সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৫:৪৪ অপরাহ্ন

হিমু ও রূপা

প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের দুই অনবদ্য সৃষ্টির নাম হিমু ও রূপা। বাংলা সাহিত্য পাঠকের বিশাল অংশ হিমু, রূপাকে ধারণ করে চলেছে নিরন্তর। হলুদ পাঞ্জাবির হিমু আর নীল শাড়ির রূপা সাদা পাতায় কালো কালিতে আটকে থাকেনি, পাঠক মনের অন্তরালে করে নিয়েছে স্থান। উদাস হিমু আর হিমুর অপেক্ষায় ক্লান্তিহীন রূপাকে নিয়ে লিখেছেন সারাহ্‌ দীনা

হিমু, নামটা শুনতেই চোখে ভেসে ওঠে উদাস এক যুবকের মুখ। তপ্ত দুপুরের প্রখর রোদেও যে খুঁজে পায় জ্যোৎস্না। মহাপুরুষ হওয়ার দুর্গম পথের যাত্রী। জাগতিক কোনো কিছুর প্রতি আকৃষ্ট না হওয়ার উপদেশ যে পেয়েছে স্বঘোষিত মহাপুরুষ গড়ার কারিগর বাবার কাছে। গল্পের বইয়ের চরিত্রদের জনপ্রিয়তা নতুন কিছু নয়। বেশ কয়েকজন সৌভাগ্যবান লেখক রয়েছেন, যাদের সৃষ্টি করা চরিত্র হয়ে উঠেছে জনপ্রিয়। কিন্তু হুমায়ূনের হিমুর মতো খুব কম চরিত্রই হয়ে উঠেছে এত জীবন্ত! হিমুকে নিয়ে লেখা উপন্যাস পড়ে হিমু হতে চেয়েছে- এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে এ যুগের তরুণ, যুবক এমনকি মধ্য বয়স্কদের দলে। প্রিয় লেখকের পাঠকরা একত্র হয়েছেন বিভিন্নভাবে। নিয়েছেন বেশ কিছু উদ্যোগ। এর মাঝে একটি উদ্যোগের নাম হিমু পরিবহন। দেশজুড়ে ছড়িয়ে আছেন হিমু পরিবহনের হেলপাররা। হেলপার- এ নামেই পরিচিত হন হিমু পরিবহনের সদস্যরা। এ বিষয়ে কথা হয় হিমু পরিবহনের হেলপার আহসান হাবীব মুরাদের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘হুমায়ূন স্যারের শেষ স্বপ্ন ছিল একটি ক্যান্সার হাসপাতাল তৈরি করা। সে স্বপ্ন নিয়েই সামনে এগোচ্ছি। তা ছাড়া আরও বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম করতে চাই আমরা। গড়ে তুলতে চাই একটি লাইব্রেরি। যেখানে থাকবে বইয়ের সংগ্রহ।’ তিনি আরও বলেন, হিমু পরিবহন একটি প্ল্যাটফর্মের নাম। শুধু হিমুপ্রেমী নন, এখানে হুমায়ূন স্যারের পাঠকরা যুক্ত হতে পারবেন।’ জানতে চাইলাম সদস্যদের সম্পর্কে। জানালেন, দেশজুড়েই হিমু পরিবহনের হেলপার রয়েছেন। একসঙ্গে গত ১২ অক্টোবর তারা আয়োজন করেছিলেন জাতীয় হিমু উৎসবের।

