বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০১:৫৫ পূর্বাহ্ন

স্মৃতিতে অম্লান পাবনার ২ কৃতি সন্তান

আজ ৪ আগস্ট পাবনার দুই কৃতি সন্তানের চলে যাওয়ার দিন। নিউজ পবানর জন্য স্মৃতি চারণমূলক লেখা লিখেছেন সাংবাদিক এবিএম ফজলুর রহমান ও বেগম নূরজাহান নবী।

আজীবন সংগ্রামী, কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু, ভুট্রা আন্দোলনের বিপ্লবী, খাপড়া ওয়ার্ডের আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ আমিনুল ইসলাম বাদশার আজ ২১তম মৃত্যুবার্ষিকী

।। এবিএম ফজলুর রহমান ।।

আজীবন সংগ্রামী, কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু, ভুট্রা আন্দোলনের অন্যতম বিপ্লবী, খাপড়া ওয়ার্ডের আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ আমিনুল ইসলাম বাদশা। আজ ৪ আগষ্ট তার ২১তম মৃত্যুবার্ষিকী বার্ষিকী।

১৯২৯ সালের ১৪ এপ্রিল পাবনা শহরের কৃষ্ণপুর মহল্লায় আমিনুল ইসলাম বাদশার জন্ম। তাঁর পিতার নাম আলহাজ্ব নুরুজ্জামান শেখ। মাতার নাম খবিরন নেছা। তাঁর পত্নীর নাম নীলুফা ইসলাম। তাঁর একপুত্র ও দুইকন্যা। তাঁর পাঁচভাই এক বোনের মধ্যে বর্তমানে জীবিত আছেন দুই ভাই।

আমিনুল ইসলাম বাদশা

১৯৯৮ সালের ৪ আগষ্ট ঢাকার হলিফ্যামিলি হাসপাতালে নেয়ার পথে তিনি মারা যান। পরদিন পাবনার আরিফপুর গোরস্থানে তাঁর মরদেহ দাফন করা হয়।

আমিনুল ইসলাম বাদশা পাবনা গোপালচন্দ্র ইনষ্টিটিউশনের ছাত্র থাকাকালে কৈশোরে ১৯৪৩ সালে প্রয়াত জননেত্রী বেগম সেলিনা বানু ও কমরেড প্রণতিকুমার রায়ের সাথে একই সঙ্গে ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন এবং ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন।

তখন চলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম উঠেছে তুঙ্গে-অবিভক্ত বাংলাদেশে তখন ৫০ এর মম্বন্তরের পদধ্বনি। আমিনুল ইসলাম বাদশা বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ উৎখাতের জন্যে, ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্যে, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ও দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ আন্দোলনে অংশ নেন।

অতঃপর পাকিস্তান আন্দোলনের নামে সৃষ্ট উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধ আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৪৭ এর ৪ঠা নভেম্বর পাবনার ঈশ্বরদীতে অনুষ্ঠিত যুব সম্মেলনে, রাজশাহীর প্রখ্যাত নেতা আতাউর রহমানের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠিত হয়, তাতে উপস্থিত ছিলেন আমিনুল ইসলাম বাদশা।

১৯৪৮ সালের গোড়ার দিক থেকেই গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্র“য়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাংলা ভাষা বিষয়ক প্রস্তাবনা মুসলীমলীগ সরকারের বিরোধিতায় নাকচ হয়ে গেলে পাবনার সচেতন প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।

১৯৪৮ এর ২৬ ফেব্রুয়ারি তারিখে সর্বদলীয় সভায় রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। আমিনুল ইসলাম বাদশা রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এর যুগ্ম আহবায়ক নির্বাচিত হন। ২৭ ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারে ১৯৪৮ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি পাবনা শহরে হরতাল পালিত হয়। প্রশাসনের জারী করা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে পাবনা শহরে ছাত্র জনতার মিছিল নামে। সেই মিছিলে নেতৃত্বদানকারীদের একজন ছিলেন আমিনুল ইসলাম বাদশা।

