রবিবার, ১৬ জুন ২০১৯, ১১:৪০ পূর্বাহ্ন

সংগ্রাম, ঐতিহ্য ও গৌরবের ৭১ বছরে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

 

।। আমিরুল ইসলাম রাঙা ।।

বাঙালী, বাংলা, স্বায়ত্তশাসন এবং স্বাধীনতার স্বপ্ন প্রতিষ্ঠার কারিগর হলো ছাত্রলীগ। বাঙালী জাতির স্রষ্টা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলতেন ছাত্রলীগ মানে স্বাধীনতা – ছাত্রলীগ মানে বাংলাদেশ।

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারী পাকিস্তান সৃষ্টির সাড়ে ৪ মাসের মধ্যে বাঙালী জাতির অধিকার এবং মুক্তির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল প্রাঙ্গনে নাইম উদ্দিন আহমেদকে আহবায়ক করে প্রথম কমিটি গঠিত হয়। পরবর্তীতে দবিরুল ইসলামকে সভাপতি এবং খালেক নেওয়াজ খানকে সাধারন সম্পাদক করে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের পূর্নাঙ্গ কমিটি গঠিত হয়। এরপর ছাত্রলীগ ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত ভাষা আন্দোলন, ৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬২ সালের শিক্ষা কমিশন আন্দোলন, ৬৬ সালের স্বায়ত্তশাসনের দাবীতে ৬ দফা ও ১১ দফা আন্দোলন, ৬৮ থেকে ৬৯ সালের গনঅভ্যুত্থান, ৭০ এর জাতীয় নির্বাচন এবং ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রলীগের অগ্রনী ভূমিকা ইতিহাসে স্বর্নাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে।

ঐতিহ্যবাহী ছাত্রলীগকে এদেশের রাজনৈতিক দলসমূহের জনক বলা হয়। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারী ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার প্রায় দেড় বছর পর ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল হিসেবে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রসঙ্গগত উল্লেখযোগ্য যে, পাকিস্তান সৃষ্টির পর বাঙালীদের অধিকার আদায়ের দাবীতে ছাত্রলীগের পরে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। ঠিক ২৪ বছর পর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২ সালের ২১ জুলাই কেন্দ্রীয় সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগ বিভক্ত হয়। মুজিববাদ এবং বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবীতে ছাত্রলীগ বিভক্ত হলে ৩১ শে অক্টোবর বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রপন্থীরা জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ( জাসদ) গঠন করে।

ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সময়কালে দুইবার সংগঠনের নাম পরিবর্তন করতে হয়েছে। ১৯৫৫ সালে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্ধুদ্ধ হয়ে ছাত্রলীগ সংগঠন থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়। সেই থেকে সংগঠনের নামকরন হয়, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ। এরপর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে সংগঠনের নাম রাখা হয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগ মূলতঃ আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন হলেও বর্তমান ছাত্রলীগ বহুধারায় বিভক্ত। আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন হিসেবে বর্তমানে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও স্বাধীনোত্তর প্রভাবশালী জাসদের সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ আজ ম্রিয়মান। জাসদ এখন ত্রিধারায় বিভক্ত হওয়ায় ছাত্র সংগঠনগুলি ৩ ধারায় চলছে। জাসদ ( ইনু) সমর্থকরা বাংলাদেশ ছাত্রলীগ – জাসদ, জেএসডি ( রব) সমর্থকরা বাংলাদেশ ছাত্রলীগ – জেএসডি এবং বাংলাদেশ জাসদ ( আম্বিয়া) সমর্থকরা বাংলাদেশ ছাত্রলীগ – বিসিএল নামে সংগঠনগুলির কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। স্বাধীনতার আগে একবার ছাত্রলীগের ভাঙ্গন হয়েছিল। ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী এবং আল মুজাহিদরা একবার ছাত্রলীগ ভেঙ্গে বাংলা ছাত্রলীগ করেছিলেন। স্বাধীনতার পরে মুজিববাদী ছাত্রলীগ ভেঙ্গে শফিউল আলম প্রধান ছাত্রলীগ ( জাগপা) করেছিলেন।