জীবনের একটা সময়ে বাস্তবিক মায়া, চাওয়া-পাওয়াকে পেছনে ফেলে হিমু হয়ে পথ হেঁটে বেড়িয়েছেন অনেকেই। হলুদ পাঞ্জাবি খুঁজে বেড়িয়েছেন দোকানে দোকানে। শেষ পর্যন্ত হলুদ কাপড় কিনে ফরমায়েশি দর্জির কাছ থেকে তৈরি করে নিয়েছেন পকেট ছাড়া পাঞ্জাবি। কারণ, হিমু হতে হবে যে। হিমু যেহেতু বাস্তবিক লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে, তাই বিনিময়ে সে বিশ্বাসী নয়। পণ্যের বিনিময়ে অর্থ প্রদানে অনাগ্রহী একজনের কাছে পকেট অযাচিত বাহুল্য হিসেবে বিবেচিত হবে এটাই স্বাভাবিক। হিমু হতে চাওয়ার ইচ্ছার প্রবল প্রমাণ আমরা দেখেছি এক সকালে, যে সকালে হিমুর স্রষ্টাকে শেষবারের মতো নিয়ে আসা হয়েছিল শহীদ মিনারে। ভিন্ন বয়সের অযুত-নিযুত ভক্তকে আমরা দেখেছি হলুদ পাঞ্জাবি গায়ে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে। হ্যাঁ, নীরবে। হিমুদের যে নির্লিপ্ত হতে হয়। আবেগ তো নয় তাদের জন্য। এমনটাই লিখে গিয়েছিলেন হিমুর বাবা। ময়ূরাক্ষি বইয়ে তেমনটাই লেখা আছে। ‘মহাপুরুষ হতে হবে যার, তাকে কি আর কান্না মানায়!’

জ্যোৎস্না নিয়ে প্রচণ্ড আবেগ আমরা দেখতে পাই হিমুর মাঝে। জঙ্গলে শুয়ে জ্যোৎস্না দেখার অনুভূতির তীব্রতা আমরা জানতে পেয়েছি তার কাছ থেকে। পুরো রাতজুড়েই জ্যোৎস্না রূপ বদলায়, এ কথা আগে কেউ বলেনি সেভাবে। হিমুর বয়ানে প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ জানিয়ে গেছেন। জ্যোৎস্না নিয়ে এমন উন্মাদনা ছড়িয়ে গেছে হাজার হিমুপ্রেমীর মাঝে। সোডিয়াম বাতি অপছন্দ হিমুর। জ্যোৎস্না রাতে সে সব সময় চেয়েছে নিভে যাক সব কৃত্রিম বাতি। এই আকাঙ্ক্ষা শুধু হিমুর মনেই কি? শহরের পথ হেঁটে যেতে যেতে যখন চোখ পড়ে যায় পূর্ণিমার চাঁদের দিকে, কী অদ্ভুতভাবে দীর্ঘশ্বাস অনুভূত হয় বুকের খুব গভীরে। খুব করে মন চায় সব বাতি নিভে যাক। চাঁদের আলোয় পুরো শহরের আলোকিত রূপ মাদকতা ছড়াক। ফিনিক ফোঁটা জ্যোৎস্না জন্য অজান্তেই মন কেমন করে।

রোদ উপভোগ নিয়েও হিমুর অনুভূতি প্রবল। খাঁ খাঁ রোদে অনিশ্চিত পথ হেঁটে যাওয়ার ভাবালুতা হিমু ছড়িয়ে দিয়েছে হাজার প্রাণে। খালি পায়ে ক্লান্তিহীন পথ হেঁটে প্রখর রোদকে জ্যোৎস্না ভেবে নিতে পেরেছে হিমু।

হিমুর একটা নিজস্ব নদী আছে। যার নাম ময়ূরাক্ষি, যা শুধু হিমু একাই দেখতে পায়। লোডশেডিংয়ের রাতে প্রচণ্ড গরমের রাতে সেই নদীর কাছেই হিমু খুঁজতে চেয়েছে এক টুকরো প্রশান্তি।

প্রিয় বন্ধু মজিদের বাবার জন্য আবেগ দেখে, আজন্ম মায়া কাটাতে চাওয়া হিমু আদৌ মায়া কাটাতে পারছে কি-না- সে প্রশ্ন নিজেই অনুভব করে।

