ঈশ্বরদীতে অনুমোদনহীন করোনা পরীক্ষা : দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মিলছে নানা তথ্য

ঈশ্বরদী, পাবনা : পাবনা সিভিল সার্জন অফিসের অনুমতি না নিয়েই কিংবা ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে না জানিয়েই স্থানীয় রূপপুর মেডিকেয়ার কীভাবে করোনার নমুনা সংগ্রহ কিংবা রিপোর্ট দিয়েছে, তার অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর বিভিন্ন তথ্য।

এদিকে, রূপপুর প্রকল্পের কাজে যুক্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট দেওয়ার অভিযোগে মেডিকেয়ারের মালিক গ্রেপ্তার হলেও এখনও অব্যাহত রয়েছে আলোচিত এই ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কার্যক্রম।

তবে বন্ধ রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পিসিআর ল্যাবে করোনা পরীক্ষা।

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুরে অবস্থিত মেডিকেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কোনো অনুমোদন না থাকার পরও করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য ‘নমুনা’ সংগ্রহের অনুমতি দেয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ।

গত ১৭ জুন কলেজটির অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. শফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত একটি প্রত্যয়নপত্রে এ অনুমতি দেওয়া হয়।

সরকারি অনুমোদন না নিয়ে করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা করার অভিযোগে মেডিকেয়ারের মালিক আবদুল ওহাব রানাকে গ্রেপ্তারের পর এ তথ্য বেরিয়ে আসে।

গত বুধবার রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. আবু সাইদ ও রানার সহযোগী সুজন আহমেদের বিরুদ্ধে ঈশ্বরদী থানায় মামলা হয়।

মামলার বাদী ঈশ্বরদী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ফিরোজ হোসেন মামলার এজাহারে উল্লেখ করেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরত ৫০ জনের নমুনা সংগ্রহ করে গত ৬ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজে জমা দেওয়া হয়।

মেডিকেয়ারের মালিক রানা করোনা পরীক্ষা করাতে জনপ্রতি পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা নিতেন। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের শ্রমিক-কর্মকর্তাদের নমুনা সংগ্রহের জন্য প্রকল্প এলাকার পাশেই একটি পরিত্যক্ত ইটভাটার মাঠে তাঁবু টানিয়ে বুথ স্থাপন করেন তিনি।

নমুনা দানকারীদের মেডিকেয়ার ক্লিনিকের পক্ষ থেকে জানানো হতো, সংগ্রহ করা নমুনা ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজের পিসিআর ল্যাবে পরীক্ষা হবে। নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট আসত অনলাইনে। সেই কপি প্রিন্ট করে দেওয়া হতো।

রিপোর্টগুলোতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পক্ষে চেয়ারম্যান ডা. আবু সাইদের স্বাক্ষর আছে।

নিয়ম অনুযায়ী, নমুনা সংগ্রহ ও রিপোর্ট দেওয়ার কথা সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলোর। সিভিল সার্জনের অনুমতি সাপেক্ষে নমুনা নির্ধারিত পিসিআর ল্যাবে যাবে।

রিপোর্টও সিভিল সার্জন কার্যালয় কিংবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাধ্যমে সংগ্রহ করতে হবে। কিন্তু এসব নিয়মের কোনো তোয়াক্কা না করেই রূপপুর মেডিকেয়ার ক্লিনিকের পরিচালক অবৈধভাবে করোনার নমুনা সংগ্রহ করে হাতিয়ে নিয়েছেন কয়েক লাখ টাকা।

এদিকে, মামলার তিন দিন পর গত ১১ জুলাই থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থাপিত পিসিআর ল্যাবে সাময়িকভাবে করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে।

এ ব্যাপারে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ডা. মো. আবু সাইদ বলেন, পিসিআর ল্যাবের প্রধান প্রফেসর জাকিউর রহমান এবং সমন্বয়কারী ডা. মো. আতিকুর রহমান করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ায় পিসিআর ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে।

ঈশ্বরদী থানার উপপরিদর্শক এসআই মো. ফিরোজ হোসেনের মামলায় আসামি করা হয়েছে ঈশ্বরদীর মেডিকেয়ারের মালিক আবদুল ওহাব রানা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. আবু সাইদ ও তাদের সহযোগী নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার নাটাবাড়িয়ার সুজন আহমেদকে।

আবদুল ওহাব রানাকে গ্রেপ্তার করা গেলেও ডা. আবু সাইদ ও সুজন আহমেদকে এখনও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আসমা খান বলেন, পাবনা ও ঈশ্বরদী উপজেলাতেই যেখানে নমুনা সংগ্রহ করার কিট বা অ্যাম্পুলের তীব্র সংকট, সেখানে অনুমোদনহীন রূপপুর মেডিকেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার কীভাবে করোনার নমুনা সংগ্রহ করে বা রিপোর্ট দেয়, তা সন্দেহজনক।

ঈশ্বরদী থানার অফিসার ইনচার্জ শেখ মো. নাসীর উদ্দীন জানান, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের মোট ১৭০ জন শ্রমিকের করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করেছে মেডিকেয়ারের মালিক রানা।

রূপপুর প্রকল্পে শ্রমিক-কর্মচারীদের করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। তাই রূপপুরের মেডিকেয়ার সরাসরি ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে কোটি টাকার বাণিজ্য করার ফাঁদ পাতে।

পূর্বপরিচিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. আবু সাইদের যোগসাজশে আবদুল ওহাব রানা এই দুর্নীতি-অনিয়ম করেন।