ঐ দিন পুলিশ আমিনুল ইসলাম বাদশাসহ ৬৪ জনকে গ্রেপ্তার করলেও আন্দোলনের মুখে ঐ দিনই আদালত মুক্তি দিয়ে দেন সকলকে। এর দুইদিন পর আবার গ্রেপ্তার হন ও আবার ছাড়াপান।

১৯৪৮ এর ১১ মার্চ সারা পাকিস্তানে ডাকা সাধারণ ধর্মঘট বা হরতাল সর্বাত্মক ভাবে পালিত হয় পাবনায়। এর পর পরই পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়। উল্লেখ্য ভাষার দাবীতে ১৯৪৮ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি এর হরতাল স্বাধীন পাকিস্তানের প্রথম হরতাল প্রায় সাড়ে ৪ বছর একটানা বিনা বিচারে আটক থাকার পর ১৯৫৩ সালের, ডিসেম্বরে মুক্তি পান।

এই দফায় আটক থাকাকালে ১৯৫০ এর ২৪ এপ্রিল রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে আটক রাজবন্দীদের উপর জেল পুলিশের নির্মম গুলি বর্ষণে ৭জন বিপ্লবী রাজবন্দী শহীদ হন এবং অবশিষ্ট ৩০ জনেরও অধিক গুরুতরভাবে আহত হন-আমিনুল ইসলাম বাদশা তাদের অন্যতম।

মৃত্যুর দিন পর্যন্ত বুলেট তাঁর পায়ের ভেতরে থেকে গিয়েছিল। তিনি তাঁর পায়ের চিকিৎসার জন্য কোনপ্রকার রাষ্ট্রীয় বা দলগত সুযোগ সুবিধাও গ্রহন করেননি।

কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে ১৯৫৩ সালে বন্দী মুক্তিসহ মুসলিমলীগ বিরোধী নানা আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন পরিচালনার জন্য গঠিত পাবনা জেলা গণতান্ত্রিক কর্মী শিবিরের যুগ্ম আহবায়ক পদে নির্বাচিত হন।

নির্বাচনী অভিযান চালানো কালে ৫৪ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি তাঁকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়-নির্বাচনে মুসলীমলীগের ভরাডুবি হলে একমাস পর মুক্তি পান। এর দু’মাস পর ৯২ (ক) ধারা জারি করে যুক্তফ্রন্ট নেতা শেরে বাংলা এ,কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে গঠিত পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক সরকারের বাতিল করার সাথে সাথে পুনরায় গ্রেপ্তার হন। দেড় বছরেরও অধিককাল পর ১৯৫৫ সালের শেষ দিকে মুক্তিলাভ করেন।

১৯৫৭ সালে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠনের পর তিনি ন্যাপে যোগ দেন।

১৯৫৮ সালে আইয়ুবের সামরিক শাসন জারির পরপরই গ্রেপ্তার হন এবং প্যারোল মুক্তি পেয়ে তিনি বিবাহ করেন। ১৯৬০ সালের শেষের দিকে ‘‘আপত্তিকর’’ পুস্তক রাখার অভিযোগে সামরিক আইনে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। একমাস পর তিনি জামিনে মুক্তি পান।

এই সময় কালে পাবনার শহরের বেনিয়াপট্টিতে পাবনাতে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ধারার বিকাশ ও নিজের আয়ের জন্য বইয়ের দোকান ‘বইঘর’ স্থাপন করেন। পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি প্রগতিশীল চিন্তাচেতনা সমৃদ্ধ চিরায়ত ধারার পুস্তক ও প্রকাশনা প্রাপ্তির একটি মাধ্যম হিসেবে বইঘর হয়ে উঠেছিলো সাংস্কৃতিক বিকাশের কেন্দ্রবিন্দু গুলির একটি।

