বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৫:১৩ পূর্বাহ্ন

রফিকুন নবীর শিল্পভুবন

বাংলাদেশে শিল্পকলা জগতের অনন্য এক নাম রফিকুন নবী। সংক্ষেপে তার পরিচিতি রনবী হিসেবে। চিত্রকলার বিভিন্ন মাধ্যমে তার অনবদ্য কাজ ইতিমধ্যে কালের খাতায় স্থান করে নিয়েছে। কার্টুন সিরিজ টোকাইয়ের স্রষ্টা রনবীর ৭৫তম জন্মদিন আগামী ২৮ নভেম্বর। জন্মদিনের প্রাক্কালে তার শিল্পভুবন নিয়ে লিখেছেন দীপ্তি দত্ত

একজন মানুষ ও তার কর্মের মধ্যে সমন্বয়সাধন ও তা বোঝার চেষ্টা একটা চলমান প্রক্রিয়া যা কখনও পূর্ণাঙ্গ নয়। এই সত্য মেনে নিয়েই আমরা শিল্পী রফিকুন নবীর সঙ্গে কিছুক্ষণ সময় কাটাব। তবে প্রথমেই বলে রাখছি, এই নিমন্ত্রণ যারা ইতিমধ্যেই শিল্পীর শিল্পসত্তার সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন তাদের জন্য। এর বাইরে কাউকে যদি এই লেখা ব্যক্তি শিল্পীর সঙ্গে পরিচিত হতে সাহায্য করে বা একটি শিল্পসত্তার নির্মাণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে আগ্রহী করে, তবে সেখানে নন্দিত হবে পাঠকের সদগুণ। শিল্পী রফিকুন নবীর শিল্পকর্ম বোঝার মাধ্যমে বুঝতে চেষ্টা করব তার ব্যক্তিসত্তাও, যা হয়তো তার শিল্পী জীবনের একটি নির্দিষ্ট সময় পরে কর্ম ও ব্যক্তিসত্তা একে অন্যের ওপর প্রভাব রেখেছে।

-চাক্ষুষ পরিবেশীয় নিয়ন্ত্রণবাদ (Physical Environmental Determinism)

-আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক রাজনীতি

-দৃশ্যশিল্পের ভাষা ও নন্দনতত্ত্ব

এই তিনটি বৈশিষ্ট্য অনুসরণে আমরা শিল্পী রফিকুন নবীর শিল্পসত্তা বোঝার চেষ্টা করব।

শিল্পী রনবী তার ছবির একাধিক শ্রেণি নির্মাণ করেছেন। রনবী পরিচয়কে চিহ্নিত করতে বা বোঝাতে তিনি প্রথমদিকে খুবই স্পষ্টভাবে ছবিকে দুটি শ্রেণির মধ্যে ফেলেছেন- মূলধারার ছবি এবং মূলধারার বাইরের ছবি। মূলধারার ছবির বৈশিষ্ট্য তাই আমাদের প্রথম আলোচ্য বিষয়।

রনবীর চিত্রে কতকগুলো সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। যে বৈশিষ্ট্যগুলো বাংলাদেশের শিল্প ইতিহাসে শিল্পী রফিকুন নবীকে স্বাক্ষরশৈলীসম্পন্ন শিল্পীর মর্যাদা দিয়েছে। তিনি তার ছবির ভাষা নির্মাণ করার ক্ষেত্রে অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছেন। চিত্রতলের পরিকল্পনা ও তার বিভাজন অত্যন্ত পরিকল্পিত। যে পরিকল্পনা আমরা পশ্চিমা রেনেসাঁর শিল্পবিদ্যালয়ে দেখতে পাই। রেনেসাঁর ছবির পরিকল্পিত পরিসর কতকগুলো অনুভূমিক ও উল্লম্ব রেখার সমষ্টি। যেখানে মানুষ ও মানুষের অর্জনের আখ্যান দৃঢ়। আপনি রেনেসাঁর মৌলিক বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত চিত্রমালা দেখার সময় কোনোভাবেই শুধু মানুষের দিকে দৃষ্টি সীমিত রাখতে পারবেন না। আপনি দেখবেন স্থাপত্য, স্থাপত্যের মধ্য দিয়ে সে অঞ্চলের মানুষের জ্ঞান ও গরিমা। এই জ্ঞান-গরিমায় প্রকাশিত হয়েছে একটি অঞ্চলের মানুষের অর্জন। যে অর্জন ‘অন্য’ ধারণা নির্মাণের মধ্য দিয়ে ঔপনিবেশিক ক্ষমতাকে সুসংহত করেছে। তাই রেনেসাঁর ছবিতে ভূমি বা ভূ-দৃশ্য গুরুত্ব পায়নি। ভূমি অন্তরালে থেকেছে অর্জনের শক্তিধারকদের পরিচায়ক হয়ে।

