংলায় সর্বকালের সর্ব শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে যে দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, তার প্রতি পরতে পরতেই রয়েছে পুলিশের অবদান। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র প্রদান, পরিকল্পনা থেকে শুরু করে সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ, সর্বত্রই ছিল পুলিশ সদস্যদের সরব পদচারণা।

স্বাধীন বাংলার অস্থায়ী সরকারের প্রতিনিধি বর্গকে গার্ড অব অনারে নেতৃত্বদানের গৌরব পেয়েছেন তদানিন্তন এসডিপিও জনাব মাহবুব উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। ফলশ্রুতিতে যুদ্ধের নয় মাসের হত্যা, লুন্ঠন, সম্ভ্রমহানিসহ নানা বঞ্চনার শিকার হয়েছে পুলিশ ও তার স্বজনেরা।

একাত্তরের উত্তাল সময়ে পাবনা জেলার মুক্তিযোদ্ধাদেরও আছে গৌরবগাঁথা। জাতির সূর্য সন্তানদের সেসব গাঁথা আজ স্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে বসেছে। বিভিন্ন পেশার মানুষের যুদ্ধকালিন অবদান যতটা প্রচার পেয়েছে, পুলিশের ভূমিকা ততটা লোক সম্মুখে উঠে আসেনি।

কীর্তিনাশা পদ্মা আর প্রমত্তা যমুনার তীরে পাবনার মানুষগুলো রয়ে গেছে লোক চক্ষুর অন্তরালে। ঠিক এই সময় পাবনার পুলিশ সুপার জনাব জিহাদুল কবির, পিপিএম, হারিয়ে যাওয়া কথাগুলো কুড়িয়ে নিয়ে স্মৃতিকথা মূলক বই প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছেন। আমি তার এই মহৎ উদ্যোগকে অভিনন্দন জানাই।”

উক্ত বইয়ের “বাণী”তে বাংলাদেশ পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল এম খুরশীদ হোসেন, বিপিএম লিখেছেন, ‘পাবনা জেলা পুলিশ কর্তৃক পাবনা জেলার মুক্তিযোদ্ধা পুলিশের স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের স্মৃতিকথা: পেক্ষিত পাবনা’ প্রকাশের মহতী উদ্যোগকে আমি স্বাগত জানাচ্ছি। রক্ত দিয়ে কেনা আমাদের এই বাংলাদেশ। লাখো শহীদের রক্তে আঁকা বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা। ভাবতেই বুক ভরে যায়, ঐ লালীমার প্রথম রক্ত ঢেলেছে আমার পুলিশ বাহিনীর সদস্যগণ।

কী প্রগাঢ় ভালবাসায় বঞ্চনার দাবানলে ঢেলেছে বুকের তাজা রক্ত। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ৭ইমার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে বুকে ধারণ করে ২৫ শে মার্চ গর্জে ওঠে অতন্দ্র প্রহরী পুলিশ বাহিনী। মধ্য রাতের পর বর্বর পিশাচ হানাদারদের অতর্কিত নারকীয় তান্ডবের প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স এর সাহসী পুলিশ সদস্যবৃন্দ। থ্রি নট থ্রি রাইফেল আর দেশ মাতৃকার প্রতি বাঁধ ভাঙ্গা দেশ প্রেমই ছিল তাদের একমাত্র সম্বল।