রূপা… হিমু আর রূপাকে নিয়ে লেখা পড়তে পড়তে অনেকেই যেমন হিমু হতে চেয়েছে, তেমনি রূপাও হতে চেয়েছে অনেকে। বারবার আশাহত হয়েও যে আশা করা যায়, আমরা তা দেখেছি রূপার চোখে। বহুদিন নিখোঁজ থাকা হিমুর হঠাৎ টেলিফোনে প্রচণ্ড খুশি রূপা হিমুর চাওয়া অনুযায়ী তৈরি হয়েছে বারবার। টেলিফোনে নীল শাড়ি আছে কি-না জানতে চেয়েছে হিমু। বলেছে, রূপাকে নীল শাড়ি পরে বারান্দায় এসে দাঁড়াতে। বাড়ির নিচের পথ ধরে হেঁটে যেতে যেতে একঝলক দেখবে সে রূপাকে। নিখুঁতভাবে তৈরি হয়েছে রূপা বারবার। নীল শাড়ি পরে, চুল বেঁধে নিয়ে, চোখে কাজল বুলিয়ে কী অধীর অপেক্ষায় অপেক্ষারত রূপাকে দেখেছি আমরা। কী অদ্ভুত অনিশ্চয়তাতেও নিশ্চয়তা খুঁজে পেয়েছে সে হিমুর ডাকে। বাবার বারণ, শাসন তাকে আটকে রাখতে পারেনি কখনও। হিমুর নীলপদ্ম সে রূপাকে দিতে পারেনি। কারণ মহাপুরুষরা কাউকে নীলপদ্ম দিতে পারে না। কিন্তু রূপা যে তার নীলপদ্মের সব ক’টাই হিমুকে দিয়েছিল, সে কথা পাঠকমাত্রই অনুভব করেছেন।

হুমায়ূন আহমেদের হিমু আর রূপাকে নিয়ে লেখার মুগ্ধ পাঠক ঈশিতা পায়েল। তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, রূপার কথা ভেবে তার কার মুখ চোখে ভাসে। উত্তরে তিনি বললেন, ‘কিশোরী বয়সে আমার মুখ, আরেকটু বড় হওয়ার পর প্রেমপাগল কোনো মেয়ের কথা, এখন এই পূর্ণ বয়সে বাস্তববাদী অথচ রোমান্টিক আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখা কোনো মেয়ের মুখ মনে হয়।’

হুমায়ূনপ্রেমীদের মধ্যে বেশিরভাগই রূপা হতে চেয়েছেন জীবনের কোনো একটা সময়ে। অপেক্ষা করতে চেয়েছেন দিনভর। সব যুক্তির বাইরে ভাবতে চেয়েছেন জীবনকে। চেয়েছেন, হিমু খালি পায়ে, হলুদ পাঞ্জাবি পরে হেঁটে যেতে যেতে বারান্দায় তাকে দেখে একঝলক হাসুক।

সাদা কাগজে কালো কালির দুটি চরিত্র কী অদ্ভুত আবেগ নিয়ে মিশে আছে আমাদের জীবনে। মাঝেমধ্যে তাই এ শহরে হিমু আর রূপার দেখা মেলে। হলুদ পাঞ্জাবি আর নীল শাড়িতে দু’জনকে আজও হেঁটে যেতে দেখা যায়। কখনও দেখা যায় হলুদ পাঞ্জাবির হিমুকে সোডিয়ামের আলোয় দূরে চলে যেতে। রূপাদের দেখা যায় একা বারান্দার কার্নিশ ধরে অপেক্ষা করতে। রূপার অপেক্ষার প্রহর শেষ হয়েছে কি-না জানা নেই, হিমু টেলিফোনে দেওয়া কথা রেখেছে কি-না জানা নেই।


বিজয় নিশান উড়ছে ঐ…

© All rights reserved 2018 newspabna.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!