শুক্রবার, ০৭ মে ২০২১, ০৬:১৩ পূর্বাহ্ন

করোনার সবশেষ
করোনা ভাইরাসে বাংলাদেশে গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু বরণ করেছেন ৬১ জন, শনাক্ত হয়েছেন ১ হাজার ৯১৪ জন। আসুন আমরা সবাই আরও সাবধান হই, মাস্ক পরিধান করি। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখি।  

আমার জাদু কথা বলে না কেন!

।। মাসুদ পারভেজ ।।

শিরোনাম পড়ে কিছু কি ভেবেছেন? কী? না, এটি কোন প্রেমের লেখার প্রারম্ভ নয় আর এখানে ‘জাদু’ কোন কপোত বা কপোতির নিজেদের ভেতরে ডাকা আদরের নামও নয়। এই ‘জাদু’র নাম মোহাম্মদ রেজা। সে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাসিন্দা। প্রথমত সে মানুষ। তারপর কারো সন্তান। কারো প্রিয় বন্ধু, কারো স্বপ্নের পুরুষ, কারো স্বজন এবং সবশেষে সে বাঁশখালীতে নির্মাণাধীন কয়লা-বিদ্যুৎ কেন্দ্রের শ্রমিক। এই ‘জাদু’ তার মায়ের ডাকা আদরের, গভীর ভালোবাসার নাম। তার মা হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে, সবটুকু আদর দিয়ে, সবটুকু আবেগ দিয়ে তাকে জাদু জাদু বলে ডাকছিলো, তার নিথর দেহের উপর বসে। ‘জাদু’ তার মমতাময়ী মায়ের পৃথিবীর সবচেয়ে আবেগঘন ডাকেও সারা দেয়নি।

খবর পড়েছেন, চট্টগ্রামের বাঁশখালীর? গত ১৭ই এপ্রিল সেখানে এস আলম গ্রুপের নির্মাণাধীন কয়লা-বিদ্যুৎ কেন্দ্রে শ্রমিক আন্দোলন হয়। সে আন্দোলনে মোহাম্মদ রেজা মারা গেছে। সে মারা গেছে তারই করের টাকায় কেনা বন্দুকের গুলিতে। সে মারা গেছে তারই অধিকার আদায়ের আন্দোলন করতে গিয়ে। হাজার বছরের অধিকার।

ক’দিন বাদেই ১লা মে। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। ঘটা করে দিবসটি সারা বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও পালন হবে। শ্রমিক দিবসের ইতিহাস অল্প বিস্তর সবাই জানেন তবু প্রসঙ্গের কারণে খুব সংক্ষেপে অবতারণ করি। আজ থেকে ১৩৫ বছর আগে ১৮৮৬ সালের ১লা মে, আমেরিকার শিকাগো শহরে সে সময়ের সবথেকে বড় শ্রমিক আন্দোলন হয়। আন্দোলনের কারণ ছিলো মূলত দৈনিক আট ঘন্টা কাজের দাবি। পূর্বে শ্রমঘন্টার কোন নির্ধারিত সময় ছিলো না। একেক কারখানায় একেক নিয়ম। সে সময় দিনে সর্বোচ্চ ১৮-২০ ঘন্টা পর্যন্তও কাজ করতে হত একজন শ্রমিককে। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্যই মূলত বৃহত্তর আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে যার ফলাফল মে দিবস। পুলিশের সাথে সংঘর্ষে সেই আন্দোলনে শ্রমিক-পুলিশ সহ বেশ কয়েকজন মারা যায়। এককথায় শ্রমিক তখন ছিলো দাস আর মালিক ছিলো প্রভু।

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতেও আন্দোলন হয়েছে শ্রমিক আর পুলিশের! আন্দোলনের কারণ কী? জানেন? পবিত্র রমজানে কর্মঘন্টা ৯ ঘন্টা থেকে কমিয়ে ৬ ঘন্টা করা। শুক্রবারে শ্রমঘন্টা ৪ ঘন্টা করা। প্রতিমাসের ৫ থেকে ১০ তারিখের মধ্যে বেতন দিয়ে দেয়া এবং ইফতার ও সাহ্রির সময় বিরতি দেয়া। কোন দাবিটি অযৌক্তিক বলতে পারেন?