১৯৬৪ সালে সার্বজনীন ভোটাধিকারের দাবিতে ন্যাপ-আওয়ামীলীগের যৌথ আন্দোলনের সময় গ্রেপ্তার হন-১ বছর পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান।

১৯৬৭ সালে পাবনার ঐতিহাসিক ভুট্টা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিষাক্ত আটার রুটি খেয়ে মৃত্যুর কারনে পাবনা হয়ে উঠেছিলো বিক্ষেভের ও বিস্ফোরনের নগরী। এই বিক্ষোভে নেতৃত্ব দানকারীদের একজন ছিলেন তিনি। পুলিশের হাতে আবারও গ্রেপ্তার হন জননেতা ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, আমজাদ হোসেনসহ অন্যান্য নেতাদের সাথে।

১৫ টি মামলা হয় তাঁর বিরুদ্ধে। ১৯৬৯-র ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে অংশ গ্রহণ করেন এবং পুনরায় গ্রেপ্তার হন। দু’সপ্তাহ পর সকলের সাথে মুক্তিলাভ করেন।

১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদের, নির্বাচনে ন্যাপ মনোনীত প্রার্থী হিসাবে অংশনেন। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে পাবনা জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে গঠিত হাইকমান্ডের তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট সদস্য। একই বছর ১০ এপ্রিল পাক-বাহিনী কর্তৃক পাবনা পুন:র্দখলের পর কলকাতা গমন করে তিনি মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে আত্মনিয়োগ করেন।

মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে প্রবাসী সরকারের সাথে রাজনৈতিক সংযোগের পাশাপাশি বিভিন্ন ক্যাম্প পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার ও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চ মহলে তাঁর প্রাক্তন রাজনৈতিক সহকর্মীগনের অনেকে থাকায় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার, মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন ক্যাম্প শরণার্থী শিবির প্রভৃতির সহন সমন্বয় সাধনে তিনি গুরুত্বর্পূন ভুমিকা রাখেন।

কেন্দ্রীয় মুক্তি সংগ্রাম সহায়ক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটিতে সমন্বয়ক হিসাবে কাজ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগর, করিমপুর, শিকারপুর, কেচুয়াডাঙ্গা, মুর্শিবাদ প্রভৃতি ক্যাম্প পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখেন।

বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে খাদ্য ঔষুধ ও রসদ সরবরাহের ব্যবস্থা করেছেন। ভারত সরকারের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন্ ক্ষেত্রে ত্রান সামগ্রী সরবরাহ নিশ্চিত করেছেন।১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাবনা সদর এলাকা ন্যাপ মনোনীত প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

১৯৭৫ এ বঙ্গবন্ধু নেতৃত্বে গঠিত একমাত্র জাতীয় দল বাকশালের পাবনা জেলা কমিটির অন্যতম যুগ্ম সম্পাদক পদে মনোনীত হন।

১৯৭৫ এর ১৫ই আগষ্টে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের সপরিবারে শহীদ হওয়ার ঘটনায় তিনি সাংঘাতিক ভাবে মর্মাহত ও ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হন। আত্মগোপনে চলে যান। ১৯৭৬-এর মার্চে বিশেষ ক্ষমতা আইনে গ্রেপ্তার এবং দেড় বছর পর হাইকোর্টে রীট আবেদনের প্রেক্ষিতে তিনি মুক্তি লাভ করেন।

১৯৭৮ সালে জাতীয়ভাবে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি গঠিত হয় তিনি ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং পাবনা জেলা শাখার সভাপতি।

১৯৭৮ সনে ন্যাপের বিভক্তির পর তিনি দলীয় রাজনীতি হতে দূরে থাকেন। ১৯৭৯-এর পাবনা পৌরসভা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ন্যাপ প্রার্থী হিসাবে অংশ গ্রহণ করেন।

