বৃহস্পতিবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ০৪:১৫ পূর্বাহ্ন

ইমানে মুজমাল বিশ্বাসের সারমর্ম

ইমানে মুজমাল বিশ্বাসের সারমর্ম

ইমানে মুজমাল-এর বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ দুটি দিক রয়েছে। প্রথম অংশে মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিনের সত্তা ও অস্তিত্বে বিশ্বাসের ঘোষণা রয়েছে এবং বলা হয়েছে, ‘বিশ্বাস করলাম যেমন রয়েছেন তিনি স্বীয় সত্তায়, নামাবলি ও গুণাবলিসহ।’ কোরআন করিমে রয়েছে, ‘যে জন স্বর্গে ও পৃথিবীতে আছে সে–ই তাঁহার নিকটে প্রার্থনা করে, প্রতিদিন তিনি একাবস্থায় আছেন।’ (সুরা-৫৫ [৯৭] আর রহমান, রুকু: ২, আয়াত: ২৯, পারা: ২৭ পৃষ্ঠা: ৫৩৩/১১)।

দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাআলার প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্য ও তাঁর সকল হুকুম-আহকাম বা বিধিবিধান নিঃশর্তভাবে মানার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে, ‘আরও মেনে নিলাম তাঁর সকল আদেশ-নিষেধ ও বিধানাবলি।’ কোরআন মজিদে বলা হয়েছে: ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা ইসলামে পরিপূর্ণরূপে প্রবেশ করো, শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না; নিশ্চয়ই সে তোমার প্রকাশ্য শত্রু।’ (সুরা-২ [৮৭] বাকারা, রুকু: ২৫, আয়াত: ২০৮, পারা: ২; পৃষ্ঠা: ৩৩/১১)।

কালিমার বিবরণ

ইসলামের মূল কালিমা হলো ‘কালিমা তইয়্যেবা’ বা পবিত্র বাক্য। ইমানের কালিমা হলো ‘কালিমাহ শাহাদাত’ বা সাক্ষ্যবাণী। এরপর রয়েছে ‘কালিমা তামজিদ’ (মর্যাদার বাণী) ও ‘কালিমা তাওহিদ’ (একত্বের বাণী)। এগুলোকে চার কালিমা বলা হয়। এর সঙ্গে ‘ইমানে মুজমাল’ ও ‘ইমানে মুফাছছাল’ যোগ করে ছয় কালিমা বলা হয়। আবার প্রথম দুই কালিমা এবং ‘ইমানে মুজমাল’ ও ‘ইমানে মুফাছছাল’-সহযোগে চার কালিমা বলতেও দেখা যায়। কালিমা ‘রদ্দে কুফর’ ধরে প্রথম চারটিসহ পাঁচ কালিমা বলা হয়ে থাকে এবং এর সঙ্গে ‘ইমানে মুজমাল’ ও ‘ইমানে মুফাছছাল’-সহকারে সাত কালিমা হয়ে থাকে। অনেকে পাঁচ কালিমার সঙ্গে ‘কালিমা রদ্দে শির্ক’ যোগ করে ছয় কালিমা বলেন এবং ইমানে মুজমাল ও ইমানে মুফাছছালকে ইমানের কালিমাদ্বয় নামে স্বতন্ত্ররূপে অভিহিত করেন। এই আট কালিমার মধ্যে কালিমা তইয়্যেবার পরই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ কালিমা হলো ‘ইমানে মুজমাল’ বা ইমানের মর্মকথা।

কূটতর্ক সমাধানে ইমানে মুজমাল

অনেক সময় মানুষ বিভিন্ন জটিল বিষয়ে ভুল ব্যাখ্যা পেয়ে থাকে। আবার কখনো শয়তানের কুমন্ত্রণায় বিভিন্ন বিষয়ের কুটিল ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। এসব বিষয়ের শিরোভাগে রয়েছে মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিনের সত্তা ও তাঁর পবিত্র গুণাবলি এবং তাঁর অবস্থা ও অবস্থান ইত্যাদি। ইমানে মুজমালে ছোট্ট দুটি শব্দ ‘কামা হুওয়া’, অর্থাৎ ‘যেমন বা যেরূপ আছেন তিনি’ প্রয়োগ দ্বারা কুতর্কে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে এবং এ ধরনের যাবতীয় বিতর্ক এড়ানোর প্রতি সতর্ক ইঙ্গিত করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা কোরআন করিমে বলেছেন: ‘তোমাদের সামান্য জ্ঞানই দেওয়া হয়েছে।’ (সুরা-১৭ [৫০] ইসরা/বনি ইসরাইল, রুকু: ১০, আয়াত: ৮৫, পারা: ১৫; পৃষ্ঠা: ২৯১/৯)। মানুষের সসীম জ্ঞানে অসীম আল্লাহকে ধারণ করা বা যথার্থরূপে বোঝা দুরূহ ব্যাপার। ইমানে মুজমাল আমাদের শেখায় বিতর্ক পরিহার করে, অসীম কুদরতের অধিকারী মহান আল্লাহর সমীপে নিজের সসীম সত্তাকে সমর্পণ করতে।