শ্রমিকদের দাবি ছিলো রমজান মাসের কারণে শ্রমঘন্টা ৯ ঘন্টা থেকে কমিয়ে ৬ ঘন্টা করা। তার মানে ওখানে প্রতিদিন ৯ঘন্টা কাজ করতে হয়। অনেকের অভিযোগ আছে ১০ ঘন্টাও নাকি কাজ করতে হয়। ১৩৫ বছর আগে ৮ ঘন্টা কাজের দাবিতে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শ্রমিক আন্দোলন হয়েছিলো, ১৩৫ বছর পরে এসেও আমরা দেখছি ৮ ঘন্টার বেশি শ্রমঘন্টা। শুক্রবার আমাদের সাপ্তাহিক ছুটির দিন, সব কিছু এমনিতেই বন্ধ। শ্রমিক হওয়াতে তারা কী স্বাভাবিকতার ঊর্ধ্বে? ওখানকার শ্রমিকদের ভাষ্যমতে তারা এখনো মার্চ মাসের বেতন পাননি। এপ্রিলের ১৭ তারিখে এসেও মার্চের বেতন চাইতে হয়? ইফতার আর সাহ্রির জন্য বিরতি আন্দোলনের ইস্যু হবে কেন! সে সময়তো এমনিতেই কাজ বন্ধ থাকার কথা।

পুলিশের গুলিতে ৫জন মারা গেছে আরও অনেকেই হাসপাতালে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে পুলিশ গুলি ছুঁড়েছে। একেবারে সামনাসামনি গুলি ছুঁড়েছে। সেসব গুলি গিয়ে বিঁধেছে শ্রমিকদের গলায়, বুকে, পেটে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তাদের ওই গলা দিয়ে হয়তো কখনো দেশের গান বের হয়ে আসত। কাজের ফাঁকে ফাঁকেই ওই বুকে হয়ত প্রিয়জনদের জন্য স্বপ্ন জমা হত। আর ওই মরার পেটের জন্যই হয়তো ঘরবাড়ি, আপনজন আর সমস্ত সম্পর্ক ছাপিয়ে তাদের পরিচয় হয় শ্রমিক। এইসব শ্রমিকের পূর্বপুরুষরাই হয়তো ‘হাতের মুঠোয় মৃত্যু চোখে স্বপ্ন নিয়ে’ দেশটাকে স্বাধীন করেছিলো।

খবরে জানলাম এই ঘটনায় দুটি মামলা করা হয়েছে। একটি পুলিশ বাদি হয়ে করেছে। আরেকটি করেছে এস এস পাওয়ার প্ল্যান্ট। এসব মামলায় শ্রমিক এবং স্থানীয় মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার জনকে আসামী করা হয়েছে। এর আগে ২০১৬ সালের এপ্রিলেও এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণের বিরোধিতার জের ধরে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভেও পুলিশের গুলিতে চারজন নিহত হয়েছিল। কি বুঝলেন! শ্রমিক এখনো দাস আর মালিক প্রভু।

এটা বা এ ধরণের ঘটনাগুলো আমাদের উন্নয়নের ভেতরের কঙ্কাল নয়তো! শ্রমিক দিবসের প্রাক্কালে এ ধরণের একটি ঘটনা দেশের নীতি নির্ধারকদের কতটা ভাবিত করবে জানিনা তবে সাধারণ জনগনকে সম্ভবত খুব একটা নাড়া দেয়নি। দিনের ভেতর সবচেয়ে বেশি সময় কাটানো যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক জুড়ে দেখলাম করোনায় দু-একজনের মৃত্যুর খবর। তবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কিন্তু ফলাও করে এই খবর প্রচার হয়েছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রার সামনে দাঁড়িয়ে যা আমাদের জন্য অবশ্যই ভালো কিছুর উদাহরণ নয়।

সভ্যতার চূড়ায় দাঁড়িয়ে আমরা চাই আর একজন মোহাম্মদ রেজাও যেনো এভাবে মারা না যায়, আর এজন মাও যেনো বুক চাপড়ে না বলে আমার জাদু কথা বলে না কেন!

লেখক- গণমাধ্যম ও সংস্কৃতি কর্মী

0
1
fb-share-icon1


শৈশব কৈশরের দুরন্ত-দুষ্টু ছেলেটিই আজকের এমপি প্রিন্স

শৈশব কৈশরের দুরন্ত-দুষ্টু ছেলেটিই আজকের এমপি প্রিন্স

শৈশব কৈশরের দুরন্ত-দুষ্টু ছেলেটিই আজকের প্রিন্স অফ পাবনা

Posted by News Pabna on Thursday, February 18, 2021

© All rights reserved 2021 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
x
error: Content is protected !!