শুক্রবার, ১৭ অগাস্ট ২০১৮, ০৭:৪০ পূর্বাহ্ন

‘স্মৃতিতে অম্লান শহীদ মাওলানা কসিমুদ্দিন’

।। এবিএম ফজলুর রহমান।।

স্মৃতিতে অম্লান শহীদ মাওলানা কুসিমুদ্দিন। ১০ জুন পাবনাবাসীর জন্য শোকাবহ দিন। ১৯৭১ সালের এদিনে পাবনার সর্বজন শ্রদ্ধেয় লোক শিক্ষক, জেলা স্কুলের হেড মওলানা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মওলানা কসিমুদ্দিন আহমেদকে পাক হানাদার বাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করে।
শ্রদ্ধায় ভালোবাসায় সিক্ত তাঁর অগণিত ছাত্র ও ভক্ত আজও তার বিদেহী রুহের মাগফেরাত কামনায় দিনটি বিশেষভাবে পালন করে থাকেন।

১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ২ মার্চ মওলানা কসিমুদ্দিন আহম্মদ বৃহত্তর পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহকুমার উল্লাপাড়া থানায় জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন মহিউদ্দিন আহমদ। তাঁরা ছিলেন পাঁচ ভাই এক বোন।

তালগাছি মাইনর স্কুল থেকে তার শিক্ষা জীবন শুরু। পরে তার পিতার ইচ্ছায় ভর্তি হন মাদ্রাসায়।
১৯৩৪ সালে সিরাজগঞ্জ ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা থেকে ফাজিল পাশ করেন এবং ভর্তি হন কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায়। ১৯৩৬ সালে পাশ করেন টাইটেল।

১৯৩৭ সালে ম্যাট্রিক পাশ করে ভর্তি হন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে। ১৯৩৯ সালে পাশ করেন আইএ। দিনাজপুর জেলা স্কুলে দ্বিতীয় মৌলভী শিক্ষক পদে যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর কর্ম জীবন শুরু হয়।

পরে হেড মৌলভী পদে পদোন্নতি লাভ করে দেশ বিভাগের পূর্বে দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি জেলায় শিক্ষকতা করেন।

১৯৪৮ সালে বদলী হয়ে আসেন পাবনা জেলায়। আমৃত্যু এখানে কেটেছে তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন।
পাবনার শিক্ষা-সামাজিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সাথে তাঁর ছিল নিবিড় বন্ধন। তিনি বয়েজ স্কাউট (উড ব্যাজ ধারী)। পাবনা জেলা স্কুল ছাড়াও, পাবনা বয়েজ স্কাউট এসোসিয়েশন, রেডক্রস সমিতি, মহিলা কলেজ, ইসলামিয়া কলেজ (সরকারী শহীদ বুলবুল কলেজ), গোপালপুর নৈশ বিদ্যালয়, জেলাপাড়া উন্নয়ন সমিতি, প্রভাতী পরিষদ, মিতালী কচি-কাঁচার মেলা, নারী কল্যাণ সমিতি, টি.বি এসোসিয়েশন, পাবনা প্রেসক্লাব, জেলা ক্রীড়া সংস্থা, পাবনা মুসলিম ইনস্টিটিউশন, আতাইকুলা-মাধপুর আমেনা খাতুন মহাবিদ্যালয় প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনার সাথে জড়িত ছিলেন।

তিনি ছিলেন একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় লোক শিক্ষক। অপ্রতিদ্বন্দ্বী সমাজকর্মী, ছাত্র দরদী শিক্ষানুরাগী এবং সর্বোপরি সংবেদনশীল একজন অভিভাবক।

পাকিস্তানী সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠা এদেশের সাধারণ মানুষের আন্দোলণ সংগ্রামের প্রতি তাঁর ছিল একনিষ্ট ও ঘনিষ্ঠ একাত্মতা।

মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ প্রদান ও ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত হানাদার মুক্ত পাবনা পরিচালনায় পুরনো টেকনিক্যাল স্কুলের দক্ষিণ ছাত্রাবাসে স্থাপিত নিয়ন্ত্রণ কক্ষের দায়িত্ব পালনের অপরাধে তাঁকে চিহ্নিত করা হয়।