বুক চেতিয়ে মোকাবেলা করেছে শত্রুর আক্রমণ এবং শাহাদৎ বরণ করেছেন অকাতরে। এরপর প্রতিরোধের দাবানলে ছড়িয়ে পড়েছে দেশব্যাপী। সারা দেশের ১১ টি সেক্টরে অসীম সাহসিকতায় যুদ্ধ করেছে পুলিশ বাহিনী। ৯ মাস যুদ্ধের পর স্বাধীন হয়েছে আমাদের মাতৃভূমি। দীর্ঘকাল অবজ্ঞা অবহেলা আর স্বীকৃতি না পাওয়া পুলিশ বাহিনীক “ স্বাধীনতা পদক- ২০১১” এ ভূষিত করেছেন বর্তমান সদাশয় সরকার। হাতে গোনা কয়েকজন শহীদ পুলিশ মুক্তিযোদ্ধার নাম বিভিন্ন দলিলে লিপিবদ্ধ হলেও অজানা রয়ে গেছে অনেকেরই নাম। জীবিত অনেক পুলিশ সদস্যই অভিমানে পরিচয় দেননা নিজেদের। যখন আমরা জাতির এই সূর্য সন্তানদের ভুলতে বসেছি, অনাদরে অবহেলায় যখন তারা নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন, ঠিক তখনই পাবনা জেলার পুলিশ সুপার জনাব জিহাদুল কবির, পিপিএম, নিয়েছেন এক অনন্য উদ্যোগ। এ উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার এবং যুগান্তকারী মাইল ফলক।”

বাংলাদেশ পুলিশ হেডকোয়াটার্স ঢাকা এর অ্যাডিশনাল ডিআইজি হাবিবুর রহমান বিপিএম (বার) পিপিএম তার “বাণী” তে লিখেছেন, ‘ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস গৌরবের আর বীরত্বের। দীর্ঘ সংগ্রামের পথ বেয়ে স্বাধীকার আন্দোলনের দাবী পরিণত হয় স্বাধীনতার দাবীতে। মাটি ও মানুষের নেতা, সর্বকালের সর্ব শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতাকামী মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তির সংগ্রামে।

পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠি জানত এই গণজাগরণ মোকাবেলার শক্তি তাদের নেই; তাই তারা বেছে নেয় ষড়যন্ত্র আর মিথাচারের পথ। ইতিহাস সাক্ষী হয় বর্বরতম গণহত্যার। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালীর উপর কাপুরুষের মতো নির্বিচার হত্যাকান্ডে মেতে উঠে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ জাগিয়ে তুলেছিল মুক্তিকামী বাঙালীকে। বাঙালী পুলিশ ও এর ব্যতিক্রম ছিলনা।

রাজারবাগের পুলিশ সদস্যরা ও প্রস্তুত হতে থাকলো, সংগঠিত হলো গোপনে। পাকিস্তানি হানাদাররা জানতো তাদের হত্যাযজ্ঞের সম্ভাব্য বাধা হবে বাঙালী পুলিশ ও ইপিআর। ফলে সবুজ বাংলাকে লাল করারঘৃণ্য উদ্দেশ্য সফল করতে “অপারেশন সার্চ লাইটে” এর নামে প্রথম আক্রমণ করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা ও রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সসহ ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে।
রাজারবাগের বাঙালী পুলিশ সদস্যরা নিজেদের থ্রি নট থ্রি রাইফেল নিয়ে গড়ে তোলেন প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধের। পুলিশ সদস্যরা নিজ নিজ কর্মস্থল ত্যাগ করে বিভিন্নভাবে মুক্তিযুদ্ধের সাথে যুক্ত হন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে নিয়ে অকাতরে প্রাণ দেয় পুলিশের একজন ডিআইজি, চারজন পুলিশ সুপার, একজন অতিঃ পুলিশ সুপার, একজন এসডিপিও, একজন ডিএসপিসহ প্রায় ১১শ-এর অধিক সদস্য।

পাবনা জেলার পুলিশ সুপার জনাব জিহাদুল কবির, পিপিএম পাবনা জেলার পুলিশ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিকথাকে কালি-কলমের বাঁধনে ধরে রাখার প্রয়াস নিয়েছেন। ‘মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের স্মৃতিকথা: প্রেক্ষিত পাবনা’ শিরোনামের বইটি প্রকাশ সেই প্রয়াসের প্রমাণক। এই উদ্যোগ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের দলিলকে আরও সমৃদ্ধ করবে। নতুন প্রজন্ম জানবে সঠিক ইতিহাস, প্রেরণা হবে উন্নয়নমুখী সম্মুখ যাত্রার।’