পরবর্তীতে ৮২-৮৩ সালে ন্যাপ পুনরেএকত্রীকরণ প্রক্রিয়ায় অংশ গ্রহণ করেন এবং ঐক্য ন্যাপের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও পাবনা জেলা কমিটির সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮৯ সালে ন্যাপ পুনরায় বিভক্ত হলে প্রয়াত জননেতা সৈয়দ আলতাফ হোসেনের নেতৃত্বে গণতন্ত্রী পার্টি গঠন করেন এবং তার সভাপতি মন্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন। আমৃত্যু তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত থেকে জাতীয় রাজনীতিতে অবদান রাখেন।

তিনি সামরিক শাসন ও স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী রাজনীতির ঐক্য গড়তে তিনি প্রানপণ কাজ করে গেছেন।

১৯৯০ এর পর ঘাতক দালাল নির্মুল জাতীয় সমন্বয় কমিটির কার্যক্রমে তিনি আত্মনিয়োগ করেন। তিনি অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল রাজনীতির ঐক্যের মাধ্যমে এদেশে কল্যাণকামী রাজনৈতিক ধারা সৃষ্টির পক্ষে কাজ করে গেছেন।

মনে প্রাণে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আমিনুল ইসলাম বাদশা আজীবন সমাজতন্ত্রের সমর্থক ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল মার্কসবাদ-লেলিনবাদের প্রতি বৃটিশ ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ এই তিন পর্বেই তিনি কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্য হিসাবে কাজ করে গেছেন। সমগ্র বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলায় তিনি অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্তে তিনি গণফোরাম, গণতন্ত্রী পার্টি, গণ আজাদী লীগ, কমিউনিষ্ট কেন্দ্র ও বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের শরীক দলগুলিসহ ১১ দলীয় ঐক্য গঠনের মাধ্যমে দেশের রাজনীতিতে একটি প্রগতিশীল বিকল্প ধারা সৃষ্টিতে আত্মনিয়োগ করেন।

কালো টাকা, বেআইনী অস্ত্র ও মাস্তানী প্রভাবিত প্রচলিত রাজনীতির তিনি ছিলেন ঘোর বিরোধী। গাড়ী, বাড়ী, ব্যাংক ব্যালেন্স, ব্যক্তিগত বৈভব ও আরাম আয়েশের প্রতি মোহগ্রস্থ হননি তিনি কখনো।

বর্তমানে আমিনুল ইসলাম বাদশার ছোট দুই ভাই জীবিত আছেন- রবিউল ইসলাম রবি (সাংবাদিক) ও জহুরুল ইসলাম মুকুল (ব্যবসায়ী)। মেঝোভাই সিরাজুল ইসলাম আফসার, আজিজুল ইসলাম মন্টু (ব্যবসায়ী) ও ছোট বোন মেরী মারা গেছেন।

আমিনুল ইসলাম বাদশার বড় মেয়ে নাজমা ইসলাম স্বপ্না, স্বামী ইয়ার খান তপন (আইনজীবি) একপুত্রের (সাদমান ইয়ার খান সৌমিক) জননী, বর্তমানে ঢাকায় বসবাস করছে।

ছোট মেয়ে ইসমত আরা কনা স্বামী মাহমুদ হাসান টুটুল (প্রখ্যাত মুসলিম পথিকৃত চিত্রশিল্পী কাজী আবুল কাশেমের পুত্র) এক কন্যা অনন্যা ও পুত্র তামিমসহ বর্তমানে কানাডার টরেন্টোতে বসবাস করছে।

আমিনুল ইসলাম বাদশার একমাত্র ছেলে সাবিরুল ইসলাম বিপ্লব পেশাগত জীবনে বিসিএস ক্যাডারের যুগ্মসচিব বর্তমানে মন্ত্রীপরিষদ বিভাগে কর্মরত। স্ত্রী লুবনা আফরোজ লুসি, পুত্র আযওয়াদ ফাইরাজ ইসলাম সময় ও মা নীলুফা ইসলামসহ বর্তমানে তার সঙ্গে ঢাকায় বসবাস করছেন।

