ঢাকাশনিবার , ২০ জুলাই ২০১৯

এই ভরা বর্ষায় পানি নেই পাবনার ইছামতি নদীতে

News Pabna
জুলাই ২০, ২০১৯ ১০:২১ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বিশেষ প্রতিনিধি : দেশের বন্যা পরিস্থিতি যখন প্রতিদিন সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে সে সময় পাবনা শহরের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত এক সময়ের স্রোতস্বিনী ইছামতি নদীতে পানি নেই!

অর্থাৎ এই ভরা বর্ষায় পানি নেই ইছামতি নদীতে।

গত ২০১৭ সালের ২৩ আগস্ট ইছামতি নদীতে নৌকার শোডাউন করা হয়েছিলো। প্রায় ৩০ বছর পর ইছামতি নদীতে আসা পানিতে নৌকা ভাসিয়ে সেদিন ‘ইছামতি বাঁচাও পাবনাকে বাঁচাও’ স্লোগানে নদীপাড় মুখরিত হয়ে ওঠেছিলো।

সেই সময় পদ্মা নদীর পানি বাড়ার কারণে এবং পাউবো পদ্মার মুখে নদীতে দেয়া স্লুইসগেটের পাল্লা খুলে দেয়। এতে ৩০ বছর পর ইছামতি নদীতে দেখা দিয়েছিল স্রোত।

এতে করে এক সপ্তাহের মধ্যে নদীতে জমে থাকা দুই যুগের কলঙ্ক ধুয়ে মুছে যায়। এর আগে ১৯৮৮ সালের বন্যায় ইছামতি নদীতে পানির দেখা পাওয়া গিয়েছিলো।

অবশ্য ২৩ আগস্টের নৌ র‌্যালির পরের সপ্তাহেই আবার আগের মতো শুকিয়ে যায় ইছামতি নদী।

ইতিহাস বলছে, বাংলার নবাব ইসলাম খাঁ ১৬০৮-১৬১৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে সৈন্য পরিচালনার সুবিধার্থে পদ্মা ও যমুনা নদীর সংযোগ স্থাপনার্থে পাবনার মধ্য শহরে একটি খাল কাটেন, যার নাম দেন ইছামতি।

এক সময়ের খরস্রোতা এই নদী দিয়ে চলতো নৌকা-ছোট জাহাজ। এই নদী দিয়েই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার নিজস্ব বোটে শাহজাদপুর আসা-যাওয়া করতেন।

কিন্তু সেই স্রোতস্বিনী প্রবাহমান ইছামতি তার যৌবন হারিয়ে আজ মৃত প্রায়। অস্তিতই বিপন্নের পথে।

মধ্য শহরে প্রবাহিত ইছামতি নদীকে এখন সবাই আক্ষেপ করে বলেন ‘ময়লা আবর্জনার ভাগাড়’ বা ‘পৌরসভার ড্রেন’।

নদীর দুই পাড় দখল করে বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মহোত্সব চলছে। শহরের সকল বাসা বাড়ি, হাটেল রেস্তোরাঁর আবর্জনা, ক্লিনিকের যাবতীয় বর্জ্য পদার্থ ও আবর্জনা ফেলা হচ্ছে নদীতে।

স্লুইস গেট দিয়ে পানি আটকে পরিকল্পিতভাবে নদীকে মেরে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

অব্যাহত দূষণের ফলে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছে জেলা শহর ও এর আশ-পাশের কয়েক লাখ মানুষ।

পাবনা থেকে বেড়া পর্যন্ত ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদীর প্রায় অর্ধেক এখন নর্দমা। এর মধ্যে পৌর এলাকার মধ্যে রয়েছে পাঁচ কিলোমিটার।

বর্তমানে উত্স মুখের কাছে (বাংলা বাজারে স্লুইস গেট) প্রায় ভরাট করে ফেলায় এ নদী হয়ে পড়েছে প্রাণহীন। ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত ইছামতি নদীতে পানি প্রবাহ ছিল।

এ নদী পাবনার উত্তর প্রান্ত দিয়ে পূর্বে আতাইকুলার পাশ দিয়ে নদীরূপে এগিয়ে গেছে। সাঁথিয়া সদরের পাশ দিয়ে বেড়া সদরের বৃ-শালিখা এলাকার হুরাসাগর নদীতে গিয়ে মিশে যমুনায় মিশেছে।

১৯৭৮ সালে পাবনা সেচ ও পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু করার সময় ইছামতির সাথে বড়াল নদের সংযোগ মুখে নির্মাণ করা হয় স্লুইস গেট। এ ছাড়া বেড়ার কাছেও ইছামতির প্রান্তখাত বন্ধ করে দেওয়া হয়।

বেড়া থেকে আতাইকুলা পর্যন্ত প্রায় ৩৫ কিলোমিটার ইছামতি পুনঃখনন করা হয়। বেড়া পাম্প হাউজের সাহায্যে খননকৃত অংশের নদীতে ভরে পানি রাখা হচ্ছে সেচ কাজের জন্য।

কিন্তু অবশিষ্ট ২০ কিলোমিটার নদী ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। শহরের নর্দমাগুলোর চেয়ে ইছামতির তলদেশ উঁচু হয়ে উঠেছে। দখল হয়ে গেছে নদীর কিনারা।

১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ডিএস মৌজা ও ম্যাপ অনুযায়ী ২০০৫ সালে সর্বশেষ জরিপ কাজ চালায় জেলা প্রশাসন। সেই জরিপের তথ্য হিসেবে, নদীর উত্সমুখ সদরের চর শিবরামপুর থেকে পাবনা পৌর এলাকার শালগাড়িয়া শ্মশানঘাট পর্যন্ত দীর্ঘ ৫ কিলোমিটারব্যাপী সাতটি মৌজায় নদীর পাঁচ হাজার বর্গফুট এলাকা বেদখল হয়ে গেছে।

বিভিন্ন স্থানে ১২০ থেকে দুই’শ ফুট প্রস্থের ইছামতি নদী এখন দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭০ থেকে ৮০ ফুটে। নদীর পাড় দখল করে বসবাস করা অবৈধ দখলদারদের সংখ্যা ২৮৪ জন।

২০০৫ সালে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’ ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে নদীর কিছু খনন ও পরিষ্কারের কাজ করে।

এ ছাড়া ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় নদী খননের জন্য প্রায় ২৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়।

প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় দুই কোটি টাকা বরাদ্দে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু বর্জ্য অপসারণ ও অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করা হলেও তা আর শেষ হয়নি।