পাবনা জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার জিহাদুল কবির, পিপিএম, পাবনা জেলায় যোগদান করার পর হতেই বিভিন্নভাবে বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরকে মূলায়ন করে চলেছেন। তিনি বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ৪৬ তম বিজয় দিবস পালনের আমেজে ২০১৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর পাবনা পুলিশ লাইন্স অডিটোরিয়ামে সকাল ১১টায় ‘মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের স্মৃতিকথা: প্রেক্ষিত পাবনা’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন ও পাবনার বীর পুলিশ মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পুলিশ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে সংবর্ধনার জন্য এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।

আমি পাবনা প্রেসক্লাবের একজন সদস্য, সাংবাদিক- কলামিস্ট এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা হওয়ায় পুলিশ সুপার আমাকে উক্ত অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানালে আমি নির্ধারিত সময়ের বেশ কিছু আগেই সেখানে উপস্থিত হলাম। আমাদের সমাজে যে কোন অনুষ্ঠানে বিলম্বে যোগদানের রীতি চালু থাকলেও বীর পুলিশ মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পুলিশ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারবর্গের সদস্যগণ অনুষ্ঠান শুরুর কিছু আগেই সেখানে উপস্থিত দেখে আমার বেশ ভালই লাগছিলো।

যাক একে একে অতিথিবৃন্দ অডিটোরিয়ামে উপস্থিত হলেন। পাবনার নবাগত জেলা প্রশাসক মোঃ জসিম উদ্দিন, পাবনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি রেজাউল রহিম লাল, সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা বাবু চন্দন কুমার চক্রবর্তী, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ পাবনা জেলা ইউনিট কমান্ডের সাবেক কমান্ডার হাবিবুর রহমান হাবিব, সংবাদপত্র পরিষদের সভাপতি আব্দুল মতীন খান, পাবনা পেসক্লাবের সভাপতি শিবজিত নাগ, সহ-সভাপতি আক্তারুজ্জামান আকতার, সাধারণ সম্পাদক আঁখিনুর ইসলাম রেমন, সাবেক সম্পাদক আহমেদ উল হক রানা,‘দৈনিক পাবনার খবর’ এর সম্পাদক এম জি বিপ্লব চৌধুরী, পাবনা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি সাইফুল আলম স্বপন চৌধুরী, সিনিয়র সহ-সভাপতি আলী মর্তুজা বিশ্বাস সনি প্রমুখ।

অপরদিকে পাবনার কৃতি সন্তান বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক আইজিপি বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ মোঃ রুহুল আমিনও অনুষ্ঠানে যোগদান করলেন।

মহান বিজয় দিবস-২০১৭ উপলক্ষে পাবনা জেলার বীর পুলিশ মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পুলিশ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে সংবর্ধনা ও “মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের স্মৃতিকথা: প্রেক্ষিত পাবনা” শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান পাবনার বেড়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছানের সাবলিল উপস্থাপনায় পাবনার পুলিশ সুপার জিহাদুল কবির, পিপিএম এর সভাপতিত্বে শুরু করা হলে উপস্থিত বীর পুলিশ মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পুলিশ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য এবং অতিথি বৃন্দকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়।

পুলিশ লাইন্স জামে মসজিদের পেশ ইমাম কর্তৃক পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সুচনা করা হলে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সকলে দাঁড়িয়ে ১ মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।

মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ কারি বীর পুলিশ মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্য হতে অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বক্তব্য দেন বীর মুক্তিযোদ্ধা কে এম সোহরাব আলী, মোঃ আবুল খায়ের বিশ্বাস ও শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্বাছ আলীর সন্তান।

এরপর সেই মহেন্দ্রক্ষণে “মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের স্মৃতিকথা: প্রেক্ষিত পাবনা” বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। মোড়ক উন্মোচন করেন সকল অতিথিবৃন্দ। সেই সাথে সকলের মাঝে বই বিতরণ করা হয়। ১১৬ পৃষ্ঠার বইটিতে মোট ৫৩জন লেখকের লেখা ছাপা হয়েছে।