লেখক : এবিএম ফজলুর রহমান, স্টাফ রির্পোটার, দৈনিক সমকাল, পাবনা অফিস।

‘আলোর পথের মানুষ প্রফেসর মুহম্মাদ নুরুন্নবী’

।। বেগম নূরজাহান নবী।।

লিখতে বসে ভাবছি, যাঁকে নিয়ে লিখবো আমার সাহস কোথায়? না জানি ভাষা, না জানি লেখার কোন কায়দা- কৌশল। চিরকাল আমি যে একজন আটপৌরে গৃহিণীই থেকে গেলাম! কোনদিন লেখার চেষ্টাও করি নাই। বই পড়েছি প্রচুর। শরৎ, বঙ্কিম, নজরুল, রবীন্দ্রনাথ – যতো বই উনি এনে দিয়েছেন, সবই প্রায় পড়েছি।

কিশোরী বয়স পার করে যৌবনে পা দিয়েই মনে মনে একজন মানুষের ছবি এঁকেছিলাম। যখন শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত উপন্যাস পড়তে শুরু করি, তখনই আমার স্বপ্নের মানুষটি মনের ভিতর ধীরে ধীরে বেড়াতে উঠতে লাগলো। একজন সহজ – সরল মানুষ অথচ অসীম জ্ঞানের প্রদীপ আর যিনি পুরোপুরি ভাবে আমার উপর নির্ভরশীল।

আমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল। সত্যি আমার উপর সম্পূর্ণ ভাবে নির্ভরশীল ছিলেন। শিশুর মতো সরল ছিলেন তিনি। মা যেমন সন্তানকে একটু একটু করে গড়ে তোলে, আমিও তাঁকে খাউয়ে দিতাম, শার্টের বোতাম লাগিয়ে দিতাম, মোজা – জুতা পরিয়ে দিতাম, টাই বেঁধে দিতাম। কত খুশি হতেন তিনি !

বই আর পড়া এই দুটি জিনিস নিয়েই ছিল তাঁর জগত। তিনি যখন লিখতেন, আমি পাশে বসে থাকতাম। উনি বলতেন,” লেখার সময় তুমি পাশে থাকলে লেখাটা ভালো হয় নূরজাহান”! ওনার মতো ভাষার দখল আমার নাই, লেখালেখি তেমন করিও নাই কখনো। তবু মনে হয় তাঁকে নিয়ে লিখি একটু। হয়তো তিনি খুশি হবেন।

বাচ্চু ভাই, বাদশা ভাইকে নিয়ে লিখলেন তিনি। রণেশ দাদা বেঁচে থাকতেই তাঁর জীবনী লিখলেন তিনি। আমি পাশে এলেই বলতেন, সবাইকে নিয়ে তো আমি লিখলাম, আমাকে নিয়ে কে লিখবে বলতো ? আমি শুধু নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম আর ভাবতাম, তাইতো কে লিখবে তাঁকে নিয়ে ? তাঁর উপর কলম ধরা তো আমাদের সাধ্যের বাইরে ।

আমাদের বিয়ে হয় ১৯৬৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর। উনি অনার্স ১ম বর্ষের ছাত্র, আমি এসএসসি পরীক্ষার্থী। সে সময়ের বাবারা এভাবেই বিয়ে দিতেন। মনে পড়ে সেই দিনের কথা। সকাল ৯.০০ টায় বিয়ে পড়ানো হলো, উনি ২.০০ টার বাস ধরে রাজশাহী চলে গেলেন। কেউ কাউকে চিনতেও পারলাম না, কোন কথাও হলো না?