মানুষের অর্জনের সঙ্গে ভৌগোলিক এই সম্পর্ক নির্ণয়ের সূত্রটিকেই ভূতত্ত্ববিদরা চিহ্নিত করে থাকেন চাক্ষুষ পরিবেশীয় নিয়ন্ত্রণবাদ হিসেবে। এই তত্ত্ব প্রাচীন গ্রিসবাসীর মধ্যে মজুদ ছিল। তারা বিশ্বাস করত তাদের অঞ্চলের পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য বিশেষ, যা সেই অঞ্চলের মানুষের সর্বোচ্চ অর্জনের জন্য যথাযথ। যার সঙ্গে জাতীয়তাবাদী ও বর্ণবাদী ধারণাও লেপ্টে থাকে। জাতীয়তাবাদী ধারণা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে আমরা পরিবেশীয় নিয়ন্ত্রণবাদের প্রভাব অন্য প্রায় সব দেশের মতো বাংলাদেশের সাহিত্য, রাজনীতিতে দেশপ্রেম নির্মাণের ভাষায় ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করব। তারই সুস্পষ্ট বয়ান-

‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি,
সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি,
সে যে আমার জন্মভূমি, সে যে আমার জন্মভূমি’
এই বয়ান পুনঃ পুনঃ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে এখনও সজীব। দেশমাতৃকার রূপনির্মাণে গানে, কবিতায় যেসব রূপকল্প চিত্রিত হয়েছে, সেখানে ভূমির গল্পই প্রধান। এই ভূমির রূপ বা ভূদৃশ্য সাহিত্যের তুলনায় দেশভাগের পরে শুরু হওয়া আধুনিক দৃশ্যশিল্পের আন্দোলনে সেই অনুপাতে জায়গা করে নিতে পারেনি। এ দেশে ভূদৃশ্য যা আঁকা হয়েছে বা হয়, তা মূলত মূলধারার শিল্পভাবনা থেকে নয়। জলরঙে আঁকা এসব ছবি যতটা না ‘ধন ধান্য পুষ্পে ভরা বসুন্ধরা’র গল্প বলতে চায় তার চেয়ে বেশি প্রতিষ্ঠিত করে ব্রিটিশের ঔপনিবেশিক চোখে দেখা স্যুভেনিয়র ধারণাকে।

আমরা রনবীর মূলধারার ছবির দিকে তাকালে দেখব তিনি তার ছবিতে চাক্ষুষ পরিবেশীয় নিয়ন্ত্রণবাদকে অস্বীকার করেছেন। অন্তত সাহিত্যের মতো দৃষ্টিগ্রাহ্য কোনো প্রমাণ তার ছবিতে নেই। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, গাণিতিকভাবে বিভাজিত পরিসরকে নিয়ে তিনি কী করতে চেয়েছেন? তিনিও কি রেনেসাঁর মতো মানুষের অর্জনের গল্প বলেছেন?

এখানে শিল্পী পশ্চিমাদের অর্জন ধারণা থেকে পৃথক হয়ে যান। তিনি পশ্চিম থেকে দৃশ্যশিল্পের ভাষা নির্মাণের জ্ঞানকে গ্রহণ করলেও মানুষের অর্জনের আখ্যান তিনি নির্মাণ করতে পারেন না বা করেন না। তিনি কোনো স্থাপত্যের মধ্যে মানুষের দঙ্গল প্রবিষ্ট করিয়ে জ্ঞানের অহমিকাও হাজির করেন না। তার ছবিতে এমনকি সার্বভৌমত্বের ধারণায় জাতীয়তাবাদও নয়, নিজ জ্ঞাতি বা গোষ্ঠীর মানুষ আঞ্চলিক অর্থে স্থান পেয়েছে। তার ছবিতে মানুষের অর্জন নয়, মানুষই স্বয়ং একটি স্থাপত্য কাঠামো হয়ে উঠতে থাকে। আর এই প্রক্রিয়ায় তিনি নির্মাণ করতে থাকেন চাক্ষুষ পরিবেশীয় নিয়ন্ত্রণবাদকে।

কীভাবে? একটু স্বচ্ছ করি। তার সব ছবিতেই মূলত আমরা জড়জীবনের একটি শিল্পআঙ্গিক লক্ষ্য করি। এই জড়জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক আছে অবসর সময়ের। অবসর সময় ও জড়জীবন যে পারস্পরিক ধারণা বিনিময় করতে পারে এই কথাটিই শিল্পী রফিকুন নবী তার ছবির মধ্য দিয়ে আমাদের জানান দেন। ফলে তার ছবিতে একদল শ্রমজীবী মানুষের অবসর, অলস বা আরামপ্রিয় সময়টি জড়জীবন হিসেবে চিত্রিত হতে হতে একটি আঙ্গিকে রূপ নিয়েছে, যা এই অঞ্চলের নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া ও নদীমাতৃক উর্বর ভূমির পরিণাম তথা প্রভাব হিসেবে দেখা হয়ে থাকে।