১৯৭১ এর ৪ জুন সকালে তিনি বাসে করে গ্রামের বাড়ী উল্লাপাড়ার উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর পাক হানাদার বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন।

পাবনা থেকে বের হওয়ার সময় মোসলেম খাঁর তেমাথা মোড়ে মিলিটারী চেকপোস্টে তাঁকে বাস থেকে নামিয়ে নেয়া হয়। সারাদিন বসিয়ে রেখে বিকেলে নেয়া হয় শহরের নূরপুর সেনা ছাউনীতে।
চলে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন। পরে ১০ জুন, বুধবার ভোরে অপর দু’জন সঙ্গীসহ তাঁকে নেয়া হয় সাঁথিয়া থানার মাধপুরের ইছামতি পাড়ের মাইগ্রামের এক নিভৃত বাঁশ ঝাড়ে।

গুলি করে হত্যা করা হয় তাঁকে।

প্রতি বছর ১০ জুন তাই অবনত মস্তকে প্রিয় শিক্ষকের মাজার প্রাঙ্গনে হাজির হন দেশ-বিদেশে থাকা তার অসংখ্য ছাত্র, গুণমুগ্ধ। শ্রদ্ধা, ভালবাসায় সিক্ত হয়ে উঠে এই শহীদ শিক্ষকের রুহ।
শহীদ মওলানা কসিমুদ্দিন আহমদকে স্মরণ করতে তার কর্মময় স্মৃতি প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চারিত ও প্রবাহিত করতে ইতোমধ্যে অনেক কর্মসূচী বাস্তবায়িত হয়েছে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাবনা মুসলিম ইনষ্টিটিউশনের নাম পরিবর্তণ করে রাখা হয় শহীদ মওলানা কসিমুদ্দিন আহম্মেদ স্মৃতি কেন্দ্র।

১৯৭৩ সালে শহরের দক্ষিণ রাঘবপুরে পাবনা পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়টির নামকরণ করা হয় তাঁর নামে।

জালালপুরে প্রতিষ্ঠিত উচ্চ বিদ্যালয়টি নামকরণ করা হয়েছে তাঁর নামে। জেলা স্কুল প্রাঙ্গনে স্থাপিত ছাত্রাবাসটির নামকরণ করা হয়েছে তাঁর নামে। জেলা স্কুলের দক্ষিণ ঘেঁষা সড়কটির নামকরণ করা হয়েছে তাঁর নামে।

বাংলাদেশ ডাক বিভাগ শহীদ বুদ্ধিজীবী সিরিজে তাঁর স্মরণে প্রকাশ করেছে স্মারক ডাকটিকিট এবং গত বছর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মওলানা কসিমুদ্দিন আহম্মদ ফাউন্ডেশন।

পাবনার সর্বস্তরের মানুষ আজও সেই নীতিবান শিক্ষককে পরম শ্রদ্ধায় মমতায় স্মরণ করে থাকে।
এ ছাড়া পাবনা জেলা পরিষদের উদ্যোগে তার মাধপুরের কবরস্থানকে শান করে বাধাই করা হয়েছে এবং কবরস্থানের সৌন্দর্য বর্ধন করা হয়েছে। উদ্যোগে নেওয়া হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির। এ ছাড়া তার ভক্ত ও ছাত্ররা তার স্মৃতি ধরে রাখতে অব্যাহত প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন।

শহীদ মাওলানা কসিমুদ্দিন আহমদের ৪৭তম শাহাদত বার্ষিকী উদযাপনে ব্যাপক কর্মসূচী নেয়া হয়েছে।

১০ জুন রোববার শহীদ মাজার ইছামতি নদী তীরে মাইবাড়িয়া গ্রামে পবিত্র কোরআন খতম, মিলাদ মাহফিল ও বিশেষ মোনাজাতের আয়োজন করা হয়েছে।

এ ছাড়া শহরের উপকন্ঠ জালালপুরে প্রতিষ্ঠিত মওলানা কসিমুদ্দিন মাহম্মদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ে পবিত্র সবিনা খতম, শহীদের জীবন ও কর্মের উপর আলোচনা সভা এবং মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।

লেখক : এবিএম ফজলুর রহমান, প্রধান সম্পাদক, বার্তা সংস্থা পিপ, পাবনা।


© All rights reserved 2018 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!