রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৬:২৪ অপরাহ্ন

মেহেরপুরের মুজিব নগর- স্বাধীন বাংলার প্রথম সরকার

।। এবাদত আলী।।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ হানাদার পশ্চিম পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালি নিধনের জন্য “অপারেশন সার্চলাইট” নামে নীলনকশার মাধ্যমে অতর্কিতে গণহত্যা শুরু করে। তৎকালিন পুর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকার পিলখানা, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশে তারা নির্বিচারে গণহত্যা চালাতে থাকে।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করতে গিয়ে
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয় এবং বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে ঐ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বন্দি করে এবং পরে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়।

২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এই ঘোষণায় তিনি পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সংগ্রামের জন্য বাংলার জনগণকে আহবান জানান। স্বাধীনতার এই ঘোষণা তৎকালিন ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলস এর ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে প্রচারের জন্য পাঠানো হয়।

২৬ মার্চ চট্রগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাকে অবলম্বন করে চট্রগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতা এমএ হান্নান স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। ২৭ মার্চ অপরাহ্নে চট্রগ্রাম কালূরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে অষ্টম ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু শেথখ মুজিবের পক্ষে স্বাধীনতার আরেকটি ঘোষণা পাঠ করেন।

এই ঘোষণাটিতে তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে। তিনি আরো উল্লেখ করেন যে, নবগঠিত এই রাষ্ট্রের সরকার জোটবদ্ধ না হয়ে বিশ্বের অপর রাষ্ট্রগুলোর সাথে বন্ধুত্বপুর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টিতে আগ্রহি।এছাড়াও এ ঘোষণায় সারা বিশ্বের সরকারগুলোকে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলারও আহবান জানানো হয়।

বাঙালিরর অধিকার আদায়ে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এই যুদ্ধকে তরাম্বিত করার লক্ষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ১০ এপ্রিল তারিখে মুজিব নগর সরকার গঠন করা হয় এবং ১৭ এপ্রিল মুজিব নগরে শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্টপতি করে গঠিত সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল ভারতের আগরতলায় এক বৈঠকে ২৮ জন এম পির উপস্থিতিতে সর্বপ্রথম বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয় এবং পাকিস্তানি বাহিনীর নিয়ন্ত্রন মুক্ত কুষ্টিয়া জেলার সীমান্তবর্তী মহকুমা শহর চুয়াডাঙা অথবা মেহেরপুর শহরকে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী ঘোষনা করার সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়। ঐ বৈঠকে ১৪ এপ্রিল অস্থায়ী সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

কিন্তু এই গোপন সংবাদ বিদেশী সাংবাদিকরা জেনে ফেলায় দেখা দেয় বিপত্তি। আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে এ সংবাদ প্রচারের পর পরই চুয়াডাঙা শহর পাক বাহিনীর টার্গেটে পরিণত হয়।

পাকিস্তান বিমান বাহিনীর জঙ্গি বিমান থেকে চুয়াডাঙার উপর ব্যাপক ভাবে বোমা হামলা চালাতে থাকলে ১৫ এপ্রিল চুয়াডাঙা পাকিস্তানি বাহিনীর নিয়ন্ত্রনে চলে যায়। সে কারণে বাধ্য হয়েই শপথ গ্রহনের তারিখ ১৪ এপ্রিলের পরিবর্তে ১৭ এপ্রিল নির্ধারণ করা হয়।

আর স্থান নির্বাচন করা হয় মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথ তলার আম্রকাননে। এ দিন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধূ শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে গঠিত সরকারের শপথ গ্রহন অনুষ্ঠিত হয়।
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী হলেন তাজ উদ্দিন আহমেদ। ঐতিহাসিক এই আম্রকাননে দেশ-বিদেশের সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে এক অনাড়ম্বর অথচ মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীসভার সদস্যদেরকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।

ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে অর্থ দপ্তরের মন্ত্রী, এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে স্বরাষ্ট্র-ত্রান ও পুনর্বাসন মন্ত্রী, খন্দকার মোস্তাক আহমদকে পররাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রী এবং এম এ জি ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করা হয়। চীপ অফ ষ্টাফ হিসেবে আবদুর রবের নাম ঘোষণা করা হয়।

এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে দিনাজপুর হতে নির্বাচিত গণপরিষদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারী পার্টির চীপ হুইপ অধ্যাপক ইউছুফ আলী বিপ্লবী সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। এ সময় প্রায় শতাধিক দেশি- বিদেশী সাংবাদিক ও আশে পাশের এলাকার প্রায় হাজার পাঁচেক ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। নাতিদীর্ঘ এই অনুষ্ঠানে আনসার ও ই পি আর বাহিনীর দু টি পৃথক প্লাটুনের কাছ থেকে প্রথমে উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম অভিবাদন গ্রহণ করেন। সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশিত হয়। এর পর পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী তাজ উদ্দিন আহমেদ কুষ্টিয়া জেলার মেহের পুর মহকুমার বৈদ্যনাথ তলার ভবেরপাড়া গ্রামের নাম পরিবর্তন করে মুজিবনগর নাম করন করেন। গার্ড অব অনারের নেতৃত্বে ছিলেন ঝিনাইদহের তৎকালীন এস ডি পি ও মাহবুব উদ্দিন আহমেদ। অনুষ্ঠানের স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় ছিলেন মেহের পুর মহকুমার তদানিন্তন এস ডি ও তৌফিক ই-এলাহী চৌধুরী। সার্বক্ষণিক সহযোগিতায় ছিলেন ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের অধ্যাপক শফিকুল্লাহ। অনুষ্ঠান পরিচালনার সামগ্রিক দায়িত্বে ছিলেন টাংগাইল থেকে নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্য এ্যাডঃ আবদুল মান্নান।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর এই মুজিব নগরে একটি স্বাধীনতার স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে।

(লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।


    পাবনায় নামাজের সময়সূচি
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ০৪:২৯
    সূর্যোদয়ভোর ০৫:৪৭
    যোহরদুপুর ১১:৫১
    আছরবিকাল ১৬:১৪
    মাগরিবসন্ধ্যা ১৭:৫৫
    এশা রাত ১৯:২৫
© All rights reserved 2019 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!