বইটিতে বাণী দিয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল এ কে এম শহীদুল হক বিপিএম, পিপিএম, রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি এম খুরশীদ হোসেন, বিপিএম, অ্যাডিশনাল ডিআইজি পুলিশ হেডকোয়ার্টার ঢাকা, হাবিবুর রহমান বিপিএম (বার), পিপিএম ও পাবনার পুলিশ সুপার জিহাদুল কবির, পিপিএম।

পুলিশ সুপার তাঁর বাণীতে বলেছেন, বহতা নদীর মত দিন বয়ে যায়। স্মৃতিগুলো ফিকে হতে থাকে। চেনা মুখ অচেনা হয়ে যায়। অনেক মূল্যে কেনাবাংলার ইতিহাস তবে কি স্মৃতির অতলে হারিয়ে যাবে? এই প্রশ্নটাই বার বার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। এরপর থেকেই একাত্তরের বীর সেনানীদের খুঁজে বের করা আমার নেশায় পরিণত হয়।

চাকুরির পাশাপাশি দেশের বীর সন্তানদের আমি খুঁজতে থাকি। কর্মস্থলের আশেপাশে পুলিশ মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করে তাঁদের স্মৃতি কথাকে লিপিবদ্ধ করতে থাকি। এরই ধারাবাহিকতায় প্রকাশিত হতে যাচ্ছে ‘মুক্তিযদ্ধে পুলিশের স্মৃতিকথা: প্রেক্ষিত পাবনা’।আমি গর্বিত যে এবছরই ইউনেস্কো জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে ‘মেমোরি অব দ্যা ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার’ এ অন্তর্ভূক্ত করেছে। এমন মহেন্দ্রক্ষণে আমার ক্ষুদ্র প্রয়াস হয়তো তরুন প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানতে সাহায্য করবে।

মূলত আমার বইটিতে আমি পাবনা এলাকার পুলিশ মুক্তিযোদ্ধাদের না বলা কথাগুলোকে তুলে এনেছি। শব্দের বেড়াজালে বাক্যের অবয়বে কথার চাতুর্যে কোন রূপকথাকে আমি রূপায়িত করিনি। বইটিতে ঠিক তাই লেখা হয়েছে, যা বীর যোদ্ধারা বলেছেন। হোক না অগোছালো, তবু ও তো তা অকৃত্তিম অবিনশ্বর।

যুদ্ধকালিন সময়ের বিভীষিকাময় ঘটনার পাশাপাশি উঠে এসেছে দেশের প্রতি প্রগাঢ় ভালবাসার গাঁথা। একদিকে যেমন রয়েছে স্বজন হারানোর বেদনা, তেমনি অন্যদিকে রয়েছে শোষনের নাগপাশ চ্ছিন্ন করার উল্লাস। সব মিলিয়ে পুলিশ পরিবারের যুদ্ধকালিন অম্লমধুর স্মৃতিগাঁথা এই বইটি। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পেরিয়ে গেছে, মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই আজ আর নেই।জীবিতরা বয়সের ভারে ন্যূজ হয়ে পড়েছেন। আর কটা দিন গেলে হয়তো ইতিহাস শোনাবার আর কেউই থাকবেননা আমাদের মাঝে। তখন তাঁদের হয়ে এ বইটি কথা বলবে। প্রেরণা যোগাবে আগামীর যোদ্ধাদের। পরিশেষে তিনি বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সকল বীর সেনানী, বীরাঙ্গনা ও তাঁদের নির্যাতিত স্বজনদের প্রতি জানাচ্ছি আমার সশ্রদ্ধ সালাম। আর যারা এই বইটি প্রকাশনার সাথে জড়িত ছিলেন তাদেরকে জানাচ্ছি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা। মুক্তির চেতনায় জেগে উঠুক সকলের প্রাণ।’