চলে যাবার ঠিক ২০ থেকে ২৫ দিন পর আমার আব্বার কাছে একটা চিঠি আসলো। চিঠি খোলার কিছুক্ষণ পর আব্বা আমাকে ডেকে এক টুকরো কাগজ আমার হাতে দিয়ে বললেন, তোমার জন্য দোয়া পাঠিয়েছে, নাও পড়। আমি হাতে নিয়ে পড়লাম। লেখা ছিলো :

১. ইক্বরা বিসমি রাব্বিকল্লাজি খালাক্ব
২. খালাকাল ইনসানা মিন আলাক্ব
৩. ইক্বরা ওয়া রাব্বুকাল আকরামুল্লাযী আল্লামা বিলক্বালাম
৪. আল্লামাল ইনসানা মা লাম ইয়া’লাম।

সুরা আল আলাক এর কয়েকটি আয়াত। এই আমার জীবনে তাঁর দেয়া প্রথম আশীর্বাদ বা চিঠি। এভাবেই আমাদের সংসার যাত্রা শুরু হলো।
তাহেরপুর কলেজ থেকে তাঁর চাকরি জীবনে শুরু হয়। তবে বেশিদিন তাহেরপুর থাকেন নি তিনি।

গনি ভাই মাস খানেক পরই তাঁকে পাবনা নিয়ে আসেন। এইবার শুরু হলো তাঁর প্রকৃত কর্ম জীবন। তৎকালীন ইসলামিয়া কলেজকে প্রতিষ্ঠিত করতে গনি ভাই আর তিনি উঠে পড়ে লাগলেন।

পরবর্তীতে এই ইসলামিয়া কলেজকেই শহীদ বুলবুল কলেজ নামে নামকরণ করা হয়। তাঁর ধ্যান.জ্ঞান ,চিন্তা, চেতনা সবই ছিল এই কলেজকে ঘিরে।

বাসায় এসেই বসতেন বই নিয়ে। বিছানার চারপাশে থাকতো বই আর উনি থাকতেন মাঝখানে। খাবার কথাও ভুলে যেতেন। আমি কোন সময় এসে বলতাম, নামাজের সময় হয়েছে। তখন উনি নামাজ পড়তে উঠতেন। সেই ফাঁকে আমি খাবার থালা নিয়ে আসতাম।

নামাজ শেষ হলে বলতাম, তুমি পড় আমি খাউয়ে দেই। ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতাম ভাতের থালা নিয়ে, বই এর পাতা থেকে কখন মুখ তুলবেন সেই আশায়।

পড়া ছাড়া কোন কিছুই তাঁকে আকৃষ্ট করতে পারতো না। বাবা, মা, ভাই. বোন. ছেলে মেয়ে – সবার জন্য ছিল তাঁর অগাধ ও অকৃত্রিম ভালোবাসা। সবাইকে নিয়ে ভাবতেন তিনি।

তাঁর চিন্তা ভাবনা সবার থেকে আলাদা। তিনি বলতেন, নিজের কষ্ট বা দুঃখের কথা কাউকে বলতে নাই, এতে নিজের কষ্ট কমে না বরং অন্যকে যন্ত্রণা দেয়া হয়।

তিনি নিজে এটা খুব মানতেন। কাউকে সহজে বলতেন না তাঁর অসুবিধার কথা। চলে যাবার একদিন আগে হঠাৎ আমাকে বললেন, দেখো, আমি তোমাকে কোন কষ্ট দিব না, শুধু তোমাকে কেন কাউকেই কোন কষ্ট দিব না। কোন সময়ও দিব না।

তিনি তাঁর কথা রেখেছেন। কাউকে কষ্ট দেননি তিনি। সময়ও দেননি। নীরবে চলে গেছেন।

লেখক : বেগম নূরজাহান নবী, প্রয়াত প্রফেসর মুহাম্মদ নুরুন্নবীর সহধর্মিনী।


    পাবনায় নামাজের সময়সূচি
    ওয়াক্তসময়
    সুবহে সাদিকভোর ০৪:২৮
    সূর্যোদয়ভোর ০৫:৪৬
    যোহরদুপুর ১১:৫২
    আছরবিকাল ১৬:১৬
    মাগরিবসন্ধ্যা ১৭:৫৯
    এশা রাত ১৯:২৯
© All rights reserved 2019 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!