১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার পর ৫২ এর ভাষা আন্দোলন এবং ৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের সল্পকালীন ক্ষমতা থাকা পর্যন্ত সংগঠনটি গোটা পূর্ব পাকিস্তানে এককভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৫৭ সাল হলো ছাত্রলীগের বিপর্যয়ের বছর। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী টাঙ্গাইলের কাগমারী সম্মেলনে আওয়ামী লীগ থেকে বের হয়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ( ন্যাপ) গঠন করলে ছাত্রলীগের উপর বিরুপ প্রভাব পড়ে। ন্যাপপন্থী ছাত্র নেতারা ছাত্রলীগ ত্যাগ করে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন গঠন করেন। এরপর ৫৮ থেকে জেনারেল সাঈদ এস্কেনদার এবং জেনারেল আইয়ুব খানের দীর্ঘ ১০ বছরের সামরিক শাসন এই অঞ্চলে রাজনীতি এবং সামাজিক অবস্থার উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সামরিক শাসনকালে পাকিস্তানি শাসকরা আওয়ামী লীগ এবং দলের নেতৃবৃন্দের উপর চরম নির্যাতন শুরু করে। আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমানের উপর ব্যাপক নিপীড়ন করে। বার বার তাঁকে আটক করে জেলখানায় আটক রাখা হয়। ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৫/১৬ বার আটক করা হয়েছিল। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা ঘোষনার পর শেখ মুজিবুর রহমানকে ৬৯ সাল পর্যন্ত্য আটক রেখে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়। তথাকথিত ঐ মামলায় প্রায় ৩৫ জন সামরিক ও বেসামরিক বাঙালী অফিসারকে আসামী করা হয়েছিল।

১৯৬২ থেকে ১৯৭১ সাল হলো ছাত্রলীগের গৌরবজ্জল সময়কাল। যা বাঙালীর রাজনৈতিক ইতিহাসে চীর অম্লান হয়ে আছে। এই সময়কালে ছাত্রলীগের ভূমিকাকেই বলা হয় – ছাত্রলীগ মানে স্বাধীনতা, ছাত্রলীগ মানেই বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশ সৃষ্টির অনেক ঘটনা এখনো অন্ধকারে নিমজ্জিত। তেইশ বছরের স্বপ্ন আর ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে এই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট পাকিস্তান সৃষ্টির সময়েই বাঙালী জাতির মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমান স্বপ্ন দেখেছিলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের। ১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে সেই স্বপ্ন নিয়ে কাজ করতে থাকেন। উনি প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের ব্যানারে বাঙালীর মুক্তি সংগ্রাম নিয়ে রাজনীতি করলেও নেপথ্যে তিনি পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করতে থাকেন। সামরিক – বেসামরিক বাঙালী কর্মকর্তাদের তিনি রিক্রুট করেন। রাজনৈতিক ভ্যানগার্ড হিসেবে ছাত্রলীগকে বেছে নেন। ১৯৬২ সালে নিউক্লিয়ার্স বাহিনী গঠন করেন। এই বাহিনীর নেতৃত্ব দেন, জনাব সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, কাজী আরেফ আহমদ, আব্দুর রাজ্জাক প্রমুখ। পরবর্তীতে এই বাহিনীতে সংযুক্ত হন, তোফায়েল আহমেদ, আ স ম আব্দুর রব, শাহজাহান সিরাজ, শরীফ নুরুল আম্বিয়া, হাসানুল হক ইনু প্রমুখ। মুলতঃ ১৯৬২ সালেই নিউক্লিয়ার্স বাহিনী গঠন করে স্বাধীনতার বীজ বপন করা হয়।

১৯৬৬ সালে ৫ ফেব্রুয়ারী তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা ঘোষনা করেন। ঐ বছরের ৬ জুন তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে শেখ মুজিবুর রহমান সহ ৩৫ জনকে আসামী করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়। ৬৬ থেকে ৬৯ সাল পর্যন্ত ছাত্র, শ্রমিক এবং সর্বস্তরের জনগন ঐক্যবদ্ধ হয়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। তীব্র গন অভ্যুত্থানে ১৯৬৯ সালে ২২ ফেব্রুয়ারী জেনারেল আইয়ুব খানের ১০ বছরের শাসনের অবসান হয়। জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা গ্রহন করেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিব সহ সকল বন্দীকে মুক্তি দেওয়া হয়। পরেরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারী রেসকোর্স ময়দানে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আয়োজিত রাজবন্দীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তৎকালীন ডাকসু’র ভিপি তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে ” বঙ্গবন্ধু ” উপাধিতে ভূষিত করেন।