এবার আসি দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যে। রনবীর যে সময়কালে বেড়ে উঠেছেন, মনন ও ব্যক্তিসত্তাকে নির্মাণ করেছেন, সে সময়কে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এককভাবে পরিবেশীয় প্রভাব দিয়ে যদি আমরা শিল্পীর মতে ব্যাখ্যাত তার মূল শিল্পকর্ম ব্যাখ্যা করি, তবে মূলধারা থেকে বিচ্যুতির কারণ, রনবীর জন্ম, তার লেখক সত্তার জন্ম ইত্যাদি বৈচিত্র্যপূর্ণ বিচ্যুতিকে ব্যাখ্যা করতে সে সময়ের বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতেই হবে এবং শিল্পীর দেওয়া নানান ভাষ্যে আমরা বিচরণ করলে তার সুস্পষ্ট বয়ান এ কথা নিশ্চিত করে যে, এই বৈচিত্র্যপূর্ণ বিচ্যুতি মূলত সময়ের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তাহলে বরং প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, শিল্পীর মূলধারার কাজ কী তার নিজস্ব সময়ের থেকে বিচ্যুত?

এই প্রশ্নে উত্তর আমরা তৃতীয় বৈশিষ্ট্যের আলোচনার মধ্য দিয়ে পাওয়ার চেষ্টা করব। শিল্পী তার ছবির ভাষা তৈরিতে বিশেষ সচেতন। তার ছবি দেখতে দেখতে অনেক সময়ই আমার মনে হয় ‘কম্পোজিশন’ তার ছবির মূল বিষয়বস্তু। তারপর সেখানে তিনি তার পরিচিত কিছু বস্তু বা রূপ বসিয়ে দেন। ফলে অনেক ছবিতেই মনে হয়, রূপ যদি অস্বীকার করা হয় তার ছবিতে তাতেও তার ছবির তেমন ক্ষতি বৃদ্ধি হবে না। এই যে রূপ অস্বীকারের একটি প্রবণতা কিন্তু শেষ পর্যন্ত করতে পারেন না, তার সঙ্গে তার সময় ও সময়ের চরিত্র যুক্ত হয়ে আছে। তার সঙ্গে যুক্ত আছে দৃশ্যশিল্পের ভাষার বাজার ও দর্শকের শিল্পপাঠের রাজনীতি। তাই শিল্পী রফিকুন নবীর মধ্যে রনবীকে মিলিয়ে নিতে দেখি এক সময় শিল্পীকে। রনবী আত্তীকৃত হয় রফিকুনের মধ্যে। যার সঙ্গে সঙ্গে শিল্পভাষার সঙ্গে সময়ের চরিত্রের, মূলধারার সঙ্গে অমূলধারারও আত্তীকরণ ঘটে। আর এর মধ্য দিয়ে আমরা বুঝতে পারি শিল্পী স্থবির নন, তিনি সময়ের পরিবর্তনকে স্বীকার করেন ও পরিবর্তিত হন। শিল্পভাষার সঙ্গে সময়ের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সম্পর্কের সমীকরণও শিল্পী স্বীকার করেন ‘বদলায়নি কিছুই’ এর হতাশা, টোকাইয়ের পুনরাবৃত্তিমূলক প্রয়োজনীয়তার কথা বলে। ফলে পোস্টারে একই ধরনের স্লোগান যেমন শিল্পীর মতে সাতচল্লিশের দেশভাগের পর থেকে এখনও প্রাসঙ্গিক, প্রাসঙ্গিক টোকাই-দর্শনও, যার বদল ঘটেনি। ফলে শিল্পীর শিল্পসত্তা তখন

বাধাপ্রাপ্ত হয়। এই বাধার মধ্যে সময়ের ও শিল্পীর নিজস্ব প্রাসঙ্গিকতার সঙ্গে শিল্পসত্তার অগ্রযাত্রার পরিপূরক সম্বন্ধটিই ধরা পড়ে। তাই রনবী ভিন্ন ভিন্নম্ন মাধ্যমে অপরিবর্তিত সময়কে ব্যক্ত করতে উদ্যোগী হয়েছেন। যে কোনো সৃষ্টিশীল মানুষের অগ্রযাত্রার এটাই মূল সূত্র। ফলে রফিকুন নবীর বৈচিত্র্যপূর্ণ শিল্পচর্চা কোনোটাই আমাদের শেষ পর্যন্ত বিচ্যুতির গল্প বলে না। মানুষের সম্ভাব্য সব সৃষ্টিকর্মের অখণ্ড আখ্যান তৈরি করে বরং তা আমাদের বিচ্ছিন্নতা বোধকে প্রতিরোধ করতে উদ্দীপ্ত করে।


বিজয় নিশান উড়ছে ঐ…

© All rights reserved 2018 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!