সর্বোপরি আল্লাহ তাআলার সর্বোত্তম গুণাবলি ও তাঁর সুন্দরতম গুণসম্পন্ন নামসমূহের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহর সত্তা সাধারণ মানুষের জন্য দুর্বোধ্য বিষয় বিধায় তাঁর কুদরতি ক্ষমতাসম্পন্ন গুণবিশিষ্ট নামসমূহ চর্চার কথা বলা হয়েছে। হাদিস শরিফে এসেছে: ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাআলার নিরানব্বইটি নাম রয়েছে, যে এগুলো আত্মস্থ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (তিরমিজি শরিফ)। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘তোমরা আল্লাহর সত্তা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা, আলোচনা-পর্যালোচনা কোরো না; বরং তাঁর গুণাবলি এবং তাঁর সৃষ্টি নিয়ে ভাবনা-চিন্তা, আলোচনা-পর্যালোচনা করো।’ (বুখারি শরিফ ও মুসলিম শরিফ)।

ইমাম আযম আবু হানিফা (রা.) বলেন: যে সকল বিষয়ে কোরআন ও হাদিসে অস্পষ্টতা রয়েছে এবং তার কোনো দৃশ্যমান যৌক্তিক ও নিশ্চিত ব্যাখ্যা আমাদের জানা নেই, সে বিষয়ে নীরবতাই সমাধান। (শারহুল আকায়িদ আন নাসাফি)। সুতরাং ‘মুতাশাবিহাত’ বা অস্পষ্ট বিষয়গুলোর যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা না থাকলে মোমিনের অবস্থান হবে ‘যেমন আছেন তিনি, যেরূপে আছেন তিনি; তেমন ও সেরূপেই বিশ্বাস করি।’ (তানজিমুল আশতাত)। এই বিশ্বাস হলো গায়েব বা অদৃশ্যের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। যা কোরআনে বলা হয়েছে: ‘তারা মুত্তাকিন মোমিন, যারা গায়েব তথা না দেখা বিষয়ে ইমান আনে বা বিশ্বাস করে।’ (সুরা-২ [৮৭] বাকারা, রুকু: ১, আয়াত: ৩, পারা: ১; পৃষ্ঠা: ৩/১)।

ইমান ও আমলের পূর্ণতায় ইমানে মুজমালের ভূমিকা

ইমানে মুজমাল নামের এ কালিমা দ্বারা একটিমাত্র বাক্যের মাধ্যমে ইমানের পরিপূর্ণতা সাধিত হয় ও ইসলামের সম্পূর্ণতা বিধান হয়। কারণ, ইমান হলো মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) কর্তৃক আনীত আল্লাহ তাআলার সকল আদেশ-নিষেধ ও বিবরণ বিশ্বাস করা এবং ইসলাম হলো সে অনুসারে জীবনযাপন বা আমল তথা কর্ম করা। এ কালিমায় উক্ত উভয়টি ব্যাপক অর্থে ঘোষণা করা ও স্বীকার করা হয়েছে। প্রথম অংশে বলা হয়েছে, বিশ্বাস করলাম আর দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে, মেনে নিলাম। শর্তহীন ও সরল এ বাক্য ইমান ও ইসলামের ষোলো আনা পরিপূর্ণ করে। এর বিপরীত হলে তথা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) কর্তৃক আনীত আল্লাহ তাআলার কোনো একটি আদেশ বা নিষেধ অমান্য বা অস্বীকার করলে ও কোনো বিবরণ অবিশ্বাস করা হলে, তা হবে কুফর; যা ইমানের পরিপন্থী এবং সে অনুসারে আমল বা কর্ম না করলে তা হবে ফাসিকি বা পাপাচার। মহাগ্রন্থ আল কোরআনে মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন: ‘তোমরা কি এ গ্রন্থের কিছু বিশ্বাস করো আর কিছু অবিশ্বাস করো? তবে যারা এরূপ করে তাদের দুনিয়াতে লাঞ্ছনা ও কিয়ামত দিবসে কঠিনতম সাজা পাওয়া ব্যতীত আর কোনো বিনিময় নেই; তোমরা যা করো সে বিষয়ে আল্লাহ বেখবর নন।’ (সুরা-২ [৮৭] বাকারা, রুকু: ১০, আয়াত: ৮৫, পারা: ১; পৃষ্ঠা: ১৪/১২)।

ইমানের কালিমাসমূহ আমাদের জীবনে মূল সূত্রের মতো কাজ করে। আমরা যদি এগুলো বুঝে, সে অনুপাতে জীবন পরিচালনা করি; তবেই আমাদের জীবনে ইমান বিকশিত হবে, ইসলাম পত্রপল্লবে সুশোভিত হবে। আমরা ইমানের স্বাদ পাব এবং ইসলামের সুফল উপভোগ করতে পারব। তাই আমাদের উচিত কালিমাগুলো পূর্ণরূপে জানা এবং তার মর্মার্থ অবগত হওয়া ও তার মূল ভাব অনুধাবন করে সে চেতনা স্বীয় জীবন ও কর্মে রূপায়ণ ও বাস্তবায়ন করা। এটাই ইমানের দাবি, এটাই মোমিনের কর্তব্য।

মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী: যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি, সহকারী অধ্যাপক, আহ্‌ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম

smusmangonee@gmail.com


© All rights reserved 2020 ® newspabna.com

 
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!