বইটিতে মোট ৫৩ জন লেখকের স্মৃতিকথা স্থান পেয়েছে। সকলেই মুক্তিযুদ্ধকালিন নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন সহজ ভাষায়। সকলের রচনাই হৃদয়গ্রাহী। তন্মধ্যে আব্দুল আজিজ মন্ডলের ‘অনেক দামে কেনা স্বাধীনতা,’ শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্বাস আলীর ‘আমি প্রাণ দিয়েছি, তোমরা শান্তি দাও’, মোঃ মজিবর রহমানের ‘১৯৭১ সালে ২৫শে মাচের্র কাল রাতে পাবনা পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা’, বীর মুক্তিযোদ্ধা মাজেদ আলীর‘ভোলা যায়না যে স্মৃতি’, মাহানুর বেগমের ‘মুক্তিযোদ্ধা স্বামী আমার গর্ব’, কাজী মোঃ আব্দুর রহমানের ‘যুদ্ধ দিনের কথা’, বীর মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবাদত আলীর‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ (বীরত্ব অবিনশ্বর) এর শুভ উদ্বোধন ও কিছু কথা’, মোঃ আবুল খায়ের বিশ্বাসের‘আমি যখন যুদ্ধে ছিলাম’, জয়নাল আবেদীনের ‘সুজানগর থানা অপারেশন’, আলী আকবরের ‘পাবনা পুলিশ লাইন্স আক্রমণ’, হোসেন আলীর ‘আমি ভাগ্যবান আমি মুক্তিযোদ্ধা’, আনিসুর রহমানের ‘রক্তের দামে কিনেছি এ দেশ’এবং আব্দুস সাত্তারের ‘বলবো সেই স্মৃতিকথা’

লেখাগুলো উল্লেখ করার মত। বইটি সম্পাদনা করেছেন, পাবনার বেড়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান ও লেখক ও সাংবাদিক এমজি বিপ্লব চৌধুরী।

প্রধান পৃষ্ঠপোষক পাবনার পুলিশ সুপার জিহাদুল কবির পিপিএম, কৃতজ্ঞতা স্বীকারে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) গৌতম কুমার বিশ্বাস, জেলা বিশেষ শাখার ডিআইও (১) সাকিল উদ্দিন আহমেদ ও আটঘরিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম।

সহযোগিতায় পাবনা ধ্রুব কন্সট্রাকশন লিমিটেড এর স্বত্বাধিকারী স্বপন চৌধুরী। অক্ষর বিন্যাসে কনস্টবল/১১৯০ মোঃ জাকির হোসেন জেলা বিশেষ শাখা ও কনস্টবল/৬৬৭ মোঃ সালাউদ্দিন পুলিশ লাইন্স পাবনা।

প্রচ্ছদ এঁকেছেন পাবনা জেলা বিশেষ শাখার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, মোছাঃ শামিমা আক্তার। বইটির প্রকাশ কাল ডিসেম্বর ২০১৭ খ্রিঃ। স্বত্ব ও প্রকাশনায় জেলা পুলিশ , পাবনা।

এরপর বীর পুলিশ মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পুলিশ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের ১১৩ জন সদস্যকে সংবর্ধনা জানানো হয় এবং তাঁদের হাতে বিশেষ উপহার তুলে দেয়া হয়। অতিথিবৃন্দের শুভেচ্ছা বক্তব্য এবং সভাপতির সমাপনি বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের ইতি টানা হয়। শেষ পর্বে উপস্থিত সকলকে মধ্যাহ্ন ভোজে আপ্যায়িত করা হয়।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।


    পাবনায় নামাজের সময়সূচি
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ০৪:১৩
    সূর্যোদয়ভোর ০৫:৩৫
    যোহরদুপুর ১২:০২
    আছরবিকাল ১৬:৩৭
    মাগরিবসন্ধ্যা ১৮:৩০
    এশা রাত ২০:০০
© All rights reserved 2019 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!