১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ একদিকে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি এবং অন্যদিকে স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগেই ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় ” জয় বাংলা ” শ্লোগান সহ ” আমি কে তুমি কে বাঙালী বাঙালী ” আমার তোমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যুমনা, ” ঢাকা না পিন্ডি, ঢাকা ঢাকা ” শ্লোগান গুলি অনুমোদন করেন । বঙ্গবন্ধু কর্তৃক গঠিত নিউক্লিয়ার্স নেতৃবৃন্দ ছাত্রলীগের জেলা কমিটি সমুহে স্বাধীনতার আন্দোলনের পক্ষে জনমত গঠনের নির্দেশ প্রেরন করেন। বঙ্গবন্ধু ধারনা করেছিলেন, পাকিস্তানি সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া যদি নির্বাচন না দেয় কিংবা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে তাহলে বাঙালীরা সশস্ত্র লড়াই করে তাদের পরাস্ত করবে। বঙ্গবন্ধু জানতেন, জনগন সংগঠিত হলে ১২ শত মাইল দুর থেকে পাকিস্তানিরা এসে বাঙালীদের সাথে লড়াই করে পারবে না। বঙ্গবন্ধুর দুরদর্শি চিন্তার প্রকাশ কিছুদিনের মধ্য পাওয়া গেল।

১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচন এবং ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষনা হলো। বঙ্গবন্ধু তার কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে জেলা এবং থানায় সাংগঠনিক সফরে বের হলেন। নির্বাচনের ৩ মাস আগে জেলা সফরে এসে সংগঠনের করুন অবস্থা দেখে নেতৃবৃন্দ হতাশ। এই পর্যায়ে আমার নিজের জেলা পাবনায় বঙ্গবন্ধু এলেন। এখানে দুইদিনের সফরে এসে বঙ্গবন্ধু দেখেন, পাবনায় জেলা শহর এবং ঈশ্বরদী থানা শহর ব্যতিত আর কোন থানায় আওয়ামী লীগের কমিটি নাই। কিছু থানায় দুই একজন নেতাকর্মী থাকলেও সেখানে আওয়ামী লীগের কমিটি নাই। পাবনার ৩ টি জাতীয় পরিষদ আসন এবং ৫ টি প্রাদেশিক পরিষদ আসনের মধ্য জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং সাধারন সম্পাদক ব্যতিত সবাই নুতন মুখ। অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে উল্লেখ করার কারন হলো, পাবনায় তখন আওয়ামী লীগ থেকে বহুগুন শক্তিশালী সংগঠন হলো ছাত্রলীগ। আর বঙ্গবন্ধুর ভরসা সেখানেই। উনি জানতেন আমার ছাত্রলীগ যা পারবে তা আওয়ামী লীগ বা অন্যদল পারবে না।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ হলো ন্যাপ ( মোজ্জাফর) এর কুঁড়েঘর, জামায়াতে ইসলামীর দাড়িপাল্লা আর ক্ষয় হওয়া মুসলিম লীগের কিছু নেতা। নির্বাচনের ঠিক এক মাস আগে নভেম্বরে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়। হাতিয়া ভোলা এবং সামুদ্রিক উপকুলে ঘুর্নিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসে একদিনে ১০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হলে নির্বাচন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ন্যাপ ( ভাসানী) নির্বাচন বর্জন করে। বঙ্গবন্ধুর দৃড়তায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  


    পাবনায় নামাজের সময়সূচি
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ০৩:৪১
    সূর্যোদয়ভোর ০৫:১১
    যোহরদুপুর ১১:৫৯
    আছরবিকাল ১৬:৩৯
    মাগরিবসন্ধ্যা ১৮:৪৭
    এশা রাত ২০:১৭
© All rights reserved 2019 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!